বাঙালিদের গৌরবের জায়গা

আমাদের গৌরবের জায়গাগুলি যে খুব কম তা নয়। অনেক গৌরবকে আমরা পদদলিত করি, ইচ্ছাকৃত, অনেক গৌরবকে হয়ত শনাক্তই করতে পারি না। পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি জাতি গোষ্ঠীর রীতিমত সশস্ত্র যুদ্ধ করে নিজেদের দেশকে স্বাধীন করার মত ঘটনা খুব বেশি নেই। বাংলাদেশের শিক্ষিত অশিক্ষিত প্রায় সকলেই জানত, এখনো জানে, বিশ্বাসঘাতকতা আর প্রতারণার মধ্য দিয়ে ১৭৫৭ সালে বাংলা সহ আর দুটি অঞ্চলকে ভিনদেশীর হাতে তুলে দেয়া হয়। বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদীরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামে ব্যবসা করার উদ্দেশে এসে পুরো ভারতবর্ষের শাসক হয়ে বসে। এর জন্য তারা দেশী বিশ্বাসঘাতকদের সাথে নেয়। বাংলাদেশের আপামর মানুষ এও জানে যে বাংলা ভাষায় বিশ্বাসঘাতকতার সমাথর্ক নতুন একটি শব্দ সংযোজন হয়। শব্দটি সেই বিশ্বাসঘাতকের নামেমিরজাফর ইতিহাস কেউ ইচ্ছা করলেই পরিবর্তন করতে পারে না। ইতিহাস চলে সময়ের ধারায়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের নেতা যেমন ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, তেমনই পৃথিবীর অনেক দেশ এই যুদ্ধের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন আদায় করতে পিআইএর প্লেন হাইজ্যাক করে এক ফরাসী যুবক জিন ইউনিজ পল শ্লে, ফ্রান্সের লেখক এবং মন্ত্রী আদ্রে মালরো যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে, লন্ডনে ট্রাফালগার স্কয়ারে অনেক বৃটিশ নাগরিক পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, বাল্টিমোরে অস্ত্রবহনকারী পাকিস্তানি জাহাজ রুখে দিয়েছিল পেনসিলভেনিয়ার রিচার্ড এবং তার দল, মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি, বৃটিশ এমপি জন স্টোনহাউজ, জাপানি এমপি হায়া কাওয়ার মত রাজনীতিকরা দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশের পক্ষে, ছুটে গেছেন শরণার্থী শিবিরগুলোতে। কবি এলেন গিন্সবার্গ কলকাতা হয়ে যাশোর রোডে শরণার্থীদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখতে গিয়েছিলেন, জোয়ান বায়েজ নিজে গান লিখে সুর করে গেয়ে রেকর্ড বের করেছিলেন।বাংলাদেশ বাংলাদেশগানটি হিট করেছিল। আরদ্য কনসার্ট অব বাংলাদেশছিল পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী শিশুদের সাহায্য করার লক্ষ্যে এত বিশাল চ্যারিটি এই প্রথম। ভাবাই যায় না সেখানে গান গাইছেন ষাটের দশকের বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যান্ডবিটলসএর শিল্পী জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান, এরিখ ক্ল্যাপটন, রিংগো স্টার, বিলি প্রেস্টন, লিওন রাসেল। তাদের সাথে আরো ছিলেন উপমহাদেশের ধ্রুপদী সংগীতের তিন মহীরুহ রবিশংকর, আলি আকবর খান আল্লারাখা খান। অনুষ্ঠানটি হয়েছিল ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের এরেনায় আগস্ট ১৯৭১। পরপর দুটি শোই ছিল সোল্ডআউট।

আজ আগস্ট। ১৯৭১ এর পর ৫৫ বছর চলে গেছে। কিন্তু পৃথিবীর মানুষ ভুলে যায়নি। জর্জ হ্যারিসন স্মৃতিচারণ করেছেন এইভাবেঃ তিনি এবং রবিশংকর রাগা ছবির মিউজিক করার জন্য লন্ডন এবং লসএঞ্জেলেসে আসা যাওয়া করছিলেন। এই সময় লন্ডন টাইমসের সেন্টার পেজে পাকিস্তানি সাংবাদিক এ্যানথনি ম্যাসকারেনহাসের একটি শব্দএঊঘঙঈওউঊশিরোনামের খবরটি চোখে পড়ে। ইতিপূর্বে অবশ্য রবিশংকরের সাথে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। তারা দুজনে পরিকল্পনা করেন শরণার্থী শিবিরে লক্ষ লক্ষ শিশু যে মানবেতর জীবনযাপন করছিল তাদের জন্য কিছু করা যায় কিনা। অতএব প্রস্তুতি শুরু হয় জুন মাসের শেষ সপ্তাহে। মাত্র সপ্তাহের প্রস্তুতিতে এই আয়োজন সম্পন্ন হয় সফলভাবে। নিউইয়র্ক টাইমসসহ অন্যান্য গণমাধ্যম আন্তরিক খবর ছাপে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য বিশ্ব জনমত গঠনে এটা যে কতবড় সহায়ক ছিল তা বিশ্লেষকরা দেখেছেন। অথচ এই উদ্যোগে কোনো দেশের কোনো সরকারের সহায়তা ছিল না। আমেরিকার সরকারের সমর্থনের প্রশ্নই ওঠে না। কারণ প্রেসিডেন্ট নিক্সন, তার ন্যাশনাল সিকিউরিটি এডভাইজার হেনরি কিসিংজার এবং রিপাবলিকানরা ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। জাতিসংঘে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত জর্জ ডব্লু্য বুশ সেখানে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো দেন।

১৯৭১এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকা, চীনসহ মধ্যপ্রাচ্য আরো কতিপয় দেশ বাদ দিলে পুরো পৃথিবীই বাঙালিদের পক্ষে ছিল। এমন কি আমেরিকা, ক্যানাডা, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপানের মত দেশের জনগণও। একাত্তর নিয়ে যারা অবান্তর প্রশ্ন তোলে তারাও এসব খবর জানে। কারণ গুগল করলে যুগে সব তথ্য ফোনেই পাওয়া যায়। পুরনো প্রজন্ম রাজনীতির ঘোলাজলে উটপাখির মত বালিতে মুখ গুজে থাকে। আর যারা ১৯৭১এ পৃথিবীকে বিস্মিত করার মত ঘটনা ঘটিয়েছিল, তারাও সঠিকভাবে সময়কে এগিয়ে নিতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু ছিলেন দূরদশীর্ প্রাজ্ঞ রাজনীতিক এবং স্টেটসম্যান। তিনি বলতেন, স্বাধীনতা অর্জন কঠিন, তার চেয়েও কঠিন স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখা। তিনি নিশ্চয় দিব্যদৃষ্টি দিয়ে এমনটি দেখেছিলেন। কিন্তু নিজেই শিকার হন হত্যার।

অবাক লাগে নতুন প্রজন্মের কথা ভাবলে। তারা একটি সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে স্বাধীনতাকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলল। এটাই অবিশ্বাস্য। কারণ ১৯৫২, ১৯৭১ ছাড়া আমাদের এত বড় বৈশ্বিক অর্জন আর কী আছে? আর কী নিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়াতে পারি?

১৯৭১ এর আগস্টের দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ বারবার আমাদের সেই গৌরবের জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয়।

Related Posts