এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো.... আনিস আহমেদ

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা এবং সুরারোপিত এই অসাধারণ দেশাত্মবোধক গানটি আমার অত্যন্ত প্রিয়। বিশেষ করে যখন স্বপ্ন দিয়ে তৈরি এবং স্মৃতি দিয়ে ঘেরা দেশটির কথা বলা হয় এই গানে, তখন এই প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে সবার আগে। আমরা যারা বিদেশ—বিভূঁইয়ে থাকি তাদের কাছে বাংলাদেশের অমোচনীয় স্মৃতির মূল্য অনেকখানি। সেই বাংলাদেশ তার দারিদ্র দ্বারা সংজ্ঞায়িত নয়, সেই বাংলাদেশ তার রূপে—রসে—গন্ধে ভরা এমন এক সত্ত্বা যা মনের গভীরে প্রোথিত রয়েছে। আর কেবলই তো স্মৃতি নয়, কবি যথার্থই বলেছেন, ‘স্বপ্ন দিয়ে তৈরি’, এ যেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে যে স্বপ্ন ছিলো সেই স্বপ্ন দিয়েই তৈরি স্বদেশের কথাই তিনি বলছেন। জানি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এই গানটি লিখেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনেক আগেই। কিন্তু বাংলার প্রকৃতি ও বাংলাদেশের প্রতি যে আবেগসঞ্জাত ভালোবাসার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন সে তো আমাদের সেই স্বপ্ন দিয়ে তৈরি স্বদেশ যাকে আমরা স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখেছি দীর্ঘ দিন। বাঙালির ভাষায়, সংস্কৃতিতে, আর্থ—সামাজিক ক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশকে যে মুক্ত স্বাধীন ভাবে দেখার স্বপ্ন দেখেছিলাম, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের পর আমরা সেই দেশটিকে পেয়েছি ১৯৭১ সালে। সেদিন আমরা সোচ্চার কন্ঠে গেয়েছিলাম আমাদের প্রাণপ্রিয় জাতীয় সঙ্গীত এবং এই অনবদ্য দেশপ্রেমের গানও। 

তবে আজ স্বাধীনতার এই পঞ্চান্ন বছর পেরিয়ে এসে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কি আমাদের দেশকে সঠিক ভাবে চিনতে পেরেছি? দ্বিজেন্দ্রলালের প্রতি ক্ষমা চেয়েই যদি বলি, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি, কথাটা এখনকার পরিপ্রেক্ষিতে নেতিবাচক অর্থেও ব্যবহার করা যেতে পারে, তাহলে সে কথাটা কি খুব ভুল হবে? কারণ এখন তো বাংলাদেশ এমন এক সময় অতিক্রম করছে যখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অবমূল্যায়িত হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধারা অপমানিত হচ্ছেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায়, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজাকারদের শাস্তি প্রদানের দাবি তোলায় মৃত মানুষকে সমাহিত করাটাও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের দ্বারা। বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পাশারিকে সমাহিত করতে বাধা দেয় সাঈদীর সমর্থকরা। কারণ মানিক পাশারি এই যুদ্ধাপরাধী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে মূল বাদী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। পিরোজপুর সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে চিতলিয়া গ্রামে গত শনিবার গভীর রাতে ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে পুলিশের উপস্থিতিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পাশারিকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করেন স্বজনেরা। মানিক পাশারির এক বোন হেনা সংবাদদাতাদের বলেন, ‘তাঁদের হুমকি দিয়ে বলা হয়েছিল, মানিক পাশারির মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা হবে, মরদেহ আটকে রাখা হবে এবং পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে আসতে দেওয়া হবে না। এমনকি এলাকার ছোট বাচ্চাদেরও বাইরে বের হতে দেওয়া হবে না বলে ভয় দেখানো হয়েছিল।’ হুমকির কারণে স্বজন ও প্রতিবেশীদের অনেকে তাঁদের সহযোগিতা করতে সাহস পাননি। ভাইয়ের মরদেহ দাফনের জন্য কবর খুঁড়ে দেওয়ার লোক খুঁজে পেতেও তাঁদের বেগ পেতে হয়। এমনও খবর পাওয়া গেছে যে তাঁর জানাজার আগেই তাঁর খোঁড়া কবর মাটি ভরাট করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। অবশেষে পুলিশের পাহারায় এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান জানিয়ে সমাহিত করা হয়। তাই বলছিলাম এমন দেশটি খুঁজে পাওয়া কি সম্ভব যেখানে দেশটিকে শত্রুমুক্ত করার অভিযোগে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে মৃত্যুর পরও লাঞ্ছিত হতে হয়। ১৯৭১ সালে এই মুক্তিযোদ্ধার বাসভবনে আক্রমণ চালিয়েছিল সদলবলে দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল তাঁর এবং তাঁর গ্রামের অসংখ্য বাড়ি। মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ে হোগলাবুনিয়ার হিন্দু পাড়ায় সাঈদী ৫০—৬০ জন রাজাকারসহ আক্রমণ চালিয়ে ব্যক্তিগতভাবে শেফালি ঘরামি নামের এক নারীকে ধর্ষণের জন্য দায়ী ছিল। রাজাকাররা আসছে জানতে পেরে অনেক হিন্দু সপরিবারে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মধুসূদন ঘরামির স্ত্রী পালাতে পারেননি। তাই সাঈদীর নেতৃত্বে রাজাকাররা তাঁকে আটক করে ধর্ষণ করে। তারা ওই এলাকার হিন্দুদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। সাঈদী তিন জন নারীকে অপহরণ করে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে তুলে দেয়। হিন্দুদের ওপর আক্রমণ, তাদের ঘর—বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া এবং হিন্দু নারীদের ধর্ষণে মদদ দিতে সাইদীর বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। 

