বাংলাদেশ কি দুর্ভিক্ষে পড়তে যাচ্ছে || মুরাদ কিবরিয়া
আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ কি দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে?
প্রশ্নটি এখন আর কেবল আশঙ্কাবাদীদের মুখে নেই। ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল, গ্যাস ও সারের চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে; প্রশান্ত মহাসাগরে ‘খুব শক্তিশালী’ এল নিনো দানা বাঁধছে আর বিশ্ববাজারে খাদ্যমূল্য প্রায় চার বছরের সর্বোচ্চে। সেপ্টেম্বরের শেষে নিউইয়র্কে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সতর্ক করেছেন, আগামী কয়েক মাসেই বড় খাদ্যসংকট আসতে পারে। তাঁর ভাষায়, এটি খাদ্য, জ্বালানি, সার ও অর্থের সম্মিলিত সংকট।
উত্তর খোঁজার আগে শব্দটিকে অবশ্য পরিষ্কার করা দরকার। আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা মাপকাঠিতে, যা আইপিসি নামে পরিচিত, দুর্ভিক্ষ হলো সবশেষ ধাপ: কোনো এলাকার অন্তত এক—পঞ্চমাংশ পরিবার চরম খাদ্যঘাটতিতে, ব্যাপক প্রাণঘাতী অপুষ্টি আর অনাহারে মৃত্যু। গত তিন দশকে পৃথিবীতে এই ধাপ পৌঁছানো প্রায় সব ঘটনাই ঘটেছে যুদ্ধ বা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়া অঞ্চলে—যেখানে খাবার মানুষের কাছে পৌঁছানোই অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। এই অর্থে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা কম। তবে এই উত্তরে স্বস্তি পাওয়ার কিছু নেই। কারণ আমাদের নিজেদের ইতিহাসই বলে, খাদ্য থাকলেই দুর্ভিক্ষ এড়ানো যায় না।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে অমর্ত্য সেনের গবেষণা অর্থনীতির ইতিহাসে একটি মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তিনি দেখিয়েছিলেন, সে বছর মাথাপিছু খাদ্যশস্যের সরবরাহ আগের কয়েক বছরের চেয়ে কম ছিল না। মানুষ মরেছিল অন্য কারণে: বন্যায় গ্রামের কাজ হারিয়ে কৃষিশ্রমিকের আয় থেমে গিয়েছিল, চালের দাম লাফিয়ে বেড়েছিল, মজুদদারি ছিল আর বিদেশ থেকে খাদ্যসাহায্যের চালান আটকে গিয়েছিল। দুর্ভিক্ষ এসেছিল খাদ্যের অভাবে নয়; খাদ্য কেনার সামর্থ্য ভেঙে পড়ায় আর নীতিগত ব্যর্থতায়। আজকের প্রশ্নটিও তাই ভিন্ন, বাংলাদেশে চাল ফুরিয়ে যাবে কি না, তা নয়; সাধারণ মানুষের চাল কেনার সামর্থ্য টিকে থাকবে কি না।
প্রথমে শক্তির জায়গাটা দেখা যাক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রাক্কলন অনুযায়ী, এ বছর দেশে ধান উৎপাদন হবে প্রায় ৬ কোটি ১৯ লাখ টন, যা গত চার বছরের গড়ের চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। বোরো ফলন গত বছরের রেকর্ডের কাছাকাছি ছিল আর চাল আমদানি গত বছরের ১৯ লাখ টন থেকে এ বছর ৮ লাখ টনে নামবে বলে এফএওর ধারণা। এপ্রিলে সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ১৯ লাখ ২০ হাজার টন; সরকারের নিজের নির্ধারিত নিরাপদ সীমা ১৩ লাখ ৫০ হাজার টনের বেশ ওপরে।
১৯৭৪ সালের বাংলাদেশের সঙ্গে আজকের বাংলাদেশের মূল পার্থক্য এখানেই। দেশ এখন নিজের চালের প্রায় পুরোটাই নিজে উৎপাদন করে; গ্রামীণ সড়ক ও বাজারের নেটওয়ার্ক খাদ্যকে দ্রুত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যেতে পারে আর খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস), খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও ভিজিএফের মতো সামাজিক সুরক্ষার একটি কাঠামো অন্তত আছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও দীর্ঘ ও পরীক্ষিত।
কিন্তু এই উৎপাদন দাঁড়িয়ে আছে এমন কিছু উপকরণের ওপর, যার প্রায় সবগুলোই আমদানিনির্ভর। আর সেখানেই একসঙ্গে চারটি ধাক্কা লাগছে। প্রথম ধাক্কা জ্বালানির। দেশের বিদ্যুতের চল্লিশ শতাংশের বেশি আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে আর এক সময় সেই এলএনজির প্রায় পুরোটাই আসত কাতার থেকে। যুদ্ধের আগে এশিয়ার স্পট বাজারে এলএনজির দাম ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ১০ ডলার; সেপ্টেম্বরে তা ৩০ ডলারের কাছে উঠেছে। ডিজেলের দাম ফেব্রুয়ারির ১০০ টাকা থেকে দুই দফায় বেড়ে এখন লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের হিসাবে, দেশের ১৬ লাখ ৫০ হাজার প্রধান সেচপাম্পের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার চলে ডিজেলে। অর্থাৎ ডিজেলের দাম মানে সরাসরি ধানের উৎপাদন খরচ।
