ঢাকা ড্রামার তিরিশ বছর পূর্তি ও প্রত্যাশা || আহমাদ মাযহার
একটা ভিন্ন দেশে গিয়ে বসতি করা অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির অভিবাসিত দেশে শেকড় গাড়া সহজ নয়! বিশেষত থিয়েটারের মতো পরিবেশনকলা যার চর্চা সশরীর উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। যে স্থানে পরিবেশিত হবে তা পরিবেশনের উপযোগী হওয়ার শর্তগুলো হাজির করাও খুব কঠিন। আর্থিক সমস্যাও হয়তো কিছুটা সামলে—ওঠা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু মূল সংকট চর্চার জন্য সময় ব্যবস্থাপনা করা। এর জন্য আর্থিক সংগতি যতটা দরকার তার চেয়ে বেশি দরকার সংস্কৃতিবোধের গভীরতা।
২০১৭ সাল থেকে নিউইয়র্ক মহানগরীতে বসবাস করতে এসে এই সময়পরিসরে বাংলাদেশী জনসমাজের নিয়মিত থিয়েটার চর্চা দেখে আমার তেমনই মনে হয়েছে। এই অভিজ্ঞতার আলোতেই ঢাকা ড্রামার তিরিশ বছরের পথচলাকে দেখতে গেলে বোঝা যায়, এটি কেবল একটি সংগঠনের টিকে থাকার ইতিহাস নয়; বরং একটি ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক অনুশীলনের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত প্রতিফলন।
নিউইয়র্ক ভিত্তিক বাংলা কমিউনিটি থিয়েটারের মূল সমস্যা হিসাবে অনেকেই চিহ্নিত করবেন অর্থের অভাবকে। কোন সন্দেহ নেই অর্থ নিশ্চয়ই বড় সমস্যা। কিন্তু অর্থ সমস্যাকে অন্যান্য সামর্থ্য সাপেক্ষে সমাধান করা যদিও—বা সম্ভব, সংস্কৃতিবোধের সমস্যা সমাধান তত সহজ নয়! কারণ এর মূলে স্থান, ধারাবাহিকতা, প্রশিক্ষণ, অনুশীলন, দর্শকসংস্কৃতি ও প্রজন্মগত বিচ্ছিন্নতাÑএগুলোই বরং আরো বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। এই জটিলতার মধ্য দিয়েই ঢাকা ড্রামা তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এটিই তাদের তিরিশ বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলে মনে হয়।
নিউইয়র্কে হল ভাড়া, লাইট—সাউন্ড, সেট ডিজাইনের ব্যয়বহুলতা অর্থসংকটের সবচেয়ে বড় কারণ। অনেকটা বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটারের আদলে এখানকার দলগুলো স্বেচ্ছাসেবী; ফলে স্বভাবতই বাজেট সীমিত। অর্থাভাবের কারণে পেশাদার থিয়েটার হল ভাড়া করা কঠিন; স্কুল অডিটোরিয়াম বা চার্চ হল ব্যবহৃত হয়, যা সবসময় নাটকের জন্য উপযোগী নয়। অভিনয়, নির্দেশনা, মঞ্চশিল্প, লাইট ডিজাইনÑএসবের পেশাদার প্রশিক্ষণ কম; ফলে নাটকের মানে অসমতা থেকে যায়। ঢাকা ড্রামার প্রযোজনাগুলোর দিকে তাকালেও এই সীমাবদ্ধতার প্রভাব অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে সীমিত উপকরণ নিয়েও ধারাবাহিক কাজ করে যাওয়ার যে মানসিকতা, সেটিই একটি দলের প্রকৃত শক্তি।
আরো বড় সমস্যা, দর্শকসংস্কৃতির দুর্বলতা। বাংলাদেশের নাগরিক সাংস্কৃতিকতায়ই থিয়েটারের পরিশীলিত দর্শক খুবই কম। এই বাস্তবতা ভিন্ন ভূখণ্ডে এসে আরো জটিল রূপ নেয়। এখানে দর্শক অনেক সময় উৎসবভিত্তিক অনুষ্ঠানেই বেশি আগ্রহী; নাটককে নিয়মিত শিল্পচর্চা হিসেবে দেখার প্রবণতা দুর্বল। এই পরিস্থিতিতে ঢাকা ড্রামার জন্য দর্শক তৈরি করা যেমন একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি সেটি একটি সাংস্কৃতিক কাজও।
প্রজন্মগত বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নটিও এখানে উপেক্ষা করা যায় না। তরুণ প্রজন্মের বাংলা ভাষার দক্ষতা তুলনামূলকভাবে কম; ফলে বাংলা নাটকে অংশগ্রহণে তাদের দ্বিধা থাকে। এমনকি তাদের নাটক দেখতে নিয়ে আসাও সহজ নয়। কিন্তু এই বাস্তবতাকেই যদি নতুনভাবে দেখা যায়, তবে এখানেই সম্ভাবনার একটি দিকও নিহিত আছে। দ্বিভাষিক নাটক, মিউজিক্যাল বা পরীক্ষামূলক প্রযোজনার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব—এবং ঢাকা ড্রামা চাইলে এই ক্ষেত্রটিতে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নিতে পারে।
