গণ—আন্দোলন, নাকি মেটিকুলাস ডিজাইন? মাসুদ কামাল

দুই বছর পর এসে পেছন ফিরে তাকানো তেমন জটিল কোনো কাজ নয়। যে কেউ সেটা পারে, সবকিছু পরিষ্কার মনে করা যায়। উপলব্ধি করা যায়, কেন কোথায় কী হয়েছিল। কিন্তু ঘটনাটা যদি হয় জুলাই আন্দোলন, যার মাধ্যমে একটা প্রবল পরাক্রম স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়েছিল, তাহলে বিষয়টা আর অত সহজ থাকে না। কারণ, এমন বিপুল একটা কর্মযজ্ঞের অনেকগুলো ডাইমেনশন থাকে। কিছুদিন পরপর একএকটা কাজের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা বের হয়ে আসে। একসময় যে কাজকে খুবই সহজ কিংবা স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয়েছিল, একদেড় বছর পর এসে জানা যায়, সেইসহজাতঘটনাটির পেছনেও ছিল বিশাল এক পরিকল্পনা।

২০২৪এর আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটল। সেপ্টেম্বরেই নতুন সরকারপ্রধান হিসেবে . ইউনূস গেলেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে। সেখানে অধিবেশনের ফাঁকে . ইউনূস যোগ দিলেন ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভের একটা অনুষ্ঠানে।

পুরো আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলেন মাহফুজ আলমকে! যোগাযোগ প্রযুক্তির এই যুগে দ্রুতই সব খবর চারদিকে ছড়িয়ে যায়। দেশে বসে আমরাও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সেটা জানতে পারলাম।

বুঝতে পারলাম না, মাহফুজ আলম মাস্টারমাইন্ড কীভাবে? এই আন্দোলনে তো আমরাও ছিলাম, পুরো জাতি ছিল। আমরা পুরো আন্দোলনকে স্বতঃস্ফূর্ত হিসেবেই জানতাম। মনে করতাম, শেখ হাসিনা সরকারের অপশাসনে এবং গণতন্ত্রহীনতায় দেশের মানুষ অনেক দিন ধরে ক্ষুব্ধ। সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণেই তাসের ঘরের মতো উড়ে গেছে সেই সরকার। সেখানে ছাত্রদের ভূমিকা যে ছিল না, তা নয়। সরকারি চাকরি পেতে, কোটা বাতিল করতে, তাদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সেখানে জনগণের ক্ষোভের বারুদে স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সেটাই মূল আন্দোলন ছিল না। মূল আন্দোলনটি করেছে জনগণ, সাধারণ মানুষ। সব শ্রেণিপেশার মানুষ তাতে অংশ নিয়েছিল। তাহলে সেখানেমাস্টারমাইন্ডএল কোথা থেকে? তাহলে কি . ইউনূস এই আন্দোলন সম্পর্কে তেমনভাবে ওয়াকিবহাল ছিলেন না? নাকি তিনি সব জানতেন, আমরাজনগণই পেছনের খবর বা পরিকল্পনার কথা কিছু জানতাম না?

সন্দেহগুলো আরও প্রবল হলো, যখন তিনি ওই সমাবেশেইমেটিকুলাস ডিজাইনকথাটি উচ্চারণ করলেন। তাঁর নিজের বক্তৃতায় তিনি সেখানে বললেন, ছাত্রজনতার এই আন্দোলন নাকি ছিলমেটিকুলাসলি ডিজাইনড!’ তো এই ডিজাইন কে করল? যুক্তরাষ্ট্র?

. ইউনূস? ছাত্ররা? জনগণ? হাসিনা সরকারের পতন চেয়েছিল অনেকেই। কিন্তু তাঁকে ফেলে দেওয়ার নীলনকশাটি করল কে? আমি নিয়ে ভেবেছি। সবই তো চোখের সামনে ঘটেছে। এত বেশি পুরোনো ঘটনাও নয় যে ভুলে যাব। তারপরও সেই সময়ের পত্রিকাগুলো উল্টেপাল্টে দেখেছি। আপনারাও সেগুলো দেখতে পারেন। আজকাল অনলাইনে পুরোনো পত্রপত্রিকা সহজে পাওয়া যায়। আন্দোলনে উত্তাল পুরো জুলাই মাসের পত্রপত্রিকা ঘাঁটলে কোথাও পাবেন না হাসিনা সরকার পতনের একটি দাবিও। ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে মনে হবে, যেন সরকার প্রথম দিকে এই আন্দোলনকে কোনো পাত্তাই দেয়নি। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হাসিনা সরকার একের পর এক সেই ভুলগুলোই ধারাবাহিকভাবে করেছে, যার প্রতিটিই আন্দোলনকারীদের পক্ষে গেছে। এসবের বিপরীতে পুরো জুলাই মাস তারা শুধু ওই সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়েই আন্দোলন করে গেছে।