দ্বিতীয় ধাক্কা সারের। বাংলাদেশ তার ব্যবহৃত সারের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ আমদানি করে, যার এক—চতুর্থাংশ থেকে এক—তৃতীয়াংশ আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। দেশের ইউরিয়া কারখানাগুলো গ্যাসনির্ভর এবং এ বছর গ্যাস সংকটে একাধিকবার সেগুলো বন্ধ রাখতে হয়েছে। বিশ্বব্যাংক এ বছর সারের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বাড়বে বলে প্রাক্কলন করেছে। দেশে সারের প্রায় তিন—চতুর্থাংশ যায় ধানে আর বোরো রোপণ শুরু হবে ডিসেম্বর—জানুয়ারিতে। আগামী তিন—চার মাসে সার ও ডিজেল কতটা পাওয়া যায় আর কত দামে, তার ওপরই নির্ভর করছে ২০২৭ সালের সবচেয়ে বড় ফসল।
তৃতীয় ধাক্কা জলবায়ুর। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, চলমান এল নিনো ‘খুব শক্তিশালী’ হয়ে ২০২৬ সালের শেষে শীর্ষে পৌঁছাবে এবং এর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়াবে। এর মধ্যেই ভারতে ২০০৯ সালের পর সবচেয়ে দুর্বল বর্ষা হয়েছে; বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ কম। মার্কিন কৃষি বিভাগ ভারতের চাল উৎপাদন ৭০ লাখ টন কমার প্রাক্কলন করছে। ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় চাল রপ্তানিকারক এবং ২০২৩ সালে অভ্যন্তরীণ দাম নিয়ন্ত্রণে চাল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ দিয়েছিল। ঘাটতি গভীর হলে এবারও তার পুনরাবৃত্তির শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হিসাবে, এল নিনো ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বে অন্তত ৪ কোটি ৯০ লাখ মানুষকে নতুন করে তীব্র ক্ষুধার মুখে ফেলতে পারে।
চতুর্থ ধাক্কা বিশ্ববাজারের। সেপ্টেম্বরে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ফাও’র খাদ্যমূল্য সূচক ১৩৬ পয়েন্টে উঠেছে, যা এক বছর আগের চেয়ে ৫.৮ শতাংশ বেশি; দানাদার খাদ্যের সূচক বেড়েছে ১৭.২ শতাংশ। ফাও এর কারণ হিসেবে হরমুজ ও কৃষ্ণসাগরে পরিবহন বিঘ্ন আর আবহাওয়াজনিত উৎপাদন শঙ্কাকে দায়ী করেছে। সংস্থাটির প্রধান অর্থনীতিবিদ একে বলছেন ‘ক্রমে বিস্তৃত হওয়া মূল্যচাপ।’ গম, ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনির জন্য বাংলাদেশ আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে এই দাম সরাসরি ঘরের বাজারে এসে পৌঁছাবে।
এই চার ধাক্কা এসে পড়ছে এমন এক সময়ে, যখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আগে থেকে দুর্বল। সরকার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর যৌথ আইপিসি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মে থেকে আগস্টে দেশে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ছিল। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরে এই সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৮১ লাখে দাঁড়াবে বলে প্রাক্কলন, যার প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার থাকবে জরুরি অবস্থায়। দুর্ভিক্ষের ধাপে কেউ নেই, কিন্তু দিকটি স্পষ্ট।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গত বছরের এক জরিপ বলছে, দেশের ৬২ শতাংশ পরিবার আয়ের অন্তত অর্ধেক খরচ করে খাবারে। এমন পরিবারে চালের দাম দশ—পনেরো শতাংশ বাড়লে প্রথমে কমে মাছ, ডিম, দুধ; তারপর কমে সন্তানের স্কুলের খরচ, চিকিৎসা; তারপর বিক্রি হয় হাঁস—মুরগি, জমি। ২০০৮ সালে বিশ্ববাজারে চালের দাম কয়েক মাসে টনপ্রতি প্রায় ৩০০ ডলার থেকে ১,০০০ ডলার ছাড়িয়েছিল আর দেশে চালের দাম বেড়েছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ। সে বছর দুর্ভিক্ষ হয়নি; তবে লাখো পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গিয়েছিল।
