কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প— শেষ পর্ব আমার মুদ্রা সংগ্রহের ভেতরের কথা || আখতার আহমেদ রাশা নিউজার্সি
কাগজের এক টুকরো নোট যে কতটা জীবন্ত ইতিহাস বুকে বয়ে বেড়াতে পারে, বিগত ২০টি পর্ব ধরে আমরা সেই রোমাঞ্চকর যাত্রারই সাক্ষী হয়েছি। চিনেছি দেশ—বিদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আর পৃথিবীর বুক রাঙিয়ে যাওয়া কালজয়ী মানুষদের। বিগত ২০টি পর্বে আমি আমার নিজের সংগ্রহে থাকা ব্যাংকনোটগুলোর নানা দিক নিয়ে সাধ্যমতো গবেষণা করেছি এবং অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোয় আপনাদের সামনে সেই অজানা ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আজ এই সমাপনী পর্বে এসে পেছনে তাকালে নিজের অজান্তেই বুকের ভেতর এক দীর্ঘশ্বাস জেগে ওঠে; স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে আজ থেকে সাড়ে তিন দশক আগের কথা। অনেকেই হয়তো ভাবেন, এত বিপুল পরিমাণ বিশ্ব—মুদ্রার এই রাজকীয় সংগ্রহ আমি কীভাবে গড়ে তুললাম? আজ সেই শুরুর রূপকথাটাই বলি।
আমার এই মুদ্রা সংগ্রহের (ঘড়ঃধঢ়যরষু) নেশাটি কিন্তু আমেরিকায় এসে শুরু হয়নি। এর বীজ বোনা হয়েছিল আমার চাকরি জীবনে, যখন আমি চট্টগ্রামে ছিলাম। তখন আমার সংগ্রহে ছিল হাতে গোনা মাত্র ৮ থেকে ১০টি বিভিন্ন দেশের নোট। সেই সামান্য কটি নোটই আমার কাছে ছিল রূপকথার আলাদিনের প্রদীপের মতো, যার গায়ে হাত দিলেই অচেনা কোনো দেশের সুবাস পেতাম।
আজ আমি দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে সপরিবারে আমেরিকায় প্রবাসী। আমার এই ক্ষুদ্র সংগ্রহটি বিশাল রূপ নিয়েছে মূলত এই প্রবাস জীবনে আসার পরেই। আমেরিকা এমন এক মেল্টিং পট যেখানে পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষের আনাগোনা। এই সুযোগটি আমি হাতছাড়া করিনি। এখানে যখনই বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে, কুশল বিনিময়ের পরেই আমার আবদার থাকতÑ ‘তোমার দেশের একটা নোট আমাকে দেবে?’ অনেকেই আমার এই পাগলামি দেখে হেসেছেন, আবার পরম মমতায় পকেট থেকে বের করে দিয়েছেন নিজের মাতৃভূমির এক টুকরো স্মারক।
আমার এই বিশাল সংগ্রহ গড়ার পেছনে আমার আত্মীয়—স্বজন ও বন্ধুদের অবদান অনস্বীকার্য। পরিচিত বা কাছের মানুষজন যখনই কোনো ভিন্ন দেশের ব্যাংকনোটের খবর পেতেন পরম মমতায় সেটি আমার জন্য তুলে রাখতেন। একটা সময় এই মুদ্রার নেশায় আমি এতটাই বুঁদ বা ‘ক্রেজি’ ছিলাম যে, সপ্তাহান্তে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যা আয় করতাম তার সিংহভাগই ঢেলে দিতাম নতুন কোনো দুর্লভ ব্যাংকনোট কেনার পেছনে! আর এই গোপন ‘অর্থনৈতিক বিপ্লব’—এর খবরটি গিন্নির কাছে সযত্নে লুকিয়ে রাখতে হতো। পরম আদরের সেই নতুন নোটটি গিন্নির চোখ ফাঁকি দিয়ে যখন চোরের মতো অতি সাবধানে অ্যালবামে গিয়ে উঠত, সেই রোমাঞ্চের যেন কোনো তুলনা ছিল না।
