গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— একুশ নিভৃত সুরের মহাসিন্ধুশিল্পী ও সুরকার কৃষ্ণচন্দ্র দে
জীবন বিশ^াসঃ চোখের সামনে যখন পার্থিব আলো একমুহূর্তে নিভে যায়, তখন অধিকাংশ মানুষই সেই নিশ্ছিদ্র অমানিশায় পথ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু কিছু দুর্লভ প্রাণ থাকেন, যাঁরা সেই অন্ধকারের গহিন থেকেই বানিয়ে নেন এক অলৌকিক সুরের রাজপ্রাসাদ। ক্যানভাস থেকে রং ছিটকে গেলে ছবি আঁকা হয়তো বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু চোখের জ্যোতি হারানোর পর যিনি নিছক স্পন্দন ও নিঃশ্বাসের ব্যাকরণে এক স্বতন্ত্র মহাসিন্ধু নির্মাণ করেন, তিনি সাধারণ গায়ক ননÑতিনি এক চিরন্তন সাংগীতিক দ্রষ্টা। সুর কখনোই তাঁর কাছে শুধুমাত্র প্রথাগত স্বরগ্রামের চাতুরি ছিল না বরং তা ছিল মহাবিশ্বের নীরবতার সঙ্গে আত্মার গভীর কথোপকথন। তিনি যখন তাঁর উদাত্ত কণ্ঠ সুরের সরোবরে ডুবিয়ে দিতেন, তখন বাইরের দৃশ্যমান রঙ ও রূপের জগৎ ফিকে হয়ে যেত, আর শ্রোতার চোখের সামনে খুলে যেত এক অপূর্ব অন্তর্দৃষ্টির দুয়ার, যেখানে রাগসংগীতের গাম্ভীর্য, বৈষ্ণব মার্গের অশ্রুসজল আকুলতা এবং নাট্যাভিনয়ের অমলিন ট্র্যাজেডি মিলেমিশে এক পরম আধ্যাত্মিক সত্যের জয়গান গাইত। সেই উদাত্ত কণ্ঠের শিল্পী আর কেউ নন, তিনি সুরকার কৃষ্ণচন্দ্র দে। বাংলা গানের আরেক মহারথী ভ্রাতুষ্পুত্র ও শিষ্য মান্না দে’কে তিনিই সংগীতের প্রথম পাঠ দিয়েছিলেন। বাংলা গানের আরেক দিকপাল শচীন দেব বর্মণও শিষ্য হিসেবে দীর্ঘদিন কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কাছে সংগীতের তালিম নিয়েছেন।
১৮৯৩ সালের ২৪ আগস্ট কলকাতার এক সংস্কৃতিমান পরিবারে কৃষ্ণচন্দ্র দে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শিবচন্দ্র দে ও মাতা রত্নমালা দেবীর এই সুযোগ্য সন্তান মাত্র ১৩—১৪ বছর বয়সে এক মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে নিজের পরম মূল্যবান চোখের দৃষ্টি চিরতরে হারিয়ে ফেলেন। তবে এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর ভেতরের সুরের আলো নেভাতে পারেনি, বরং তা যেন তাঁকে স্বর ও শব্দসাধনার এক গভীর উপাসনায় অলৌকিক স্থিরতা এনে দিয়েছিল। দীর্ঘ সাড়ে ছয় দশকের একনিষ্ঠ সুরসাধনা শেষে ১৯৬২ সালের ২৮ নভেম্বর এই মহান কণ্ঠসাধক কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সাংগীতিক জীবন মূলত এই চিরন্তন সত্যকেই তুলে ধরে যে, বাহ্যিক আলো নিভে গেলেও অন্তরের আত্মিক তেজ যদি খাঁটি হয়, তবে মানুষ নিজেই নিজের আঁধারের ভেতর এক অবিনাশী বাতিঘর হয়ে উঠতে পারে। তিনি ছিলেন বাংলা সংগীতের এক অনন্য বাতিঘর।
ওস্তাদদের গুরুগৃহ, তালিম ও বৈষ্ণব কীর্তনের পরশ
কৈশোরের সেই করুণ অমানিশার পর সংগীতই হয়ে উঠেছিল তাঁর অস্তিত্বের একমাত্র আশ্রয়। একবার যেকোনো গান বা দুরূহ তান শোনামাত্র তা হুবহু নিজের স্মৃতিতে গেঁথে নেওয়ার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। প্রথাগত তালিমের সূচনায় তিনি খেয়ালের দীক্ষা নেন শশীভূষণ দে—র কাছে, আর টপ্পার সূক্ষ¥ মিড় ও গমকের জটিল কাজগুলো আয়ত্ত করেন সতীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। পরবর্তীতে ওস্তাদ কেরামতুল্লা খান, ওস্তাদ বাদল