আর্টিস্টস ফোরামের আর্ট ক্যাম্পে ৪৪ শিল্পীর গ্রুপ শো || গভর্নর্স আইল্যান্ডে বাংলাদেশের বাতাস

কৌশিক আহমেদঃ গভর্নর্স আইল্যান্ডের নোলান পার্কের ১৬ নম্বর বাড়ির সামনে ঝুলছে ব্যানার। তাতে লেখা আছে বাংলাদেশীআমেরিকান আর্টিস্ট ফোরামের গ্রুপ আর্ট এক্সিবিশনবিটুইন রিভার এন্ড হারবরঃ স্টোরিজ দ্যাট ক্যারি আস গত শনিবার দুপুরে মধ্যাকাশে সূর্য। তবে তার রশ্মি আগুনজ্বলা নয়। সামনের সবুজ ঘাসে ইজেল বসিয়ে শিল্পীরা নিজের মনে ছবি আঁকছেন। বামেডানে কোথাও তাকাচ্ছেন না। তাদের দৃষ্টি ক্যানভাসে, তুলিতে বা ব্রাশে এবং রঙে। অদূরের বাড়ির পাশের আঙ্গিনায় গান বাজিয়ে ছেলেমেয়েরা নাচছে। ডানের অন্য বাড়িতে ল্যাটিন আমেরিকান শিল্পীদের গ্রুপ প্রদর্শনী চলছে। সেখানেও শিল্পপ্রেমিকদের যাওয়াআসা। ১৬ নম্বর বাড়ির ভেতরে পর্দায় দেখানো হচ্ছে শামীম আল আমিনের তাৎক্ষণিক বানানো এই প্রদর্শনী ভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র। অনেক শিল্পী নিশ্চুপ বসে দেখছেন। ডকুমেন্টারি শেষে তিনি এর প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।

গত ২৩ মে শুরু হয়েছে এই গ্রুপ শো। চলবে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত। কিন্তু গত ২৫ জুলাই ছিল শিল্পীদের বার্ষিক অনুষ্ঠানআর্ট ক্যাম্প সে কারণে এদিন অংশগ্রহণকারী ৪৪ শিল্পীর মধ্যে বেশির ভাগই উপস্থিত ছিলেন। এই ৪৪ জনের জন প্রয়াত স্বনামধন্য শিল্পী মতলুব আলী কালিদাস কর্মকার। তাদের স্মরণে উৎসর্গ করা হয়েছে বছরের আর্ট ক্যাম্প।

গত উইকএন্ডে নিয়মিত প্রদর্শনী ছাড়াও ছিল জন শিল্পীর বিশেষ প্রদর্শনী। এই পাঁচ শিল্পী হলেন তাজুল ইমামসহ আলমা লিয়া, মোহাম্মদ হাসান রোকন, বিশ্বজিৎ চৌধুরী দিনা জামান। তাদের এক এক জনের প্রদর্শনী চলছিল দুতলায় পৃথক পৃথক গ্যালারিতে। মুক্তিযোদ্ধা সব্যসাচী শিল্পী তাজুল ইমামের প্রদর্শনী গ্যালারিতে আয়োজিত হলো বিশেষ অনুষ্ঠান। এখানে তাজুল ইমাম এই গ্যালারির ছবিগুলো আঁকার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করলেন। তাঁর প্রদর্শনীর নাম বাংলায়গহীন গানের নিবিড় কথাÑ অতীত সমকালীন চিত্রাবলী তিনি বলেন, ছবির প্রকাশ ভঙ্গিতে আমার ঐকান্তিকতা মিলিত হয় বলেই ছবির প্রাসঙ্গিকতা বদল হয়। কারণ সময় আমাকে বদলে দেয়। তিনি বলেন, ছবি আসলে আমার যাপিত জীবনের প্রাত্যহিক অনুভবের দিনলিপি। এই গ্রুপের একটি ছবি উল্লেখযোগ্যÑ বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতিসৌধের সাইড ভিউ। মাথায় সূর্যগ্রহণ। তা সত্ত্বেও আকাশের পূর্ব পাশে আগুন রং মেঘ। সামনের লেকে স্মৃতিসৌধের প্রতিবিম্ব। মনে হচ্ছিল প্রকৃতির প্রতিকূলতা সত্ত্বেও স্মৃতিসৌধ ঋজু ভঙ্গিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বলছে, আমি অম্লান, অনির্বাণ, চিরায়ত। তবে একটি ইন্সটলেশন আর্ট দৃষ্টি কাড়ে। পাহাড়ের ঝর্ণা থেকে পানি নেমে নদী বয়ে যাচ্ছে দুই কুল ছুঁয়ে। মনে হবে পৃথিবীর সব নদী যেন সংযুক্ত একটি ধারায়। এছাড়াও ছিল ভিন্ন ধারার আরো বেশ কিছু ছবি। সেখানে জীবন আছে, প্রকৃতি আছে, সংগ্রাম আছে।

