পিস লিলি || বদরুন নাহার
আমার ঘরে পিস লিলি বাঁচে না! এই নিয়ে দুই দুবার চেষ্টা করলাম। শান্তির এই ঘরকুনো গাছটির কথা ডাক্তার আহম্মেদই আমাকে প্রথম বলেছিলেন। তা প্রায় পাঁচ—ছয় বছর আগের কথা।
আমার বার্ষিক ব্লাড টেস্টের রিপোর্ট সামনে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘কোথাও কোনো সমস্যা নেই, মিস সুলতানা। আপনি একদম ঠিক আছেন।’
আমি তখন ব্যাকপেইন, ঘুমের সমস্যাসহ এমন আরও গোটা পাঁচেক অসুবিধার কথা জানালাম।
তিনি বললেন, ‘আপনার লাস্ট এমআরআই, মেমোগ্রাম আর স্টে্রস টেস্টের রেজাল্টও এক্সেলেন্ট। গত ভিজিটে আপনাকে যে ব্যায়ামগুলো করতে বলেছিলাম, সেগুলো করছেন? জীবনযাপনের একটা রুটিনের কথা বলেছিলাম।’
আমি বললাম, ‘ব্যায়ামগুলো সব সময় করা হয় না। তবে নিয়মিত হাঁটছি, তাড়াতাড়ি রাতের খাবার সেরে ফেলছি। রাত দশটার পর আমার মোবাইল স্লিপ মোডে চলে যায়। রুটিন মাফিকই চলছি। এই রুটিনের জন্য পরিবার আর সমাজে আমার বেশ বদনামও রটে গেছে! কিন্তু সমস্যাগুলো তো যাচ্ছে না।’
ডাক্তার আহম্মেদ চশমার ফ্রেমের ওপর দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তারপর তাঁর চোখ গিয়ে স্থির হলো সাইড টেবিলে রাখা গাঢ় সবুজ গাছটার ওপর; সেখানে সাদা ফুলের মোড়ানো বুকে ঈষৎ ঘিয়ে রঙের পুষ্পদন্ডটির দিকে। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বললেন, ‘মিস সুলতানা, আপনি একটা পিস লিলি কিনতে পারেন। গৃহকোণে শান্তি আসলে স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে পারে। জীবনে শান্তিটা বড় জিনিস।’
সেদিনই ডাক্তারের চেম্বারে বসে গুগল করে পিস লিলি সম্পর্কে জেনে নিলাম। এর আদি নিবাস আমেরিকা আর দক্ষিণ—পূর্ব এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল। অল্প পরিচর্যায় এমন শান্তির গৃহসজ্জা আর হয় না। আমিও তো পূর্ব গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল থেকে আসা অভিবাসী মানুষ। এর চেয়ে ভালো সহচর আর কী হতে পারে আমার!
রিগোপার্কের সাবওয়ে থেকে মাথা তুলে উপরে উঠতেই ডানকিনের দরজাটা সামনে পড়েছিল, ক্যাফিনের ডাক বড় কঠিন, এড়ানো যায় না। একটা ব্লাক কফিতে ঠেঁাট ছুঁয়ে দুটো সিগন্যাল পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম আইকিয়াতে। ওদের লাল টবে ভরা কুচকুচে সবুজ পাতার শান্তির সাদা ফুল সমেত পিস লিলিটি নিয়ে এলাম ঘরে। এক মাসও টেকেনি। মরে গেল!
তারপর আমি সেই লিলিটির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। ব্যস্ত আর অনিশ্চিত শেকড়হীন জীবনে তখন নানা কিছু আঁকড়ে ধরার ব্যস্ততা। বিরক্তিতে মনে হচ্ছিল, এটাই বুঝি জীবন!
