দুঃসময়ে বিশ্ববিদ্যালয়; দুঃসহ বেদনায় সিক্ত শিক্ষক || আনিস আহমেদ

যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আপনার প্রায় নাড়ির সংযোগ সেই প্রতিষ্ঠানের অবনতি যে কতটা বেদনাসিক্ত হতে পারে, সে কথা বলাই বাহুল্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে আমার প্রিয় পরিচিত সেই রকম এক প্রতিষ্ঠান যার সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা আত্মিক। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিদেশে থাকা সত্ত্বেও আমি ভুলিনি আমার প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই স্বপ্ন ছিল আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে এক ধরনের গর্ব অনুভব করতাম, সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী হবার স্বপ্ন দেখতাম। পরবর্তীতে সে স্বপ্ন পূরণ হলো এবং তারও পরে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষকতা করার সুযোগ পেলাম। বহু পান্ডিত্যপূর্ণ শিক্ষকের এবং সহকর্মীদের সান্নিধ্য পেলাম যাঁদের সকলেই ছিলেন প্রগতিশীল। তাঁদের অনেকেই ধার্মিক হলেও, ধর্মান্ধ ছিলেন না এবং ধর্মকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে নিয়ে আসেননি। ছাত্র সংসদগুলোও ধর্মীয় আবর্তের বাইরেই ছিল। ধর্ম ছিল যার যার নিজস্ব ব্যাপার কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সকল শিক্ষার্থী শিক্ষকের। 

সেই পরিস্থিতির যে আমূল পরিবর্তন হয়েছে আগস্টের পর থেকে সে তো আমরা লক্ষ্য করছি। কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদগুলিতে স্বাধীনতা বিরোধী জামায়েতের অঙ্গ সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরের বিজয় এবং ইউনুস সাহেবের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খোলনলচে পাল্টে দেবার চেষ্টা চলেছে। ব্যাপারে মারাত্মক ভুল অবশ্য করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের এমন সুযোগ দিয়েছিলেন যাতে তারা সহজেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে। আর সেই সুযোগে মগজ ধোলাই হওয়া এই সব শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়কে কার্যত একটি বড় মাদ্রাসায় পরিণত করার গোপন প্রক্রিয়া শুরু করে। এমনশিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ছাত্রলীগে যোগ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি বাহ্যত শ্রদ্ধা নিবেদন করে, গোপনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বিলীন করে দেয়ার প্রচেষ্টা চালায়। এদের মধ্যে ২৪এর ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা সারজিস আলমও অন্তর্ভুক্ত। কিছু দিন আগে তাঁর একটি ভিডিও দেখে বিস্মিত হয়েছি যেখানে সে আবেগবিহ্বল ভাবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। এই ভিডিওটি জুলাইয়ের আন্দোলনের আগের যখন তিনি ছাত্র লীগের ভেতরেই ঘাপটি মেরে বসে ছিলেন। হাসিনা এই গুপ্ত ঘাতকদের বুঝতেই পারেননি যারা বাংলাদেশের ইতিহাসকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। ক্রমশই ক্যাম্পাস হয়ে ওঠে এই নব্যরাজাকারদের আশ্রয় স্থল এবং অবশেষে একটি বানোয়াট আন্দোলনের মাধ্যমে, সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করে তারা হাসিনা সরকারের পতন ঘটায়। 

