যা দেখেছি যা বুঝেছি—৩৪ || মনিরুল ইসলাম

ভীমরতি

অভিধান অনুযায়ী একজন পুরুষের ‘৭৭—বছর ৭—মাস ৭—রাত্রিতে বার্ধক্যজনিত ঈষৎ বুদ্ধিভ্রংশ বা ক্ষ্যাপামি’—কে বলা হয় ভীমরতি, সংস্কৃতে ভীমরাত্রী। জীবন তো আর অভিধান মেনে চলে না, তাই কখন যে কার ভীমরতি আসে, ঠিক ঠাহর করা যায় না। কিন্তু এটা বলা যায় যে, পৃথিবীর প্রত্যেক প্রাণীর মধ্যে এই ভীমরতি আসে, নারী—পুরুষ সবার। কেউ চাপিয়ে রাখে সমাজের ভয়ে, কেউ লুকিয়ে চালায়, সাহসী ও নির্লজ্জরা করে প্রকাশ্যে। কিছু মানুষ চাইলেও পারে না, এর জন্য দরকার চাতুর্য, দুঃসাহস, বোকামি, অর্থবল, মনোবল। রাজা—বাদশাহরা কেন একাধিক বিবি রাখেন, কারণ তারা পারেন। পারলে হয়ত অনেকেই রাখতে চাইবেন, বিপরীত লিঙ্গের অন্তত একটা চ্যালা। পারলে মানে কি? আপনি আমি কেন পারি না? চলুন দেখি ব্যাপারটা কি।

সাধারণ বাগ্ধারায় ভীমরতি মানে হল উল্টাপাল্টা কাজ করা, আরো স্পষ্ট করে বললে, বুড়ো বয়সে বিয়ে করা, বৃদ্ধ কর্তর্ৃক তরুণীর পাণিগ্রহণ। বৃদ্ধাও যুবাকে বিয়ে করে থাকে। যাক, আপাতত ভীমরতি নিয়েই কথা বলি, যেখানে নিজের চেয়ে অনেক অল্পবয়স্কাকে ধরে। পশ্চিমা সমাজ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য ‘আজীবন একবিয়ের’ আইনগত ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু বাস্তবে এরা বহুগামী, বৈচিত্র্যকামী। 

ভীমরতির আরেকটি ধরন বা প্রকাশ হল পরকীয়া। পুরনোটাকে না ছেড়েই নতুন একটা নেয়, গোপনে স্বেচ্ছায় সোৎসাহে। এর মধ্যে লুকোচুরি আছে, অনৈতিকতা অবৈধতা অশুদ্ধতা আছে। ভালোবাসা যতটুকু, তারচেয়ে বেশি যৌনতা, তাই লোকসমাজে নিন্দনীয়। পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলায় ক্ষতিকর বলে শাস্তিযোগ্য বিবেচিত, অনেক দেশে আইনত দন্ডনীয় অপরাধ।

ভীমরতির সবচেয়ে নরম (মাইল্ড) ধরন হল নারী—পুরুষ বন্ধুত্ব। এধরনের হালকা ভীমরতিতে লোকধারণাকে ফাঁকি দেয়ার জন্য বলে সে আমার ভালো বন্ধু, যাতে এটা অবাধে চলে, কারো শ্যেনদৃষ্টির বদনজরে না পড়ে। নারী—পুরুষে আত্মীয়তা/পরিচিতি থাকতে পারে, গাঢ় বন্ধুত্ব নয়। তবে নর—নারীর বন্ধুত্ব বা পাতলা ভীমরতি সংসারে উপকারী এবং গ্রহণযোগ্য, অনেকক্ষেত্রেই নির্দোষ।

মানুষ যখন যেখানে থাকে, বাইরে গোপনে তার একটা ‘অন্তরঙ্গ’ (সুইটহার্ট) দরকার হয়, খঁুজে বেড়ায় এমন কাউকে যার মনের সাথে মিশে যেতে চায় নিজের মন। বাল্যে, কৈশোরে, তারুণ্যে, যৌবনে, প্রৌঢ়ে, বার্ধক্যেÑজীবনের সকল স্তরে এই চাহিদা অক্ষুণ্ণ থাকে। এটা ছাড়া সামাজিক মানুষের নিঃসঙ্গতা কাটে না, মানে কী? মানে হল ভীমরতির অনিবার্যতা। এটাকে ভীমরতি, পরকীয়া, বন্ধুত্বÑযে নামেই আখ্যায়িত করি, বহুগামিতা অতি স্বাভাবিক। এটা পাগলামি নয়, রোগ তো নয়ই, বলা যায় প্রাণীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যÑএকা নয়, এক নয়, বহুকে নিয়ে বসবাস।

প্রাণীর দিকে তাকাই, কারণ মানুষও একধরনের প্রাণী। একটি সিংহ বা বাঘ কয়েকটি সিংহী/বাঘিনী নিয়ে তার প্রাইড বা দল গঠন করে, সেই দলে আর কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ থাকতে পারে না, থাকলেও তার যৌন সম্ভোগের অধিকার নেই। লুকিয়ে বা চান্সে প্রেম—পিরিতি করতে গেলেও খবর আছে! দলপতি পশু যেমন নাগালের সবগুলো মাদিকে দখলে রাখতে চায়, মানুষপ্রাণীও তাই চায়। শুধু বুদ্ধি বেশি বলে সবকিছু সে করে সূক্ষ্ম সুচারু শোভনভাবে।

