উন্নয়নশীল বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—১৯ || ড. আনিস রহমান
ঈযধঢ়ঃবৎ ৫: উন্নত মেটেরিয়াল সায়েন্স ও আণবিক বিজ্ঞান
ব্যাটারি প্রযুক্তি: গ্রীষ্মমন্ডলীয় জলবায়ুর উপযোগী উদ্ভাবন
গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশগুলোতে ব্যাটারি প্রযুক্তির প্রধান শত্রু হলো উচ্চ তাপমাত্রা এবং অতিরিক্ত আর্দ্রতা। প্রথাগত লিথিয়াম—আয়ন ব্যাটারিগুলো সাধারণত ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার আশেপাশে সবচেয়ে ভালো কাজ করে। কিন্তু যখনই তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখনই ব্যাটারির ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং ব্যাটারির কার্যক্ষমতা দ্রুত কমতে থাকে। বাংলাদেশে বা ভারতের মতো অঞ্চলে যেখানে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে, সেখানে সাধারণ ব্যাটারি ব্যবহারের ফলে বিস্ফোরণ বা ‘থার্মাল রানওয়ে’—এর ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। এই সমস্যা সমাধানে এআই এখন নতুন উপাদানের ডিজাইন এবং স্মার্ট থার্মাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
গবেষকরা এআই সিমুলেশন ব্যবহার করে একটি বিশেষ ধরনের ‘অল—ক্লাইমেট ব্যাটারি’ (অঈই) ডিজাইন করেছেন। এই ব্যাটারির বৈশিষ্ট্য হলো এটি মাইনাস ৫০ ডিগ্রি থেকে শুরু করে ৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও সমানভাবে কার্যকর। এই উদ্ভাবনের পেছনের রহস্য হলো ব্যাটারির ভেতরে থাকা মাত্র ১০ মাইক্রন পুরুত্বের একটি নিকেল ফয়েল। এআই মডেলগুলো এই ফয়েলের মাধ্যমে ব্যাটারির অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার প্রক্রিয়াটি অপ্টিমাইজ করেছে। যখন বাইরের তাপমাত্রা খুব বেশি হয়, তখন এআই ইলেক্ট্রোলাইটের অস্থিরতা বা ভোলাটিলিটি কমানোর জন্য নির্দিষ্ট রাসায়নিক সংযোজন করার পরামর্শ দেয়। অন্যদিকে, শীতকালে এই নিকেল ফয়েল ব্যাটারিকে গরম রাখতে সাহায্য করে। এআই—এর মাধ্যমে করা এই তাপীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাটারির আয়ুষ্কাল প্রায় ৫০% বৃদ্ধি করতে সক্ষম বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
ব্যাটারির এই থার্মাল ম্যানেজমেন্টে এআই—এর আরেকটি সফল প্রয়োগ হলো কুলিং চ্যানেলের জ্যামিতিক নকশা তৈরি। ইলেকট্রিক যানবাহন বা বৃহৎ বিদ্যুৎ সঞ্চয় কেন্দ্রে ব্যাটারি প্যাকগুলো ঠান্ডা রাখার জন্য কুলিং চ্যানেল ব্যবহার করা হয়। এআই—এর জেনেটিক অ্যালগরিদম (এঅ) এবং কম্পিউটেশনাল ফ্লুইড ডাইনামিক্স (ঈঋউ) সিমুলেশন ব্যবহার করে এখন এমন সব জটিল নকশা তৈরি করা হচ্ছে যা প্রথাগত প্রকৌশল পদ্ধতিতে অসম্ভব ছিল। এই এআই মডেলগুলো বায়ুপ্রবাহের গতি এবং ব্যাটারির কোষগুলোর মধ্যকার দূরত্বের এক আদর্শ ভারসাম্য খুঁজে বের করে। এর ফলে কুলিং ফ্যানগুলো ব্যাটারির শক্তির মাত্র ৪% ব্যবহার করেই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৭% পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারে। এই ধরনের স্ব—নিয়ন্ত্রিত শীতলীকরণ ব্যবস্থা গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে ইলেকট্রিক যানবাহনের স্থায়িত্ব নিশ্চিতে এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
এছাড়াও, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো চরম উষ্ণ জলবায়ুর দেশগুলোতে এআই এবং ‘আইস ব্যাটারি’ (ওপব ইধঃঃবৎু) প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে দিনের বেলার উদ্বৃত্ত সৌর শক্তি ব্যবহার করে বরফ জমানো হয় এবং রাতে সেই বরফের শীতলতা ব্যবহার করে ভবনগুলোকে ঠান্ডা রাখা হয়। এআই এখানে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করে যা আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বিদ্যুতের গ্রিড সংকেত এবং ভবনের ভেতরের তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করে কখন শক্তি সঞ্চয় করতে হবে এবং কখন তা মুক্ত করতে হবে। এই স্মার্ট এনার্জি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশগুলোর বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে।
