নতুন প্রযুক্তির লাগাম কে টানবে?
ভারতসহ ইয়োরোপের রাস্তায় যখন নানা কারণে নেমে পড়েছে তরুণ—তরুণীরা, দেশে দেশে সরকারের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগের পাহাড়, তখন আগুনে ঘি ঢালার মত পৃথিবীর বৃহত্তম আইটি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট বিশ্বব্যাপী তাদের ওয়ার্কফোর্স থেকে ৬০,০০০ কমীর্কে স্বেচ্ছা অবসরের ঘোষণা দিয়েছে। মাইক্রোসফট পৃথিবীর সেরা কর্পোরেট হাউজের অন্যতম। যে কোনো তরুণ—তরুণীর সেই প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়া তাদের ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। ভাগ্যের মোড় শুধু আর্থিক কারণে নয়, সম্মান বা সামাজিক স্ট্যাটাসের দিক দিয়েও।
ভারতসহ ইয়োরোপ জুড়ে তরুণ—তরুণীদের রাস্তায় নেমে আন্দোলন করা কেবল সরকারের বিরোধিতা করার জন্য নয়, সরকার তাদের কর্মসংস্থান করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেও। আর এমন এক সময়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নামক প্রযুক্তির অভাবিতপূর্ব বিকাশ কেবল চাকরির বাজারে হিউম্যান ওয়ার্কফোর্সের জায়গা দখল করছে তাই নয়, নৈতিকতার বিষয়টিও বিশাল আকারে সামনে এসে পড়েছে। বলা হচ্ছে, মানুষের তৈরি প্রযুক্তি এইভাবে এগিয়ে গেলে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। ফলে এর নিয়ন্ত্রণের যে ব্যারোমিটার তাকে আগেভাগেই সেট করতে হবে। যন্ত্রকে অসীম ক্ষমতাশালী করে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে আগেই বিজ্ঞানীদের বা উদ্ভাবকদের কিংবা প্রযুক্তিবিদদের একটি জায়গায় থামতে হবে।
যুগে যুগে, বিশেষ করে আধুনিক গণতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতি গড়ে ওঠার প্রবণতা শুরু হলে জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয় বিংশ শতকে। কিন্তু দুটি বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বব্যবস্থাকে তছনছ করে দেয়। যুদ্ধ হতো এক সময় গোত্রে গোত্রে। তারপর দেশে দেশে। দেশের সীমান্তে, প্রধানত। কিন্তু উড়োহজাহাজ আবিষ্কার যখন জন ও পণ্য পরিবহনের পথ উন্মুক্ত করে দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে, তখন ইনফ্যান্ট্রি বা স্থলবাহিনী ও নৌবাহিনীর পাশপাশি আকাশ পথেও যুদ্ধের বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ উড়োজাহাজ বহরে যুদ্ধ বিমান যুক্ত করা হয়। সেই বিমান অন্য দেশে গিয়ে সেখানে বোমা নিক্ষেপ করে ফিরে আসে। মানুষ তখন শক্তি ও আগ্রাসনকে নতুন চেহারায় দেখে। যুদ্ধের ময়দানে স্থলবাহিনীর যুদ্ধে সাধারণত সৈন্যরাই প্রাণ হারাত। কিন্তু যুদ্ধবিমানে বোমা নিক্ষেপ করার কারণে সাধারণ মানুষের জীবন এবং সম্পদ দুই ধ্বংস হওয়া শুরু হয়। রাইট ব্রাদারদ্বয় অরভিল রাইট ও উইলবার রাইট বিমান আবিষ্কারের মাত্র ৪২ বছরের মধ্যে (প্রথম ফ্লাইট হয় ১৯০৩ সালে ১৭ ডিসেম্বর) রবার্ট আপেনহাইমারের নেতৃত্বে একদল ফিজিসিস্ট ম্যানহ্যাটান প্রজেক্টের ব্যানারে ভয়াবহ এটোমিক বোমা আবিষ্কার করে ১৯৪৫ সালের আগস্টের ৬ ও ৯ তারিখে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বিস্ফোরণ ঘটায়। যাতে প্রায় ৮০,০০০ সম্পূর্ণ বেসামরিক সব বয়সের মানুষ মৃত্যুবরণ করে তাৎক্ষণিকভাবে। আহত হয় ১৪০,০০০ মানুষ।
