মরক্কো সীমান্তে অভাবনীয় দৃশ্য || সংঘর্ষে ও ডুবে ৬০ জনের মৃত্যু প্রায় ৫০,০০০ মাইগ্রেন্ট ঢুকে পড়েছে স্পেনে

আল জাজিরা প্রতিবেদনঃ মরক্কো থেকে হাজার হাজার ইমিগ্রান্ট সমুদ্র স্থল উভয় পথেই সীমান্ত অতিক্রম করার পর স্পেন জরুরি ভিত্তিতে সেউটা অঞ্চলে সেনা মোতায়েন করেছে। 

স্পেনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন টিভিই জানিয়েছে যে, ৩০ জুলাই প্রায় ,০০০,০০০ মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের সেউটাতে প্রবেশ করেছে। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরে হিসাব করে যে, প্রায় ৪৯,০০০ ইমিগ্রান্ট ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমুদ্র স্থল উভয় পথেই মরক্কো থেকে সেউটাতে সীমান্ত অতিক্রম করেছিল।

সূত্রমতে, আরও প্রায় ৩০,০০০ মানুষ এখনো সীমান্ত এলাকার কাছে জড়ো হয়ে আছেন এবং তারা সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারেন।

কর্মকর্তারা মনে করেন, স্পেননিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে এটি এযাবৎকালের অন্যতম বৃহত্তম ইমিগ্রেশন ঢেউ।

সীমান্তে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেউটার ঠিক সীমান্তবর্তী মরক্কোর শহর ফনিদেকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ সীমান্ত পার হওয়া মানুষের স্রোত থামাতে জলকামান ব্যবহার করেছে।

এদিকে, উত্তর আফ্রিকার আরেকটি স্প্যানিশ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল মেলিলায়, স্থানীয় গণমাধ্যম মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রকাশিত ভিডিওতে বেনি আনসার সীমান্ত ক্রসিংয়ে সংঘর্ষের দৃশ্য দেখা গেছে।

মরক্কোর মানবাধিকার সংস্থার সদস্য ওমর নাজির মতে, অন্তত তিনটি যানবাহন পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ইমিগ্রান্ট নিরাপত্তা বাহিনী উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

সিউটা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৩০ জুলাই তারা নয়টি মৃতদেহ উদ্ধার করেছে, যার ফলে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই অঞ্চলে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টাকালে নিহত মানুষের মোট সংখ্যা ৬০ দাঁড়িয়েছে।

ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার জবাবে, স্প্যানিশ সরকার সিউটাতে নিজেদের বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য মূল ভূখণ্ড থেকে শত শত বিশেষ বাহিনীর পুলিশ সৈন্য মোতায়েন করেছে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে যে, তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দেমারলাস্কার সঙ্গে সেউটা পরিদর্শন করেন ৩১ জুলাই।

সেউটা কর্তৃপক্ষ জরুরি অবস্থা ঘোষণার অনুরোধ জানিয়েছে।

রয়টার্সের তথ্যমতে, স্পেন সম্প্রতি প্রায় লক্ষ নথিবিহীন ইমিগ্রান্টের বসবাসের বৈধতা দেওয়ার জন্য একটি কর্মসূচি চালু করেছে, যার ফলে আবেদনের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

কিছু দল এই নীতির সমালোচনা করে যুক্তি দিয়েছে যে, এটি আরও বেশি ইমিগ্রান্টকে স্পেনে আশ্রয় নিতে উৎসাহিত করেছে এবং তারা প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের বিরুদ্ধে সেউটার পরিস্থিতিকে সংকটে পরিণত হতে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে।

পিপলস পার্টির (পিপি) নেতা আলবার্তো নুনেজ ফেইহো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন: ‘সেউটার পরিস্থিতি ভয়াবহ। সরকার তা উপেক্ষা করতে পারে না; আমরা একটি জাতীয় নিরাপত্তা সংকটের সম্মুখীন।

সেদিন এর আগে, সেউটার মেয়র হুয়ান হেসুস ভিভাস ইমিগ্রান্টদের ঢল মোকাবেলায় স্পেনীয় সরকারকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