এই পর্বে তাজুল ইমামকে উপস্থাপন করেন শিল্পী জেবুন্নেসা হেলেন এবং শিল্পী কিউরেটর কায়সার কামাল। তাজুল ইমামের ছবি আঁকা বিষয়ে ঘরের তথ্য দেন তার স্ত্রী স্বপ্না ইমাম।

আলমা লিয়া একটি গ্যালারিতে মাত্র একটি শিল্পকর্ম প্রদর্শন করেন। সিলিং থেকে মেঝে পর্যন্ত একটি সাদা ক্যানভাসে একটি সোনালি ফুল পানিতে ভেসে আছে। সেখানে ফড়িং, প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে বা বসে আছে। প্রজাপতির পাখার রংও সোনালি। নিচে পাথরে তিনটি ব্যাঙ মাথা উঁচু করে বসে আছে। আলমার এই ধরনের কাজই তার বিশেষত্ব।

তিনি কাফনের মধ্যেই প্রাণের উৎস খোঁজেন। ক্লাইমেট পরিবর্তন ফুল, ফড়িং ব্যাঙদের কিভাবে প্রভাবিত করছে, তার প্রকাশ বেশ করুণ। আলমা লিয়া জানালেন এই ইন্সটলেশন আর্ট তিনি এখানেই করেছেন।

ওহাইওয়ো থেকে আসা শিল্পী দিনা জামানের চিত্রকর্ম নির্দয় এবং সরব। আমেরিকায় তিনি যে নির্বাসিত জীবন যাপন করেন, তার নিষ্ঠুর বর্ণনা তুলে ধরেছেন গ্যালারি এবং হলওয়ে জুড়ে আঁকা ইন্সটলেশন আর্টে। ব্রাউন এবং লালচে কন্সট্রাকশন পেপারকে ছিঁড়ে জিগজ্যাগ করে, তারপর জোড়া লাগিয়েছেন। তার ওপর এঁকেছেন ইমিগ্রান্ট নারীদের জীবন সংগ্রাম যন্ত্রণার গল্প। যতগুলো মেয়ের মুখ এঁকেছেন, তাদের চোখে কান্না প্রতিবাদ যুগপত এসেছে। ওহাইয়ো থেকে আসা দিনা জামান নির্বাসন, বিচ্ছিন্নতা, অস্তিত্ববাদি মনোস্তত্ত্বের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন ইমার্সিভ ইমেজ। ইমিগ্রান্টদের জীবনের এই প্রতিকূলতা বারবার দর্শকদের ভাবায়। হয়ত এটাই ইমিগ্রান্টদের আর্ট। বা আউটসাইডার আর্ট।