আমার প্রতিবেশী কোরিস সুয়েরো বলল, ‘মিস বাহার, তুমি চিন্তা করো। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশে তুমি আছো। পৃথিবীর রাজধানীতে থাকতে হলে তোমাকে তো দৌড়াতেই হবে, সেটাই জীবন।’
কোথায় যেন পড়েছিলাম, কোনো এক শীতে বব ডিলান প্রথমবার নিউইয়র্ক শহরে পা রেখেছিলেন। সে সময় নতুন শহর নিয়ে সে বলেছিল, নিউইয়র্কে থাকতে হলে সবার আগে পা সচল রাখতে হবে। একথা এত বছর পরও সত্যি।
কোরিসও ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে এই শহরে এসেছে। তাঁর নতুন স্বামীর সঙ্গে আগের ঘরের পুত্র আছে, এ নিয়ে কম কষ্ট পোহাতে হচ্ছে তাঁকে? যদিও তাঁর যে কষ্ট হচ্ছে, তা কিন্তু সে কখনও বলেনি। আমার চিরায়ত বাঙালি মন, সহসা আমি তাঁর কষ্ট যুক্ত করে নিয়েছি কখন! নিজেই জানি না। বা কি জানি একাধিক নারীর বা পুরুষের ঔরসে জন্মানো সন্তান নিয়ে আমাদের পরিবারগুলো অনেক আগেই ছেড়েছে, দুই—একটা ঘটনা যা বহমান তা খুব ভালো নয়। এখানে এই বিষয়গুলো খুবই স্বাভাবিক। আমি নিজেই তো একবার ভীষণ অস্বস্তিতে পড়েছিলাম, যখন আমার গাইনোকোলজিস্ট মিস রোজেলিনকে জানালাম আমার কোনো সন্তান নেই, তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার স্বামীর কি কোনো সন্তান আছে?
আমি তো অবাক! বোকার মতো তাকিয়েছিলাম তাঁর দিকে, সে দৃষ্টি দেখে তিনি কি বুঝলেন, জানি না, আরও খোলাসা করে বললেন, আপনার স্বামীর কোনো র্গাল ফ্রেন্ড..
সহসা আমি বলে উঠি, না না ডাক্তার, আপনি যা ভাবছেন তা আমাদের সমাজে হয় না। অবশ্য এরপর থেকে এসব প্রশ্ন আমাকে আর বিস্মিত করেনি।
তারপরও কোরিসের কথা ভাবলেই মনে হয়, আহা রে বেচারা, অন্যের ছেলে পালছে! কী কষ্ট! ও আমাকে বাহার বলে ডাকে, যদিও আমার নাম সুলতানা বাহার। আর আমার যে আরও একটা ডাকনাম আছে, বুলি, তা এ দেশের লোকেরা জানে না। ওটা আমি কাউকে বলি না, টিকটিকির লেজ খসে পড়ার মতো বুলি খসে পড়েছে! আমি ওটা তুলে রেখেছি পরিবারের জন্য। তো কোরিস আমার উচ্চ রক্তচাপের কথা শুনে একদিন বলেছিল, ‘কী বল, মাম্মা! তোমার তো বয়স কম। নিজের যন্ত্র নাও, জিমে যাও। একটু একটু রেড ওয়াইন খেতে পারো, শরীরের জন্য ভালো।’
সে আমার চেয়ে খুব বেশি বয়স্ক নয়। হয়তো পাঁচ বছরের মতো পার্থক্য। কিন্তু তার কথার টোনে সব সময় দাদিমাসুলভ একটা ভঙ্গি জেগে থাকে। এটা আমি দেশেও দেখেছি, কোনো কোনো মানুষ বয়স্ক মানুষের আদলে কথা বলে। সেই কোরিস একদিন চলে গেল নিউ জার্সিতে। বাসাভাড়া কম, ছেলেকে সেখানকার স্কুলে দেবে, নিজেও একটা কারখানায় চাকরি পেয়েছে। ওরা যাওয়ার সপ্তাহখানেক পরেই শুরু হলো কোভিড নাইনটিনের লকডাউন।
সেই ভয়ংকর দিনগুলোতে আমার অনেক প্রিয়জনের জীবনের বিনিময়ে নিজের মৃত্যু কামনা করতে লাগলাম। মনে হতে লাগল, আমি একা মানুষ, মারা গেলে ক্ষতি তো বেশি নয়। কিংবা কী জানি নিজের ভেতর মৃত্যু নিয়ে কোনো ভয়ই যেন কাজ করছিল না। যুদ্ধ—বিগ্রহ, কলেরা, মহামারি এসব এত দিন গল্প—উপন্যাসের বিষয় ছিল। এই প্রথম আমাদের নিজেদের জীবনে মহামারি নেমে এলো। মানুষ মানুষের নিঃশ্বাস বাঁচিয়ে চলাফেরা করছে! কারও সামনে হাঁচি—কাশি দেওয়া যেন গর্হিত অপরাধ। দেশ থেকে বন্ধু সাবিনা প্রতিদিনই ফোন করছে, আর সে—ই রকম সব খবর। সন্তানেরা বাবাকে আলাদা ঘরে ফেলে রেখেছে, ঠিকমতো খাবার দিচ্ছে না। কোনো এক গাঁয়ে বধূর মৃতদেহ নিেয়ে বাবা ও শ্বশুরবাড়ির মাঝে চলছে ঠেলাঠেলি, কেউ কবর দিতে যাচ্ছে না!
