ক্ষমতা ও গণতন্ত্রের পরীক্ষায় আমেরিকা || ড. জীবন বিশ্বাস

আমেরিকার ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার মাত্র চার দিন আগে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার অঙ্ক বিস্ময়করভাবে সংকীর্ণ। হাউজে বর্তমানে রিপাবলিকান সদস্য ২১৮ জন, ডেমোক্রেটিক ২১৪ জন, স্বতন্ত্র একজন এবং দুটি আসন শূন্য। পূর্ণ ৪৩৫ সদস্যের হাউজে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি, ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি; আরও দুই স্বতন্ত্র সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে অবস্থান নেন। ৫০—৫০ সমতা হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নির্ণায়ক ভোট দিতে পারেন। ফলে বর্তমান অবস্থান ধরে রেখে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের কার্যত ৫১ আসনে পৌঁছাতে হবেÑঅর্থাৎ নিট চারটি আসন বাড়াতে হবে। কিন্তু এই ছোট ছোট সংখ্যা আরও বড় একটি প্রশ্ন আড়াল করে রেখেছে: ৩ নভেম্বর কি কেবল কংগ্রেসের সদস্যবিন্যাস বদলাবে, নাকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সির রাজনৈতিক সীমারেখাও নতুন করে নির্ধারণ করবে? এ প্রসঙ্গেই আজকের উপসম্পাদকীয়।

বর্তমান জাতীয় রাজনৈতিক আবহ ডেমোক্র্যাটদের অনুকূলে, তবে কোনো জাতীয় নির্বাচনের নিশ্চয়তার মতো নয়। ২৬ অক্টোবর শেষ হওয়া রয়টার্স—ইপসোস জরিপে নিবন্ধিত ভোটারদের ৪৭ শতাংশ ডেমোক্রেটিক এবং ৩৬ শতাংশ রিপাবলিকান কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন। সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের দলীয় ঝোঁক হিসাবের মধ্যে আনলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৫০—৪১; সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে ৫৩—৪৪ ব্যবধানে। পাঁচ দিনব্যাপী অনলাইন এই জরিপে ১,৬৭৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন; তাঁদের মধ্যে নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন ১,২৮০ জন। নিবন্ধিত ভোটারদের ক্ষেত্রে নমুনাগত ত্রুটির সীমা শতকরা তিন ভাগ। অন্যদিকে ১৯—২০ অক্টোবরের এনপিআর—পিবিএস নিউজ—ম্যারিস্ট জরিপেও সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা ৫২—৪৪ ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন।

কিন্তু এসব সংখ্যা রাজনৈতিক গতি নির্দেশ করে, নির্বাচনী নিয়তি নয়। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হয় একেকটি নির্বাচনী এলাকা ও একেকটি স্টেটে। নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ, ক্ষমতাসীন সদস্যের সুবিধা, প্রার্থীর মান, প্রচার—অর্থ এবং ভোটার উপস্থিতিÑসবকিছুই জাতীয় জনমতের সঙ্গে আসনসংখ্যার সম্পর্ক বদলে দিতে পারে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন নির্বাচনী মানচিত্রে রিপাবলিকানরা নয়টি স্টেটের ১৫টি আসনে বাড়তি সুবিধা পেয়েছে; ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে এমন সুবিধাজনক পরিবর্তন হয়েছে ছয়টি আসনে।

তারপরও কংগ্রেসের হাউজেই ডেমোক্র্যাটদের জন্য অপেক্ষাকৃত সহজ লক্ষ্য। ২৩ অক্টোবরের কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টে ১৭টি আসনকে অনিশ্চিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি বর্তমানে রিপাবলিকানদের, পাঁচটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে। অক্টোবরের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য নিট আসন বৃদ্ধি ৯ থেকে ১৯—এর মধ্যে অনুমান করেছিল। সেই পূর্বাভাস সত্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলের জন্য প্রয়োজনীয় সীমা সহজেই অতিক্রম হবে। কিন্তু পূর্বাভাস ফলাফল নয়; জাতীয় ঢেউকে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় ভূগোলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেই হবে।

সিনেটের পথ কঠিনতর, যদিও এখন আর অবাস্তব নয়। কুকের সর্বশেষ তালিকায় আলাস্কা, আইওয়া, ক্যানসাস, মেইন, মিশিগান, ওহাইও ও টেক্সাসÑএই সাতটি সিনেট নির্বাচনকে সর্বাধিক অনিশ্চিত বলা হয়েছে। এর ছয়টি আসন বর্তমানে রিপাবলিকানদের, শুধু মিশিগান ডেমোক্র্যাটদের দখলে। নর্থ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা এখন তুলনামূলক শক্তিশালী, নিউ হ্যাম্পশায়ারেও তারা এগিয়ে। অক্টোবরের শুরুতে কুক ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য নিট আসন বৃদ্ধির সীমা দুই থেকে ছয়ে উন্নীত করেছিল। সেই পরিসরের মধ্যেই প্রয়োজনীয় চারটি আসন রয়েছে। কিন্তু রিপাবলিকানদের অনুকূলে স্টেটভিত্তিক রাজনৈতিক ভূগোল, প্রচার—অর্থের সুবিধা এবং কয়েকটি ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান স্টেট জয়ের বাধ্যবাধকতা এখনও বড় প্রতিবন্ধকতা।

