গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— বিশ মেঠো সুর থেকে সেলুলয়েডের আধুনিকতায় শিল্পী ফেরদৌসী রহমান
জীবন বিশ^াসঃ ভাওয়াইয়ার উদাস বাতাস যখন উত্তরবঙ্গের মেঠো পথ অতিক্রম করে শহরের ইটের চার দেওয়ালে এসে ধাক্কা খায়, তখন সুরের ঝংকার অনেকটাই বদলে যায়। কিন্তু সেই ধুলোমাখা সুরকে একতারার কোল থেকে তুলে এনে যদি পিয়ানোর কালো—সাদা চাবিতে কিংবা স্টুডিওর সূক্ষ্ম মাইক্রোফোনে বসানো যায়, তবে তা কেবল লোকসংগীতের সীমানায় বন্দি থাকে না, হয়ে ওঠে এক শাশ্বত নাগরিক মেলোডি। এই অভাবনীয় সাঙ্গীতিক রূপান্তরের যিনি প্রধান পথপ্রদর্শক, তিনি কেবল একজন কণ্ঠসাধক নন, তিনি সুরের এক অনন্য ব্যাকরণ। যাঁর কণ্ঠে উত্তরবঙ্গের মাটির সোঁদা গন্ধ আর বিশ্বসংগীতের কঠিন জ্যামিতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। একাধারে বাউলের আকুলতা, অন্যদিকে মার্গসংগীতের কঠোর অনুশাসনÑএই দুই বিপরীতমুখী স্রোতকে এক মোহনায় এনে যিনি কয়েক প্রজন্মের বাঙালিকে সুরসাগরে ভাসিয়েছেন, তিনি ফেরদৌসী রহমান।
১৯৪১ সালের ২৮ জুন পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে ফেরদৌসী রহমানের জন্ম—পিতৃদত্ত নাম ছিল ফেরদৌসী বেগম। পারস্যের বিখ্যাত মহাকবি ফেরদৌসীর নামানুসারে লোকসংগীতের কালজয়ী মহীরুহ আব্বাসউদ্দীন আহমদ পরম আদরে মেয়ের এই নামটি রেখেছিলেন। ফেরদৌসী রহমান মৃত্যুহীন এক সুরযাত্রার প্রতীক এবং অশীতিপর বয়স পেরিয়ে আজও স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিরাজ করছেন। অতি সম্প্রতি ২০২৬ সালে তাঁর আত্মজীবনী প্রকাশকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতি অঙ্গনে নতুন করে গভীর অনুধ্যানের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর পরিবারটিই ছিল এক বিদগ্ধ সংস্কৃতির পাঠশালা—যেখানে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ব্যারিস্টার মুস্তফা কামাল আব্বাসী, মেজ ভাই লোকসংগীতের প্রখ্যাত গবেষক ও শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী।
দেশভাগ ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পিতার ইচ্ছায় এই পরিবারটি কোচবিহার থেকে স্থানান্তরিত হয় ঢাকায়। সেই বছরই ঢাকার বেতারে ‘খেলাঘর’ আসরে শিশুশিল্পী হিসেবে তাঁর সাঙ্গীতিক অভিষেক ঘটে। পরবতীর্তে ১৯৫৫ সালে বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে একজন পূর্ণাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্ক শিল্পী হিসেবে বেতারে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠিনতম রাগ ‘মিঞাঁ কি টোড়ি’—র খেয়াল পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। এই একটি উপস্থাপনা স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, তিনি কেবল পিতৃসূত্রে প্রাপ্ত লোকসংগীতের উত্তরাধিকার বহনেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না বরং মার্গসংগীতের দুরূহ ব্যাকরণ জয় করে আধুনিক বাংলা সুরের এক নতুন দিগদর্শন তৈরি করবেন।
ওস্তাদদের গুরুগৃহ ও সুরের বহুস্বরিক বিস্তার
