ডয়েচে ভেলের বিশ্লেষণ || বাংলাদেশে ট্রাইব্যুনালে বিচারের আইনি মানদন্ড
ডয়চে ভেলে প্রতিবেদনঃ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মনে করে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে গুরুতর অপরাধের বিচারের জন্য গঠন করা অভ্যন্তরীণ আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরিচালনা করা এক ডজনেরও বেশি মামলার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আইনি প্রক্রিয়ার যথার্থতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।’ সেখানে ‘সরকারি কৌঁসুলিরা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আটক ও তাদের বিরুদ্ধে কথিত অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ গঠন করেছেন’ উল্লেখ করে আরো বলা হয়, অনেক মামলা করা হয়েছে সাক্ষীর জবানবন্দির ওপর নির্ভর করে এবং অনেক ক্ষেত্রে একই জবানবন্দি বিভিন্ন জনের বিরুদ্ধে ‘হুবহু কাট—অ্যান্ড—পেস্ট’ (অনুলিপি) করে বসানো হয়েছে বলে মনে হয়।’
এ ব্যর্থতার ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, আইনের শাসন ক্ষুণ্ণ হতে পারে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ করা হতে পারে এবং অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বলেও মনে করে তারা।
গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এ কথা জানায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ)।
বিবৃতির শুরুতে বলা হয়, ‘গত ২৭ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার, দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী শাসনের পর ২০২৪ সালে গণ—আন্দোলনের মুখে যে সরকারের পতন ঘটে, সেই আমলের গুরুতর মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে রাজনীতিবিদ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং এমনকি সাংবাদিকসহ নানা ব্যক্তির বিচার করছে।’
তারপর হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক ডেপুটি ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত নানা অপকর্মের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের যথাযথভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত৷ তবে অনেক বিচার প্রক্রিয়াতেই সুষ্ঠু বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা হচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের জরুরি ভিত্তিতে তার ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সংস্কার করা প্রয়োজন এবং নতুন সরকারের উচিত ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত ও ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কোনো সুযোগ যে না থাকে, তা নিশ্চিত করা।’
জুলাই গণ—অভ্যুত্থানেরসময় ছাত্র—জনতার ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর দমন—পীড়নের কথা উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে ছাত্রদের নেতৃত্বে চলা আন্দোলনের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর দমন—পীড়ন সংক্রান্ত মামলার শুনানি করছে, যেখানে আট শ’র বেশি মানুষের মৃত্যু ও কয়েক হাজার মানুষ গুরুতর আহত হয়েছিল এবং যার পরিণামে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছিল। এছাড়া হাসিনার শাসনামলের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের মতো অপরাধের জন্যও ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলছে।’
ট্রাইব্যুনালের বিচার—প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ ও উদ্বেগের কারণ
এরপরই ট্রাইব্যুনালের বিচার—প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে গুরুতর অপরাধের বিচারের জন্য গঠন করা অভ্যন্তরীণ আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরিচালনা করা এক ডজনেরও বেশি মামলার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আইনি প্রক্রিয়ার যথার্থতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।’ সেখানে ‘সরকারি কৌঁসুলিরা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আটক ও তাদের বিরুদ্ধে কথিত অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ গঠন করেছেন’ উল্লেখ করে আরো বলা হয়, অনেক মামলা করা হয়েছে সাক্ষীর জবানবন্দির ওপর নির্ভর করে এবং অনেক ক্ষেত্রে একই জবানবন্দি বিভিন্ন জনের বিরুদ্ধে ‘হুবহু কাট—অ্যান্ড—পেস্ট’ (অনুলিপি) করে বসানো হয়েছে বলে মনে হয়।’
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক ডেপুটি ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত নানা অপকর্মের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের যথাযথভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত। তবে অনেক বিচার প্রক্রিয়াতেই সুষ্ঠু বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা হচ্ছে না।’
ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজের দৃশ্যমান অগ্রগতির বর্ণনা দিতে গিয়ে এইচআরডাব্লিউ জানায়, ‘হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে ট্রাইব্যুনাল ৬টি মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করেছে। এর ফলে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ৬২ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪২ জনের বিচার তাদের অনুপস্থিতিতে হয়েছে (সেখানে স্বয়ং হাসিনাও রয়েছেন) এবং ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।’
তারপর বর্তমান ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে শেখ হাসিনার আমলের ট্রাব্যুনালের যোগসূত্র উল্লেখ করে বলা হয়, ‘এই ট্রাইব্যুনালটি ২০১০ সালের মার্চ মাসে হাসিনার সরকারই প্রতিষ্ঠা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহায়তা করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের লংঘনমূলক অপরাধ, যেমন মানবতাবিরোধী অপরাধ, করেছেন বলে অভিযোগ ছিল, এমন ব্যক্তিদের বিচার করা। সেই বিচার প্রক্রিয়ায় ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে প্রমাণের অভাব, রাজনৈতিক পক্ষপাত, সরকারি কৌঁসুলি ও বিচারকদের মধ্যে আঁতাত এবং আইনি প্রক্রিয়ার মৌলিক সুরক্ষাব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণে সেগুলো ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল।’
‘২০২৪ সালে বিক্ষোভের মুখে হাসিনার সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ট্রাইব্যুনাল পরিচালনার আইনটি সংশোধন করে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এর এখতিয়ারভুক্ত অপরাধের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সংশোধনীগুলো পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক আদালতের সমতুল্য আইনি প্রক্রিয়া ও কার্যপ্রণালীর মানদণ্ড নিশ্চিত করতে পারেনি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)—র বর্তমান প্রশাসন নির্বাচিত হলেও এরপর আর কোনো সংশোধনী আনা হয়নি।’
‘ট্রাইব্যুনাল পরিচালনার আইন অনুযায়ী, সরকারি কৌঁসুলিদের এখনো সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য—প্রমাণ ছাড়াই কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া, আটকের কারণ লিখিতভাবে না জানিয়েই মাসের পর মাস আটক রাখা এবং অন্য কোনো আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন আবেদনের সুযোগ না দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য—প্রমাণ উপস্থাপনের মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই বিচার কার্যক্রম শুরু হতে পারে। ফলে আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ প্রস্তুতির জন্য খুব কম সময় পাওয়া যায়। আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার—কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রেও যথাযথ সুরক্ষার ব্যবস্থা, যেমন নিজেদের পক্ষে লড়ার জন্য আইনজীবী নির্বাচনের অধিকার, প্রয়োজনীয় মাত্রায় নিশ্চিত করা হয় না। পাশাপাশি, সাক্ষীদের জেরা করার ক্ষেত্রেও ট্রাইব্যুনাল বিবাদী পক্ষের আইনজীবীদের সুযোগ সীমিত করে দেয়।’
যুক্তরাষ্ট্র বলছে বাংলাদেশে ভ্রমণ এখন আগের চেয়ে নিরাপদ
ঢাকা থেকেঃ বাংলাদেশের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা হালনাগাদ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সামগ্রিক ভ্রমণ সতর্কতা ‘লেভেল ৩’ (ভ্রমণ পুনর্বিবেচনা করুন) থেকে ‘লেভেল ২’ (অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করুন)—এ পরিবর্তন করা হয়েছে। এর অর্থ, ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশ আগের চেয়ে নিরাপদ।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের ভ্রমণ পরিস্থিতি আগের তুলনায় নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর এই ইতিবাচক অগ্রগতি এসেছে। বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোর অংশ নেন। বৈঠক শেষে সার্জিও গোর একটি খুদে বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে অবহিত করেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।
ভ্রমণ সতর্কতার এই উন্নয়ন বাংলাদেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও স্থিতিশীলতার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন বলে জানানো হয়েছে। গত ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জোরদারে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের ইতিবাচক অগ্রগতিরও ইঙ্গিত বহন করে।
বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, ভ্রমণ সতর্কতার এই উন্নয়ন দেশের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার স্বীকৃতি।