ইতিহাসও ক্ষমতাসীন দলের সামনে একটি বিপরীত স্রোত রেখে যায়। ১৯৩৮ সালের পর ২২টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ২০টিতেই প্রেসিডেন্টের দল হাউজে আসন হারিয়েছে। ব্যতিক্রম ১৯৯৮ সালে বিল ক্লিনটন এবং ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়। দুটি নির্বাচনই হয়েছিল ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও উচ্চ প্রেসিডেন্সিয়াল জনসমর্থনের প্রেক্ষাপটে। মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রায়ই গণতন্ত্রের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রের মতো কাজ করেÑক্ষমতা একদিকে অতিরিক্ত জমা হয়েছে বলে মনে হলে ভোটাররা কংগ্রেসের মাধ্যমে তার ভারসাম্য পুনর্গঠন করেন। তবে ইতিহাস সম্ভাবনা দেখায়, ভবিষ্যৎ লিখে দেয় না।

২০২৬—কে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে এই নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রায় প্রত্যক্ষ উপস্থিতি। ২৬ অক্টোবরের রয়টার্স—ইপসোস জরিপে তাঁর জনসমর্থনের হার ৩২ শতাংশ। ম্যারিস্টের জরিপে সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে তা ৪০ শতাংশ এবং নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ৩৮ শতাংশ। এই পার্থক্যকে সরাসরি পরস্পরবিরোধী ফল বলা ঠিক নয়; জরিপে নমুনা, উত্তরদাতা নির্বাচন ও পরিসংখ্যানগত ওজন দেওয়ার পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো ভোটের প্রেরণা। ম্যারিস্ট জরিপে ৪৪ শতাংশ সম্ভাব্য ভোটার বলেছেন, তাঁদের কংগ্রেসীয় ভোট মূলত ট্রাম্পের বিরুদ্ধে; তাঁর পক্ষে ভোট হিসেবে দেখছেন মাত্র ২১ শতাংশ।

তবে ট্রাম্পবিরোধী মনোভাবকে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অসন্তোষ থেকে আলাদা করা কঠিন। ম্যারিস্ট জরিপে ৩৪ শতাংশ সম্ভাব্য ভোটারের প্রধান উদ্বেগ জীবনযাত্রার ব্যয়; প্রায় সমান ৩৩ শতাংশের প্রধান উদ্বেগ গণতন্ত্র রক্ষা। ইমিগ্রেশন ১২ শতাংশ, পররাষ্ট্রনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা পাঁচ শতাংশ করে। অন্যদিকে পিউ রিসার্চ সেন্টার একটিমাত্র বিষয় বেছে নিতে না বলে প্রতিটি বিষয়ের গুরুত্ব জানতে চেয়েছিল। সেখানে ৮৪ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার অর্থনীতিকে, ৭৩ শতাংশ গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে, ৫৯ শতাংশ অভিবাসনকে এবং ৫৭ শতাংশ পররাষ্ট্রনীতিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। প্রশ্নের ধরন ভিন্ন হওয়ায় সংখ্যা ভিন্ন; কিন্তু উভয় জরিপই দেখায়Ñপারিবারিক অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগ পাশাপাশি চলছে।

অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানও সেই উদ্বেগের কিছু ব্যাখ্যা দেয়। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বার্ষিক ভোক্তামূল্যস্ফীতি ছিল ৩.৭ শতাংশ। অথচ বেকারত্বের হার এখনও তুলনামূলকভাবে কম—৪.২ শতাংশ। কিন্তু সেপ্টেম্বরে নতুন কর্মসংস্থান বেড়েছে মাত্র ২৯ হাজার। ২৬ অক্টোবর নিয়মিত পেট্রলের জাতীয় গড় মূল্য ছিল গ্যালনপ্রতি ৪.২৬৯ ডলার। রয়টার্স—ইপসোস জরিপে ৭৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় ভুল দিকে যাচ্ছে। এখানেই সামষ্টিক অর্থনীতি ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পার্থক্য। মন্দা না থাকলেও খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও জ্বালানির ব্যয় পরিবারকে চাপে রাখতে পারে।

