কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প—২২ কাগজের নোটে বিশ্বখ্যাত উদ্ভাবক ও তাঁদের যুগান্তকারী আবিষ্কার || আখতার আহমেদ রাশা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাঁদের কাগজের মুদ্রায় এমন কিছু মানুষকে স্থান দিয়েছে, যাঁদের মেধা আর আবিষ্কার মানবসভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছিল। বিশ্বখ্যাত উদ্ভাবকদের নিয়ে বিশেষ সিরিজের এবারের পর্বে আমরা চোখ রাখব এমন কিছু দুর্লভ ও দৃষ্টিনন্দন ব্যাংকনোটের ওপর যেগুলো একই সাথে বিজ্ঞান ও ইতিহাসের এক একটি অনন্য স্মারক। আমার সংগ্রহে থাকা এমনই কিছু চমৎকার নোট ও তাঁদের পেছনের গল্প নিয়ে আজকের আয়োজন।
গণিত, পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে নেদারল্যান্ডসের ক্রিস্টিয়ান হাইগেনস এক অনন্য আলোকবর্তিকা। তবে উদ্ভাবক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো ‘পেন্ডুলাম ঘড়ি’ (চবহফঁষঁস ঈষড়পশ) আবিষ্কার এবং আলোর তরঙ্গ তত্ত্বের প্রবর্তন। ১৯৫৫ সালের নেদারল্যান্ডসের ক্ল্যাসিক ২৫ গুল্ডেন নোটে হাইগেনসের প্রতিকৃতির পাশাপাশি জ্যামিতিক ও বৈজ্ঞানিক নকশার একটি চমৎকার ছাপ রয়েছে, যা সে সময়ের ইউরোপীয় মুদ্রাশৈলীর এক অনন্য উদাহরণ। আধুনিক নৌ—যোগাযোগ ও জাহাজ চলাচল ব্যবস্থায় যিনি বিপ্লব এনেছিলেন তিনি হলেন জোসেফ রেসেল। তিনি জাহাজের ‘স্ক্রু প্রপেলার’—এর আবিষ্কারক। ১৯৬৫ সালের অস্ট্রিয়ার ৫০০ শিলিং নোটে এই মহান উদ্ভাবককে সম্মান জানানো হয়েছে। নোটটিতে জোসেফ রেসেলের ছবির সাথে তাঁর সেই ঐতিহাসিক প্রপেলারের নকশাও দেখা যায় যা প্রযুক্তিপ্রেমী ও থিম্যাটিক নোট সংগ্রাহকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। আধুনিক তড়িৎ প্রকৌশলের জাদুকর এবং অল্টারনেটিং কারেন্ট (অঈ) বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জনক নিকোলা টেসলাকে সার্বিয়া অমর করে রেখেছে তাদের ২০১৩ সালের ১০০ দিনারের নোটে। নোটটির নকশা অত্যন্ত আধুনিক ও তথ্যসমৃদ্ধ। এতে টেসলার চমৎকার প্রতিকৃতির পাশাপাশি তাঁর তৈরি বিখ্যাত ‘টেসলা কয়েল’ (ঞবংষধ ঈড়রষ) এবং আবেশ মোটরের (ওহফঁপঃরড়হ গড়ঃড়ৎ) গাণিতিক সূত্র ও নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
সঙ্গীতের দুনিয়ায় একটি জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্র ‘স্যাক্সোফোন’ (ঝধীড়ঢ়যড়হব)—এর উদ্ভাবক আডলফ স্যাক্স। বেলজিয়াম ১৯৯৫ সালে তাদের ২০০ ফ্রাঙ্কের ব্যাংক নোটে এই গুণী মানুষকে স্থান দেয়। নোটটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। স্যাক্সের প্রতিকৃতির পাশাপাশি এতে স্যাক্সোফোনের ছবি এবং সুরের নোটের একটি চমৎকার জলছাপ ব্যবহার করা হয়েছে, যা নোটটিকে এক অনবদ্য শিল্পকর্মে রূপ দিয়েছে।
পেশায় পশু চিকিৎসক হলেও বিশ্বকে গতিশীল করতে বিশাল অবদান রেখেছিলেন জন বয়েড ডানলপ। তাঁর হাত ধরেই প্রথম আলোর মুখ দেখে ব্যবহারিক ‘নিউমেটিক টায়ার’ (চহবঁসধঃরপ ঞুৎব) বা বাতাসভর্তি রবার টায়ার, যা আজকের বিশ্ব মোটরগাড়ি শিল্পের চাকা ঘোরানোর মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিল। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ১৯৯৭ সালের (ফাস্টর্ ট্রাস্ট ব্যাংক) ১০ পাউন্ডের নোটে তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করা হয়েছে।
