গভর্নর্স আইল্যান্ডে জান্নাত সুলতানারচিত্র প্রদর্শনীতে || পুনরাবিস্কারের প্রত্যাবর্তনের সুর

ড. জীবন বিশ্বাসঃ বাংলাদেশী—আমেরিকান চিত্রশিল্পী জান্নাত সুলতানার একক চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সম্প্রতি গভর্নর্স আইল্যান্ডের ১৬ নোলান পার্কে। ট্রাস্ট ফর গভর্নর্স আইল্যান্ডের অর্গানাইজেশন্স ইন রেসিডেন্স কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশী আমেরিকান আর্টিস্ট ফোরামের আর্টিস্ট ইন রেসিডেন্স কর্মসূচি বিটুইন রিভান এন্ড হারবর: স্টোরিজ দ্যাট ক্যারি আস—এর অংশ হিসেবে এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

দীর্ঘদিন হৃদয়ের মধ্যে বহন করেও যে শিল্পের কাছে নিয়মিত ফেরা হয়নি, একদিন তার কাছে ফিরে আসার মধ্যে এক বিশেষ আকুতি থাকে। তুলির হাত যেন মনের আগেই পুরনো পথ চিনে নেয়। পরিচিত দৃশ্যও তখন নতুন চোখে দেখা দিতে শুরু করে। জান্নাত সুলতানার একক প্রদর্শনীর অন্তর্নিহিত সুরটি যেন এই পুনরাবিষ্কারের। নদী, জল, ফুল, আকাশ, ঘর, নৌকা, বৃক্ষ ও দৈনন্দিন বস্তু তাঁর ছবিতে নিবিড় দৃষ্টির স্পর্শে আবার দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

জান্নাত সুলতানার শিল্পশিক্ষা ও সৃজন—অভিজ্ঞতার পরিসর বিস্তৃত। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় স্নাতকোত্তর এবং শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে কারুশিল্পে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। সূচিকর্ম, বাটিক, বাঁধাই—রং, চামড়ার কাজ, তাঁতবস্ত্র, অ্যাপ্লিক, নকশা, লেখালেখি ও কবিতা আবৃত্তিÑবহু মাধ্যম তাঁর সৃষ্টিজীবনের অংশ। দীর্ঘদিন তাঁর শিল্পসাধনা ছিল অনিয়মিত। তাই বর্তমান কাজগুলোকে নিছক স্মৃতিকাতরতা নয়, বরং দেখার ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের এক শিল্পভাষা বলে মনে হয়। তবে তাঁর কাজকে বোঝার প্রথম পথ প্রবাসী পরিচয় নয় বরং ছবিগুলোর নিজস্ব স্বভাব—সংযত, পর্যবেক্ষণমুখী এবং নাটকীয়তার প্রতি অনাগ্রহী।

এই শিল্পভাষার জন্য প্যাস্টেল বিশেষভাবে উপযোগী। এর গুঁড়োময় কোমলতা রেখার প্রান্ত ঝাপসা করতে পারে, রংকে উচ্চকণ্ঠ ঘোষণার বদলে মৃদু আবেশে স্থির রাখতে পারে, আর দৃশ্যের চারদিকে কুয়াশার মতো আবহ তৈরি করতে পারে। স্মৃতি যেমন সচরাচর কঠোর সীমারেখায় ফিরে আসে না, জান্নাতের প্যাস্টেলও তেমনি দৃশ্যকে সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট না করে অনুভবের জন্য কিছু অবকাশ রেখে দেয়।

‘সানরাইজ’ (প্যাস্টেল, ১২দ্ধ১৮ ইঞ্চি)—এ ম্লান নীল আবহের বিপরীতে বাম দিকে ঘন হয়ে উঠেছে লালচে পত্রপল্লব। দূরের আলো জল ও দিগন্তের ব্যবধানকে খুব সামান্যই স্পষ্ট করেছে। সকাল এখানে বিস্ফোরিত হয় নাÑধীরে ধীরে পরিস্ফুটিত হয়। আবছা আলো স্থানিক বিভাজন নরম করে দেয়, ফলে সূর্যোদয়কে প্রত্যক্ষ দৃশ্যের চেয়ে স্মৃতির মধ্য দিয়ে ফিরে আসা আলোর মতো মনে হয়।

‘রিভারসাইড’ (প্যাস্টেল, ১২দ্ধ১৮ ইঞ্চি)—এ দৃশ্যটি উন্মুক্ত হয়ে যায় দূরের দিকে। সামনের অংশে লাল, হলুদ ও সবুজ ফুলের ঘন উপস্থিতি; তার ওপারে বিস্তৃত নীল জল ও আকাশ, দূরে ছোট নৌকা। ডান পাশের গাঢ় স্থাপত্যরেখা ছবিতে আশ্রয়ের অনুভূতি সৃষ্টি করে, অথচ দিগন্ত ডেকে নেয় অসীমতার দিকে। এই নিকট ও দূরের টানাপোড়েনই ছবিটির আবেগগত কাঠামো। শিল্পীর শৈশব ও জীবনের সঙ্গে বুড়িগঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলী, কীর্তনখোলা এবং পরে হাডসন নদীর সম্পর্ক রয়েছে; তবু ছবিটিকে কোনো নির্দিষ্ট নদীর প্রতিরূপ বলা সমীচীন নয়। এখানে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হলো অন্তরঙ্গ আশ্রয় থেকে দূরের দিকে তাকানোর অভিজ্ঞতা।