পররাষ্ট্রনীতিও এখন ঘরোয়া অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক হামলার পর জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। তবে অধিকাংশ ভোটারের কাছে পররাষ্ট্রনীতি এখনও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের নির্বাচনী অভিঘাত তাই সম্ভবত সবচেয়ে প্রবল হয় তখনই, যখন দূরের সংঘাত ঘরের খরচে এসে ধরা দেয়Ñজ্বালানির দাম, সামরিক ব্যয় কিংবা দীর্ঘস্থায়ী বিদেশি সম্পৃক্ততার আশঙ্কায়।

ইমিগ্রেশনও তীব্র বিভাজনের আরেকটি ক্ষেত্র। ট্রাম্প প্রশাসন সীমান্তে গ্রেপ্তারের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়াকে কঠোর নীতির কার্যকারিতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। অন্যদিকে সমালোচকরা জোর দিচ্ছেন আক্রমণাত্মক প্রয়োগপদ্ধতি, নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্ন এবং বর্ধিত কেন্দ্রীয় অভিযানের মানবিক পরিণতির ওপর। পিউ রিসার্চের হিসাবে রিপাবলিকান—সমর্থকদের ৭২ শতাংশ ইমিগ্রেশনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। ডেমোক্র্যাট—সমর্থকদের মধ্যেও এই হার ৫৩ শতাংশ। তাই বিতর্কটি শুধু নীতি কার্যকর কি না, তা নিয়ে নয়Ñবৈধ ও মানবিক প্রয়োগের সীমা কোথায়, তা নিয়েও।

আর আছে গণতন্ত্রের প্রশ্ন। ম্যারিস্ট জরিপে ৭৭ শতাংশ সম্ভাব্য ভোটার বলেছেন, তাঁদেও স্টেট ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সুষ্ঠু ও নির্ভুল নির্বাচন পরিচালনা করবে বলে তাঁরা আস্থাশীল। ৮১ শতাংশ বলেছেন, গণনা শেষে তাঁদের সমর্থিত প্রার্থী পরাজিত হলে সেই ফল মেনে নেওয়া উচিত। কিন্তু এই মতের পক্ষে রিপাবলিকানদের হার ৭০ শতাংশ, ডেমোক্র্যাটদের ৯০ এবং স্বতন্ত্রদের ৮৩ শতাংশ। পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গণতান্ত্রিক নির্বাচন শুধু ভোট গণনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না, বৈধ পরাজয় মেনে নেওয়ার সংস্কৃতির ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে।

এই কারণেই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন শুধু দলীয় প্রতীকের বদল নয়। ডেমোক্র্যাট—নিয়ন্ত্রিত হাউজ তদন্ত, তদারকি, সমন, বরাদ্দ আলোচনা এবং ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়ার দিক বদলে দিতে পারে। ডেমোক্র্যাট—নিয়ন্ত্রিত সিনেট বিচারক ও নির্বাহী পদে নিয়োগ অনুমোদনের রাজনীতিকে আমূল বদলে দেবে। উভয় কক্ষ বদলে গেলে হোয়াইট হাউজের ওপর আইনপ্রণয়ন ও তদন্তমূলক নিয়ন্ত্রণ অনেক শক্তিশালী হবে। একটি কক্ষ বদলালেও বর্তমান একদলীয় কেন্দ্রীয় ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে যাবে।

ভোটের চার দিন আগে প্রমাণের ভার ডেমোক্র্যাটদের জন্য অনুকূল পরিবেশের দিকেই ঝুঁকছেÑবিশেষত হাউজে। কিন্তু সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্ক অনেক বেশি কঠিন। জনমত জরিপ মুহূর্তের ছবি, পূর্বাভাস সম্ভাবনার হিসাব, আর রাজনৈতিক উৎসাহ তখনই ক্ষমতায় রূপ নেয় যখন তা ব্যালটে পৌঁছে।

এই কারণেই ৩ নভেম্বরের মধ্যবতীর্ নির্বাচনের গভীর অর্থ কেবল কে জয়ী হবে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন একটি প্রশাসন নির্বাচন করে, মধ্যবর্তী নির্বাচন নির্ধারণ করতে পারে সেই প্রশাসন কতটা অবাধে ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। সেই অর্থে আমেরিকানরা এবার শুধু প্রার্থী, মূল্যস্ফীতি, ইমিগ্রেশন কিংবা যুদ্ধ নিয়ে ভোট দিচ্ছেন না, প্রেসিডেন্সির মধ্যপথে দাঁড়িয়ে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেনÑরাজনৈতিক ক্ষমতার কতটা একই হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে, আর কতটা ফিরে যাবে সংবিধানের ক্ষমতার ভারসাম্য ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণের কাঠামোয়।


Related Posts