রাজনীতি জনগণের সেবার পরিবর্তে মানুষ হত্যার দিকেই ধাবিত হয়েছে। আর শিল্প বিপ্লবের পর যে পুঁজি সরকারকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে, তার থেকে রেহাই পাওয়ার লক্ষ্যে মার্কস ও এংগেলস যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পথনির্দেশ দেন, বিংশ শতকের প্রায় পুরোটা জুড়েই অর্থাৎ প্রায় ৭০ বছর সোভিয়েট ইউনিয়নের নেতৃত্বে তা ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব ইয়োরোপসহ বিভিন্ন দেশে। কিন্তু আমেরিকা এবং পশ্চিম ইয়োরোপের পুঁজিবাদী দেশগুলোর কূটবুদ্ধিতে ও ষড়যন্ত্রে এবং রাজনীতিকদের লোভী মানসিকতার কারণে তার বিকাশ ঘটার আগে হুড়মুড় করে ধসে পড়ে। আর এ সময়ই মুক্তবাজার অর্থনীতির থিয়োরি বিপুলভাবে আকর্ষণ করে ছোট থেকে মাঝারি ও বৃহৎ দেশগুলোকে। এই মুক্তবাজার অর্থনীতি মূলত পুঁজিবাদের নতুন মুখোশ। তার আকর্ষণ অনাবিল। সেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার মত একটি মহৎ দর্শনও পুঁজিবাদের মদিরায় তরুণদের বিভ্রান্ত করে। পুঁজিবাদী সমাজে যে ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বরূপ তাতে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতা মানুষের জীবনকে নিংড়ে তার ভেতরের সব সুকুমার প্রবৃত্তিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। পুঁজির নতুন চেহারা প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি প্রাতিষ্ঠানিকতা থেকে বেরিয়ে এসে ঢুকে পড়েছে ব্যক্তি জীবনে। যে ব্যক্তি জীবনের সব কিছু এখন নানা বয়সী মানুষ উন্মুক্ত করে দিতে চায়। ব্যক্তিজীবনের ঘাঁ—পাচড়া, লোভ—লালসা, এবং নিজেকে জাহির করার নির্লজ্জ প্রবণতা একদিকে মানুষের ব্যক্তিত্বকে পঙ্গু করে দিচ্ছে, অন্যদিকে তাকে অসম প্রতিযোগিতার মাঠে ছুেঁড় ফেলছে। মানুষ যখন এইভাবে আত্মজ্ঞানহীন বিভ্রান্ত, তখনই পুঁজিবাদ তাদেরকে অর্থের লোভ দেখিয়ে, বিনা পরিশ্রমে (কায়িক ও মেধার) অর্থ উপার্জনের লোভ দেখিয়ে কোন অনিশ্চিত পথে নিয়ে যাচ্ছে তা ভাবলে বিস্ময়ের সীমা থাকে না।
ঠিক এই সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পুঁজিবাদী দেশ এমন এক দৃষ্টান্ত তৈরির কারখানা বানিয়েছে যা কেবল হ্যামিলনের পাইড পাইপারের মত মানুষকে অনিশ্চিত গন্তব্যে ধাবিত করছে। একদিকে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার জন্য যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, অন্য দেশকে ভেঙেচুরে, সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে, জাতিকে পঙ্গু করে দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি মানুষকে দ্বিতীয় পর্যায়ে নামিয়ে এনে যন্ত্রকে তার ওপরে স্থাপন করছে। সেই সাথে দেশে দেশে কিছু মাঝারি মেধাবী মানুষকে পুরস্কার দিয়ে ভুয়া মহীরুহে পরিণত করে, নিজেদের বগলের নিচে রেখে তাদের দিয়ে স্বার্থ পূরণ করার ভোতাবুদ্ধির খেলায় মেতে উঠেছে। ফলে সেসব দেশের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা ক্রমশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দেশের ঐতিহ্য ধ্বংস করা হচ্ছে। তাবেদারদের ধুতরার রস খাইয়ে তাদের ইতিহাস পাল্টে দিয়ে নিজের স্বার্থ পুষিয়ে নিচ্ছে।
দেশে দেশে তরুণদের পথে নামার জন্য শুধুমাত্র সেই দেশের সরকারের ব্যর্থতা তা নয়, আন্তর্জাতিক বলয়ে প্রযুক্তির উত্থানও দায়ী। এই উত্থানের পিছনেও রয়েছে পুঁজির নিরংকুশ অবদান। এবং ডানপন্থার উত্থান। আর আছে সা¤্রাজ্যবাদের উসকানি, খুব সন্তর্পনে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে পুঁজির যে প্রবল শক্তি তারই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি আজকের বিশ্ব পরিস্থিতি। খুব সরল মনে বা খালি চোখে দেখলে এর ভেতরের ব্যাকটেরিয়া ধরা পড়বে না। এর পরিণতি মানবসমাজ পাবে আরো বেশ কয়েক বছর পরে, যদি না ততদিনে কেউ লাগাম টেনে না ধরে।
