৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্পঃ নর্থ ক্যারোলাইনা কোল্ড মাউন্টেনঃ চার্লস ফ্রেজিয়ার || আবদুল্লাহ জাহিদ
পৃথিবীর সমস্ত যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কিছু মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি হয়ে ওঠে। ইতিহাস সেখানে বিজয়ী ও পরাজিতের হিসাব রাখে, কিন্তু অপেক্ষমান প্রেমিকার চোখের জল, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা সৈনিকের নিঃসঙ্গতা কিংবা একটি পরিত্যক্ত খামারবাড়ির দীর্ঘশ্বাসের কোনো হিসাব রাখে না। আমেরিকান ঔপন্যাসিক চার্লস ফ্রেজিয়ারের কোল্ড মাউন্টেন (১৯৯৭) এমনই এক উপন্যাস, যেখানে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের বিশাল পটভূমিতে ফুটে উঠেছে দুটি মানুষের ভালোবাসা, বিচ্ছেদ এবং ঘরে ফেরার আকুল আকাক্সক্ষা।
উপন্যাসটির পটভূমি নর্থ ক্যারোলাইনার ব্লু রিজ পর্বতমালা। সেখানে কোল্ড মাউন্টেন নামে একটি পাহাড় আছেÑকুয়াশায় ঢাকা, বনজঙ্গলে ঘেরা, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে যার রং বদলায়। সেই পাহাড় কেবল ভৌগোলিক অবস্থান নয়; এটি হয়ে ওঠে মানুষের আশ্রয়, স্মৃতি, স্বপ্ন এবং হারানো শান্তির প্রতীক।
ফ্রেজিয়ারের এই উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছেন দুজন মানুষÑইনম্যান এবং অ্যাডা মনরো। একজন যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে পালিয়ে ফিরছেন ভালোবাসার কাছে; অন্যজন অপেক্ষা করতে করতে শিখছেন কীভাবে নিজের হাতে জীবনকে নতুন করে গড়ে তুলতে হয়।
পটভূমি ও প্রাথমিক প্রেক্ষাপট
গল্পের সূচনা ১৮৬৪ সালের শেষভাগে, আমেরিকার নর্থ ক্যারোলাইনার নীল পবর্তমালার কোল্ড মাউন্টেন অঞ্চলে।
ইনম্যান: কনফেডারেট বাহিনীর একজন মারাত্মক আহত সৈনিক। যুদ্ধের বীভৎসতা, রক্তপাত এবং অনর্থক হিংস্রতা তার আত্মাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে সিদ্ধান্ত নেয়, সে আর লড়াই করবে না। সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে সে পায়ে হেঁটে ৩০০ মাইল দূরের নিজের বাড়ি কোল্ড মাউন্টেনের উদ্দেশে রওনা হয়, যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে তার জীবনের একমাত্র আলোÑঅ্যাডা।
অ্যাডা মনরো: শহরের একজন অভিজাত ও সুরসিক নারী, যে তার পাদ্রি বাবার সাথে কোল্ড মাউন্টেনে এসেছিল। কিন্তু বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে সে খামারবাড়িতে একেবারে একা এবং অসহায় হয়ে পড়ে। গৃহযুদ্ধের এই সংকটে শহরের রুচিশীল কায়দা—কানুন তাকে বাঁচাতে পারে না; সে অনাহারে দিন কাটাতে শুরু করে।
দুই পথের যাত্রা
ইনম্যানের বিপদসংকুল অভিযান: ইনম্যানের যাত্রা ছিল বিপদের আগ্নেয়গিরি। তার পিছু নিয়েছে নিষ্ঠুর ‘হোম গার্ড’Ñযাদের কাজ হলো সেনাত্যাগী পলাতকদের খুঁজে বের করে হত্যা করা। পথে সে মুখোমুখি হয় নানা চরিত্রের—
—এক কলঙ্কিত যাজক (ভিজি), যে তাকে আরও বিপদে ফেলে।
—এক উদার ও ছাগলপালক বৃদ্ধা, যে তাকে সুস্থ করে তোলে এবং দিকনির্দেশনা দেয়।
—লোভী প্রতারক ও নৃশংস সৈনিকদের আক্রমণ।
ইনম্যান পদে পদে মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফেরে, তবে যুদ্ধের মানসিক ট্রমা তাকে তাড়া করে বেড়ায়।