সময়ের সংকটের কথাও এখানে অনিবার্যভাবে এসে যায়। জীবিকার প্রয়োজনে ব্যস্ততার কারণে মহড়ার সময় মেলানোই এক কঠিন বাস্তবতা। এই বাস্তবতার মধ্যেও একটি দল যদি নিয়মিত অনুশীলন ধরে রাখতে পারে, তবে সেটি নিছক সাংগঠনিক সক্ষমতা নয়Ñবরং একটি গভীর সাংস্কৃতিক অঙ্গীকারের পরিচয়। ঢাকা ড্রামার দীর্ঘ পথচলায় এই অঙ্গীকারের উপস্থিতি অনুভব করা যায় বলেই তাদের তিরিশ বছর পূর্তি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজন ও অস্থিরতা কেবল দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব বহির্ভূত জনসমাজেও প্রতিফলিত হয়। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও এর বাইরে থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি বড় সমস্যা—আর্কাইভের অভাব। নাটকের দলগুলোর ইতিহাস, প্রযোজনার দলিল, ছবি, ভিডিও—এসব ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষিত না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। ঢাকা ড্রামার মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি দলের জন্য এই সংরক্ষণ—প্রক্রিয়াটি ভবিষ্যতের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই সমস্ত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সম্ভাবনা অনুপস্থিত নয়। বহুসাংস্কৃতিক এই মহানগরের সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর ভেতরেই নানা সুযোগ নিহিত রয়েছেÑছোট থিয়েটার স্পেস, আর্টস গ্রান্ট, ওয়ার্কশপ, এবং আন্তঃসংস্কৃতি সহযোগিতা। ডিজিটাল মাধ্যম—ইউটিউব, ফেসবুক লাইভ, রেকর্ডেড নাটকÑদর্শক বিস্তারের নতুন পথ তৈরি করেছে। এই ক্ষেত্রগুলোকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে ঢাকা ড্রামা তাদের কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যেতে পারে।
ভাষা দিবস, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, পয়লা বৈশাখÑএই অনুষ্ঠানগুলোতে যে প্রস্তুত দর্শকসমাগম তৈরি হয়, তাকে নাট্যচর্চার সঙ্গে আরও সুসংগঠিতভাবে যুক্ত করা সম্ভব। নাটক মানুষের সমবেত অভিজ্ঞতার শিল্প; এটি সামাজিক বন্ধনও তৈরি করে। সেই দিক থেকে ঢাকা ড্রামার কাজ কেবল নাট্যপ্রযোজনায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণের কাজও।
ওপরে আলোচিত প্রসঙ্গগুলো নতুন কিছু নয়; প্রায় সকলেরই জানা। কিন্তু উত্তরণের প্রশ্নে যে বিষয়টি বারবার ফিরে আসে তা হলো, এই মহানগরের নিজস্ব সাংস্কৃতিকতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের আগ্রহ। কেবল থিয়েটারীয় আঙ্গিক অনুশীলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে এগিয়ে চলা কঠিন হবে। বরং ছোট পরিসরের অবকাঠামো ব্যবহারের সংস্কৃতি, আন্তঃসংযোগ, এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে একটি নতুন অনুশীলনের পথ তৈরি করা প্রয়োজন।
সেই অর্থে ঢাকা ড্রামার তিরিশ বছর পূর্তি একটি আত্মসমালোচনার মুহূর্তও বটে। এই দীর্ঘ পথচলার ভেতরে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে, তাকে বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা জরুরি। প্রবাসিত জীবনের গল্প, ভাষা, স্মৃতি ও সংগ্রামÑএসব অনন্য উপাদানকে নাট্যে রূপ দেওয়ার মধ্যেই একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণ সম্ভব।
প্রয়োজন অর্থ, স্থান, প্রশিক্ষণ, দর্শকÑএসবের কথা বারবারই আসবে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন একটি গভীর সংস্কৃতিবোধ, ধারাবাহিক অনুশীলন এবং নিজস্ব অবস্থানকে চিনে নেওয়ার সক্ষমতা। ঢাকা ড্রামা যদি এই জায়গাগুলোতে নিজেদের চর্চাকে আরও সুসংহত করতে পারে, তবে তিরিশ বছরের এই অর্জন নিছক অতীতের স্মারক হয়ে থাকবে নাÑবরং ভবিষ্যতের একটি দৃঢ় ভিত্তিতে পরিণত হবে।