প্রদর্শনীতে সৈয়দ আজিজুর রহমান তারিফ তার দুটি ছবিতে সমাজ, রাজনীতি প্রকৃতিকে একীভূত করেছেন তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে। নদীর গন্তব্য সমুদ্র হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের অনিবার্যতাকে তিনি মেনে নিতে রাজি নন। তিনি আশাবাদী যে মানুষই পারে পৃথিবীকে বাঁচাতে। এর সাথে তিনি মিলিয়েছেন ৩২ নম্বর ভবনের ধ্বংসযজ্ঞকে। যেন বঙ্গবন্ধু ভবন নয়, পুড়ছে বঙ্গোপসাগরের অববাহিকা। নীল সবুজের সমন্বয়ে তারিফ বিভ্রান্তি আশাকে যুগপত বসিয়েছেন। বাংলাদেশের সমকালীন পরিস্থিতির যে ঝড় তা উঠে এসেছে তার ছবিতে।

মোহাম্মদ হাসান রোকনের কয়েকটি ছবিতে রং এবং রেখার ব্যবহার এতটাই নিবিড় গভীর যে দর্শককে তীব্রভাবে আকর্ষণ করে ভেতরে নিয়ে যায়। তার দুটি ছবি ক্যানভাস অতিক্রম করে গেছে। সেখানে যোগ হয়েছে বস্তু। যেমন প্রচন্ড ঘূর্ণায়মান বৃত্তের গভীরতায় নতুন দ্যোতনা তৈরির জন্য ধাতব তার ব্যবহার করেছেন। আর গভীর শুষ্ক জংগলের নির্লিপ্তিতে অনুষঙ্গ তৈরির জন্য ক্যানভাসের বাইরে গাছের বাকল ছড়িয়ে দিয়েছেন। এই অনুষঙ্গ ছবির ব্যপ্তিকে শুধু ক্যানভাসের বাইরে নয়, মনে হবে বহুদূরে বিস্তৃত করেছে।

শিল্পী বিশ্বজিৎ চৌধুরীর কাজে এক ধরনের কোমল, নিবিড়, আর্দ্র ভালোবাসা হেমন্তের জ্যোৎস্না রাতের মত বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। এই প্রদর্শনীর ছবিগুলিতে সেই নৈর্ব্যক্তিক অথচ একান্ত নিজস্ব স্বপ্ন যেন ক্যানভাস ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চেয়েছে। দূর থেকে দেখলে টেরাকোটা বা পোড়ামাটির কাজ মনে হবে। কিন্তু এই কাজগুলো ক্যানভাসে আঁকা। পোড়ামাটির রংই ব্যবহার করেছেন তিনি। এক একটি ফ্রেমে ছয়টি স্কয়ার। প্রতিটি স্কয়ারে নিরব কান্না যেন বেঁধে রাখা যায়নি। শিরোনামহীন একটি ভার্টিকেল ফ্রেমের ইমেজটি যেন পৃথিবীর আদিম ভূমি। সেখানকার দুঃখবোধ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়।

এই গ্রুপ শো কিউরেটর শিল্পী কায়সার কামাল। প্রদর্শনীতে তার ভিন্ন ধারার শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। তিনি বাংলাদেশের নিজস্ব মোটিফ জামদানি শাড়ি নিয়ে যে কাজ করেছেন, সেখানে কেবল শাড়ির ইন্সটলেশন করেননি, জামদানির ডিজাইনের যে জ্যামিতিক কোন এবং কৌণিক ইমেজ তাও পৃথকভাবে তিনটি ছবিতে দেখিয়েছেন। ঢাকার জামদানি পল্লী যেহেতু নদীর ধারে তাই শাড়ির ইন্সটলেশনে নদীর আবহ ধরতে চেয়েছেন। মূলত জামদানির মোটিঢও ধানসিড়ি নদীর মত। অন্য ইন্সটলেশনে তার ঢাকা থেকে নিউইয়র্কে মাইগ্রেশনের যে রূপান্তর দেখিয়েছেন উজ্জ্বল রঙে, তিনটি মানুষের ভারহীনতা অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিলেও সেখানে আলোর উল্টো পিঠও আছে, উজ্জ্বল রঙের বিপরীত ধমীর্ চরিত্রও কল্পনায় উঠে আসে। অপর ইন্সটলেশনে বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডের ওপর ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার উঠে এসেছে। উঠে এসেছে রিমোটে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ, ড্রোনের যুদ্ধ আর মিলিটারির রণসজ্জা। মূলত এটি একটি যুদ্ধবিরোধী ইন্সটলেশন।

