প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানে আবারও ত্রুটি

ঢাকা থেকেঃ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী উড়োজাহাজে আবারও ত্রুটি ধরা পড়ল। বৃহস্পতিবার টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পুশব্যাকের পর ট্যাক্সি করার সময় উড়োজাহাজটির স্পয়লারে রেড সিগন্যাল দেখায়। এতে বিমানের ভেতরেই দুই ঘণ্টার বেশি অপেক্ষার পর প্রধানমন্ত্রীসহ অন্য যাত্রীদের নামিয়ে আনা হয়। সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয় উড্ডয়ন। এ ঘটনায় বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা যাচাই ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেন ভিভিআইপি ফ্লাইট ঘিরে একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা ঘটছে তা নিয়ে শক্ত তদন্ত দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত বছর লন্ডন থেকে দেশে ফেরার ফ্লাইট বোয়িং ৭৮৭—৯ উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণে গুরুতর অনিয়ম ও নিরাপত্তাঝুঁকির তথ্য পেয়েছিল তদন্ত কমিটি। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার জাপান সফর শেষে ফেরার পথে ত্রুটি দেখা দিল প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে। এ ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে সরকারের উপর মহল। প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটির বিষয়ে সরকারের শীর্ষ মহল থেকে বিমানের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার কাছে কয়েকটি বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে—বিমানে কী ধরনের কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছিল, উড্ডয়নের আগে নির্ধারিত কারিগরি পরীক্ষায় (প্রি—ফ্লাইট চেকলিস্ট) ত্রুটি কেন শনাক্ত হয়নি এবং এ ঘটনায় বিমান কর্তৃপক্ষ কী ধরনের ব্যবস্থা নেবে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ভিভিআইপি ব্যক্তির নিরাপত্তায় এমন শৈথিল্য স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এ ধরনের ঘটনা শুধু যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয় নয়। উড্ডয়নের আগে কারিগরি পরীক্ষা যথাযথভাবে করা হয়েছিল কিনা বা আগের ত্রুটি থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়েছিল কিনা এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

বিমানের পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ধরনের ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে না দেখে পুরো রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করা উচিত। উড্ডয়নের আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে হবে। এই ফ্লাইটের প্রকৌশলী কে ছিলেন সেটিও দেখতে হবে। তিনি কেন কারিগরি ত্রুটি জেনেও ছাড়পত্র দিলেন কীভাবে— সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে আগের তদন্তে উঠে আসা অনিয়মের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন। দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে নারিতা থেকে ঢাকার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিজি—৩৭৭ ফ্লাইটটির উড্ডয়নের কথা ছিল। বোর্ডিং শেষে উড়োজাহাজটিকে টার্মিনাল থেকে পুশব্যাক করা হয়। পরে রানওয়ের দিকে ট্যাক্সি করার সময় ককপিটে স্পয়লার—সংক্রান্ত ত্রুটির সংকেত (রেড সিগন্যাল) দেখা যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে উড্ডয়নের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন পাইলট ক্যাপ্টেন ইমামুল। নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৪০ মিনিট পর ককপিট থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ফ্লাইট ছাড়তে দেরি হওয়ার কথা জানান পাইলট। এজন্য যাত্রীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। পরে উড়োজাহাজটিকে টারমাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ত্রুটি মেরামতে দীর্ঘ সময় লাগায় প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রতিনিধিদলের সদস্যরা উড়োজাহাজ থেকে নেমে যান। অন্য যাত্রীদেরও অপেক্ষার জন্য বিমানবন্দরের লাউঞ্জে নেওয়া হয়। সূত্রমতে, ফ্লাইটটির কারিগরি পরীক্ষা করে উড্ডয়ন উপযোগী হওয়ার ছাড়পত্র দিয়েছিলেন বিমানের প্রকৌশলী মো. সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া। যদিও প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের ভিভিআইপি ফ্লাইটে দায়িত্বপ্রাপ্ত সাদেকুলকে নিয়ে আগেই প্রশ্ন উঠেছিল। বিমানের অভ্যন্তরীণ দায়িত্বপত্র অনুযায়ী, বিজি—৩৭৬ ও বিজি—৩৭৭ ফ্লাইটের জন্য মনোনীত প্রকৌশলীদের তালিকায় ছিলেন সাদেকুল। তিনি ২০১৪ সালে মিসরীয় উড়োজাহাজ সংস্থা ইজিপ্ট এয়ার থেকে দুটি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়া সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলার আসামি। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ভিভিআইপি ফ্লাইটে তাকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের যাচাই করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। বিশেষ করে, সাদেকুলের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বিধিনিষেধ ছিল কিনা এবং তাকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছিল—তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিমানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের উড্ডয়ন উপযোগিতার ছাড়পত্র দেওয়ার সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায়, ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের ভূমিকা আড়ালেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি জড়িত।

এ ধরনের দায়িত্ব দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগ্যতা, অতীত কর্মকাণ্ড ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি ছিল।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শাহনূর আহমেদ ত্রুটির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় বৃহস্পতিবার জাপানের নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইটটির যাত্রা বিলম্বিত হয়।

Related Posts