আমিও বলি, ‘শোন সাবিনা, আমেরিকার মতো জায়গায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে! হাসপাতালে গ্লাভসের অভাবে নার্স গার্বেজ ব্যাগ হাতে পেঁচিয়ে কাজ করছে! আর এটা তো বাংলাদেশ।’
সাবিনা বলত, ‘না না, সুলতানা। মানুষ কেবল অমানুষের মতো কাজ করছে না। কতজন অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে দৌড়াচ্ছে, কতজন প্রতিবেশীর দরজায় খাবার রেখে যাচ্ছে!’
সত্যিই মনে হতে লাগল, এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে যারা বেঁচে থাকবে, তারা হয়তো নতুন মানুষ হবে। প্রকৃতি চাইলে এখনও মানুষকে ধ্বংস করে দিতে পারে। সেই ভয় মানুষকে হয়তো নতুনভাবে মানবিক করে তুলবে। পৃথিবী বদলে যাবে। আমাদের দীর্ঘ ফোনালাপে সাবিনা আর আমি একমত হই। পৃথিবীতে হিংসা—বিদ্বেষ, যুদ্ধ—বিগ্রহ এরপর আর থাকবে না রে।
কিন্তু বেঁচে থাকাও তো এক যুদ্ধ। প্রথম লকডাউন উঠে যেতেই আমিও বেঁচে আছি! এই দায় মেটাতে সিভি হাতে পথে বেরিয়ে পড়লাম। বাসার অন্যরা হা হা করে উঠল। আমার নাকি মরার শখ হয়েছে!
বললাম, ‘এই চান্স! এখন অনেকেই বাড়ি থেকে বেরুবে না। শুনলে না, সেদিন মনির ভাই বললেন, তাদের কারখানায় মেক্সিকান লোকজন ছাড়া কেউ কাজে আসছে না। এই লোকের ক্রাইসিসটাতে আমার হয়ত চাকরি মিলতেও পারে।’
কিন্তু বিষয়টা অত সহজ হলো না। পথে—ঘাটে ভয়ের আবহাওয়া। একদিন বের হলে দুদিন বের হই না। হাতের সঞ্চয় কমে আসছে। করোনায় যখন বেঁচে আছি, তখন বেঁচে থাকার যুদ্ধটা তো রয়েই গেল! আজকাল নাকি নানা গ্রোসারি, চেইন শপিংমলে ঘন ঘন কর্মী সংকট হচ্ছে। কেউ একবার কোভিডে আক্রান্ত হলেই আর জবে ফিরে আসছে না, ঘরে বসে আনএমপ্লয়মেন্ট জুটে যাচ্ছে। আমার তো তখনও এ দেশে চাকরির অভিজ্ঞতা নেই, সেই আনএমপ্লয়মেন্টেরও সুযোগ নেই। তারা যেমন সুযোগটা নিচ্ছে, আমিও তেমনি চাকরির সুযোগের ধান্দায় দোকানে দোকানে ঘুরছি সংকটকালীন কর্মী হতে।
সেবার আমার পিস লিলিটা মারা গেল বটে, কিন্তু ধান্দাটা সফল হলো। একটা চাকরি পেয়ে গেলাম!
আর সেই শুরু। আজ এই যে কাস্টমার কেয়ারের চাকরিটা, সে তো ওই পথ ধরেই পেয়েছি। আমরা বরং নানারকম ধান্দাবাজির পথে আরও একধাপ এগিয়ে গেলাম! পৃথিবীব্যাপী মানুষের ঘরবন্দি সময়ে যে আকাশগামী প্রকাশের জানালা খুলে গেল ব্যাপকভাবে, সেই সুযোগে মানুষ কনটেন্ট ক্রিয়েট করে, পুরনো বন্ধুকে ফেসবুকে খুঁজে পেয়ে, যে যার মতো করে এই যুগে ঢুকে গেল! মাঝে মাঝে মনে হয়, এসব কোনো কন্সপিরেসি থিওরি নয় তো!
