৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্পঃ মেরিল্যান্ড অ্যান টাইলারঃ আ স্পুল অব ব্লু থ্রেড || আবদুল্লাহ জাহিদ
মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোর শহরের এক শান্ত, বৃক্ষশোভিত গলিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি চমৎকার ত্রিতল কাঠের বাড়ি। আপাতদৃষ্টিতে এটি কেবল একটি সুন্দর স্থাপত্য নয়, বরং এটি এক শতাব্দী প্রাচীন এক যৌথ পরিবারের সুখ—দুঃখ, ভাঙা—গড়া এবং হাজারো গোপন দীর্ঘশ্বাসের নীরব সাক্ষী। অ্যান টাইলার তাঁর বিখ্যাত ২০তম উপন্যাস ‘আ স্পুল অব ব্লু থ্রেড’—এ এই বাড়িটিকে কেন্দ্র করেই বুনেছেন হুইটশ্যাঙ্ক পরিবারের চার প্রজন্মের এক মহাকাব্যিক ঘরোয়া উপাখ্যান।
টাইলারের জাদুকরি লেখনীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি খুব সাধারণ, আটপৌরে মধ্যবিত্ত জীবনের ভেতরের সূক্ষ্ম জটিলতা, সূচিশিল্পের মতো নিখুঁত সুতোর বুননে ফুটিয়ে তোলেন। বইটি না পড়েও কীভাবে নীল সুতোর এই স্পুলটির প্রতিটি জট এবং তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা পারিবারিক সত্যের স্বাদ নেওয়া যায়, তার এক গভীর সাহিত্যিক পরিক্রমা নিচে তুলে ধরা হলো।
উপন্যাসের পটভূমি:
উপন্যাসের মূল মঞ্চ মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোর শহর। অ্যান টাইলারের লেখার অনুরাগী মাত্রই জানেন, বাল্টিমোর তাঁর সাহিত্যের এক অপরিহার্য পটভূমি। তবে এই উপন্যাসে বাল্টিমোর শহরের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে একটি বিশেষ বাড়ি-যেটি হুইটশ্যাঙ্ক পরিবারের আদি পুরুষ রেড হুইটশ্যাঙ্কের পিতা আব্বি হুইটশ্যাঙ্ক (যিনি একজন কাঠমিস্ত্রি ছিলেন) অন্য এক ধনী পরিবারের জন্য পরম যত্নে তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে নানা চড়াই—উতরাই পেরিয়ে সেই বাড়িটিই হয়ে ওঠে হুইটশ্যাঙ্ক পরিবারের নিজস্ব নীড়।
বাড়িটি কেবল ইট—কাঠের কাঠামো নয়, এটি এই পরিবারের আভিজাত্য, স্থায়িত্ব এবং অহংকারের প্রতীক। বাইরের মানুষের কাছে এই বাড়ি এবং তার ভেতরের বাসিন্দাদের মনে হয় নিখুঁত, সুখী এবং ঈর্ষণীয় এক পরিবার।
উপন্যাসের শিরোনামটি এসেছে সেলাইয়ের নীল সুতোর স্পুল থেকে। জীবন এবং সম্পর্কগুলো আসলে এই সুতোর মতোইÑবাইেও থেকে দেখতে মসৃণ ও গোছানো মনে হলেও, গভীেও প্রবেশ করলে দেখা যায় সেখানে অজস্র জট, গিঁট এবং আলগা সুতোর মাথা লুকিয়ে আছে। হুইটশ্যাঙ্ক পরিবারের গল্পটি মূলত সেই জট খোলার এবং নতুন কেও বোনার গল্প।
এই উপন্যাসের আখ্যানভাগ কোনো সরল রৈখিক পথ ধেও চলে না। টাইলার অত্যন্ত নিপুণভাবে সময়কে পেছনে নিয়ে গেছেন এবং আবার ফিরিয়ে এনেছেন বর্তমানের আলোয়। গল্পটি মূলত আব্বি এবং রেড হুইটশ্যাঙ্ক, তাদেও সন্তান এবং তাদেও পূর্বপুরুষদেও ঘিেও আবর্তিত।
বর্তমানে পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু হলেন রেড হুইটশ্যাঙ্ক এবং তাঁর স্ত্রী অ্যাবি। রেড একজন গম্ভীর, দায়িত্বশীল এবং নিজের পারিবারিক নির্মাণ সংস্থাকে আঁকড়ে ধেও রাখা প্রবীণ ব্যক্তি। অন্যদিকে অ্যাবি হলেন একজন স্নেহময়ী, সমাজকর্মী এবং অসম্ভব আবেগী মা, যিনি সারাজীবন চেষ্টা করেছেন তাঁর চার সন্তানকে এক অদৃশ্য স্নেহের সুতোয় বেঁধে রাখতে। কিন্তু বয়সের ভােও অ্যাবি এখন ক্রমশ তাঁর স্মৃতিশক্তি হারাচ্ছেন, যা পরিবারের সবাইকে এক নীরব সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