পিতা আব্বাসউদ্দীনের সরাসরি সান্নিধ্য তো ছিলই, পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওস্তাদদের চরণতলে বসে তিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন। ওস্তাদ আবদুল গফুর খান, মুহাম্মদ হোসেন খসরু, ওস্তাদ ইউসুফ খান কুরেশি, ওস্তাদ কাদের জামেরি, ওস্তাদ মুনশী রইসউদ্দীন, ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খান, ওস্তাদ মুনীর হোসেন, ওস্তাদ মস্তান গামা এবং পরবর্তীতে ওস্তাদ নাজাকত আলী খান ও সালামত আলী খানের মতো প্রাজ্ঞ দরবারি সংগীতজ্ঞদের কাছ থেকে তালিম গ্রহণ করে তাঁর স্বরযন্ত্র তৈরি হয়েছিল সর্বাধুনিক ও সর্বশাস্ত্রীয় রূপে। খেয়াল, ঠুমরি, গজল, নজরুলগীতি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলা গানে তাঁর সমান ও অনায়াস বিচরণ সুরের জগতে এক বিরল ঘটনা।
প্রথম রেকর্ড, সেলুলয়েডের জাদু ও সুরকারের মুকুট
১৯৫৭ সালে করাচীর এইচএমভি (ঐগঠ) থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম দুটি লোকসংগীতের গ্রামোফোন রেকর্ড—‘আমার প্রাণের ব্যথা কে বুঝবে সই’ এবং ‘আমায় ঘরছাড়া করিলি’। দুটি গানই যেন জানান দিয়েছিল যে, মাটির ঘ্রাণ ও মানব হৃদয়ের আকুলতাকে তিনি তাঁর কণ্ঠের স্ফটিকস্বচ্ছ আভিজাত্যে ধারণ করতে প্রস্তুত। ১৯৫৯ সালে খান আতাউর রহমানের সুর ও পরিচালনায় ‘এ দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সেলুলয়েডের জগতে তাঁর কণ্ঠের প্রবেশ ঘটে, যদিও ‘আসিয়া’ ছবির জন্য গান রেকর্ডিং হয়েছিল আরও আগে। এরপর ‘হারানো দিন’ ছবির ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা’, ‘বুঝি না মন যে দোলে বাঁশির সুরে’ কিংবা ‘এই যে নিঝুম রাত’—এর মতো কালজয়ী সৃষ্টিগুলো তাঁকে আপামর জনমানসে অলৌকিক রূপকথার রাজকন্যার আসনে বসিয়ে দেয়। চলচ্চিত্রসংগীতে তিনি কেবল কণ্ঠ দেননি, ‘রাজধানীর বুকে’ ছবিতে রবিন ঘোষের সঙ্গে যৌথভাবে এবং ১৯৭৬ সালে ‘মেঘের অনেক রং’ চলচ্চিত্রের একক সুরকার হিসেবে কাজ করে অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, যা তৎকালীন উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রে একজন নারী সংগীত পরিচালকের ক্ষেত্রে ছিল এক বৈপ্লবিক ঘটনা।
টেলিভিশনের নতুন ভোর ও কালজয়ী সুর—পাঠশালা
১৯৬৪ সালে ঢাকায় টেলিভিশন কেন্দ্রের যাত্রা শুরুর শুভক্ষণে প্রথম শিল্পী হিসেবে বেজে উঠেছিল তাঁরই কণ্ঠ। তবে ছোটপর্দায় তাঁর সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক কীর্তি হলো ‘এসো গান শিখি’ অনুষ্ঠানটি। কাচঘেরা বাক্সের সামনে বসে তিনি বছরের পর বছর ধরে কোটি শিশুর মুখে স্বরবর্ণের মতো সুরের অ আ ক খ তুলে দিয়েছেন। ‘গান শেখানো আপা’ নামে পরিচিত এই মানুষটি কোনো প্রথাগত পরিবেশনার খাঁচায় বন্দি না থেকে সংগীতকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার এক বিশাল শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
প্রাতিষ্ঠানিক মেধা ও বিশ্বজনীন পাণ্ডিত্য
ফেরদৌসী রহমানের শিল্পীসত্তা কেবল অনুভূতির তোড়ে ভেসে যায়নি, তার পেছনে ছিল তীক্ষè মেধা ও পাণ্ডিত্যের কঠিন ভিত। ১৯৫৬ সালে প্রবেশিকা (এসএসসি) পরীক্ষায় বালিকা বিভাগে প্রথম ও সম্মিলিত মেধা তালিকায় সপ্তম স্থান এবং ১৯৫৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে দ্বাদশ স্থান অধিকার করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে ইউনেস্কো ফেলোশিপ লাভ করে যুক্তরাজ্যের ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিক থেকে ‘স্টাফ নোটেশন’—এর ওপর উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করেন। ফলে সংগীতকে তিনি কেবল রেওয়াজ হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন এক সংহত শাস্ত্র ও বিশ্বজনীন লিপি হিসেবে।
