যা দেখেছি যা বুঝেছি—২২ || মনিরুল ইসলাম
নিজের খোঁজে
ছোট ছোট বিদায়কে বলে ছোট ছোট মৃত্যু। সবশেষে চলে আসে বড় বিদায়। জীবনকে অনেকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আমার মনে হয়েছে জীবনটা একটা চক্র বা বৃত্তের মতো। পুরো জীবনটা একটা বড় বৃত্তের মতোÑজন্মের ক্ষণে বৃত্ত অঁাকা শুরু হয় মৃত্যুর মুহূর্তে সেটা পূর্ণতা লাভ করে। এই বড় বৃত্তের মাঝখানে অসংখ্য ছোট—বড় বৃত্ত তৈরি হয় অথার্ৎ আমরা এক একটা বৃত্ত বা কর্মকাল শেষ করি, একদিন অঁাকা শেষ হয় জীবনের পূর্ণবৃত্ত। এই যেমন আমি চীনে তিন বছরের একটা বৃত্ত অঁাকা শেষ করে অন্য বৃত্তে (কানাডা) চলে গেলাম।
নিজের কথা কিছু বলি। ‘আমি চিরতরে নিঃশেষে বিলুপ্ত হয়ে যাব’Ñএকথা বিশ্বাস করার সাহস সবার নেই, আমারও নেই। তাই অনেকের মতো আমারও বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে ‘আত্মা’ বলে কিছু একটা আছে। আত্মার ধারণাটা কল্পনাপ্রসূত, অনুমান—ভিত্তিক ও বাসনা—নির্ভর। যাদের বাসনা অনির্বাণ বদ্ধমূল, তারাই আস্তিক ধার্মিক। পৃথিবীর সর্বত্র এত প্রাণকণা অণুজীব জীবন, সবকিছু একদিন মরে যায়। সবই কি চিরতরে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, নাকি তার কিছু রেশ থেকে যায়? কোথাও কি চলে যায়, সঞ্চিত হয় গিয়ে ¯্রষ্টার স্টোরেজে?
আমার প্রাণ আর প্রাণীদের প্রাণের মধ্যে পার্থক্য কি? যদি আমার আত্মা ও স্পিরিট বেঁচে থাকে, বৃহদাকার প্রাণী বা ক্ষুদ্রাকার কীটের জীবাত্মা কেন বেঁচে থাকবে না? ‘আত্মা’ থাকলে সবার আছে, না—থাকলে কারো নাই। মশা একনিমিষে মরে যায় কিন্তু গরু মরতে সময় নেয়Ñকেন? হাতি—তিমির প্রাণ কি পিঁপড়া—পোকার সমান নয়? প্রাণ কি তবে ছোট—বড় হয়? প্রাণের তারতম্য বুঝে দয়া—মায়াও কি কম—বেশি হয়? কোন প্রাণীর প্রাণ কতবড় মাপতে পারলে ভাল হত।
মাঝেমধ্যে মনে হয় মাথা আর বুক চৌচির হয়ে ‘কিছু’ বের হয়ে আসবে। কোথা থেকে কখন কেন এল এই অবিনাশী অদৃশ্য অস্পৃশ্য অনির্বাপণীয় ‘অনুভূতি’। তাহলে কি তার নামই ‘আত্মা’? সে কি স্বর্গীয়Ñঅমর অক্ষয় অজড় অনাদি অনন্ত এক ব্যাখ্যাতীত ‘জিনিস’, যা ‘আমি’ রূপে বিরাজ করে মর্তে্য? তাকে নিয়েই কি ‘আমি’ ফিরে যাব আমার আদি উৎসে? সেই ‘আমি’—ই কি যাবে স্বর্গে বা নরকে? আমার ‘আমি’ হয়ত দেখা পাবে অনিন্দ্যের ‘আমি’—কে।
ঈশ্বর গ্রহনক্ষত্র পাহাড়সাগর আগুনপানি সৃষ্টি করলেন ভালকথা, কিন্তু কী এক আশ্চর্য ‘প্রাণ’ সৃষ্টি করলেন যা আবার মরে যায়, নবরূপে আবিভূর্ত হয়। বিশ^ব্রহ্মাণ্ডের আর সব সৃষ্টির মতো সমস্ত আত্মা—প্রাণ কি এক, অভিন্ন, সংযুক্ত? নাকি প্রত্যেক আত্মা স্বতন্ত্র অনন্য? হয়তো পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার যেমন, সকল জীবাত্মাও তেমনিÑএক অভিন্নভাবে যুতবদ্ধ হয়ে বিরাজিত। পানির সকল ধারা যেমন সাগর থেকে এসে সাগরে মিশে একাকার হয়ে যায়, মানবাত্মা হয়তো তাই। একজন ব্যক্তিমানুষ সেই মহাজ্ঞানভাণ্ডারের ও মহাত্মার ক্ষুদ্রাংশ ধারণ করে।
সমস্ত শক্তি যেমন এক অক্ষয় অবিনাশ রূপান্তরযোগ্য, প্রাণও কি তাই? এটা কি কোনো এক মহাসূত্র থেকে খণ্ড—বিখণ্ডভাবে ছড়িয়ে পড়ে, আবার কি একসাথে মিলে যায়? ঈশ^রের সকল সৃষ্টি নাকি এককালে অখণ্ড অভিন্ন একসাথে ছিল, তারপর সবকিছু ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবী যেমন খণ্ড—বিখণ্ড হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে, মহাবিশ^ (টহরাবৎংব) যেমন মহাকাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে, মাল্টিভার্স যেমন অবর্ণনীয়ভাবে বিস্তৃত, প্রাণও কি এভাবে অন্তহীন বিস্তৃতি নিয়ে ছড়িয়ে আছে? যে শক্তির ইঙ্গিতে এই মহাবিস্তৃতি, তার ইচ্ছাতেই কি আবার হবে মহাসম্মিলন? যদি সব প্রাণ একই সূত্রে গাঁথা তাহলে কেন আমরা একে অন্যকে কষ্ট দিই? জানি না। কতোকিছু আমরা জানি না, বুঝি না। এক মহাঅজ্ঞতার অন্ধকারে আমরা হাবুডুবু খেয়ে জীবন শেষ করি। এই পৃথিবীটাকে আমি বুঝতে চেষ্টা করি, পারি না, একদম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। দুর্গম দুর্বোধ্য দুরূহ মনে হয় সবকিছু। পৃথিবী এবং তার প্রাণপ্রবাহ এত জ্ঞানগর্ভ অথচ আমি তার কিয়দংশও বুঝি না। কারণ জ্ঞান অসীম, জ্ঞানী সসীম। এই কিছু বোঝা, কিছু না—বোঝার দোলাচল আমাকে অস্থির করে রাখে।
এতকিছু বলার পর আমি কি ‘নিজেকে’ জেনে গেছি বা চিনেছি আমার স্বরূপ? ‘প্রাণ’—এর রহস্যভেদ হয়েছে সামান্য? না, কিছুই হয়নি। কিছুই যে হয়নি, সেটুকু অবশ্য সামান্য বুঝতে পারছি। ‘নিজের খোঁজে’ বের হয়েছিলাম, বিদ্যালোচনা করে এবার বরং নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। জ্ঞান মানুষের চক্ষু খুলে দেয়, আমার চোখ যে বন্ধ করে দিল!