রেড ও অ্যাবির চার সন্তান, যাদেও চরিত্রগুলো একে অপরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা:
— জেনি ও আমান্ডা: দুই দায়িত্বশীল কন্যা, যারা নিজেদের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে কিন্তু বাবা—মায়ের এই পড়ন্ত বয়সে তাঁদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
— স্টেম (ঝঃবস): সৎ ও বাধ্য পুত্র, যে বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করে এবং সবসময় বাবা—মায়ের লক্ষ¥ী ছেলে হয়ে থাকার চেষ্টা করে।
— ডেনি (উবহহু): এই উপন্যাসের সবচেয়ে রহস্যময় এবং জটিল চরিত্র। সে পরিবারের ‘ব্ল্যাক শিপ’ বা বোহেমিয়ান ছেলে। ডেনি ঘরকুনো নয়; সে হুট করে নিখোঁজ হয়ে যায়, বছরের পর বছর পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখে না, আবার হুট করেই এক অদ্ভুত ঝড়ের মতো ফিরে আসে। ডেনিকে কেন্দ্র করেই অ্যাবি এবং রেডের জীবনের সবচেয়ে বড় মানসিক টানাপোড়েনগুলো আবর্তিত হয়।
গল্পের শুরুতেই আমরা দেখতে পাই রেড এবং অ্যাবি বয়সের এমন এক প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন যেখানে তাঁদের একলা থাকা আর নিরাপদ নয়। অ্যাবি প্রায়শই নিজের অজান্তে বাল্টিমোরের রাস্তায় হারিয়ে যান, অবান্তর কথা বলেন। এই খবর পেয়ে সন্তানদের মধ্যে এক নীরব তোলপাড় শুরু হয়। ঠিক এই সময়েই, বহু বছর পর হঠাৎ করে ফিরে আসে তাঁদের ভবঘুরে ছেলে ডেনি।
ডেনি ফিরে এসে ঘোষণা করে যে সে এখন থেকে বাবা—মায়ের সাথে এই বাড়িতেই থাকবে এবং তাঁদের দেখাশোনা করবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটি পরিবারের অন্য সদস্যদের, বিশেষ করে স্টেমের মনে এক নীরব ঈর্ষা ও সন্দেহের জন্ম দেয়। স্টেম ভাবত, সে সারাজীবন বাবা—মায়ের অনুগত থেকে যা পায়নি, ডেনি কেবল ফিরে এসেই তার চেয়ে বেশি ভালোবাসা ও মনোযোগ পেয়ে যাচ্ছে।
টাইলার এখানে ভাইদের ভেতরের সেই আদিম মনোস্তাত্ত্বিক রেষারেষি অত্যন্ত সূক্ষ¥ভাবে দেখিয়েছেন। ডেনি চরিত্রটি এমন যে, সে ভালোবাসা চায় কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারে না। সে ঘরের ভেতরে এক অশান্ত বাতাস, যে সবাইকে ভালোবাসে অথচ সবার থেকে দূরে পালিয়ে বেড়াতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
উপন্যাসটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় অংশে টাইলার আমাদের নিয়ে যান অতীতের বাল্টিমোরে। এটি এই উপন্যাসের সবচেয়ে নান্দনিক অংশ। বর্তমানের হুইটশ্যাঙ্ক পরিবারের যে নিখুঁত রূপ আমরা দেখি, তার পেছনের সত্যগুলো জানতে আমাদের কয়েক দশক পিছিয়ে যেতে হয়।
১৯২০ এবং ৩০—এর দশকের বাল্টিমোরে আমরা দেখতে পাই কীভাবে রেডের বাবা আব্বি হুইটশ্যাঙ্ক এবং মা জুনিয়ার সংসার শুরু হয়েছিল। আব্বি ছিলেন একজন অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক, রুক্ষ কিন্তু কাজের প্রতি একনিষ্ঠ কাঠমিস্ত্রি। জুনিয়া ছিলেন উচ্চাভিলাষী এবং প্রচণ্ড জেদি এক নারী। এই বাড়িটি, যা আজ হুইটশ্যাঙ্ক পরিবারের অহংকার, তা আসলে আব্বি অন্য এক ধনী পরিবারের জন্য তৈরি করেছিলেন। কিন্তু জুনিয়ার অদম্য জেদ এবং কৌশলের কারণেই বাড়িটি শেষ পর্যন্ত হুইটশ্যাঙ্কদের দখলে আসে।
