ডয়চে ভেলের সংবাদ বিশ্লেষণ || বাংলাদেশে সরকার কি ব্যক্তি জীবনে হস্তক্ষেপ করছে
ডয়চে ভেলে প্রতিবেদনঃ ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশের কারণে এক নারীকে গ্রেপ্তার আর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৮৫ জন তরুণ—তরুণীকে কারাদণ্ডের ঘটনা নিয়ে সরকারের সমালোচনা চলছে। প্রশ্ন উঠছে আইন প্রয়োগের নামে সরকার কি নাগরিকের ব্যক্তিজীবনে প্রবেশ করছে?
সরকার অবশ্য এমন অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে। তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থর ভাষায়, সরকার মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করছে না। তার মতে, প্রতিটি ঘটনা আলাদা এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সংস্কৃতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই মাঠপর্যায়ের প্রতিক্রিয়া অতিরঞ্জিত হয়ে যেতে পারে। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকার ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারে বিশ্বাসী।
সাথী আক্তারের সঙ্গে যা হয়েছে
গত রবিবার দুপুরে ‘সাথী মেকওভার’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে দুটি লাইভ ভিডিও প্রচার করেন সাথী আক্তার। পাঁচ মিনিট ২২ সেকেন্ড ও ৮ মিনিট ৮ সেকেন্ডের ভিডিও দু’টিতে নিজের ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে চুরির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। একপর্যায়ে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়া আজকে আমি ভুক্তভোগী।’ ভিডিও দু’টি ছড়িয়ে পড়ার পর ময়মনসিংহের ভালুকায় স্থানীয় বিএনপির নেতা—কর্মীরা তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘেরাও করে বিচার দাবি করেন।
এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে ওই দিন রাত সাড়ে আটটার দিকে পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। থানায় ধরে নেওয়ার পর ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি ওই নারীর ফেসবুক লাইভের পুরো ভিডিও চারবার পর্যালোচনা করেছি। সেখানে সরকারবিরোধী বক্তব্য বা সরকারের সমালোচনামূলক কিছু পাওয়া যায়নি। পুরো ভিডিও না দেখেই গুজবের কারণে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে।’ তবে কোনো নাগরিক সরকারবিরোধী মন্তব্য করলেও সেটি অপরাধ কিনা সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।
তারপরও এর পরদিন ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা—সমালোচনা শুরু হলে বুধবার জামিনে ছাড়া পান তিনি।
সাথী আক্তার ভালুকা উপজেলার স্কয়ার মাস্টারবাড়ী এলাকার খাদিজা প্যালেস মার্কেটে ‘সাথী বিউটি পার্লার’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। বুধবার আদালত থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ফোনে তিনি কথা বলেন ডয়চে ভেলের সঙ্গে। নিজে বিএনপির রাজনীতি করেন উল্লেখ করে সাথী বলেন, ‘কেন আমার কষ্টটা ছিল? যে যাকে ভালোবাসে তার সাথেই তো রাগ করে, তাই না? বুঝেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি অল্প বয়স থেকে একজন নারী উদ্যোক্তা, মানে অনেক ত্যাগের সাথে ধরে রাখছি এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যা আমার নিজের সন্তানের মতো। আজকে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে একই জায়গায়, একই মার্কেটে ব্যাবসা করি। বিএনপির যখন দুর্দিন ছিল, কেউ বিএনপির নামই নিতে পারে নাই, সেই দিনে আমরা প্রথম সারিতে ছিলাম। আমাদের নেত্রীর সুস্থতার জন্য যে বাইরে পাঠানোর জন্য, সেই মিছিলে আমি ছিলাম। নিজের গাড়ি ভাড়া দিয়ে গেছি। আমার কষ্টটা কোথায়? মানে আমি ওই লাইভটা করার কারণ ছিল এইটা যে তখন তো আমরা ছিলাম সামনের সারিতে। আমি আজকে এই ২৬ সালে আইসা এত ক্ষতিগ্রস্ত হবো কেন?’
