অসামান্য উদ্যোগ ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ || শামীম আল আমিন
বাংলাদেশের মানুষ তখন ঝাঁপিয়ে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধে। বীর বাঙালি যখন স্বাধীনতার জন্য লড়ছে, তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গোটা দেশকে পরিণত করেছিল এক বিভীষিকাময় মৃত্যুপুরীতে। দেশজুড়ে চলছিল হত্যা, নির্যাতন আর ধ্বংসযজ্ঞ। লাখো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে শরণার্থী হতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে বাংলার সর্বস্তরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অসংখ্য বিবেকবান মানুষ বাংলাদেশের ন্যায্য সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানান। নানা উপায়ে তাঁরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। সেই সহমর্মিতার সবচেয়ে স্মরণীয় উদ্যোগগুলোর একটি ছিল ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’।
দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট, রবিবার। প্রথমে একটি কনসার্ট আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দর্শকদের ব্যাপক আগ্রহের কারণে শেষ পর্যন্ত দুটি শো করতে হয়Ñএকটি দুপুর আড়াইটায়, অন্যটি রাত আটটায়। মানবতার আহবানে বিশ্বের সেরা সংগীতশিল্পীরা সেদিন এক ছাদের নিচে একত্রিত হয়েছিলেন। পৃথিবী বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেছিল, কীভাবে সংগীত মানবতার ভাষায় ইতিহাস রচনা করতে পারে।
কিন্তু এই আয়োজনের পেছনের গল্প কী?
বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা এবং মানবিক বিপর্যয়ের খবর গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল বিশ্বখ্যাত বাঙালি সেতারবাদক পণ্ডিত রবি শংকরকে। বাংলার মানুষের দুর্দশা তাঁকে ব্যথিত করেছিল। তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সে সময় বিপুল জনপ্রিয় বিটলসের শিল্পী জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে কথা বলেন। শরণার্থীদের সহায়তায় একটি বেনিফিট কনসার্ট আয়োজনের প্রস্তাব দেন। জর্জ হ্যারিসন মুহূর্তের মধ্যেই সেই আহ্বানে সাড়া দেন। মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই তিনি এই বিশাল আয়োজন করে ফেলেন।
জর্জ হ্যারিসন এরপর বিশ্বের খ্যাতিমান সংগীতশিল্পীদের আমন্ত্রণ জানান নিউইয়র্কের বিখ্যাত ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের এই কনসার্টে অংশ নেওয়ার জন্য। তিনি তাঁর সাবেক ব্যান্ড দ্য বিটলস—এর সদস্যদেরও আহবান জানান। পল ম্যাকার্টনি যোগ দেননি। জন লেনন আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু স্ত্রী ইয়োকো ওনোর সঙ্গে আইনি জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত আসতে পারেননি। মিক জ্যাগার তখন ফ্রান্সে ছিলেন। ফলে বিটলসের সদস্যদের মধ্যে কেবল রিঙ্গো স্টারই অংশ নিয়েছিলেন ঐতিহাসিক এই কনসার্টে।
তবে আয়োজন এখানেই থেমে থাকেনি। জর্জ হ্যারিসনের ডাকে সাড়া দিয়ে উপস্থিত হন বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রেস্টন, লিয়ন রাসেল এবং হ্যারিসনের নতুন ব্যান্ড ব্যাডফিঙ্গার—এর শিল্পীরা। বিটলস ভেঙে যাওয়ার পর এটি ছিল জর্জ হ্যারিসনের প্রথম বড় মঞ্চ পরিবেশনা। প্রায় পাঁচ মাস পর এরিক ক্ল্যাপটনও এই কনসার্টের মাধ্যমে মঞ্চে ফিরে আসেন। আর ১৯৬৯ সালের পর প্রথমবারের মতো বব ডিলানও দর্শকদের সামনে গান পরিবেশন করেন।
পণ্ডিত রবি শংকরের সঙ্গে ছিলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি সরোদবাদক আলি আকবর খান। তবলায় ছিলেন আল্লা রাখা এবং তানপুরায় কমলা চক্রবর্তী। অনুষ্ঠানের শুরুতেই তাঁদের পরিবেশিত ‘বাংলা ধুন’ দর্শকদের মুগ্ধ করে।
জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবি শংকরের এই উদ্যোগ ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে আছে ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ নামে। বিশ্বের বিখ্যাত শিল্পীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই কনসার্টের প্রভাব ছিল ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। এর মাধ্যমে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ বাংলাদেশের নাম আরো ভাল ভাবে জানতে পারে। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে প্রায় ৪০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে সেদিন তুলে ধরা হয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের চিত্র। কনসার্টটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছিল, বিবেককে নাড়া দিয়েছিল।
দুটি বেনিফিট কনসার্ট এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে প্রায় আড়াই লাখ ডলার সংগ্রহ করা হয়। এই অর্থ পরে ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিশু শরণার্থীদের সহায়তায় ব্যয় করা হয়। পরবর্তীতে কনসার্টটির লাইভ অ্যালবাম প্রকাশিত হয় এবং তা বিক্রির নতুন রেকর্ড গড়ে। একটি তিন—ডিস্কের বক্স সেট এবং অ্যাপল ফিল্মস নির্মিত তথ্যচিত্রও ১৯৭২ সালে মুক্তি পায়।
তথ্যচিত্রটির শুরুতেই দেখা যায়, রবি শংকর ও জর্জ হ্যারিসনের সংবাদ সম্মেলন, যেখানে তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে কনসার্টের ঘোষণা দেন। এরপর ধীরে ধীরে উঠে আসে এই আয়োজনের প্রেক্ষাপট, প্রস্তুতি এবং মানুষের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণের গল্প। জর্জ হ্যারিসন তাঁর জনপ্রিয় অ্যালবাম অষষ ঞযরহমং গঁংঃ চধংং—এর গান দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করেন। এরপর একে একে মঞ্চে আসেন বিলি প্রেস্টন, রিঙ্গো স্টার, লিয়ন রাসেল, বব ডিলানসহ বিশ্বের সেরা সংগীতশিল্পীরা। আর এই মঞ্চেই জর্জ হ্যারিসন পরিবেশন করেন তাঁর লেখা সেই ঐতিহাসিক গান ‘ইধহমষধ উবংয’, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্ববাসীর কাছে আরও পরিচিত করে তোলে।
একটি স্বাধীন দেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে এভাবেই জড়িয়ে গেছে বিশ্বের অগণিত মানুষের প্রিয় শিল্পীদের নাম। অনেকেই হয়তো লিখেছেন ঐতিহাসিক সেই কনসার্টকে ঘিরে। তবে অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত আমার একটি বইয়ে আমি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি ঘটনাপ্রবাহ, পেছনের গল্প, কীভাবে বাস্তব হলো, কনসার্টের প্রভাবই বা কী ছিল, ইত্যাদি সব কথা। বইটির নামও রেখেছি ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। বইটি এরইমধ্যে পাঠকপ্রিয় হয়েছে। এ ছাড়া নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত সেই কনসার্টকে ঘিরে আমি একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছি। নাম দিয়েছি ঝড়হমং ভড়ৎ ধ ঈড়ঁহঃৎু বা একটি দেশের জন্য গান। ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে বাংলাভাষায় সেই ঘটনাবলীকে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করে রাখাই ছিল এই উদ্যোগের মূল কথা। নির্মোহ চেষ্টায় কাজটি করার চেষ্টা করেছি, হয়তো কাজে লাগবে সময়ের।
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ এর মধ্য দিয়ে মানবতার যে অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন জর্জ হ্যারিসন, পণ্ডিত রবি শংকর এবং অন্য শিল্পীরা, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। সেইসব মহান শিল্পীদের প্রতি রইলো অতল শ্রদ্ধা।