আর তাই এখনও বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যাই, যখন শুনি সাঈদীর সমর্থকরা মুক্তিযোদ্ধা মানিক পাশারির মরদেহকে সমাহিত করতে বাধা প্রয়োগ করে, তাঁর মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার হুমকি দেয়। এরাই সম্ভবত সাঈদীকে চাঁদে দেখতে পাওয়ার ভূয়া তথ্য দিয়েছিল। সে জন্যই আবার দ্বিজেন্দ্রলালের এই অমর সঙ্গীতের লাইনটি আমাকে বার বার নাড়া দেয়। দেশটির যে অনন্য সাধারণ গুণের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন, তার বিপরীতে ভিন্ন রকম চিত্র আমরা দেখতে পাই। 

এমন দেশটিও খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় যে দেশের জনককে অবমাননা করা হয়, জাদুঘরে রূপান্তরিত তাঁর বাসভবনকে ভেঙে পুড়িয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় এবং সে দেশের নতুন সরকার প্রধানরা ভুলেও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম তাদের মুখে আনেন না। বরঞ্চ এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ক্ষুব্ধ হয়ে বলা হয়, নতুন প্রজন্ম নাকি ইতিহাসের ওপর রিসেট বোতাম টিপে দিয়েছে। সম্প্রতি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র এবং তাঁর আইটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যে নিরাপরাধ লোকদের, কেবলমাত্র আওয়ামী লীগের সমর্থক হওয়ার ‘অপরাধে’ জেল—জুলুমের শিকার হতে হচ্ছে অথচ মানবতা বিরোধী অপরাধীরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে। এই ঘটনার একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবে সজীব ওয়াজেদ জয় স্পষ্টই উল্লেখ করেন যে হোলি আর্টিজানে হামলাকারি ধর্মীয় উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। জেন—জি নামের নতুন এই ‘জেড’ প্রজন্ম ইতিহাসকে মুছে ফেলে, নতুন এক ইতিহাস নির্মাণে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের বিবেচনায় সাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছে পরিচিত ‘জুলাই জঙ্গিরা’ ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের স্থান দখল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। তাই বড় বেশি করে জানতে ইচ্ছে করে এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। 

আমাদের দুর্ভাগ্য এতো সেই দেশ, যে দেশের জাতীয় সঙ্গীত রচয়িতার ছবিতে কালি লেপে দেওয়া হয় এবং এই বলে অপতথ্য ছড়ানো হয় যে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন। এমনকি তদানীন্তন পূর্ববঙ্গে তাঁর জমিদারির প্রজাদের জন্য তিনি কখনও কিছু করেননি। ইতিহাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এই ব্যক্তিরা জানেনই না যে পূর্ববঙ্গের সাধারণ মানুষদের সুবিধার্থে তিনি বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন যাতে তাঁর দরিদ্র প্রজারা উপকৃত হতে পারেন। আবার সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করি একদল মৌলবাদী, কাজী নজরুল ইসলামকে রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে দাঁড় করানোর আরেক অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 

তাই কষ্ট পাই এই কথা ভেবে যে বাংলাদেশ কি সকল দেশের রাণী, নাকি গ্লানি! 


Related Posts