আমি আর ঢাকা ড্রামা || সারোয়ার হারুন
আমি তখনও হাইস্কুলের সীমানা পার হতে পারিনি। রেডক্রসের বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় একক অভিনয়ে অংশ নিয়েছিলাম। প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন বাবুল রশীদী। তখন তিনি শিল্পকলা একাডেমির নাটক ও চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক, পাশাপাশি নাট্যচক্রের একজন দাপুটে অভিনেতা। অভিনয় শেষে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,
— বড়দের সঙ্গে অভিনয় করবে?
আমার কাছে যেন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো ব্যাপার। এক মুহূর্ত দেরি না করে প্রস্তাবটি লুফে নিলাম।
সেখান থেকেই শুরু।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় টিএসসি। ম. হামিদ নিজে নাটক নির্দেশনা দিচ্ছেন, স্ক্রিপ্ট বিশ্লেষণ করছেন, চরিত্রের গভীরে প্রবেশের পথ দেখিয়ে দিচ্ছেন। মমতাজউদ্দীন আহমেদ প্রতিদিন একটু একটু করে নতুন পাণ্ডুলিপি পড়ে শোনান। এনএসডি থেকে সদ্য ফিরেছেন কামালউদ্দীন নিলু, ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, গোলাম সারওয়ার। তাঁদের সবার মধ্যে ছিল অকৃপণভাবে দিয়ে যাওয়ার আনন্দ। আর আমরা, যারা নতুন, তাদের মধ্যে ছিল শেখার অদম্য ক্ষুধা।
স্তানিস্লাভস্কি, ব্রেখট, বাদল সরকার, সেলিম আল দীন, বোয়াল, বেকেটÑ এসব নাম আর তাঁদের নাট্যভাবনা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে টিএসসির আড্ডা যেন প্রতিদিনই উত্তপ্ত হয়ে উঠত।
তিন বছরের মধ্যেই নাট্যচক্রের পাঠ শেষ করে বাড়ির কাছের নাট্যদল মহানগরী ৭৭—এ যোগ দিলাম। সেখানে কয়েক বছর কাজ করার পর অগ্রজ বন্ধু সৈয়দ আজিজ, রফিকুল ইসলাম বাবু ও শিকদার মোকাদ্দেস আহমেদ তুহিন একদিন বললেন,
— আমরা নতুন দল করছি। তোমাকে থাকতে হবে।
শুরু হলো কুশীলবের যাত্রা।
আমার নাট্যচর্চার সবচেয়ে নিবিড় পর্বটি গড়ে উঠেছে কুশীলবকে ঘিরেই। দলের হয়ে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, শিল্পকলা একাডেমি, গ্যেটে ইনস্টিটিউট, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারÑ যেখানে কর্মশালা হয়েছে, সেখানেই ছুটে গেছি। আবার দলের প্রশিক্ষণ সম্পাদক হিসেবে নিজেদের কর্মশালার আয়োজনের দায়িত্বও ছিল আমার ওপর। শিল্পকলা একাডেমি ও বাংলা একাডেমির বিভিন্ন নাট্য—আয়োজনে নিয়মিত অংশ নিতাম। নাটকই তখন আমার দিন, নাটকই আমার রাত।
ঠিক সেই সময়, যখন আমার নাট্যজীবনের সূর্য মধ্যগগনে, তখনই দেশ ছেড়ে চলে এলাম এই শহরে।
চারপাশে অগণিত মানুষ, অসংখ্য কর্মব্যস্ততাÑ অথচ আমি যেন সেই ভিড়ের মধ্যেও একা।
একদিন হঠাৎ দেখা হয়ে গেল ঢাকার নাট্যসহচর টিটু গাজীর সঙ্গে। সে জানাল, নতুন একটি নাটকের দল গড়ছে, আমাকে চায় সেই দলে। দ্বিতীয়বার ভাবিনি। এস্টোরিয়ার একটি রেস্তোরাঁয় মহাসমারোহে হলো দলের আত্মপ্রকাশ।
জাফর রহমানের নির্দেশনায় প্রথম প্রযোজনা ছিল হুমায়ূন আহমেদের ১৯৭১। সে নাটকে আমি অভিনয় করিনি, কিন্তু নেপথ্যের প্রায় সব কাজেই যুক্ত ছিলাম।
এদিকে ঢাকায় আমার রূপান্তর করা নাটক গিট্ঠু ও চক্কর বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। সবাই চাইল, গিট্ঠু এখানেও মঞ্চস্থ হোক। স্কুলের মিলনায়তন ভাড়া করা হলো, বাইরে থেকে আলো এনে মঞ্চ তৈরি করা হলো। প্রায় পাঁচশো আসনের হল পূর্ণ হয়ে গেল। টিকিট না পেয়ে অনেক দর্শক ফিরে গেলেন।
সেই সাফল্যের পেছনে নাটকটির জনপ্রিয়তা যেমন ছিল, তেমনি ছিল সময়ের বাস্তবতাও। তখন এই শহরে এত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো না, ওটিটি প্ল্যাটফর্মও ছিল না। মানুষ ভালো বিনোদনের জন্য অপেক্ষা করে থাকত।
কিন্তু এই সাফল্যও আমাকে পুরোপুরি তৃপ্ত করতে পারেনি।