এই গ্রুপ শোতে বাংলাদেশী শিল্পীদের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার ছবি স্থান পেয়েছে। দীপা দেবনাথের লাল কাপড়ে একটি নারীর চোখ বাঁধা সোচ্চার প্রতিবাদ হয়ে এসেছে। পশ্চাদপটের ঘড়িটি জানান দিচ্ছে এই পরাধীনতার দিন শেষ হয়ে আসছে। এই ছবির সবুজের ব্যবহার যেমন আশা জাগানিয়া, তেমনই সাদা পোশাক মৃত্যুকে ভয় না করার দৃঢ়তা। এছাড়াও রয়েছে অনেক গভীর ব্যঞ্জনাময় ছবি। সেগুলোর প্রত্যেকটি পৃথক পৃথকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

প্রদর্শনীতে এর বাইরেও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম রয়েছে। খুব গভীরভাবে নিবিষ্ট মনে প্রত্যক্ষ করলে অনুভব করা যায়, সেসব ছবিতে তীব্র কান্না, একাকীত্ব, অনিশ্চয়তা, নির্বাসন অস্তিত্ব সংকটের চিন্তা উঠে এসেছে রঙে রেখায়। রিভার এন্ড হারবরেরর মধ্যবতীর্ জায়গাটিই শিল্পীদের নতুন জীবন। সেই জীবনে যন্ত্রণাকাতরতা যতটুকুই থাকুক, শিল্পীরা তাদের ছবিতে আশাবাদের গানই গেয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, এই শিল্পীরা প্রবাস জীবনেও দেশকে ভোলেননি, দেশের প্রকৃতিকে এবং মানুষকে ভোলেননি। অনেকের ছবি দেখে মনে হয়েছে যেন বাংলাদেশের সবুজ বাতাস ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে গভর্নর্স আইল্যান্ডের ১৬ নম্বর (নোলান পার্কে) গ্যালারিতে এবং এর সামনের সবুজ প্রান্তরে।

প্রদর্শনীতে শিল্পী মতলুব আলী শিল্পী কালিদাস কর্মকারের দুটি ছবি রয়েছে। দুটি গ্যালারির নাম দেয়া হয়েছে এই দুই শিল্পীর নামে। তারা এক সময় এই শহরে বাস করতেন। রবিবার ছিল শিশুদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা। এতে প্রায় ৫০ জন শিশু কিশোরকিশোরী অংশ নেয়।

প্রদর্শনীতে অংশ নেন (ক্যাটালগ অনুসারে) আর্থার আজাদ, আলমা লিয়া, আজমির হোসেন, বারকিয়া আজম, বাশিরুল হক, বিশ্বজিত চৌধুরী, ছবি জুলফিকার, দিনা জামান, দীপা দেবনাথ, ফারহানা ইয়াসমিন, কায়সার কামাল, কানিজ হুসনা আকবরী, কাওসার ফেরদৌসী, কাজল এ্যানথনি দাস, খুরশিদ সেলিম, কিউ সি মং, মোহাম্মদ হাসান (রোকন), মোহাম্মদ সাইদুল হাসান, মুস্তাফা আরশাদ, নাজ হোসেন পলি, নূরুল হক মিনু, সাইদুর রহমান, রোকেয়া সুলতানা, রুদ্র মো. আয়ুধ জাহাঙ্গীর, সালমা সিনহা কানিজ, সাঈদ এম. হক, সাজেদা সুলতানা, শামীম আরা, শামীম বেগম, শারমিন সিরাজি, স্বর্গ ভট্টাচার্য, শামীম সুব্রানা, সুজিত কুমার সাহা, আজিজুর রহমান, তাজুল ইমাম, তাহমিনা সরকার, তারিক জুলফিকার, তাসনুভা রহমান, ওয়াহিদ আজাদ, জান্নাত সুলতানা জেবুন কামাল হেলেন।

Related Posts