তাছাড়া উইকএন্ডে বিভিন্ন ফ্লি—মার্কেটে (ঋষবধ গধৎশবঃ) ঘুরে ধুলোবালি আর জং—ধরা বাক্সের ভেতর থেকে মুদ্রা খুঁজে বের করা ছিল আমার নিয়মিত এক অন্যরকম অভিযান। একবার তো বাজার থেকে কেনা ধুলোমাখা এক পুরনো বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে তার ভাঁজে হঠাৎ আবিষ্কার করলাম চমৎকার একটি নোট! জীর্ণ মলাট আর ধুলোমাখা সেই বইয়ের হলদেটে পাতার ভাঁজ থেকে হঠাৎ লুকিয়ে থাকা নোটটি খুঁজে পাওয়ার আনন্দ ছিল কোটি টাকার লটারি পাওয়ার চেয়েও মধুর। ধুলোমাখা সেই প্রাচীন কাগজের টুকরোটি হাতে নিয়ে সেদিন যে অনাবিল প্রশান্তি পেয়েছিলাম তা একজন প্রকৃত সংগ্রাহক ছাড়া আর কারও পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
প্রবাস জীবনের শুরুর দিনগুলোর কথা মনে হলে এখনো রোমাঞ্চ অনুভব করি। তখন সবেমাত্র আমেরিকায় পা রেখেছি। টিকে থাকার লড়াইয়ে গভীর রাতে একটি দোকানে কাজ করতাম যেখানে মদও বিক্রি হতো। আইন অনুযায়ী রাত ১০ টার পর মদ বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। একদিন রাত তখন ২টা। কাউন্টারে একা বসে আছি। হঠাৎ এক স্প্যানিশ ভদ্রমহিলা এসে হাজির। তিনি একটি মদের বোতল কেনার জন্য ভীষণ জোরাজুরি শুরু করলেন। কিন্তু আমি তো আইন ভাঙতে পারি না। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে আমার নজর গেল তাঁর হাতের দিকে। তাঁর হাতে গোঁজা ছিল বড় অঙ্কের বেশ কয়েকটি নীল—বেগুনি রঙের অস্ট্রিয়ান ব্যাংকনোট!
আমার ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা সংগ্রাহক সত্তাটি তখন যেন ঝুঁকি নেওয়ার জন্য ছটফট করে উঠল। আমি তাঁকে বললাম, ‘আমি তোমাকে মদের বোতলটি দিতে রাজি আছি, তবে শর্ত একটিই—তোমার হাতের ওখান থেকে আমাকে একটি নোট দিতে হবে। মহিলা এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলেন এবং খুশি হয়ে আমাকে একটির জায়গায় দুটি বড় অঙ্কের নোট দিয়ে দিলেন। পরে যখন একটু খোঁজখবর নিলাম, তখন জানতে পারলাম ওই নোটগুলো ছিল ১৯৮৩ সালের অস্ট্রিয়ান ১০০০ সিলিং (১০০০ ংপযরষষরহম) ব্যাংকনোট। নোটটির একপাশে জ্বলজ্বল করছে বিখ্যাত নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আরউইন শ্রোডিঞ্জার (ঊৎরিহ ঝপযৎস্খফরহমবৎ)—এর ছবি আর অপর পিঠে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে অস্ট্রিয়া যোগ দেওয়ার আগে ওগুলোর আর্থিক মূল্য ছিল অনেক বেশি। কোনো এক ধনী অস্ট্রিয়ান ভদ্রলোকের সাথে রাত কাটানোর পর ভদ্রমহিলা সম্ভবত সেগুলো চুরি করেছিলেন। আইনের চোখে ঘটনাটি হয়তো প্রশ্নবিদ্ধ, কিন্তু একজন সংগ্রাহকের জীবনে এমন কত শত বিচিত্র ও রোমাঞ্চকর ঘটনার জন্ম হয় যার হিসাব রাখা কঠিন!