বারবার মনে হয়েছে, শুধু দেশের নাটক মঞ্চস্থ করলেই হবে না; এই শহরের মানুষের গল্পও বলতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই লিখলাম সোনার টুকরো ছেলে। বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটারের আঙ্গিকে। কোনো মঞ্চের প্রয়োজন নেই, আলো নেই, সাউন্ড নেইÑ শুধু অভিনেতার শরীর আর অভিনয়ই হবে নাটকের ভাষা।
কিন্তু সবাই তো সেই ভাষায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। প্রসেনিয়াম মঞ্চের আকর্ষণ অনেকের কাছেই বেশি। তাই আবার ফিরে গেলাম সেই ধারায়। একে একে মঞ্চস্থ হলো ভেল্কি, শাস্তি ও ঝড়ের খেয়া।
তবু সুযোগ পেলেই ফিরে যেতাম নন—প্রসেনিয়ামে। কারণ, স্কুলের মিলনায়তনগুলো নাটক মঞ্চায়নের জন্য আদর্শ ছিল না। বাইরে থেকে আলো এনে ট্রাস বেঁধে সব প্রস্তুতি শেষ করার পর জানা যেত, হলের বিদ্যুৎ এত লোড নিতে পারবে না।
বাংলাদেশ থেকে আসা অনেক নাট্যবন্ধু আমার এই লড়াইটাকে পাগলামি বলে হেসেছেন। কিন্তু আমি জানতাম, এই লড়াই একদিন ফল দেবে। আর সেই বিশ্বাসে পাশে থেকেছে আমার দলের বন্ধুরা। তারা কখনো আমাকে একা হতে দেয়নি।
এরপর গার্গী এল।
আমার শক্তি যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। আগে একা ভাবতাম, এখন দুজনে ভাবি। একজন আরেকজনের ভাবনাকে প্রশ্ন করি, চ্যালেঞ্জ করি, তর্ক করি। সেই দীর্ঘ সৃজনশীল লড়াইয়ের ভেতর থেকেই জন্ম নিল স্টোরিজ অব জ্যাকসন হাইটস এবং আই, শকুন্তলা। গ্রান্টও পেলাম। শুরু হলো পেশাদার মঞ্চে কাজÑ প্রথমে কুইন্স থিয়েটার, পরে জামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টার।
একই সঙ্গে চলতে থাকল এপিক অ্যাক্টর্স ওয়ার্কশপের সঙ্গে কাজ। নিউইয়র্কে আমার প্রথম অভিনয়ও তাদের সঙ্গেই। জীবনের প্রথম অভিনয় কর্মশালাটিও করেছিলাম সালেক খানের পরিচালনায়, তখন আমরা শিশু একাডেমির নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলাম। বহু বছর পরে আবার তাঁরই নির্দেশনায় নিউইয়র্ক ইন্টারন্যাশনাল ফ্রিঞ্জ ফেস্টিভ্যালে অভিনয় করলাম বাদল সরকারের বল্লভপুরের রূপকথায়।
সেই থেকে এপিকের সঙ্গে পথচলা অব্যাহত। ধাবমান, নিরস্ত্র, চৈতালী রাতের স্বপ্ন, মিছে কোলাহলÑ একের পর এক প্রযোজনা। এর মধ্যে নিরস্ত্র আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজগুলোর একটি।
ঢাকা ড্রামা যখন নিরস্ত্র নিউইয়র্কে মঞ্চস্থ করার উদ্যোগ নিল, তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এটি কোনো স্কুল মিলনায়তনে নয়। কুইন্স থিয়েটার ভাড়া করে পর্যাপ্ত দর্শক আনা ছিল কঠিন। ঠিক সেই সময় পরিচয় হলো জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের সঙ্গে। আজকের আর্টিস্টিক ডিরেক্টর কোর্টনি ফ্রেঞ্চ নিজেই আমাকে মিলনায়তন ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন। তখনও কেন্দ্রটি আজকের মতো ব্যস্ত হয়ে ওঠেনি। সবকিছু তিনি নিজেই দেখাশোনা করতেন।
নিরস্ত্র দিয়েই শুরু হয়েছিল আমাদের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের সঙ্গে দীর্ঘ পথচলা।
পরে তাদের নিজস্ব প্রকল্প গববঃ ঃযব চষধুৎিরমযঃ—এ আমাদের দুবার ফিচার করা হয়। এই মিলনায়তনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারা নিউইয়র্কের বাংলা নাট্যচর্চার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। আমার বিশ্বাস, এই কেন্দ্র আমাদের কমিউনিটির নাটককে একটি নতুন পরিচয় ও নতুন গতি দিয়েছে।
আজ নাট্যজীবনের এই পর্যায়ে এসে মনে হয়, নিউইয়র্কে বাংলা নাটকের পথ আর থেমে থাকবে না। আমাদের সাথে নতুন প্রজন্ম এসে গেছে।
ওদের হাত ধরে নিউইয়র্কের বাংলা নাটক অনেক দূর যাবে। আজ আমি সেই স্বপ্নই দেখি।
