জাপান—বাংলাদেশ যৌথ বিবৃতি ৫ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের প্রত্যাশা

রাকিবুল ইসলামঃ টোকিওতে ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বড় একটি বিনিয়োগ প্রত্যাশার কথা এসেছে। আগামী পাঁচ বছরে জাপানি বেসরকারি খাত থেকে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত বিনিয়োগ আসতে পারে। বাংলাদেশী মুদ্রায় নয়, ডলারে হিসাব করলে এর পরিমাণ প্রায় ৬৩৪ কোটি ডলার। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের প্রত্যাশাও জানানো হয়েছে।

খবরটি আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এখানে একটি শব্দ বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। সেটি হলো, ‘পর্যন্ত’। কারণ এটি বিনিয়োগের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ অঙ্ক, নিশ্চিত অর্থপ্রাপ্তির ঘোষণা নয়। টাকা এখনো বাংলাদেশের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়নি, কারখানাও সব ক্ষেত্রে তৈরি হয়নি। ফলে বড় অঙ্কের ঘোষণাকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দেওয়ার প্রস্তুতিটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

জাপানের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রত্যাশা বাংলাদেশে এবারই প্রথম তৈরি হয়নি। এমন গল্প আমরা আগেও শুনেছি। ২০১৪ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে ৬০০ বিলিয়ন ইয়েন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তখনকার বিনিময়মূল্যে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। সেই অর্থের বড় অংশ ছিল সরকারি ঋণ। এবার ঘোষণার চরিত্র আলাদা। এবারের এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের সম্ভাব্য বিনিয়োগের বড় অংশ আসার কথা জাপানি বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে।

এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি। সরকার ঋণ বা উন্নয়ন সহযোগিতার অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু কোনো বেসরকারি কোম্পানি বিদেশে কারখানা স্থাপন করবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নির্ভর করে তার নিজস্ব ব্যবসায়িক হিসাবের ওপর।

অর্থনীতিবিদ জন ডানিংয়ের বহুল আলোচিত তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি বিদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয় যখন তিনটি সুবিধা একসঙ্গে কাজ করে। প্রথমত, কোম্পানির এমন প্রযুক্তি, ব্র্যান্ড বা দক্ষতা থাকতে হয়, যা তাকে প্রতিযোগীদের তুলনায় এগিয়ে রাখে। দ্বিতীয়ত, বিদেশের নির্দিষ্ট দেশে উৎপাদন করলে বাড়তি সুবিধা পেতে হয়, যেমন বড় বাজার, উপযুক্ত অবকাঠামো বা তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়। তৃতীয়ত, নিজেই কারখানা পরিচালনা করা অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে উৎপাদনের অনুমতি দেওয়ার চেয়ে বেশি লাভজনক হতে হয়।

তাই টোকিও চাইলেই কোনো জাপানি কোম্পানিকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে বাধ্য করতে পারবে না। সরকার সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোম্পানিকে নিজের লাভ, ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ বাজারের হিসাব কষেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ কারণেই বিনিয়োগের ঘোষণায় ‘পর্যন্ত’ শব্দটিকে সম্ভাবনার সীমা হিসেবে দেখা উচিত, নিশ্চিত অঙ্ক হিসেবে নয়।

ঘোষিত অঙ্কটি কত বড়, তা বুঝতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে তুলনা করা যায়। গত অর্থবছরে সব দেশ মিলিয়ে বাংলাদেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল প্রায় ১৪৭ কোটি ডলার। এর মধ্যে নতুন মূলধন ছিল মাত্র ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের মতো। বাকি অর্থের বড় অংশ এসেছে দেশে আগে থেকেই বিনিয়োগ করা কোম্পানির মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে।

জাপানের সম্ভাব্য এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের বিনিয়োগ পাঁচ বছরে ভাগ করলে বছরে গড়ে প্রায় ১২৭ কোটি ডলার দাঁড়ায়। অর্থাৎ, অন্য সব দেশ মিলিয়ে বাংলাদেশে এক বছরে যত নিট বিদেশি বিনিয়োগ আসে, জাপান থেকে একাই তার কাছাকাছি অঙ্ক পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অবশ্য এই তুলনা পুরোপুরি সমজাতীয় নয়, কারণ ঘোষিত জাপানি বিনিয়োগের মধ্যে অর্থায়নের বিভিন্ন ধরন থাকতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি কাজ করছে, অথচ দেশটি থেকে বাংলাদেশের সরাসরি বিনিয়োগ এখনো ৫০ কোটি ডলারের নিচে। ফলে দুই লাখ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশার সঙ্গে বিনিয়োগের অঙ্ক মিলিয়ে আরেকটি প্রশ্ন ওঠে। আমার হিসাবে, ৬৩৪ কোটি ডলারকে দুই লাখ সম্ভাব্য চাকরি দিয়ে ভাগ করলে প্রতি কর্মসংস্থানের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৩২ হাজার ডলার পড়ে। পোশাক কারখানার মতো শ্রমঘন শিল্পে কর্মীপ্রতি বিনিয়োগ সাধারণত এত বেশি হওয়ার কথা নয়। তাই ধারণা করা যায়, প্রস্তাবিত বিনিয়োগের বড় অংশ গাড়ি উৎপাদন ও জ্বালানির মতো মূলধনঘন খাতে যেতে পারে। নিক্কেইয়ের প্রতিবেদনেও এ ধরনের খাতের সম্ভাবনার কথা এসেছে।

Related Posts