সংস্কার নয়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এই গোষ্ঠিটি আগস্ট, যাকে তারা ৩৬শে জুলাই বলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দখল নেয়। এমনকি শিক্ষক নিয়োগে এবং শিক্ষকদের দায়িত্ব বিতরণে ইউনুস সরকার সম্পূর্ণভাবে এক চোখে দেখেছে। আওয়ামী লীগ পক্ষের শিক্ষকরা তো বটেই, আওয়ামী লীগপন্থি না হয়েও কেবল মাত্র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের উদারমনস্ক শিক্ষকশিক্ষয়িত্রীরা সরকারি রোষের শিকার হয়েছেন। এখন তারেক রহমানের সরকার সেই একই পথ অনুসরণ কেও চলেছে। যদিও শিক্ষার্থীদের মহলে একটি স্পষ্ট বিভাজন আমরা লক্ষ্য করছি যখন শিবিরের সঙ্গে ছাত্রদলের সংঘাত বেড়েই চলেছে, কেবল ছাত্রলীগকে কোণঠাসা করতে তারা জোট বদ্ধ। এদিকে বর্তমানে এই তারেক রহমান সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ জুলাই গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে কতিপয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্ত, অব্যাহতি এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার মতো কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু জুলাইয়ের আন্দোলনের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে কোনো ভাবেই যারা সক্রিয় ছিলেন না তাদের মতো শিক্ষকশিক্ষয়িত্রীদের বিরুদ্ধেও রকম শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তাছাড়া ২৪এর জুলাইয়ের সেই আন্দোলন ছিল সরকারের বিরুদ্ধে একদল শিক্ষার্থীর আন্দোলন। এই আন্দোলনের বিপক্ষে যদি কোনো শিক্ষক অবস্থান গ্রহণ করেও থাকেন সেটা তো কোনো মতেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা হতে পােও না। অথচ সরকারি ঘোষণায়অশিক্ষকসুলভ আচরণ নৈতিক স্খলন’—এর অস্পষ্ট মিথ্যা অভিযোগ তুলে ইতোমধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিমসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া চার শিক্ষককে একাডেমিক প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

আমারই এক প্রাক্তন ছাত্রী গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপিকা . কাবেরী গায়েন হচ্ছেন এমন এক নিবেদিত প্রাণ শিক্ষয়িত্রী যিনি কোনো দলের আবর্তে নিজেকে আবদ্ধ করেননি। তিনি একাডেমিক কার্যক্রমে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত রেখেছেন নিজেকে। সত্যি কথা, তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক, বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল এক ব্যক্তি কিন্তু দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকেছেন বরাবর। তাহলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকাটাই কি কাবেরীর বড় অপরাধ! সম্ভবত তাই, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন কাগুজে স্বায়ত্ত্বশাসন আছে বটে তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের অনেকখানিই এখন সরকারের অনুগত। ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশের কথা তাঁরা বলছেন বটে কিন্তু সেই অধ্যাদেশের কোথাও এমনটি নেই যে কোনো রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করলে শিক্ষককে চাকুরিচ্যুত করা হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো এই যে কাবেরী গায়েনের রাজনৈতিক আদর্শ যাই হোক না কেন, তিনি তাঁর ব্যক্তিক আদর্শকে কখনোই তাঁর একাডেমিক কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করেননি। 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই একতরফা নীতির শিকার হয়েছেন আরেকজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ অধ্যাপিকা . সাদেকা হালিম। খবরে বলা হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য . সাদেকা হালিমকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একটি রাজনৈতিক মতবাদের বিরুদ্ধে যে কোনো শিক্ষক অবস্থান নিতেই পারেন। সাদেকা হালিম তো কাউকে হত্যা করেননি, তিনি নিজস্ব মতবাদে অটল থেকেছেন। জুলাই আন্দোলনের সময়ে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্য়ালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পদটি কোনো সরকার প্রদত্ত পদ ছিল না, নিজের মেধা মননের ফলে একাডেমিক কারণেই তিনি সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে দীর্ঘ দিন শীর্ষ স্থানে ছিলেন। বলা হয় তিনি আওয়ামীপন্থি নীল দলের রাজনীতি করতেন। সেটা যদি তিনি করেও থাকেন, তাহলেও তা দেশের কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো আইনেরই পরিপন্থি ছিল না।

আসলেই আমার প্রিয়বিদ্যাপিঠ এখন এক দুঃসময় অতিক্রম করছে। কেবল কোনো ব্যক্তির সমস্যা নয়, গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুঃসময়।


Related Posts