আমার বন্ধু সাবিনাকে বলতেই সে বলে, ‘ধ্যাৎ, তুই সব সময় জটিল করে চিন্তা করিস।’
—আরে না, তুই দেখ, করোনাকে বলা হলো চীনের ল্যাবে তৈরি। সবাইকে ঘরে বন্দি করে অনলাইন ক্লাস, রিমোট জব, এই ধর, আইটি জায়েন্টদের একটা কারসাজি নয় তো!
সাবিনা বলে, ‘না না তা নয়! অবশ্য মানুষ আরও প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, সে তো এমনিই দিনে দিনে হতো।’
আমি বলি, ‘দ্যাখ, এই পথে আত্মঘাতী সত্য—মিথ্যায় পরিপূর্ণ এক মায়াজাল তৈরি হয়েছে!’
আমাদের কি সবসময় মনে হচ্ছে না এই সেই সময় বা সুযোগ, একে কাজে লাগাতে হবে? আমরা কি আরও বেশি দৌড়াচ্ছি না?’
সাবিনা অস্ফুট হু শব্দ তুলে, যেন ভাবছে। আমি ক্রমাগত বলে চলি—
‘তবে সামাজিকতার অভাব রইল নারে, ওই ফেসবুক, টুইটার, নানা গ্রুপ, ইনস্টাগ্রাম। আছি তো তোমাদের সাথেই আছি, আহারে, সেই তুই! কতদিন পর, দেখ। কেমন ন্যাকা—ন্যাকা সম্পর্ক একের পর এক হচ্ছে। সামাজিক যাদুবাস্তবতা।’
এবার সাবিনা বলে, ‘এ তোর মানসিক সমস্যা।’
আমি যেন মানসিক সমস্যাকে নিত্যবাজারের থলিতে ভরে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম! আহা রে, আর যারা ওই করোনাকালীন মানসিক চাপের মধ্যে থেকে আর বের হতে পারল না! তাদের কথা বাদই দিলাম। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেল রাশিয়া—ইউক্রেনে আক্রমণ! মহামারি শেষ কিন্তু যুদ্ধ চলমান!
আমার সহকর্মী তরুণ সঞ্জয় রাজকুমার, মাত্র বিশ বছর বয়সে কম্পিউটার সায়েন্সের পড়া ছেড়ে অফিস সহকারীর পদে নিযুক্ত হয়ে গেল। পড়া নাকি অনেকেই ছেড়েছে আজকাল, এসব নাকি কোভিডের সাইড ইফেক্ট। আরেক সহকর্মী অ্যাঞ্জেলা পঞ্চাশ পেরোনো ল্যাটিনা আমেরিকান, এতদিনে ভলান্টিয়ার কাজ করার সুবাদে এই চাকরিতে স্থায়ী হলো! কার যে ভালো হলো আর কার ভবিষ্যৎ থেমে গেল এসব নিয়ে ওরা ভাবছে কই! আমার মতো সাউথ এশিয়ান বাঙালি মন কেবল ভাবে, ইস্, এই সঞ্জয়ের এটা কোন জীবন! এই কেরানীর চাকুরী!
অ্যাঞ্জেলা মেক্সিকান উইডো। সরকারী ব্যবস্থাপনার স্বল্পমূল্যের আবাস নাইচার দু—কামরার এক ফ্ল্যাটে থাকে। শুরুতে আমার সঙ্গে নানা ক্যাচাল করলেও এখন আমাকে মেনে নিয়েছে। বলে, ‘তুমিও নাইচার ফ্ল্যাটের জন্য অ্যাপ্লাই করো, পাবা।’
আমি হুঁ হুঁ করি, কিন্তু আর ওসব চেক করে দেখা হয় না।
সেদিন দেখি খুব গজগজ করছে অ্যাঞ্জেলা। ওর মেয়েকে একবেলার জন্য বাসায় এসে থাকতে বলেছিল, বলেছে পারবে না! থাকলে পে করতে হবে!