আজকের বদলে যাওয়া পৃথিবীর দিকে তাকালে এক অদ্ভুত বাস্তবতা চোখে পড়ে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করে দিলেও কিছু ঐতিহ্যকে যেন কেড়ে নিচ্ছে। বিশ্বজুড়েই এখন কাগজের ব্যাংকনোটের ব্যবহার দিন দিন কমে যাচ্ছে। ক্রেডিট কার্ড, অনলাইন পেমেন্ট বা ডিজিটাল ওয়ালেটের দাপটে মানুষ আর আগের মতো পকেটে কাগজের মুদ্রা বয়ে বেড়াতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। হয়তো আর কয়েক দশকের মধ্যে এই ব্যাংকনোটগুলো জাদুঘরের শোকেসে ঠাঁই করে নেবে। মানুষ যখন আর সশরীরে কাগজের নোট ছুঁয়ে দেখবে না, তখন আমাদের মতো সংগ্রাহকদের জমানো এই অ্যালবামগুলোই হয়ে উঠবে একেকটি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের মহাসমুদ্র।
আজকের তরুণ সংগ্রাহক বা যারা এই অনন্য শখটি শুরু করতে চান, তাদের উদ্দেশে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ছোট্ট কিছু পরামর্শ দিতে চাই:
শুরুতেই আপনাকে অনেক টাকা খরচ করে দামী নোট কিনতে হবে না। আপনার শুরুটা হতে পারে আমার মতোই, হাতে গোনা ৫—১০টি সাধারণ নোট দিয়ে। বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া কিংবা নিজের জমানো নোটই হতে পারে আপনার প্রথম সংগ্রহ। কাগজের নোটের প্রধান শত্রু হলো আলো, আর্দ্রতা আর ভাঁজ। তাই সবসময় চেষ্টা করবেন নোটগুলো পিভিসি—মুক্ত (চঠঈ—ভৎবব) বিশেষ অ্যালবাম বা স্লিভে ফ্ল্যাট করে রাখতে। কখনোই নোটে আঠা বা সেলোটেপ ব্যবহার করবেন না, কিংবা ধুয়ে ইস্ত্রি করার চেষ্টা করবেন নাÑএতে নোটের ঐতিহাসিক ও আর্থিক মূল্য চিরতরে হারিয়ে যায়। এখন ইন্টারনেটের যুগে অনেক জাল বা নকল নোটের ব্যবসা চলে। তাই কোনো দামী বা ঐতিহাসিক নোট কেনার আগে নির্ভরযোগ্য ডিলার বা লাইসেন্সড ফোরামের সাহায্য নিন।
কাগজের নোট হলো মানুষের তৈরি সভ্যতার এক একটি ছোট ‘টাইম ক্যাপসুল’। দীর্ঘ ২০টি পর্ব ধরে যারা আমার এই কাগুজে ক্যানভাসের বিশ্বভ্রমণে সহযাত্রী ছিলেন, তাদের সবাইকে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ডিজিটাল দুনিয়ায় কাগজের নোট হারিয়ে গেলেও, ইতিহাসের যে গল্পগুলো তারা বহন করে চলেছে, তা চিরকাল অমলিন থাকবে। আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের সংগৃহীত নোটগুলোর দিকে তাকালে মনে হয় পুরো পৃথিবীটা আমার অ্যালবামের পাতায় শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। হয়তো এই লেখাটি পড়ার পর আপনার নিজের পকেটে থাকা কোনো সাধারণ নোটের দিকেও আপনি আজ নতুন চোখে তাকাবেন।
কে বলতে পারে, হয়তো আজ থেকেই শুরু হবে আপনার নিজের এক নতুন বিশ্বভ্রমণের গল্প! (শেষ)