এই কোটাবিরোধী আন্দোলনে সরকারের নাজেহাল হওয়ার ঘটনা কিন্তু নতুন কিছু নয়। এর আগে ২০১৮ সালেও একবার এই আন্দোলন হয়েছিল। সেবার নেতৃত্বে ছিলেন নুরুল হক নূর, রাশেদ খানএরা। সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণে রেখে সরকার আরও আগেই আপস আলোচনায় যেতে পারত। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভ আর অতি আত্মবিশ্বাস তাদের জন্য কাল হয়েছিল।

সরকার পতনের দাবি প্রথম উচ্চারিত হয় আগস্ট শনিবার। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বিশাল গণসমাবেশ থেকে শেখ হাসিনা তাঁর মন্ত্রিসভার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। আর এই দাবি আদায়ে আগস্ট থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। এর আগে তারিখে ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি, উত্তরাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবি করে স্লোগান উচ্চারিত হয়। তবে সেসব উচ্চারণ ছিল বিচ্ছিন্নভাবে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রথম আসে তারিখেই। ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলনে যেভাবে সব বিরোধী দল এবং সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততায় সরকার যে অনেকটাই পাজলড হয়ে গিয়েছিল, সেটা প্রথম টের পাওয়া যায় আগস্টের প্রথম দিনে। সেদিনই তারা জামায়াত শিবিরের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একদিকে এই কঠোরতা এবং বিপরীত দিকে ওই একই দিনে আটক ছয় ছাত্রনেতাকে রিমান্ড বাতিল করে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে সরকারের আপসকামী মনোভাবেরও প্রকাশ ঘটে।

লালনের একটা গানের কলি আছে, ‘সময় গেলে সাধন হবে না ক্ষেত্রেও তাই দেখা গেল। পৃথিবীর সব আন্দোলনেই এটা দেখা গেছে। আন্দোলনের চাপের মুখে সরকার যখন নমনীয় হয়েছে, আন্দোলনকারীরা তখন আরও বেগবান হয়েছে। অথচ এর অর্ধেক নমনীয়তা আগে দেখালে হয়তো আন্দোলনটি এই পর্যায়ে আসতই না। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে শাসকগোষ্ঠী প্রায়ই এই ভুল করে থাকে। হাসিনা সরকারও করেছে সেটা। আগস্টে এসে সরকার কিন্তু ছাত্রনেতাদের সঙ্গে একটা বৈঠকে বসার জন্য রীতিমতো কাকুতিমিনতি করতে থাকে। কিন্তু ছাত্ররা তা প্রত্যাখ্যান করে। তারা অটল থাকে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে। তখন আর কোটা বাতিলের দাবিটা মূল জায়গায় থাকে না। আসলে ছাত্রদের পক্ষে সরকারের অনুরোধে সাড়া দেওয়ার আর কোনো সুযোগও ছিল না। কারণ, জনগণের সম্পৃক্ততার কারণে আন্দোলনের যে বেগ তখন পেয়েছিল, সেটা থামানোর ক্ষমতা তখন আর হাতেই ছিল না। এটা বোঝা গিয়েছিল, ছাত্রনেতারা যখন ডিবি অফিসে বসে আন্দোলন থামানোর জন্য মুচলেকা দিয়েছিল, তখনই। তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করেছিল, কিন্তু সম্পূর্ণ অভাবিতভাবে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

এই যে সর্বগ্রাসী আন্দোলন, এখানে মেটিকুলাস ডিজাইনটা কোথায়? মাস্টারমাইন্ড মাহফুজ আলমের ভূমিকাটাইবা কীভাবে? আসলে রকম হয়। ঝড়ে বক মরলে ফকিরের কেরামতি বাড়ে। তবে বক না মরা পর্যন্ত ফকির সাহেব কিন্তু তাঁর কেরামতির কথা উচ্চারণের সাহস পান না। ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। সরকার পতনের পর জনগণের আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফকির সাহেব একজনকে মাস্টারমাইন্ড বানিয়েছেন, পুরো আন্দোলনটাকে অভিহিত করেছেনমেটিকুলাস ডিজাইনহিসেবে।

দুই বছর পর এসে যখন পেছন ফিরে তাকাই, আমারও মনে হয়, আমরা একটা ষড়যন্ত্রের মধ্যে পড়ে গেছি। জনগণের অর্জনটা আর গণআন্দোলন থাকেনি, . ইউনূস সেটাকে নিছক একটা ডিজাইন বা ষড়যন্ত্রে পরিণত করে ফেলেছেন। দেশের তরুণসমাজের সম্মিলিত ঐক্যটাকে ক্ষমতার লোভের চোরাবালিতে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। সম্মিলিত অর্জনকে তারা দ্রুতই ব্যক্তিগত লোভলালসার শর্টকাট পথে পরিণত করেছে। আর বিপরীত দিকে পতিত সরকার এবং তার অনুগতরা বলার সুযোগ পাচ্ছেচব্বিশে আসলে নাকি কোনো আন্দোলনই হয়নি, ওটা ছিল নিছক একটা ষড়যন্ত্র!

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Related Posts