মাস্কস এন্ড মেটাফরস— ঢাকা ড্রামার ৩০তম বার্ষিকী || গার্গী মুখার্জী
জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে আজ আপনাদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে থিয়েটার, কম্যুনিটি, বন্ধুত্ব এবং সকলে মিলে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তিন দশক উদযাপন করা আমাদের জন্য আনন্দের এবং গৌরবের। আপনারা কেউ ঢাকা ড্রামার যাত্রার শুরু থেকে আমাদের সঙ্গে থাকুন কিংবা আজ প্রথমবারের মতো আমাদের সঙ্গে যুক্ত হনÑএখানে উপস্থিত থাকার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।
জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টার আমাদের জন্য তাদের দরজা খুলে দেওয়ায় এবং এই উদযাপনে আমাদের মূল্যবান সহযোগী ও অংশীদার হিসেবে পাশে থাকার জন্য আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। আমরা জ্যামাইকা সেন্টার ফর আর্টস অ্যান্ড লার্নিং—এর আর্টিস্টিক ডিরেক্টর কোর্টনি ফ্রেঞ্চের প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই, যিনি ২০১৮ সাল থেকে ঢাকা ড্রামার একনিষ্ঠ বন্ধু ও সমর্থক। তাঁর উৎসাহ, উদারতা এবং কম্যুনিটিভিত্তিক শিল্পচর্চার প্রতি বিশ্বাস সাংস্কৃতিক বিনিময়, শিল্পীসত্তার বিকাশ এবং অর্থবহ সংযুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছে।
এই উৎসবের বিষয়বস্তু, মাস্কস এন্ড মেটাফরস অর্থাৎ মুখোশ ও রূপক, এমন এক যাত্রার কথা বলে যা আমাদের অনেকের কাছেই গভীরভাবে পরিচিত। ত্রিশ বছর ধরে ঢাকা ড্রামা সেই ভূমি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থিয়েটার সৃষ্টি করে চলেছে, যেখানে আমাদের ভাষা, গল্প এবং ঐতিহ্যের জন্ম। এই পথ চলায় আমরা আমাদের ফেলে আসা ঘরের কিছু অংশ নিয়ে এসেছি, একই সঙ্গে একটি নতুন দেশে নতুন জীবন গড়ে তুলতে শিখেছি।
মুখোশ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পালন করা বহু ভূমিকাকে প্রতিনিধিত্ব করেÑঅভিভাবক, কর্মী, অভিবাসী, শিল্পী, প্রতিবেশী, বন্ধু। এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা অভিযোজিত হতে পারি, তবু নিজেদের পরিচয় ধরে রাখতে পারি। রূপক প্রতিনিধিত্ব করে সেই গভীর সত্যগুলোকে, যা থিয়েটার আমাদের অনুসন্ধান করতে দেয়: স্মৃতি ও পরিচয়, বিচ্ছেদ ও আপনত্ব, হারানো ও আশা, ভিন্নতা ও বোঝাপড়া। থিয়েটারের মাধ্যমে আমরা এমন গল্প বলার পথ খুঁজে পাই, যা গভীরভাবে ব্যক্তিগত, আবার সর্বজনীনভাবে মানবিক।
এই যাত্রায় কমিউনিটি থিয়েটারের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। প্রায়ই এখানেই শিল্পস্বপ্নের প্রথম শিকড় গজায়। এখানেই কোনো শিশু প্রথমবারের মতো মঞ্চে পা রাখে, কোনো নবাগত অভিনয়ের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস আবিষ্কার করে, কোনো স্বেচ্ছাসেবক আলো, শব্দ, পোশাক নকশা বা মঞ্চ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শেখে, এবং আজীবনের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। বহু দক্ষ অভিনেতা, পরিচালক, লেখক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা তাঁদের শিল্পযাত্রা শুরু করেন কমিউনিটি থিয়েটার থেকে। পেশাদার মঞ্চ, টেলিভিশন পর্দা বা চলচ্চিত্রের সেটে পৌঁছানোর বহু আগে তাঁরা পারস্পরিক সহযোগিতা, শৃঙ্খলা এবং গল্প বলার মৌলিক শিক্ষা অর্জন করেন এমনই স্থানগুলোতে।