খান, ওস্তাদ দবির খান, ওস্তাদ জমিরউদ্দিন খান এবং মহেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মতো ভারতীয় মার্গসংগীতের শীর্ষ—ওস্তাদদের ছায়াতলে থেকে তাঁর কণ্ঠ নিখুঁত দুর্গের রূপ নেয়। পরবর্তীতে রাধারমণ দাসের কাছে কীর্তনের নিবিড় তালিম গ্রহণ তাঁর গায়কিকে দিয়েছিল একদম ভিন্ন এক আধ্যাত্মিক মাত্রা। তিনি বুঝেছিলেন, ক্লাসিক্যাল রাগের শক্ত কাঠামোর ভেতর যদি মাটির টান, বাণীর সরল ব্যাকুলতার সজল অশ্রু না মেশানো যায়, তবে তা বাঙালির নিভৃত হৃদয় স্পর্শ করতে পারবে না।
প্রথম রেকর্ড, থিয়েটারের মঞ্চ ও অনন্য সাংগীতিক শৃঙ্খলা
মাত্র আঠারো বছর বয়সে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড। ‘আর চলে না চলে না মাগো’ এবং ‘মা তোর মুখ দেখে কি’—এই গান দুটির মাধ্যমে সংগীতপ্রেমীদের দরবারে তাঁর যে দ্যুতিময় প্রবেশ ঘটেছিল, তা পরবর্তীতে এক প্রকাণ্ড মহীরুহে পরিণত হয়। ১৯২৪ সালে নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ীর আমন্ত্রণে অ্যালফ্রেড থিয়েটারে ‘বসন্তলীলা’ নাটকের মাধ্যমে তাঁর থিয়েটার যাত্রার সূচনা ঘটে। পরবর্তীতে ‘সীতা’ নাটকে তাঁর গাওয়া ‘অন্ধকারের অন্তরেতে অশ্রুবাদল ঝরে’ গানটি বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে মঞ্চসংগীতের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। চোখের জ্যোতি না থাকা সত্ত্বেও কাঠের তৈরি বিশাল মঞ্চের প্রতি ইঞ্চি পরিমাপ তিনি যেন নিজের ভেতরের অদৃশ্য স্কেল দিয়ে মেপে নিতে পারতেন। চরিত্র ও নাট্যমুহূর্তের সঙ্গে সুরের এমন নিখুঁত ও জীবন্ত মেলবন্ধন দর্শকমণ্ডলীকে বারবার অভিভূত করতÑবোঝা যেত, তাঁর দৃষ্টিহীনতা কখনোই কোনো দুর্বলতা ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল তাঁর শিল্পীসত্তার এক অতুলনীয় সাংগীতিক শৃঙ্খলা।
সবাক চলচ্চিত্রে সেলুলয়েডের জাদু ও সুর পরিচালনা
উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রের সবাক যুগের ভোরে কৃষ্ণচন্দ্র দেÑযাঁকে ভারতবর্ষের সংগীতজগত মূলত কে. সি. দে নামেই চেনেÑছিলেন চলচ্চিত্রের গান ও সুরের প্রধান রূপকার। দেবকী বসুর কালজয়ী ‘চণ্ডীদাস’ চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠে ‘সেই যে বাঁশি বাজিয়েছিলে’, ‘ফিরে চল আপন ঘরে’, ‘শতেক বরষ পরে’ এবং ‘ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না বধূ’ গানগুলো সেলুলয়েডের জগতে এক নতুন স্বর্ণযুগ নিয়ে আসে। পরবর্তীতে ‘ভাগ্যচক্র’, ‘দেবদাস’, ‘গৃহদাহ’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘চাণক্য’, ‘আলোছায়া’ এবং ‘পূরবী’—র মতো বিখ্যাত চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় ও সুরের বহুমুখী প্রকাশ তৎকালীন ভারতীয় চলচ্চিত্রসংগীতকে বিশাল গভীরতা দিয়েছিল। বিশেষ করে ‘পূরবী’ ছবিতে সুরকারের দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রমাণ করেন যে, ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, ঠুংরি ও লোকসংগীতের প্রাচীর ভেঙে কীভাবে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর মতো এক সাবলীল ও মননশীল সাংগীতিক সেতু নির্মাণ করা যায়।
স্বদেশী আন্দোলনের বহ্নিশিখা ও পরবর্তী প্রজন্মের আলোকবর্তিকা