‘প্রহিবিশন’ (কোলাজ, ১২দ্ধ১৪ ইঞ্চি)—যা পৃথক প্রহিবিশন পিরিয়ড কাজটির সঙ্গে এক নয়Ñসম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্যব্যাকরণ হাজির করে। আলোকচিত্রের খণ্ড, রেখামূলক আকৃতি ও একটির ওপর আরেকটির চাপ তৈরি করা স্তর ছবির পরিসরকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আগের ভূদৃশ্যগুলোর মসৃণ আবহ এখানে অনেকটাই অনুপস্থিত। এক ছবি আরেকটিকে বাধা দেয়; চোখ একটি স্থির বয়ানে আশ্রয় পায় না। নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক অর্থ আরোপ না করেও বলা যায়, বিচ্ছিন্ন অংশ জোড়া দেওয়ার এই প্রক্রিয়ায় বাধা, অনিশ্চয়তা কিংবা ভাঙা স্মৃতির অনুভূতি তৈরি হয়েছে।

চৎড়যরনরঃরড়হ প্রহিবিশন যেখানে বিচ্ছিন্ন করে, স্যাংচুয়ারি (প্যাস্টেল, ১২দ্ধ১৮ ইঞ্চি) সেখানে যেন সমবেত করে। ফুলের তোড়া, দেয়ালের একটি ফ্রেম, বাদ্যযন্ত্রের কীবোর্ড এবং মৃদু নীল অন্দরপরিসরÑসব মিলিয়ে নির্মিত হয়েছে নীরব গৃহস্থ স্থিরতা। ছবিটির শক্তি কোনো বৃহৎ প্রতীকে নয়, বরং থেমে থাকার মধ্যে। শিরোনামের সূত্র ধরে এই ঘরকে একটি মানসিক ও সৃজনশীল আশ্রয় হিসেবে পড়া যায়Ñযেখানে সংগীত, চিত্র, স্মৃতি এবং পরিচিত বস্তু পরস্পরকে নিঃশব্দে ধারণ করে।

‘দ্য স্কাই’ (প্যাস্টেল, ৯দ্ধ১২ ইঞ্চি)—এ রং আরও প্রত্যক্ষভাবে আবেগের কাঠামো নির্মাণ করেছে। নীল—বেগুনি বৃক্ষ ও পাতাহীন শাখার মধ্য দিয়ে দীপ্ত গোলাপি—কমলা দিগন্ত দেখা যায়; নিচের প্রতিফলিত আলো সেই আবহকে আরও প্রসারিত করে। এখানে প্রকৃতির আক্ষরিক রং থেকে শিল্পী সরে এসেছেন অনুভূতির রঙের দিকে। এটি কোনো নির্দিষ্ট স্থানের দলিল নয়, বরং রূপান্তরের একটি মুহূর্তÑযখন বাইরের ভূদৃশ্য ধীরে ধীরে অন্তরের আবহে পরিণত হয়।

ক্লে ভেস, জেসমিন, উডস, ডাকস, পার্পল ভেস, ভেস উইথ ফ্লাওয়ার, হেরিটেজ, স্নো ইয়ার্ড এবং হ্যাপি ফেস—এর মতো অন্যান্য কাজ তাঁর দৃষ্টির বিস্তার সম্পর্কে ধারণা দেয়। বস্ত্র, নকশা ও কারুশিল্পের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা হয়তো পৃষ্ঠতল, বিন্যাস, রঙের স্তর এবং হাতে তৈরি বস্তুর প্রতি তাঁর বিশেষ সংবেদনশীলতার একটি সূত্র। তাঁর ক্ষেত্রে কারুশিল্প চিত্রকলার নিচের কোনো স্তর নয়; দুটিই একই স্পর্শস্মৃতির অংশ।

এই প্রদর্শনীর স্বাতন্ত্র্য লক্ষণীয়। দীর্ঘ বিরতির পর শিল্পী যেন আবার মন দিয়ে দেখার অভ্যাসটিকেই আবিষ্কার করছেন। একটি ফুল, দূরের নৌকা, একটি ঘর, আকাশের সামান্য আলো—প্রতিটি দৃশ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ সেগুলোকে আবার নতুন করে দেখা হয়েছে। জান্নাত সুলতানার শিল্পে ফিরে আসা তাই অতীতে ফিরে যাওয়া নয়। এটি মনোযোগের কাছে ফিরে আসা—এবং চিরপরিচিত পৃথিবীকে হঠাৎ আবার দৃশ্যমান হয়ে উঠতে দেখার সেই নীরব বিস্ময়ের কাছে প্রত্যাবর্তন।

Related Posts