ফ্রান্সে দাবানল — সংকটে ইউরোপ || ড. জীবন বিশ্বাস
প্রকৃতির কি কোনো নীরব ভাষা আছে? নাকি তার ক্রোধ কেবল দাবানলের রুদ্ররূপে আত্মপ্রকাশ করে? ২০২৬ সালে ফ্রান্সে যে ভয়াবহ অগ্নিগ্রাস দেখা দিল, তা কেবল কয়েকটি বনভূমির ছাই হয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এ এক সভ্যতার আয়নায় ফুটে ওঠা বিপজ্জনক সত্য। ইউরোপের যে উন্নত অবকাঠামো জনস্বাস্থ্য আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রাচীর তুলে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিল, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের এক ফুৎকারে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। জুলাইয়ের ২৯ তারিখের মধ্যে ফ্রান্স ও স্পেনের সীমান্ত পেরিয়ে ৩ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষকে নিজ গৃহের ভিটেমাটি ছেড়ে পালাতে হয়েছে। দক্ষিণ ইউরোপের সবুজ মানচিত্রের একাংশ মুহূর্তেই এক ধূসর শ্মশানে পরিণত হয়েছে। কেবল ফ্রান্সেই পুড়ে ছাই প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর বনভূমি (কিলোমিটারের হিসাবে যা ১,১৬০ বর্গকিলোমিটারের এক বিপুল আয়তন)। কোনো ঐতিহাসিক রেকর্ড এই ধ্বংসের ভয়াবহতাকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। চরম তাপপ্রবাহ, টানা খরা আর অতিদাহ্য অরণ্যের বুক চিরে হাওয়ার তীব্র বেগÑসব যেন এক মহাসংঘাতের চিত্রনাট্য রচনা করেছে। প্রকৃতির এই ভয়াবহতা ও এর সম্ভাব্য প্রতিকার নিয়েই আজকের উপসম্পাদকীয়।
বিপর্যয়ের সবচেয়ে করুণ আলেখ্য রচিত হয়েছে দক্ষিণ—পশ্চিম ফ্রান্সের জিরোন্দ বিভাগে, আর আর্কাশোঁ অববাহিকার ছায়াঘেরা পাইন বনে। প্রধান অগ্নিশিখাটি একাই গ্রাস করে নিল ৪২ হাজার হেক্টরের বেশি ভূখন্ডÑযা চিরচেনা প্যারিস শহরের আয়তনের প্রায় চার গুণ! বোর্দো নগরীর নিঃশ্বাস ছোঁয়া দূরত্বে, মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে যখন আগুন এসে দাঁড়ায়, তখন আতঙ্ক যেন বাস্তব হয়ে দেখা দেয়। জরুরি অবস্থার চরম মুহূর্তে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছে। ক্যাপ—ফেরে উপদ্বীপে যখন ডাঙার পথ আগুনের প্রাচীরে অবরুদ্ধ, তখন নৌকায় করে সমুদ্রপথে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া ছাড়া পথ ছিল না। বনের আগুন থেকে বাঁচতে সাগরের বুকে আশ্রয়ের এই দৃশ্য যেন কোনো যুদ্ধ কিংবা মহাপ্লাবনের মহড়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। সভ্যতার ইতিহাসে যা ছিল বিরল, তা—ই এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা।
কিন্তু প্রকৃতির খেলা সেখানেই শেষ হয়নি। জিরোন্দের এই বিধ্বংসী আগুন নিজের ভেতরেই জন্ম দিল এক অদ্ভুত বায়ুমন্ডলীয় দানবের। উত্তপ্ত বাতাস যখন হু হু করে আকাশে উঠল, তখন বায়ুমন্ডলে রচিত হলো ‘পাইরোকিউমুলোনিম্বাস’Ñসহজ কথায় অগ্নি—বজ্রঝড়। আকাশ তখন মেঘ নয়, ধোঁয়া আর বাষ্পের এক নরকপুরী। এই অগ্নিমেঘ থেকে নেমে এলো উন্মত্ত বাতাসের ঝাপটা আর বজ্রপাত। তপ্ত অঙ্গার উড়ে গিয়ে পড়ল বহুদূরে, অগ্নিনিরোধক কৃত্রিম সীমানা টপকে জ্বালিয়ে দিল নতুন নতুন বনভূমি। আগুন তখন আর আবহাওয়ার দাস নয়, সে নিজেই নিজের আবহাওয়া তৈরি করে ধ্বংসলীলাকে কঠোরভাবে পরিচালনা করতে শুরু করল।