বিষয়টা সে আমাকে খুলে বলে, নাইচার সুপারভিশনের সময় বাসায় কেউ একজন উপস্থিত থাকা চাই। মেয়েটার পেছনে সে গত উইকএন্ডও শেষ করেছে! বাচ্চা দুটোকে গ্র্যান্ডমার কাছে রেখে কন্যা অ্যাশলে চলে গিয়েছিল নতুন বয়ফ্রেন্ড নিয়ে ডেটিং—এ। তখন তো তার পে করার কথা মাথায় আসেনি।
অ্যাঞ্জেলা গজগজ করতে করতে বলে, ‘ঠিক আছে, আমিও আর রাখব না বাচ্চাদের।’
কিন্তু তা কি হয়! দুই সপ্তাহ যেতে না যেতেই দেখি সোমবার সকাল সকাল নাক—চোখ টানতে টানতে কাজ করছে। জিজ্ঞেস করতেই বলে, সারাদিন গ্র্যান্ডচাইল্ডদের নিয়ে কনি আইল্যান্ডে বেশ ধকল গেছে, রেস্ট হয়নি।
আহারে বেচারি!
তো এমনই তো চলছে চারপাশে। হামাস হামলা করছে, ইসরাইল অভিযান চালাচ্ছে! ভিন্ন ভিন্ন নামে মানুষ তো মানুষকে মেরে চলেছে ক্রমাগত। করোনার সময় তুমুল বিতৃষ্ণায় যারা ট্রাম্পের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, সেই তারাই তো আবার প্রচুর ভোটে বিজয়ী করেছে তাঁকে।
অ্যাঞ্জেলা অবশ্য সরাসরি স্বীকার করে, ‘শোন, তুমি যাই বলো, ট্রাম্পই তো আমাদের করোনার সময় দুই হাজার ডলার দিয়েছিল। তা নয় কি?’
—‘হুম।’
সে আরও বলে, ‘তাছাড়া ও এলে অ্যাবরশনবিরোধী আইনও পাস হয়ে যাবে। এটা ভালো না?’
আমি হ্যাঁ—না কিছু বলি না, আমার মতো অবিশ্বাসীর আবার কী!
অ্যাঞ্জেলা জানায়, সে অ্যাবরশন কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না। ক্যাথলিক হিসেবে সে খুবই প্র্যাকটিসিং, নিয়মিত অফিসের স্পিরিচুয়াল প্রেয়ার রুমে যায়। নিজের মেয়ের নির্বুদ্ধিতায় সে আফসোস করে, ‘কতবার বলেছি ডেটিং—এর সময় প্রটেকশন ইউজ করতে, না হলে তো বাচ্চা জন্ম দিতেই হবে। এখন সিঙ্গেল মা হয়ে নিজে কষ্ট করছে আর আমাকেও খাটাচ্ছে। বয়ফ্রেন্ড তো পালিয়েছে।’
গৃহশান্তিতে অ্যাঞ্জেলা বরাবরই বিশ্বাস করে, নিজে স্বামীর সাথে বিবাহিত জীবন—যাপন করেছে, স্বামী মারা যাবার পর আর কারো সাথে সম্পর্কই করেনি। তবে প্রতিবেশী হ্যারিসনের সঙ্গে তার বেশ ভালো ভাব। লোকটি বিশেষ ভদ্রলোক, কস্টকো থেকে বড় বড় গ্রোসারি করতে খুব সাহায্য করে। অ্যাঞ্জেলার গাড়ি নেই বলে সে আর তার অভাব বোধ করে না। লোকটাও নির্ঝঞ্ঝাট, যুদ্ধফেরত অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য। একটা কুকুর নিয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে ওর জন্য অ্যাঞ্জেলা টুকটাক খাবার কিনে নেয়, স্পেশাল স্প্যানিস মেন্যু রান্না করে দু’জনে একসাথে বসে খায়। মেক্সিকান তামালি হ্যারিসনের ভীষণ পছন্দ, অ্যাঞ্জেলা জানায় তামালি বানানো খুব সহজ কাজ নয়। বেশ সময় সাপেক্ষ। তবে লোকটা এত ভালো, ওর জন্য মাঝে মাঝে সে সময় ব্যয় করে। দিব্যি চলে যাচ্ছে তাদের দিন।
আমি মাথা নেড়ে সায় দেই, সে—ই, সে—ই।
তো বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ আর শান্তি দুটোকেই তো সমতালে রাখতে হয়। এক বুধবার লাঞ্চ ব্রেকে অফিসের স্পিরিচুয়াল প্রেয়ার রুম থেকে অ্যাশেজ মেখে এলো, মলিনতায় স্নিগ্ধ চেহারা মেলে অ্যাঞ্জেলা বলল,‘জানো, এখনও আমার মৃত স্বামী আমাকে সকালে জাগিয়ে দেয়! আমি অনুভব করতে পারি!’