তাঁর কণ্ঠে দেশাত্মবোধের আগুন জ্বলত ঠিক ততটাই প্রদীপ্ত হয়ে, যতটা শান্ত ও সমাহিত আলো জ্বলত তাঁর বৈষ্ণব কীর্তনের বাণীতে। ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ গানটি কেবল একটি স্বদেশী গীতি ছিল না; তা ছিল পরাধীন ভারতের মুক্তিকামী যুবকদের পরম আত্মোৎসর্গের এক শাশ্বত রণধ্বনি। তবে তিনি কেবল নিজের একক গায়কীতেই বন্দি থাকেননি; একজন পথপ্রদর্শক শিক্ষক হিসেবে তিনি রচনা করেছিলেন এক ঐতিহাসিক সাংগীতিক সাম্রাজ্য। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে শচীন দেব বর্মণ তাঁর গুরু কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কাছে সুরের সূক্ষ¥ কারুকাজ শেখেন। আর তাঁরই স্নেহের ভ্রাতুষ্পুত্র প্রবোধচন্দ্র দেÑযাঁকে সংগীত—বিশ্ব মান্না দে নামে শ্রদ্ধা জানায়, কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে—র কাছেই লাভ করেছিলেন শাস্ত্রীয় সুরের জ্যামিতিক নিয়মকানুন নিখুঁতভাবে, শুদ্ধ শব্দোচ্চারণ ও বাণীর ভাবকে মর্যাদা দেওয়ার পরম দীক্ষা।
কৃষ্ণচন্দ্র দে—র গাওয়া কয়েকটি বিখ্যাত গান
বাংলা সংগীতের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করা কৃষ্ণচন্দ্র দে—র গাওয়া ইতিহাসপ্রসিদ্ধ কয়েকটি কালজয়ী গানের তালিকা নিচে উল্লেখ করা হলো:
১। ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে, ২। মুক্তির মন্দির সোপানতলে, ৩। অন্ধকারের অন্তরেতে অশ্রুবাদল ঝরে, ৪। সেই যে বাঁশি বাজিয়েছিলে, ৫। ফিরে চল আপন ঘরে, ৬। শতেক বরষ পরে, ৭। ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না বধূ, ৮। জয় সীতাপতি সুন্দর তনু, ৯। ঘন তমসাবৃত অম্বর ধরণী, ১০। মেঘ হেরি নীল গগনে, ১১। ঘন ডম্বরু বাজে, ১২। স্বপন যদি মধুর এমন, ১৩। আজ অবেলায় কলসি নিয়ে, ১৪। আঁধারে ডম্বরু তলে, ১৫। যে আকাশে ঝরে বাদল, ১৬। ও দিকে নিমাই চলে, ১৭। হিয়ায় রাখিতে যে পরশমণি, ১৮। রাধে বুঝাও আমারে কেন গো মলিন, ১৯। কুঞ্জ সাজায়ে দিল, ২০। বলি শুনো হে মথুরারাজ, ২১। ও তুই সকালে চলিলি যমুনা সিনানে, ২২। বধূ চরণ ধরে বারণ করি, ২৩। মেঘমেদুর ঘনছায়ে আসিলে কি, ২৪। ওগো যামিনী তুমি দীঘল হয়ো, ২৫। তুমি গো বহ্নিশিখা আমি পতঙ্গসম।
পরিশেষ
কৃষ্ণচন্দ্র দে—কে কেবল অতীত শতকের একজন সফল শিল্পী হিসেবে গণ্ডিবদ্ধ করা সমীচীন নয়, তিনি মূলত বাংলা সংগীতের আকাশমণ্ডলে এক অমলিন উজ্জ্বল বাতিঘর। দৈহিক আলোর বিনাশ ঘটলে মানুষের অন্তরের যে অলৌকিক জগত জাগ্রত হয়Ñতিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে সেই অন্তরালোকে সুরের মুখোমুখি বসতে হয়। তাঁর কণ্ঠে রাগসংগীতের কাঠিন্য কখনো ব্যাকরণের শুষ্কতায় পরিণত হয়নি, আবার অনুভূতির প্রাবল্য কখনো সুরের শৃঙ্খলা বিনষ্ট করেনি। থিয়েটারের আলোছায়ার মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রের সেলুলয়েড, আর নিভৃত ভজনালয় থেকে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম—সর্বত্রই তাঁর সুর ছিল এক অনাবিল শক্তির আধার। চোখ বন্ধ করে তাঁর গান শুনলে আজও অনুভব করা যায়, মানুষের বাহ্যিক দৃষ্টি কত ক্ষণস্থায়ী কিন্তু গানের সুর কতটা দীর্ঘস্থায়ী। শিল্পী ও সুরকার কৃষ্ণচন্দ্র দে চোখের আলো হারিয়েও আত্মার গভীরে সুরের মহাসিন্ধু ধারণ করেছিলেন, তিনি নিঃসন্দেহে বাংলা আধুনিক গানের একজন অমর দ্রষ্টা।