আফ্রিকার মানুষ মানবজাতির আদিপুরুষ হিসাবে বিবেচিত। আমাদের সেই পূর্বপুরুষেরা এখনো একাধিক স্ত্রী রাখেÑধর্ম, দেশ, জাতি নির্বিশেষে একই প্রথা চিরন্তনভাবে চলে আসছে মহাদেশে। পলিগামি বা বহুবিবাহ হল ভীমরতির স্বীকৃত রূপ, যার প্রচলন বিশেষত আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশের অধিবাসীদের মধ্যে বেশি দৃশ্যমান। ঔপনিবেশিক শাসনকালে দাস হিসাবে পুরুষদের রপ্তানির কারণেও এটা বেড়েছে। বহুবিবাহ একই পরিবারে এবং ভিন্ন পরিবারেও হতে পারে। ভুটানে যেমন রাজা একই পরিবারের একাধিক বোনকে বিয়ে করেন। প্রাচীন চীন—জাপান—কোরিয়াতে প্রচলিত ছিল কনকুবাইন প্রথা, যার মাধ্যমে বহু নারী রক্ষিতা হিসাবে রাজপ্রাসাদে রাজার জন্য নিয়োজিত থাকত। 

পলিঅ্যান্ড্রি শব্দের মানে হল বহুভর্তৃত্বÑএক নারীর একাধিক স্বামী। কোথাও আবার সব ভাই মিলে এক স্ত্রীকে গ্রহণ করে। দ্রৌপদির পঞ্চপান্ডব বিয়ে পুরাকথা, এই সেদিনও ভারতে দুইভাই একমেয়েকে বিয়ে করেছে। অধিকাংশ ধর্মে বহুস্বামিত্বের অনুমোদন নেই। ভারত, চীন, ভুটান ও নেপালের কিছু পাহাড়ি সমাজে বহুস্বামী গ্রহণের প্রথা আছে। এর সাথে ভূমির মালিকানার প্রশ্ন জড়িত, যৌনতা নয়। কীট পতঙ্গ পশুদের মধ্যে এটি হয় বেশি।

ভীমরতি মানে যদি বুড়ো বয়সে পুরুষের যুবতী দারগ্রহণ বোঝায়, তাহলে বয়স্কা নারীর যুবক বিয়ে করাকে কী বলা যায়? পুরুষের প্রভুত্ব (ডমিনেন্স) এবং নারীর লজ্জা—শরমের কারণে এর কোনো নামশব্দ বের হয়নি (পশ্চিমে নাকি অলরেডি চলে এসেছে, জিগোলো)। আমি না—হয় বললাম ‘ভীমামতি’। এই ভীমামতির উদাহরণও ইদানীং বাড়ছে। ধনবতী নিঃসঙ্গ বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা নারী এই সুযোগটা নেয়। ভীমরতি যদি সমাজে সহনীয় হয়ে যায়, ভীমামতিও মেনে নেয়া দরকার। যাক, ভীমরতি নিয়ে ধর্ম ও সমাজ কি বলে দেখি।

হিন্দু পুরাণে অনেক দেব—দেবীর একাধিক স্ত্রী—স্বামী ছিল, দেবতার বিয়েতে বয়সের বাধা ছিল না। প্রাচীন ধর্মে বহুবিবাহের স্বীকৃতি ও প্রচলন ছিল, যদিও বর্তমানে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ। বৌদ্ধধর্ম বিবাহের ধরন নিয়ে কিছু বলে না। ইহুদি ধর্মে কনকুবাইন প্রথার ইতিহাস পাওয়া যায়। ইহুদির মধ্যে বহুবিবাহ প্রচলিত ছিল কিন্তু বর্তমান ইসরাইলে তা নিষিদ্ধ। খ্রিস্টধর্মে বহুবিবাহ অনুমোদিত নয় বলে পশ্চিমা দেশে তা বেআইনী। কিন্তু অনেক আফ্রিকান খ্রিস্টান পুরুষ ধর্ম—আজ্ঞা মানে না, কারণ তাদের সমাজ তাকে অনুমোদন দেয়। ঘানার এক ট্যাক্সিচালক আমাকে বলেছিল, তুমি ক’টা স্ত্রী রাখবে তা নির্ভর করে তোমার পকেট—গরমের ওপর। ইসলামে স্ত্রীর সম্মতি সাপেক্ষে পুরুষের চার—বিবাহ স্বীকৃত কিন্তু নারীদের নয়। নারী সচেতনার কারণে মুসলিম সমাজেও বহুবিবাহ কমে এসেছে। তবে মৃত্যু এবং তালাকজনিত কারণে নরনারী উভয়ের ক্ষেত্রে পুনর্বিবাহ ধর্মানুগ ও আইনসিদ্ধ।

মনোগামি হল একের সাথে এক, সিরিয়াল মনোগামি হল একটা ছেড়ে আরেকটা বিয়ে করতে থাকা। মানুষ এবং কিছু প্রাণী প্রকৃতিগতভাবে মনোগামি, একজন সঙ্গী রাখে। যেমন, ঘুঘু। পর্যবেক্ষণে দেখা যায় জীবনব্যাপি একমাত্র মেটিং—ম্যাট মানুষের জন্য ‘স্বাভাবিক’ নয়, ব্যতিক্রম। যদিও ভীমরতি নিয়ে অপারগ মানুষ ঠেঁাট বাঁকিয়ে হাসে। ইদানীংকার কিছু মানুষ আবার স্থায়ীভাবে স্ত্রী বা স্বামী চায় না, তারা লিভ—ইন টুগেদার করবে, সন্তানও নেবে এবং প্রয়োজনে আলাদা হয়ে অন্য একটি ধরবে। এসবই ভীমরতির প্রকারভেদ। এই ভীমরতি—ভীমামতির কারণ কি? বিজ্ঞান এবং সমাজবিদ্যায় আলাদা উত্তর আছে, অভিজ্ঞতার কথা শুনি।


Related Posts