অ্যাডার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই
অন্যদিকে, অ্যাডার জীবনে ঘটে এক অভূতপূর্ব রূপান্তর। তার জীবনে আগমন ঘটে রুবি থিউস নামক এক অশিক্ষিত কিন্তু প্রকৃতিঘনিষ্ঠ ও অত্যন্ত কর্মঠ পাহাড়ি মেয়ের।
—রুবি অ্যাডাকে শেখায় কীভাবে মাটি চাষ করতে হয়, পশু পালন করতে হয় এবং বেঁচে থাকতে হয়।
—অ্যাডার সূক্ষ¥ রুচিবোধ এবং রুবির রূঢ় বাস্তবতাবোধÑএই দুইয়ের মেলবন্ধনে তাদের ভাঙাচোরা খামারটি আবার জীবিত হয়ে ওঠে। অ্যাডা এক অলস শহরের নারী থেকে এক আত্মনির্ভরশীল, শক্তপোক্ত পাহাড়ি নারীতে পরিণত হয়।
মিলন ও ট্র্যাজেডি
মাসজুড়ে অমানসিক শারীরিক কষ্ট ও দুর্গম পথ পার হয়ে ইনম্যান অবশেষে বরফাবৃত কোল্ড মাউন্টেনে পৌঁছায়। পাহাড়ি এক শিকার অভিযানে বহু বছর পর অ্যাডা ও ইনম্যানের মুখোমুখি দেখা হয়।
প্রথম দেখায় তারা একে অপরকে চিনতেই পারেনিÑইনম্যান ক্ষতে ও ক্লান্তিতে জর্জরিত, আর অ্যাডা এখন এক কঠোর খামারজীবনের নারী। কিন্তু চেনার পর তাদের মধ্যে সেই পুরনো ব্যাকুল ভালোবাসা নতুন করে জেগে ওঠে। পাহাড়ি এক পরিত্যক্ত গ্রামে তারা কয়েকদিন একসাথে কাটায় এবং জীবনের নতুন স্বপ্ন আঁকতে শুরু করে।
কিন্তু এই সুখ স্থায়ী হয়নি।
বাড়ি ফেরার ঠিক শেষ মুহূর্তে, ‘হোম গার্ড’—এর অধিনায়ক টিগ এবং তার সঙ্গীরা তাদের ঘিরে ফেলে। ইনম্যান বীরত্বের সাথে একে একে সবাইকে পরাস্ত করলেও, বার্চ নামক এক কমবয়সী হিংস্র সদস্যের গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হয়। অ্যাডা দৌড়ে এসে পৌঁছালে ইনম্যান তার কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
গল্পের মূল বার্তা কেবল মৃত্যু বা বিচ্ছেদ নয়, বরং টিকে থাকা ও পুনর্জন্ম। ১০ বছর পর কোল্ড মাউন্টেনের সেই খামারে অ্যাডাকে দেখা যায় তার ৯ বছরের মেয়েকে নিয়েÑযে ইনম্যানের স্মৃতি ও রক্তের প্রতীক। রুবি তার নিজের সংসার সাজিয়েছে, আর পুরো পরিবার একত্রিত হয়ে এক শান্ত, সুখী সন্ধ্যা উদযাপন করছে।
যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ‘কোল্ড মাউন্টেন’ প্রমাণ করে যে, প্রেম, প্রকৃতি এবং মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়।
লেখক পরিচিতি: চার্লস ফ্রেজিয়ার
চার্লস ফ্রেজিয়ার ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস কোল্ড মাউন্টেন প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে এবং ১৯৯৭ সালের ন্যাশনাল বুক এওয়ার্ড লাভ করে।
ফ্রেজিয়ারের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে থার্টিন মুন্স (২০০৬) নাইটউডস (২০১১), ভ্যারিনা (২০১৮) এবং দ্য ট্র্যাকার্স (২০২৩)। তাঁর রচনায় আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের ইতিহাস, স্থানীয় মানুষের জীবন, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মানবিক সম্পর্কের জটিলতা বিশেষ গুরুত্ব পায়।
২০০৩ সালে কোল্ড মাউন্টেন অবলম্বনে একই নামে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, যার পরিচালক অ্যান্থনি মিঙ্গেলা। এতে অভিনয় করেন জুড ল, নিকোল কিডম্যান ও রেনে জেলওয়েগার।
