বিপজ্জনক পর্বে সৌদি—ইরান বৈরিতা || ড. জীবন বিশ্বাস নিউইয়র্ক
সৌদি আরব ও ইরানের সংঘাতকে প্রায়ই সুন্নি—শিয়া বিরোধের সুপ্রাচীন ধারাবাহিকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এ ব্যাখ্যা সুবিধাজনক, কিন্তু অসম্পূর্ণ। ধর্মতাত্ত্বিক বিভাজনটি জনমত সংগঠনের ভাষা জোগায় কিন্তু মূল সংঘাত আবর্তিত হচ্ছে ক্ষমতা, শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তা, কৌশলগত ভূগোল এবং মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে। মক্কা ও মদিনার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে সৌদি আরব ধর্মীয় মর্যাদা লাভ করে, আর তার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব আহরণ করে আঞ্চলিক স্থিতাবস্থা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র থেকে। অন্যদিকে, ‘বেলায়াত—ই—ফকিহ’ বা ‘ইসলামি আইনজ্ঞের অভিভাবকত্ব’ নামক বিপ্লবী মতাদর্শে পরিচালিত ইরান নিজেকে পশ্চিমা ও ইসরাইলি আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অগ্রদূত হিসেবে উপস্থাপন করে। উভয় রাষ্ট্রই মিত্রতা বৈধ করা এবং স্থানীয় বিরোধকে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত করার জন্য সাম্প্রদায়িক পরিচয়কে বারবার রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়েছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস যথার্থই সতর্ক করেছেÑচৌদ্দ শতাব্দীর সুন্নি—শিয়া বিভাজন এককভাবে সমকালীন সংঘাতের ব্যাখ্যা দেয় না বরং রিয়াদ ও তেহরান তাদের ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা পূরণে এই বিভেদকে ব্যবহার করছে। এ প্রসঙ্গেই আজকের উপসম্পাদকীয়।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই বৈরিতা তার বর্তমান বিপজ্জনক রূপ লাভ করে। তেহরানের বিপ্লবী নেতৃত্ব রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানায় এবং পরবর্তীকালে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাক ও সিরিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠী, ফিলিস্তিনি সংগঠন এবং ইয়েমেনের হুতিদের নিয়ে একটি ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ গড়ে তোলে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর এই নেটওয়ার্ককে বিভিন্ন মাত্রায় অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও কৌশলগত নির্দেশনা দিয়ে চলছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব বন্ধুভাবাপন্ন সরকার এবং বিভিন্ন সময়ে সুন্নি রাজনৈতিক কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন করেছে। ফলে ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ ও সংকট রিয়াদ—তেহরানের বৃহত্তর ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
২০২৩ সালের ১০ মার্চ চীনের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত সমঝোতা এই ধ্বংসাত্মক গতিপথে সাময়িক ছেদ টেনেছিল বলে মনে হয়েছিল। সৌদি আরব ও ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পূর্ববর্তী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চুক্তিগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে সম্মত হয়। এই সম্পর্কোন্নয়ন তাৎক্ষণিক উত্তেজনা হ্রাস করলেও ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, প্রক্সি সংগঠন বা সামুদ্রিক বলপ্রয়োগ নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে পারেনি। ২০২৪ সালেই ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ সতর্ক করেছিল যে, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ একটি স্থবির পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং বাস্তব অগ্রগতি না হলে তা পুনরায় পশ্চাৎমুখী হতে পারে। চুক্তিটি দূতাবাস ফিরিয়ে এনেছিল বটে, কিন্তু পরস্পরবিরোধী দুই নিরাপত্তা—ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে পারেনি।
সেই সীমাবদ্ধতা এখন নির্মমভাবে দৃশ্যমান। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বৃহত্তর মার্কিন—ইসরাইল—ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান এবং ইরান—সমর্থিত গোষ্ঠীর নামে পরিচালিত হামলা উপসাগরীয় অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচলকে আঘাত করেছে। ১১ মার্চ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২৮১৭ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রের ওপর ইরানের হামলার নিন্দা জানায়। জুলাইয়ের শেষ নাগাদ সৌদি তেল স্থাপনায় ৩০টির বেশি ইরানের ড্রোন হামলার খবর পাওয়া যায়। ২৯ জুলাই মার্কিন ও সৌদি যুদ্ধবিমান ইরাকে ইরান—ঘনিষ্ঠ পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের বিভিন্ন ইউনিটের ওপর সমন্বিত হামলা চালিয়ে অস্ত্র ও রসদকেন্দ্র ধ্বংস করে। ইরাক এই অভিযানকে তার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানায়Ñযা দেখিয়ে দেয়, প্রক্সি যুদ্ধ যে রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিচালিত হয়, শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকেই ক্ষয় করে।