দূরপাল্লার বেতার বার্তা বা রেডিও যোগাযোগের মহান উদ্ভাবক গুগ্লিয়েলমো মার্কোনিকে ইতালি স্থান দিয়েছিল তাদের ইউরো—পূর্ববর্তী যুগের বিখ্যাত ২,০০০ লিরার নোটে। ৯০—এর দশকের এই নোটটি এর অসাধারণ থিম্যাটিক ডিজাইনের জন্য সংগ্রাহকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। নোটের একপাশে মার্কোনির প্রতিকৃতির সাথে তাঁর প্রথম দিকের বেতার যন্ত্রের নকশা রয়েছে। আর অপর পিঠে দেখা যায় আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে বেতার তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ার প্রতীকী চিত্র, তাঁর ব্যবহৃত বিশাল অ্যান্টেনা এবং বিখ্যাত ইতালীয় গবেষণা জাহাজ ‘ইলেট্রা’ (ঊষবঃঃৎধ), যেখান থেকে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বেতার পরীক্ষা চালিয়েছিলেন।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত একটি নোট হলো ২০১১ সালের ৫০ পাউন্ডের নোটটি। কারণ, এতে যৌথভাবে দু’জন মানুষের অবদানকে উদযাপন করা হয়েছে—একপাশে আধুনিক স্টিম ইঞ্জিন বা বাষ্পীয় ইঞ্জিনের রূপকার জেমস ওয়াট (যিনি শিল্প বিপ্লবের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন) আর অন্যপাশে দূরদর্শী ব্যবসায়ী ও প্রকৌশলী ম্যাথিউ বোল্টন, যিনি ওয়াটের এই আবিষ্কারকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করে তোলেন। নোটের পেছনে এই দুই অংশীদারের প্রতিকৃতির পাশাপাশি ব্যাকগ্রাউন্ডে জেমস ওয়াটের তৈরি করা সেই ঐতিহাসিক ‘হ্যান্ডসওয়ার্থ কারখানার’ (ঐধহফংড়িৎঃয গধহঁভধপঃড়ৎু) একটি বিশাল বাষ্পীয় ইঞ্জিনের নিখুঁত স্কেচ বা ব্লু—প্রিন্ট ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিজ্ঞান ও পুঁজির মেলবন্ধন কীভাবে পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিল, এই নোটটি যেন তারই একটি জলজ্যান্ত দলিল।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও জীবন রক্ষাকারী আবিষ্কারগুলোর একটি হলো ‘পেনিসিলিন’ (চবহরপরষষরহ)—যা পৃথিবীর প্রথম কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক। আর এর আবিষ্কারক স্কটিশ বিজ্ঞানী স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং। ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সম্পূর্ণ ঘটনাক্রমে (অপপরফবহঃধষ উরংপড়াবৎু) ল্যাবরেটরিতে এক ধরনের ছত্রাক থেকে তিনি এটি আবিষ্কার করেন, যা ব্যাকটেরিয়াজনিত মহামারী থেকে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিল। এই যুগান্তকারী অবদানের জন্য ১৯৪৫ সালে তাঁকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ২০০৯ সালে স্কটল্যান্ডের ক্লাইডেসডেল ব্যাংক (ঈষুফবধংফধষব ইধহশ) তাদের ৫ পাউন্ডের নোটের সামনের অংশে এই মহান বিজ্ঞানীর প্রতিকৃতির স্থান দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করে। নোটটিতে ফ্লেমিংয়ের ছবির পাশাপাশি তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি এবং ল্যাবরেটরির বৈজ্ঞানিক অনুষঙ্গের একটি সূক্ষ¥ ছোঁয়া রয়েছে যা চিকিৎসা ইতিহাসের এক অনন্য স্মারক।
কাগজের এই ছোট ছোট টুকরোগুলো আসলে একেকটি টাইম মেশিন। এগুলো পকেটে নিয়ে আমরা যেমন ঘুরতে পারি, ঠিক তেমনি এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেইসব মানুষদের কথা যাঁদের রাতজাগা পরিশ্রম আর উদ্ভাবনী ক্ষমতা আজকের আধুনিক পৃথিবীকে গড়ে তুলেছে। আমার সংগ্রহের এই নোটগুলো কেবল কাগজের মুদ্রা নয় এগুলো মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রার একেকটি জীবন্ত ইতিহাস।