ওর চোখে অদ্ভুত বিশ্বাসের রহস্য জেগে থাকে। শতবছরের মায়াজাল। আমি তখন ব্রেকের জন্য বেরিয়ে পড়ি। আত্ম—স্বস্তির বিষয়টি তো আপেক্ষিকই।
চারপাশে শান্তি পাওয়ার এত অবকাশ দেখে আমি দ্বিতীয় বারের মতো পিস লিলি কিনেছিলাম, তা দুই হাজার চব্বিশ সনের আগস্ট মাসে। বাংলাদেশে তুমুল আন্দোলনের পর, যখন স্বৈরশাসনের পতন হলো, নিউইর্য়কের পথে পথে কিছু মানুষ উচ্ছ্বাসে মিষ্টি বিতরণে ব্যস্ত। আমি কোনো কালেই তুমুল স্রোতের লোক নই। কিছুটা নিভৃতচারী, তবে শান্তিকামী। তাদের উন্মাদ উচ্ছ্বাসের জিলিপি—সন্দেশ আমাকে টানে না। প্রবাসী সমাবেশগুলো থেকে আমি বরাবরই দূরে থাকি।
তাই হিলসাইড ছেড়ে সোজা চলে গেলাম জ্যামাইকা অ্যাভিনিউর দিকে। কালো মানুষের হলিডে মার্কেট পেরিয়ে, সেল্টার হাউজের পাশে চলছে বারবিকিউয়ের ব্লক পার্টি! ওদের স্বল্প মসলার মুরগীপোড়ার গন্ধও আমাকে টানে না। আমি সেসব পেরিয়ে হাঁটতে থাকি, সরাসরি হোম ডিপোতে গিয়ে থামি। সেখান থেকে মেটে রঙা এক টবে থাকা পিসলিলি, দ্বিতীয়বারের মতো একটা কিনে ঘরের দিকে পা বাড়ালাম।
মাথার মধ্যে ঘুরছিল সেই নব্বইয়ের দশক। তখন স্কুলে পড়ি। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে মানুষ পথে নেমেছিল। শহরের জনতা ব্যাংকের মোড়ে দাঁড়িয়ে আমার অপরিপক্ক কণ্ঠে পাঠ করেছিলাম—
‘ছেনাল সময় উরুত দেখায়ে নাচে
নপুংশকেরা খুশিতে আত্মহারা।
বেশ্যাকে তবুও বিশ্বাস করা চলে
রাজনীতিকের ধমনী শিরায় সুবিধাবাদের পাপ’
কানে ভাসে সুদিন আসে না...আসে না সুদিন! হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, খুব বেশি কিছু কি চায় মানুষ? একটু শান্তিই তো!
সাধারণ মানুষের যন্ত্রণা কিংবা মুক্তির পথে হাঁটা শেষ হওয়ার নয় সে সত্যি। তবুও বুকের কাছে জড়িয়ে নতুন করে লিলি নিয়ে ঘরে ফিরলাম। আমার বেসমেন্টের ঘরে একটি মাত্র জানালা। পিস লিলিটাকে এমনভাবে রাখলাম, যাতে জানালার আলো—বাতাসে সে বেঁচে থাকে।
এখানে সময় যেন দ্রুত চলে যায়! পরের সপ্তাহেই অ্যাঞ্জেলা জানালো এই অফিসে সে আর নেই, চলে যাচ্ছে। তাঁর এই হঠাৎ ঘোষণায় আমি যেন আচমকাই আছড়ে পড়লাম।
আমি ভেবেছিলাম, ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে! কত কত গল্প হতো প্রতিদিন। অথচ একবারের জন্যও বলেনি, সে মেট্রোপলিটনে আরও বেশি বেতনের চাকরিতে অ্যাপ্লাই করেছে!