এই দাবানলের ক্ষত গিয়ে লেগেছে ফ্রান্সের জাতীয় সংস্কৃতির হৃৎপিন্ডেও। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাইসাইকেল রেস ‘ট্যুর দ্য ফ্রান্স’—এর শেষ ধাপের দূরত্ব ১৩৩ কিলোমিটার থেকে ছাঁটাই করে ৮৯ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হলো। আপাতদৃষ্টিতে এটা ক্রীড়াজগতের সাময়িক বিভ্রাট মনে হতে পারে, কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, জলবায়ু সংকটের মূল্য কতখানি চড়া। যখন প্রতিটি পুলিশ সদস্য, হেলিকপ্টার, অ্যাম্বুলেন্স ও দমকলকর্মী দাবানলের আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য হন, তখন রাষ্ট্রের অন্য সব স্বাভাবিক ছন্দ থমকে দাঁড়ায়।
কোপার্নিকাস জলবায়ু পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সাম্প্রতিক তথ্য উপাত্ত বিশ্বকে কোনো সান্ত্বনা দেয় না। ১৯৯৬ থেকে ২০২৫Ñএই তিন দশকে ইউরোপের স্থলভাগের তাপমাত্রা প্রতি দশকে বেড়েছে ০.৫৬ক্ক সেলসিয়াস হারে। অথচ পুরো বিশ্বের গড় বৃদ্ধির হার ছিল ০.২৭ক্ক সেলসিয়াস। অর্থাৎ, এই বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত উত্তপ্ত হতে থাকা মহাদেশের নাম এখন ইউরোপ। কেবল সুদূর আর্কটিক অঞ্চল ০.৭৫ক্ক সেলসিয়াস হারে উত্তপ্ত হয়ে এর চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
কেন ইউরোপের বুকে এই অগ্নিবৃষ্টি? উত্তরটা একক কোনো সমীকরণে মেলে না। সমুদ্রের চেয়ে স্থলভাগ দ্রুত উত্তপ্ত হয়Ñএ তো বিজ্ঞান। তার ওপর যুক্ত হয়েছে ‘আর্কটিক অ্যামপ্লিফিকেশন’। বরফের ধবধবে সাদা চাদর গলে যখন তলার গাঢ় রঙের মাটি আর সমুদ্র জেগে ওঠে, তখন তা আগের চেয়ে অনেক বেশি সৌরশক্তি শোষণ করে। ফলে উত্তাপ বাড়ে চক্রবৃদ্ধি হারে। বায়ুমন্ডলের গতিপথও বদলে গেছে। পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে ‘ডাবল—জেট’ বায়ুপ্রবাহের করুণ কাহিনী। জেট স্ট্রিম যখন দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন মহাদেশের ওপর আটকে যায় এক স্থবির উচ্চচাপবলয়। অবরুদ্ধ সেই উত্তপ্ত বাতাস পুরো পশ্চিম ইউরোপকে এক উষ্ণ চুল্লিতে পরিণত করে। গবেষণার হিসেব বলছে, ইউরোপের সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং পশ্চিম ইউরোপের চরম পরিস্থিতির প্রায় পুরোটাই এই থমকে যাওয়া বায়ুপ্রবাহের অভিশাপ।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে এক অদ্ভুত বৈরিতাÑ ‘অ্যারোসল প্যারাডক্স’। ইউরোপ পরিবেশ পরিচ্ছন্ন করার তাগিদে বায়ুমন্ডল থেকে সালফেটের মতো ক্ষতিকর কণা কমিয়েছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য যা আশীর্বাদ, তা—ই প্রকৃতির জন্য আরেক বিপত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অ্যারোসল কণা সূর্যালোক ফিরিয়ে দিয়ে পৃথিবীকে কিছুটা শীতল রাখত। সেই আবছায়া পর্দা সরে যেতেই গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্বউষ্ণায়নের আসল রুদ্ররূপটি নগ্ন হয়ে বেরিয়ে এসেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বায়ুদূষণ ভালো, বরং বার্তাটি পরিষ্কার—দূষণ কমানোর পাশাপাশি গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণও নিঃশর্তভাবে কমাতে হবে।