তবু কমিউনিটি থিয়েটার আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু করে। এটি মানুষকে একত্রিত করে।
একটি কমিউনিটি থিয়েটার দলে বিভিন্ন পেশা, প্রজন্ম, পটভূমি এবং জীবনের অভিজ্ঞতার মানুষ একটি সাধারণ লক্ষ্যের জন্য পাশাপাশি কাজ করেন। একজন শিক্ষক একজন প্রকৌশলীর সঙ্গে মহড়া দিতে পারেন। একজন শিক্ষার্থী একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করতে পারে। কেউ হয়তো বহু দশক আগে এই দেশে এসেছেন, আবার কেউ হয়তো খুব সাম্প্রতিক সময়ে এসেছেনÑতবু তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেন। থিয়েটার এমন এক স্থান তৈরি করে, যেখানে এই পার্থক্যগুলো আমাদের বিভক্ত করে না; বরং আমাদের সমৃদ্ধ করে।
আধুনিক জীবনের যে বিচ্ছিন্নতা, থিয়েটার সেখানে আমাদের একত্রে সমবেত হওয়ার সরল কাজটির কথা মনে করিয়ে দেয়। আমরা একসঙ্গে বসি, একসঙ্গে শুনি, একসঙ্গে হাসি, একসঙ্গে ভাবি, এবং কখনও কখনও একসঙ্গে শোক করি। কয়েক ঘণ্টার জন্য অপরিচিত মানুষ একটি কম্যুনিটিতে পরিণত হয়। গল্পের মাধ্যমে আমরা একে অপরের মধ্যে নিজেদের দেখতে শিখি। সেই অর্থে, থিয়েটার শুধু একটি শিল্পরূপ নয়; এটি সংযোগের কাজ, একটি অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার কাজ।
আজকের উৎসব শুধু ঢাকা ড্রামার ইতিহাসকেই উদযাপন করছে না, বরং শিল্পী, সংগঠন এবং দর্শকদের সেই প্রাণবন্ত পরিসরকেও উদযাপন করছে, যারা কমিউনিটি থিয়েটারকে জীবন্ত রাখেন। আমাদের অংশগ্রহণকারী দল, উপস্থাপক, পরিবেশক এবং অতিথিদের সঙ্গে এই দিনটি ভাগ করে নিতে পেরে আমরা সম্মানিত; তাঁদের কাজ আমাদের বৃহত্তর নাট্য সম্প্রদায়ের সৃজনশীলতা ও বৈচিত্র্যকে প্রতিফলিত করে।
দিনভর পোস্টার প্রদর্শনী, পথনাট্য প্রযোজনা এবং প্রোসেনিয়াম পরিবেশনা উপভোগ করার সময় আমরা আশা করি আপনারা শুধু মঞ্চের কাজই দেখবেন না, বরং এই সমাবেশকে সম্ভব করে তোলা বহু বছরের নিষ্ঠা, আবেগ এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাকেও অনুভব করবেন।
ঢাকা ড্রামার পক্ষ থেকে, আমি আমাদের পৃষ্ঠপোষক ও দাতাদের তাঁদের উদার সহায়তার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই; এই উদযাপনে আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য আমাদের সম্মানিত অতিথিদের ধন্যবাদ জানাই; বছরের পর বছর যাঁদের উৎসাহ আমাদের ধরে রেখেছে, সেই দর্শকদের ধন্যবাদ জানাই; এবং ঢাকা ড্রামা ও জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের স্বেচ্ছাসেবক, সংগঠক, শিল্পী, প্রযুক্তিকর্মী এবং থিয়েটারকর্মীদের ধন্যবাদ জানাই, যাঁরা এই উৎসবকে জীবন্ত করে তুলতে মাসের পর মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।
সবচেয়ে বড় কথা, এখানে উপস্থিত থাকার জন্য এবং মানুষকে একত্রিত করার থিয়েটারের স্থায়ী শক্তিতে বিশ্বাস রাখার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।
আমরা আশা করি আপনারা উৎসবটি উপভোগ করবেন এবং এই চলমান গল্পের অংশ হয়ে উঠবেন।
কৃতজ্ঞতাসহ,
গার্গী মুখার্জী
কিউরেটর
মাস্কস এন্ড মেটাফরস
ঢাকা ড্রামা ৩০তম বার্ষিকী উৎসব
বন্ড স্ট্রিট থিয়েটার