তবে, প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত বিষয়গুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভয়াবহ দুর্ঘটনা এবং অন্যান্য জাতীয় দুর্যোগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিবিধানের আওতায় পড়ে না।

৩০ জুলাই ফক্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি বলেছেন যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পইউরোপকে দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, গণ অভিবাসন সহজতর করাসহ উগ্রবামপন্থী বিশ্বায়ন নীতি অনুসরণ অব্যাহত রাখলে তার পরিণতি কী হবে।

ইতালির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি স্পেনের জন্য শেনগেন ভিসার মর্যাদা সাময়িকভাবে স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানিও বলেছেন যে, সেউটা থেকে পাওয়া ছবিগুলো থেকে বোঝা যায় স্প্যানিশ সরকারের ইমিগ্রেশন নীতিভুল পথে গেছে

২৪ ঘন্টায় ৪৯,০০০ ইমিগ্রান্ট স্পেনে প্রবেশ করেছে

স্প্যানিশ পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, ‘সারা রাত ধরেই সিউটাতে মানুষের আগমন অব্যাহত ছিল। দিনের বেলার তুলনায় সংখ্যাটা কম হলেও, ইমিগ্রান্টরা রাতভর সীমান্ত পার হওয়া অব্যাহত রেখেছে এবং আজ সকাল পর্যন্তও তা থামেনি।

সিউটা একটি ১০ মিটার উঁচু সীমান্ত বেড়া দিয়ে মরক্কো থেকে বিচ্ছিন্ন, কিন্তু মরক্কো থেকে আসা ইমিগ্রান্টরা বেড়াটি এড়িয়ে সমুদ্র সাঁতরে সিউটার তারাজাল সৈকতে পৌঁছাতে পারে।

স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের অনুমান অনুযায়ী গত ২৪ ঘণ্টায় মরক্কো থেকে সমুদ্র স্থলপথে প্রায় ৪৯,০০০ ইমিগ্রান্ট উত্তর আফ্রিকার ভূখণ্ড সিউটাতে প্রবেশ করেছে। মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রের মতে, সমুদ্রপথে সিউটাতে পৌঁছানোর চেষ্টাকালে অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন।

এলাকাটিতে স্প্যানিশ বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সমিতির প্রধান রশিদ সবিহি বলেছেন যে, বেশিরভাগ ভুক্তভোগী সমুদ্র পার হওয়ার সময় ডুবে মারা গেছেন, তবে তারাজাল সৈকতে ঢেউপ্রতিরোধক বাঁধ পার হওয়ার জন্য ভিড়ের ধাক্কাধাক্কিতে পদদলিত হয়েও কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে।

উন্নত অর্থনৈতিক সুযোগের আশায় অথবা নিজ দেশের সহিংসতা থেকে বাঁচতে ইউরোপে ইমিগ্রান্টদের প্রবেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হলো স্পেন।

২৯ জুলাই সিউটা শহরে বিপুল সংখ্যক মানুষের ঢল নামার পর স্পেন মরক্কোর সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, হাজার হাজার মানুষ, যাদের অধিকাংশই পুরুষ, তারাজাল সৈকতের ঢেউরোধী বাঁধের চারপাশে সাঁতার কাটছে অথবা শহরে প্রবেশের জন্য সীমান্ত বেড়ার গেট ভেঙে ফেলছে। স্পেনের ভূখণ্ডে প্রবেশের সময় তাদের মধ্যে কেউ কেউস্পেন দীর্ঘজীবী হোকবলে স্লোগান দিচ্ছিল।

ধারণা করা হচ্ছে, মরক্কো তারাজাল সীমান্ত ক্রসিং খুলে দিয়েছে, যার ফলে ঢল নেমেছে স্প্যানিশ ভূখণ্ডে মানুষের প্রবেশ। বিষয়ে মরক্কোর কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করেননি।

স্পেন সেউটা কর্তৃপক্ষকে শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করার জন্য সৈন্য মোতায়েন করেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যত দ্রুত সম্ভব সীমান্ত অতিক্রমকারীদের প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা করার জন্য মরক্কোর সহযোগিতা চেয়েছে।

Related Posts