একথা মানতেই হবে, বিপুল ধনসম্পদ আর বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি কোনো ভূখন্ডকে প্রকৃতির অসীম প্রলয়ংকরী ক্ষমতা থেকে রক্ষা করতে পারে না। ইউরোপীয় স্থাপত্যের অধিকাংশ প্রাচীন ঘরবাড়ি তৈরি হয়েছিল শীতের তীব্রতা আটকানোর জন্য, ৪০ক্ক সেলসিয়াসের দাবদাহ সহ্য করার জন্য নয়। ফলে যে প্রবীণ জনগোষ্ঠী নিয়ে ইউরোপের গৌরব, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, গত চার বছরেই ইউরোপে অতিরিক্ত তাপে প্রাণ গেছে ২ লাখের বেশি মানুষেরÑযার অধিকাংশই ছিল প্রতিরোধযোগ্য।
অর্থনৈতিক ক্ষতিও কফিনে শেষ পেরেক ঠুকছে। ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জলবায়ুজনিত দুর্যোগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষতি হয়েছে ৮২২ বিলিয়ন ইউরো। কেবল গত চার বছরেই বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৪৪ বিলিয়ন ইউরো। রাইন কিংবা দানিয়ুব নদী কেবল ভূগোলের পাঠ্যবইয়ের নাম নয়, এগুলো ইউরোপীয় বাণিজ্যের প্রধান ধমনী। নদীর পানি শুকিয়ে গেলে যখন জাহাজ চলাচল থমকে যায়, তখন সেই ধাক্কা গিয়ে লাগে কলকারখানা, খাদ্যমূল্য এবং সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে।
বিপদের দিনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সংহতির হাত বাড়িয়েছে ঠিকই। ইইউ সিভিল প্রোটেকশন মেকানিজমের অধীনে ফ্রান্সে এসে পৌঁছেছে একাধিক দেশের বিমান ও হেলিকপ্টার। স্পেনেও গেছে জরুরি সাহায্য। কিন্তু এই আয়োজন এক বিরাট সত্যকে উন্মোচন করেছে নগ্নভাবেÑএকযোগে একাধিক দেশে আগুন জ্বললে তা সামলানোর মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম কারো কাছে নেই। ২০২৬ সালের চরম মৌসুমে পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংরক্ষিত বহরে অগ্নিনির্বাপক বিমান ছিল মাত্র ২২টি! তবে ইউরোপের এই আর্তনাদে যেন এশিয়া বা আফ্রিকার অনাহারী মানুষগুলোর হাহাকার ঢাকা পড়ে না যায়! দক্ষিণ গোলার্ধের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার হয়তো ইউরোপের চেয়ে কম, কিন্তু সেখানকার কোটি কোটি মানুষের কাছে কোনো আর্থিক নিরাপত্তা বলয় নেই। নিচু দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্বই আজ সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার মুখে।
ফ্রান্সের এই জ্বলন্ত অরণ্য আসলে কোনো সুদূর ভবিষ্যতের সতর্কতা নয়, এটি বর্তমানকালের বিপজ্জনক সত্য। কেবল কৃত্রিম আগুন নেভানোর জলকামান দিয়ে এই লড়াই জেতা যাবে না। দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ না কমাতে পারলে, মানুষের সব অভিযোজন চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। ফ্রান্সের দগ্ধ পাইন বনের ছাই থেকে ভেসে আসা বিপদ—বার্তাটি স্পষ্ট—আগুন আর শহরের বাইরে অপেক্ষা করে নেই, তা এখন দোরগোড়ায়।
যৌথভাবে এর প্রতিকার করা জরুরী, এখনই! সময়ক্ষেপণের সময় নেই মোটেই! শিল্পোন্নত যে সমস্ত দেশ বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়িয়ে চলেছে অঢেল বিত্তের লোভে, তাদেরকেই ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ এবং এই পরিবেশ দুর্যোগের প্রতিকারের দায়িত্ব নিতে হবে সিংহভাগ!