এসব ঘটনা সৌদি সংযমনীতির একটি নির্ণায়ক পরিবর্তন নির্দেশ করেÑতবে পরিবর্তনটিকে নির্ভুল ভাষায় চিহ্নিত করা প্রয়োজন। রিয়াদ এখন তেহরান—সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে কিন্তু প্রকাশ্যে প্রমাণিত সৌদি হামলাগুলো মূলত ইরানের ভূখণ্ডের বদলে প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকেই লক্ষ্য করছে। অতএব সংঘাতটি গোপন প্রতিযোগিতার সীমা অতিক্রম করে প্রকাশ্য সামরিক অংশগ্রহণে পৌঁছেছে, যদিও এখনো পূর্ণাঙ্গ সৌদি—ইরান আন্তরাষ্ট্রীয় যুদ্ধে রূপ নেয়নি। পার্থক্যটি অত্যন্ত সূক্ষ¥, অস্থিতিশীল এবং ক্রমেই বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
লোহিত সাগর এই সংঘাতের দ্বিতীয় রণাঙ্গন। হুতিরা সৌদি জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে অবরোধ ঘোষণা করেছে এবং সৌদি—সংশ্লিষ্ট তেলবাহী জাহাজ ও জ্বালানি পরিবহনপথে আক্রমণ চালিয়েছে। এরপর রিয়াদ ৪৩টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের নিয়ে বহুজাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগ গঠনের বৈঠক আহ্বান করে, ১৪টি রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবটিকে সমর্থন করেছে। এর কৌশলগত অভিঘাত সৌদি ভূখণ্ডের বহু বাইরে বিস্তৃত। নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাব এল—মান্দেব দিয়ে দৈনিক তেল পরিবহন ২০২৩ সালের ৮.৭ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে ২০২৪ সালের প্রথম আট মাসে প্রায় ৪ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছিল। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছেÑযা বৈশ্বিক পেট্রোলিয়ামজাত তরল ব্যবহারের প্রায় এক—পঞ্চমাংশ। হরমুজ ও বাব এল—মান্দেব একই সময়ে বিঘ্নিত হলে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি, জাহাজভাড়া, খাদ্যমূল্য ও জ্বালানি—নিরাপত্তার সংকটে রূপ নেবে।
তবু সৌদি আরব এক কৌশলগত স্ববিরোধের মুখোমুখি। সামরিক নিষ্ক্রিয়তা আরও হামলাকে উৎসাহিত করবে এবং ইরানের বিকেন্দ্রীভূত প্রক্সি নেটওয়ার্ক দায় স্বীকার না করেই প্রতিপক্ষকে শাস্তি দিতে পারেÑএমন ধারণা আরও শক্তিশালী করবে। আবার সংঘাত বিস্তৃত হলে সৌদি নগরী, তেল শোধনাগার, লবণাক্ত পানি পরিশোধনকেন্দ্র এবং ভিশন ২০৩০—এর বিপুল বিনিয়োগ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়বে। এমনকি দৈনিক প্রায় ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল লোহিত সাগরমুখী পরিবহনে সক্ষম সৌদি ইস্ট—ওয়েস্ট পাইপলাইনও দুটি সামুদ্রিক পথ একযোগে অনিরাপদ হলে যথেষ্ট বিকল্প দিতে পারবে না।
এই বাস্তবতাই যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের আপাতবিরোধী অবস্থান ব্যাখ্যা করে: একদিকে সামরিক প্রতিশোধ অনুমোদন, অন্যদিকে সংলাপকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং বৃহত্তর যুদ্ধ এড়িয়ে চলার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আহ্বান। তাঁর এই অনুরোধ আগস্টের শুরুতে ওয়াশিংটনকে পরবর্তী হামলা স্থগিত করতে প্রভাবিত করেছিল। এটি নীতিগত অসংগতি নয় বরং নিয়ন্ত্রিত কূটনৈতিক বলপ্রয়োগÑসৌদি আরব সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না এমন যুদ্ধ না বাধিয়ে প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।
২০২৩ সালের সম্পর্কোন্নয়ন চুক্তির রাজনৈতিক ভিত্তি ভেঙে পড়লেও একে আইনগতভাবে মৃত ঘোষণা করা উচিত নয়। সামরিক উত্তেজনা প্রতীকী মৈত্রীর অসারতা প্রকাশ করলেও এর কূটনৈতিক যোগাযোগপথ এখনো প্রয়োজনীয় হতে পারে। একটি কার্যকর উত্তরসূরি কাঠামোয় প্রক্সিদের মাধ্যমে হামলা নিষিদ্ধ করতে হবে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হস্তান্তরের ওপর যাচাইযোগ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, উপসাগর—লোহিত সাগর জরুরি হটলাইন গঠন করতে হবে এবং ইরাক ও ইয়েমেনকে যুদ্ধক্ষেত্র নয়, সার্বভৌম অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। চীন নিশ্চয়তাদাতার ভূমিকা বজায় রাখতে পারে তবে ওমান, জাতিসংঘ এবং মধ্যস্থতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অন্যান্য পক্ষেরও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন।
সাম্প্রদায়িক বিজয় কিংবা সামরিক আধিপত্যÑকোনোটিই মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলকে স্থিতিশীল করতে পারবে না। সশস্ত্র নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতা বিস্তার করে ইরান একই সঙ্গে তাদের কর্মকাণ্ডের দায় অস্বীকার করতে পারে না। আবার স্থানীয় ক্ষোভ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতায় টিকে থাকা একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সৌদি আরব শুধু বোমা মেরে নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না। অর্ধচন্দ্রকে তরবারির সেবায় নিয়োজিত করা বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় সৌদি—ইরান সংঘাত মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, তা নির্ধারণ না করে বরং নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বী দাবিগুলো কীভাবে সেই বিশ্বকেই বিপন্ন করে তুলতে পারে, তারই নির্মম ও করুণ প্রমাণ হয়ে থাকবে।