সাথী আক্তার এ সময় তার ব্যবসার সরঞ্জাম চুরি ও চাঁদাবাজির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন। বলেন, ‘কারেন্টের তার চুরি হয় জীবনেও শুনিনি৷ আমার কারেন্টের তার কেটে নিয়ে গেছে, তারপরে কিছুদিন আগে আমার আরেকটা শোরুম থেকে ৩ টন এসির তার কাইটা নিয়ে গেছে। এসির মিস্ত্রি বললো, যে আপনার ৩ কেজি গ্যাস লাগবে। তো প্রতি কেজি গ্যাসের দাম হচ্ছে ২৫০০ করে, তারপর আবার এসির তার লাগবে। দেখেন ক্ষতিগ্রস্ত আমি কোথায়! যেদিন আমি গ্রেপ্তার হইলাম সেই দিন আমি বলছি যে আমার কপাল খারাপ। আমার একটাই কষ্ট যে আমি মেয়ে মানুষ, আমি একজন ব্যবসায়ী মানুষ, তাহলে আমি যদি কোনো অপরাধ করে থাকি, আমার দেশে আইন ছিল, প্রশাসন ছিল আমাকে গ্রেপ্তার করতো, কিন্তু একজন নেতাকর্মী এসে আমার বুকে লাথি মারছে। সে আমার কাছে চাঁদা দাবি করছে।’
সাথী স্থানীয় বিএনপির দুই নেতার বিরুদ্ধে তার কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করেন। বলেন, চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাকে মারধর করা হয়েছে। তার মোবাইল কেড়ে নিয়ে গেছে তারা।
সাথীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে ডয়চে ভেলে তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থর জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একেকটা এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া একেক রকম হয়। ওইখানে ওই মহিলার ওইটা করার পর ওই লোকালিটিতে একটু যারা পলিটিক্স বা পলিটিক্সের সাথে জড়িত যারা বিএনপির সাথে, তাদের মধ্যে একটা রিঅ্যাকশন এমন ভাবে দেখা গেছে যে, এই কারণেই ওনাকে, আমি যেটা ময়মনসিংহের এসপি সাহেবের সাথে কথা বলছি, ওনাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সরকারের যদি ইল—মোটিভ থাকতো তাহলে তো ন্যাচারালি সরকার আরো ইন্টারফেয়ার করতো বা কঠিন মামলা দিত। এরকম তো কিছু না। ওইটা মেইনলি সিকিউরিটির জন্যই করা হয়েছে, বাট এটা না করলেও পারতো।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি যেটা এসপি সাহেবের সাথে কথা বলছি যে, এগুলি আরো কীভাবে অ্যামিকেবলি দেখা যায়, সেদিকে আমাদের খেয়াল করা উচিত। কারণ, আমরা প্রথম থেকেই বলছি যে ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে। এটা হান্ড্রেড পারসেন্ট আমরা এইটাকে ইন্টারফেয়ার যাতে না করি। সংবাদ মাধ্যম থেকে আরম্ভ করে যেকোনো পার্সনের ব্যক্তিগত, একটা মানুষ সরকারের পক্ষেও কথা বলতে পারে, বিপক্ষেও বলতে পারে। যে পর্যন্ত তার কথাবার্তা বা কোনো কিছু ক্রাইম হিসেবে গণ্য করা হবে না বা হয় না, সে পর্যন্ত দ্যাট ইজ নরমাল ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন।’
মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিজীবনে হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ
ময়মনসিংহ ও ঢাকার দুই ঘটনাতেই নাগরিকদের মত প্রকাশ ও ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন মানবাধিকারকর্মীরা। ঢাকায় পুলিশের অভিযানে ৮৫ জনকে গ্রেপ্তার ও সংক্ষিপ্ত বিচারে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ১০১ জন বিশিষ্ট নাগরিক। তারা আটক ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তি, ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবন, গোপনীয়তা ও মর্যাদায় হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
মানবাধিকার কর্মী ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘এখানে পুলিশ তরুণ—তরুণীদের বিরুদ্ধে যে মিডিয়া ট্রায়াল করেছে সেটা তো খুবই অন্যায় হয়েছে। এই অধিকার তো পুলিশকে কেউ দেয়নি। তারা যদি অপরাধ করে, বিচার হতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকদের ডেকে ক্যামেরার সামনে তাদের হাজির করার যে দৃশ্য আমরা দেখেছি, তাতে পুরোনো আমলের কথাই মনে করিয়ে দেয়।’
অন্যদিকে মনজিল মোরশেদ মনে করে, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সরকারের মুখের কথা ও বাস্তবতার মিল দেখা যাচ্ছে না। সাথী আক্তারের গ্রেপ্তারের ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই নারীকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে সরকার আসলে কী বার্তা দিতে চাইলো? যারা মব করেছে তাদের গ্রেপ্তার না করে ওই নারীকে গ্রেপ্তার করে সরকার আবারও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে মুখে যা বলছে, তার উলটোটা করলো। সরকার মবের বিরুদ্ধে কথা বললেও কাজে তো দেখা যাচ্ছে না। মব তো হচ্ছে। এভাবে নিজের কথা বলার কারণে যদি কাউকে গ্রেপ্তার হতে হয় তাহলে তো আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না।’