সাশ্রয়ী পানি বিশুদ্ধকরণ মেমব্রেন ডিজাইন ও এআই—এর প্রয়োগ
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব একটি চিরস্থায়ী সংকট। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে পানির লবণাক্ততা এবং ভূ—গর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক বা ম্যাঙ্গানিজের আধিক্য একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। রিভার্স অসমোসিস (জঙ) এবং আল্ট্রাফিল্টরেশন (টঋ) প্রযুক্তির মাধ্যমে পানি বিশুদ্ধ করা সম্ভব হলেও এই মেমব্রেনগুলোর উৎপাদন এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অত্যন্ত বেশি। মেমব্রেন ফাউলিং বা ছিদ্রে ময়লা জমে যাওয়া এই প্রযুক্তির প্রধান বাধা। এআই বর্তমানে এই সমস্যার সমাধানে আণবিক পর্যায় থেকে শুরু করে অপারেশনাল লেভেল পর্যন্ত কাজ করছে।
মেমব্রেন গবেষণায় এআই—এর অন্যতম প্রধান কাজ হলো ‘মেমব্রেন বিহেভিয়ার প্রেডিকশন’ বা মেমব্রেনের আচরণের পূর্বাভাস প্রদান। কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক (অঘঘ) এবং মেশিন লার্নিং (গখ) মডেলগুলো এখন পানির ফ্লাক্স রেট বা প্রবাহের হার এবং ফাউলিং প্রক্রিয়াটি সিমুলেশন করতে পারে। গবেষকরা এই মডেলগুলোকে কয়েক হাজার ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেন, যার ফলে এআই বলে দিতে পারে পানির নির্দিষ্ট গুণমান এবং চাপের অধীনে একটি মেমব্রেন কতদিন টিকবে। এর ফলে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ভারতের গ্রামীণ অঞ্চলে পরিচালিত একটি পাইলট প্রজেক্টে দেখা গেছে যে, সাধারণ মেশিন লার্নিং মডেল ব্যবহারের ফলে পানির গুণমান রিয়েল—টাইমে মনিটর করা সম্ভব হচ্ছে এবং মেমব্রেন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি ২০% পর্যন্ত কমেছে।
সাশ্রয়ী মেমব্রেন তৈরির ক্ষেত্রে এআই এখন নতুন পলিমারিক উপাদানের বিপরীতমুখী নকশা (ওহাবৎংব উবংরমহ) করতে পারছে। প্রথাগতভাবে নতুন মেমব্রেন তৈরি করতে বছরের পর বছর পরীক্ষা—নিরীক্ষা করতে হতো। কিন্তু এআই এখন টার্গেট প্রপার্টি বা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য—যেমন ৯৯% লবণ দূর করার ক্ষমতা এবং অতি—পাতলা গঠন—দিয়ে শুরু করে এবং সেই অনুযায়ী উপযুক্ত আণবিক কাঠামো খুঁজে বের করে। পলিমারজিএনএন (চড়ষুসবৎএঘঘ) এবং পলিবার্টের (চড়ষুইঊজঞ) মতো উন্নত মডেলগুলো পলিমারের ব্যাপ্তিযোগ্যতা এবং স্থায়িত্বের নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে। এর মাধ্যমে গবেষকরা এমন সব ন্যানোপোরাস (ঘধহড়ঢ়ড়ৎড়ঁং) বা ক্ষুদ্র ছিদ্রযুক্ত মেমব্রেন তৈরি করতে পারছেন যা খুব কম চাপে এবং কম বিদ্যুৎ খরচে পানি বিশুদ্ধ করতে পারে। ন্যানোপোরাস মেমব্রেন হলো এমন ঝিল্লি যার ছিদ্রের আকার সাধারণত ১—১০০ ন্যানোমিটার। এত ছোট ছিদ্র থাকার কারণে এটি খুব সূক্ষ¥ভাবে পদার্থ আলাদা করতে পারে—যেমন প্রোটিন, ভাইরাস, আয়ন, গ্যাস ইত্যাদি। এটি মূলত একটি পাতলা, নমনীয় প্রতিবন্ধক যা দুই পরিবেশ বা পদার্থকে আলাদা করে রাখে—এটি ‘মেমব্রেন’ শব্দের সাধারণ সংজ্ঞার সাথেও মিলে যায়, যেখানে মেমব্রেনকে বলা হয় একটি পাতলা, নমনীয় স্তর বা পর্দা যা দুই পরিবেশকে পৃথক করে।
এছাড়াও, গবেষকরা এআই ব্যবহার করে এমন সৌর চালিত লবণাক্তকরণ সিস্টেম তৈরি করেছেন যা কোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ ছাড়াই কাজ করতে পারে। এআই এখানে সৌরশক্তির শোষণ এবং বাষ্পীভবনের হারকে অপ্টিমাইজ করে, যা উপকূলীয় দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানির এক টেকসই সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মেমব্রেনের উপরিভাগে ন্যানো—পার্টিকেলের আস্তরণ দিয়ে তার ফাউলিং প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এআই সিমুলেশন ব্যবহৃত হচ্ছে, যা মেমব্রেনের আয়ু বাড়িয়ে একে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী করে তুলছে।