এখানে টাইলার আমাদের দেখান যে, যে পারিবারিক ঐতিহ্যকে বর্তমান প্রজন্ম পবিত্র মনে করে আগলে রেখেছে, তার পেছনের ভিত্তিটি তৈরি হয়েছিল আক্ষেপ, জেদ এবং কিছুটা অনৈতিক কৌশলের ওপর ভিত্তি করে।
এরপর আমরা জানতে পারি তরুণ রেড এবং অ্যাবির ভালোবাসার গল্প। বাইরে থেকে তাঁদের দাম্পত্য জীবনকে নিখুঁত মনে হলেও, তাঁদের শুরুর দিনগুলো মোটেও সহজ ছিল না। অ্যাবি আসলে রেডের বন্ধুকে ভালোবাসতেন, কিন্তু এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে রেডের জীবনে তাঁর আগমন ঘটে। তাঁদের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের পেছনে ছিল অজস্র আপস, না—বলা অভিমান এবং নীরব বোঝাপড়া।
এই ফ্ল্যাশব্যাকগুলো পাঠককে এক গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়: কোনো পরিবারই আসলে বাইরে থেকে যেমন দেখায়, ভেতর থেকে তেমন নয়। প্রতিটি নিখুঁত হাসির পেছনে থাকে এক দীর্ঘ মানিয়ে নেওয়ার ইতিহাস।
উপন্যাসের শেষ ভাগে এসে কাহিনী আবার ফিরে আসে বর্তমান বাল্টিমোরে। অ্যাবির শারীরিক ও মানসিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। একদিন এক আকস্মিক ও বেদনাদায়ক ঘটনার মধ্য দিয়ে অ্যাবির জীবনাবসান ঘটে। অ্যাবির চলে যাওয়া হুইটশ্যাঙ্ক পরিবারের সেই অদৃশ্য সুতোটিকে ছিঁড়ে দেয় যা সবাইকে একসাথে ধরে রেখেছিল।
অ্যাবির মৃত্যুর পর সেই বিশালাকার কাঠের বাড়িটি খালি হয়ে যেতে থাকে। রেড একা হয়ে পড়েন। ডেনি এবং স্টেমের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এক চরম সীমায় পৌঁছায়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, বাড়িটি বিক্রি করে দেওয়া হবে।
যে বাড়িটি চার প্রজন্মের স্মৃতিকে ধারণ করে রেখেছিল, যার প্রতিটি কোণে লেগে ছিল আব্বি হুইটশ্যাঙ্কের হাতের ছোঁয়া, জুনিয়ার জেদ, অ্যাবির মাতৃত্বের সুবাসÑতা আজ অন্য কারও হয়ে যাবে। বাড়িটি বিক্রির দিনে ডেনি যখন শেষবারের মতো সেই বারান্দায় এসে দাঁড়ায়, তখন তার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু পাঠককে এক পরম শূন্যতার স্বাদ দেয়।
লেখক পরিচিতি
অ্যান টাইলার সমকালীন আমেরিকান সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক। ১৯৪১ সালে মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর সাহিত্যিক জীবন ও সৃষ্টির সঙ্গে মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোর শহরের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবন, প্রজন্মগত সম্পর্ক, একাকিত্ব, দাম্পত্য, স্মৃতি এবং মানবিক দুর্বলতাকে অসাধারণ সংযম ও সহানুভূতির সঙ্গে তুলে ধরাই তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে Dinner at the Homesick Restaurant, The Accidental Tourist, Breathing Lessons যার জন্য তিনি ১৯৮৯ সালে পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন।