সবকিছু নিশ্চিত করে যখন জানাল, আমি তাকে কনগ্র্যাচুলেট করলাম। ভেতরে ভেতরে হিংসায় জ্বলে যেতে লাগলাম। আগে জানালে কী হতো! আমি অ্যাপ্লাই করতাম! শেষ দিন অ্যাঞ্জেলা আমার জন্য পাথরকুচি—ভর্তি কাচের জারে করে গুডলাক ব্যাম্বু নিয়ে এলো। পরম মমতায় আমাকে হাগ করল। বাসায় ফিরে সেটাকে টিভি স্ট্যান্ডের ধারে রেখে দিলাম। জানালার ধারটা আমার পিস লিলির জন্য বরাদ্দ। যদিও শান্তির বিষয়টা বরাবরই আপেক্ষিক বলে মনে হয়।
যখন সোয়েবের সঙ্গে ছিলাম, সে প্রচন্ড উঁচু ভলিউমে হেভি মেটাল গান শুনে শান্তি পেত, আমাকে অশান্তিতে ফেলে। আর আমি রবীন্দ্রসংগীত বাজালে সোয়েবের অশান্তি। এমন প্যানপেনে প্রেমে তার মন নেই।
ক্রমশ আমাদের শান্তির মা মরে গেল! আমরা ভিন্ন ভিন্ন পথে নেমে গেলাম। পরিবার—সমাজ দারুণ আহত হলো। একটু মানিয়ে চললে এমনটা হয় না, এটা নাকি সত্যি। অথচ আমাদের সত্য পথে চলা হয় না। সত্যের চেয়ে সহজ পথে মাঝে মাঝে নেমে পড়ে মানুষ।
আমার সঙ্গে সহকর্মী লিন্ডা এন্ডারসনের খুব ভাব হয়েছে আজকাল। এতদিন অ্যাঞ্জেলার সঙ্গে গুজুর—গুজুর করার জন্য নাকি সে আমাকে এড়িয়ে চলত। আসলে সে আমাকে নয়, অ্যাঞ্জেলাকে এড়িয়ে চলত। শীঘ্রই আমি এই অফিস ছাড়ছি। লিন্ডাকে তা আর জানালাম না।
গত কিছুদিন ধরে পিস লিলিটাকে বেশ মিইয়ে পড়া মনে হচ্ছিল। আমি জানালার পর্দাটা সরিয়ে রাখলাম, যেন গাছটির কোনো সমস্যা না হয়, যেন সে আবার তরতাজা হয়ে ওঠে। এবার সে বেঁচে আছে বছর পেরিয়ে গেছে! অনেক দিন পর মনে হচ্ছিল, যাক, সব তাহলে ঠিকঠাক চলছে।
সাবিনা অনেকদিন পর ফোন করেছিল, খুব বেশি কথা হলো না। ওর গলায় একটা হতাশা কাজ করছিল। আমিও বিশেষ কিছু জানতে চাইলাম না। সব খবর তো জোয়ারের মতো ভেসেই আসে, ফেসবুকের বক্ষ জুড়ে। তা নিয়ে কথা বলার অবশিষ্ট কিছু থাকে না।
সেদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ক্লান্তিতে কাউচে গা এলিয়ে দিয়েছি, রিমোট চেপে টিভিতে খবর দেখছিলাম। ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেত্রী, গণতন্ত্রপন্থী রাজনীতিক মারিয়া কোরিনা মাচাদো এসেছেন আমেরিকায়। তিনি ইতিহাসে নতুন ঘটনার জন্ম দিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে তুলে দিচ্ছেন তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কারটি!
প্রেসিডেন্টের সে—ই হাসি...! ভালো করে দেখা হলো না। আমার নাকে একটা কটু গন্ধ ভেসে এলো। ইঁদুর মরেছে!
সারা বাড়ি খুঁজে দেখলাম। কার্পেটটা ভ্যাকুয়াম করলাম, গার্বেজ ক্যান ধুয়ে ফেললাম। কিন্তু গন্ধ রয়েই গেল!
জানালার কাছে যেতেই গন্ধটা আরও তীব্র হলো। অবশেষে সেই গন্ধের উৎস পেলাম। আমার পিস লিলি! গোড়াটা পঁচে গন্ধ বেরিয়েছে। আগেই বলেছিলাম, আমার বাড়িতে পিস লিলি বাঁচে না। সহসা চোখ গেল অ্যাঞ্জেলার দেওয়া সৌভাগ্যের বাঁশ গাছটির দিকে। সে তরতর করে বেড়ে উঠেছে।