রেকর্ড, ক্যাসেট ও আন্তর্জাতিক সম্মানের তোরণ
উপমহাদেশের সংগীত সংস্কৃতির ইতিহাসে পাঁচ শতাধিক ডিস্ক রেকর্ড, এলপি, ক্যাসেট ও সিডিতে ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর কণ্ঠের জাদু। দুই শতাধিক বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে তাঁর নেপথ্য গায়ন এ অঞ্চলের সিনেমাকে দিয়েছে এক ভিন্ন আভিজাত্য। লাহোর সিনে জার্নালিস্ট অ্যাওয়ার্ড, প্রেসিডেন্টস প্রাইড অব পারফরম্যান্স, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার এবং মেরিল—প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার আজীবন সম্মাননা—সম্মানের এই সুদীর্ঘ তালিকা তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির সাক্ষ্য দেয়। তবে সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক অর্জনের ওপরে তাঁর আসল সম্মান হলো বাঙালির সাঙ্গীতিক স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে থাকা।
ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া কয়েকটি বিখ্যাত গান
১। আমি রূপনগরের রাজকন্যা, ২। আমার প্রাণের ব্যথা কে বুঝবে সই, ৩। আমায় ঘরছাড়া করিলি, ৪। বুঝি না মন যে দোলে বাঁশির সুরে, ৫। এই যে নিঝুম রাত, ৬। এই রাত বলে ওগো তুমি আমার, ৭। এই সুন্দর পৃথিবীতে আমি এসেছিনু কিছু নিতে, ৮। মনে যে লাগে এত রং, ৯। পরাণে দোলা দিল এ কোন ভ্রমরা, ১০। নদী বাঁকা জানি, চাঁদ বাঁকা জানি, ১১। কথা বলো না বলো ওগো বন্ধু, ১২। গান হয়ে এলে, ১৩। ও কি গাড়িয়াল ভাই, ১৪। ও মোর সোনার বন্ধুরে, ১৫। যেজন প্রেমের ভাব জানে না, ১৬। পদ্মার ঢেউ রে, ১৭। বিধি বইসা বুঝি নিরালে, ১৮। নিশি জাগা চাঁদ হাসে, ১৯। ঝরা বকুলের সাথী আমি, ২০। যার ছায়া পড়েছে মনের আয়নাতে, ২১। লোকে বলে প্রেম আর আমি বলি জ্বালা, ২২। আমার জীবন গাঙ্গের নাইয়া, ২৩। ও কি বন্ধু কাজল ভ্রমরা, ২৪। অচিন গাঁয়ের অচিন বন্ধুরে, ২৫। এই নীল নীল নিঃসীম নির্জনে
পরিশেষ
গান শেষ হয়ে গেলেও যেমন তার একটি সূক্ষ¥ অনুরণন বাতাসে ভেসে থাকে, ফেরদৌসী রহমানের জীবনসাধনাও তেমনই এক চিরন্তন প্রতিধ্বনি। তিনি এমন এক সাঙ্গীতিক মহীরুহ যাঁর মূল শিকড় মাটির গভীরে পোঁতা হলেও যাঁর শাখা—প্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজনীন স্বরলিপির নীল দিগন্তে। ভাওয়াইয়ার সুরকে শহরের বৈঠকখানায় এনে যেভাবে তিনি তাকে স্ফটিকস্বচ্ছ আভিজাত্য দিয়েছিলেন, কিংবা মার্গসংগীতের জটিল ব্যাকরণকে শিশুর সহজ হাসিতে রূপান্তর করেছিলেন—তা সংগীতের ইতিহাসে এক অনবদ্য অধ্যায়। যুগের পর যুগ ধরে গানে গানে যে দীপ্তি তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন, তা কখনো ফিকে হওয়ার নয়। যতদিন বাংলার নতুন প্রজন্ম প্রথম সুর সাধতে বসবে, ততদিন তাঁর এই কণ্ঠসুধা পরম মমতায় বাঙালির হৃদয়ে এক অমলিন বাতিঘর হয়ে জ্বলবে।