আয়ের দিকটিও চাপে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে নিটওয়্যার কারখানাগুলোর এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৮ শতাংশ কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে এবং ৫৫ শতাংশ কারখানার ক্রেতা অর্ডার বাতিল বা কমিয়েছে। সানেমের একটি মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণ বলছে, জ্বালানির দাম, পরিবহন বিঘ্ন ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রবাসী আয় কমার সম্মিলিত প্রভাবে জিডিপি প্রায় ৩ শতাংশ কমতে পারে। পোশাকশ্রমিক আর প্রবাসীর পরিবার—এ দুই গোষ্ঠীই গত দুই দশকে গ্রামীণ দারিদ্র্য কমানোর মূল কারিগর। এখন দুটিই একসঙ্গে ঝুঁকিতে।
সবশেষে রাষ্ট্রের নিজের সামর্থ্যের প্রশ্ন। জ্বালানি, সার আর খাদ্য আমদানির জন্য ডলার লাগে। আর সেই ডলারের ওপর এখন বহুমুখী টান। চলতি অর্থবছরে শুধু বৈদেশিক ঋণের কিস্তি প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন ডলার আর অক্টোবরের শুরুতে জ্বালানি আমদানির জন্যই ছয় মাস মেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণ নিতে হয়েছে। অথচ চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৬ শতাংশ কমানো হয়। অর্থাৎ যখন সুরক্ষাবলয়ের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, ঠিক তখনই তার জন্য রাখা অর্থ কমেছে।
তাহলে করণীয় কী? প্রথম অগ্রাধিকার আগামী বোরো মৌসুম। ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত কৃষকের হাতে সার ও সেচের ডিজেল পৌঁছানোর নিশ্চয়তা আজই দরকার। উপসাগরের বাইরের উৎস থেকে সার আমদানি চুক্তি, ইউরিয়া কারখানার জন্য গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার আর সেচ মৌসুমে কৃষিতে বিদ্যুৎ ও ডিজেলের সুরক্ষিত বরাদ্দ চাই। এখানে এক টন সার কিংবা এক লিটার ডিজেলের ঘাটতির দাম পরে কয়েক গুণ বেশি দিতে হবে চাল আমদানিতে।
দ্বিতীয়ত, আমদানির পরিকল্পনা আগাম করা। ভারত রপ্তানি সীমিত করলে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানের চালের দাম একসঙ্গে বাড়বে আর তখন কিনতে গেলে সবচেয়ে বেশি দাম দিতে হবে—যার ডলার সবচেয়ে কম, তাকেই। সরকারে সরকারে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি আর মজুতকে নিরাপদ সীমার ওপরে ধরে রাখা এখনই শুরু হওয়া উচিত। ২০০৮ সালে যারা আগে কিনেছিল, তারাই কম দামে পেয়েছিল।
তৃতীয়ত, সুরক্ষাবলয়কে সংকোচন নয়, সম্প্রসারণ করা। ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতা বাড়ানো আর দিনমজুর, পোশাকশ্রমিক ও ফেরত আসা প্রবাসীর পরিবারকে লক্ষ্য করে নগদ সহায়তা দেওয়া দুর্ভিক্ষ ঠেকানোর সবচেয়ে সহজ উপায়। অমর্ত্য সেন যা বলেছিলেন, তার মূলকথাও এটি: বাজারে খাবার থাকলেই হবে না; মানুষের হাতে কেনার উপায় থাকতে হবে। একই সঙ্গে বাজার তদারকি জোরদার করা দরকার, কারণ অনিশ্চয়তার সময়ে মজুদদারিই দামকে সবচেয়ে দ্রুত উসকে দেয়, যেমনটা ১৯৭৪ সালে হয়েছিল।
চতুর্থত, এল নিনোর জন্য আগাম প্রস্তুতি। খরা ও তাপপ্রবাহ সহিষ্ণু জাতের বীজ বিতরণ, উত্তরাঞ্চলে সেচের পানির পরিকল্পনা আর আগাম সতর্কবার্তা কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া, যাতে আবহাওয়ার ধাক্কাটি হঠাৎ আসা বিপর্যয় না হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দুর্ভিক্ষের যে সংজ্ঞা—আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে বাংলাদেশের সেই পরিণতিতে পৌঁছানোর শঙ্কা হয়তো কম। কিন্তু ক্ষুধা আসছে, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ কম; বরং তা ইতিমধ্যেই এসে গেছে। প্রায় দুই কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে; অথচ জ্বালানি, সার ও আবহাওয়ার ধাক্কা এখনও শীর্ষে পৌঁছায়নি। এই ক্ষুধা আকালের ছবির মতো দৃশ্যমান হবে না; দেখা দেবে থালায় কমে যাওয়া মাছ—ডিমে, স্কুল ছেড়ে কাজে নামা শিশুতে, বিক্রি হয়ে যাওয়া গবাদিপশু আর জমিতে—নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া পরিবারগুলোতে।
আগামী ছয় মাসের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, এই ক্ষুধা একটি কঠিন বছরে সীমাবদ্ধ থাকবে; নাকি দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অসন্তোষের দীর্ঘ অধ্যায়ের সূচনা করবে।
—মুরাদ কিবরিয়া: লেখক ও চার্টার্ড একাউন্টেন্ট
