‘ওরা গদির জন্য আঁতাত করে, আঁতাত টেকে না, শুধু গদি চলে যায়’ || মনজুর কাদের
‘এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম/ প্রেম মেলেনা/ শুধু সুখ চলে যায়’— রবিঠাকুরের এই বিখ্যাত গানটির প্যারোডি করেছে পশ্চিম বঙ্গের বীরভূমের তেলাপোকা পোলাপানঃ ‘ওরা গদির জন্য আঁতাত করে, আঁতাত টেকে না, না, শুধু গদি চলে যায়’।
বীরভুমে কবিগুরুর বিশ্বভারতীর আঙিনায় দাঁড়িয়েই দুষ্টু ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে এই প্যারোডি করেছে জানতে পারলে গুরুদেব কি রাগ করতেন? নাকি মুচকি হাসতেন? অবশ্যি দীর্ঘদিন ক্ষুর—কাঁচির পরশ না পাওয়া গোঁফ দাড়ির ভেতর থেকে ওনার মুচকি হাসি ঠিক ঠাহর করা যেত কি না সেও আরেক চিন্তার বিষয়।
সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের কৃষি জমি রক্ষা ও ভূমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলন করে লাইমলাইটে আসা মমতা ব্যানার্জি যখন তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যানারে ভোট করতে মাঠে নামলেন, তখন ক্ষমতাসীন ভারতীয় মার্কসবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির হোমরা—চোমরা মন্ত্রীরা সিনা চেতিয়ে বলেছিলেন, এটা রবীন্দ্রনাথের বঙ্গ, নেতাজি সুভাষ বোসের বঙ্গ, বিদ্যাসাগরের বঙ্গ, উত্তম—সুচিত্রার বঙ্গ। এখানে মমতার মতো মানুষ নির্বাচিত হবে কী করে! তিনি সম্ভবত মমতা ব্যানার্জির ঘি মাখন না খাওয়া চেহারা, অনভিজাত এলাকায় বসবাস করা, কমদামী পোশাক আশাক বা চটাং চটাং করা সস্তা চটির প্রতি ইঙ্গিত করেই তাচ্ছিল্যের সুরে এসব কথা বলেছিলে। ভোটের পর দেখা গেলো, তিনি ভূমিধস বিজয় পেয়ে মূখ্যমন্ত্রী হয়ে গেলেন।
তৃণমূল কংগ্রেস এমন কিছু জনপ্রিয় দল ছিলো না, কিন্তু সে দলটিই তুমুল জনপ্রিয় ও দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সিপিএমকে ধরাশায়ী করে চমক লাগিয়ে দিলো।
বিয়ের আগে প্রেমিকার কাছে প্রেমিক পুরুষ যতটা অনন্য সাধারণ থাকে, বিয়ের পরই সে ততটাই বিরক্তিকর হতে হতে পৃথিবীর সবথেকে অকর্মণ্য পুরুষে পরিণত হয়। মমতার ক্ষেত্রে ঠিক এরকমই হয়েছে।
রাজনীতিতে সব জনপ্রিয়তায়ই ধ্বস নামে। মমতারও নেমেছিলো। তিনি তখন সেই সস্তা হাতিয়ার, সংখ্যালঘুদের কাছে টানলেন। সংখ্যালঘুরাও মওকা পেয়ে ঢোড়া থেকে কালসাপে পরিণত হতে থাকলো। এরা মমতাকে যৎকিঞ্চিত ঠেকনা দিলেও প্রবল জলোচ্ছ্বাসের সামনে সেই ঠেকনা পাটখড়ির মতোই ভেসে গেছে।
একই ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটেছে। বাংলাদেশে দুই তৃতীয়াংশেরও বেশী সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসে কোন কুহকে সাম্প্রদায়িক দলগুলোর কাছে নিজস্বতা বিসর্জন দিতে হলো।
বিশ্বাস ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্বাসী ও বিশ্বাসভিত্তিক বিধিবিধান বাস্তবায়নে প্রাণান্ত দলগুলোর তরুণ প্রজন্মকে এক টানে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান করে দেয়ার সব ব্যবস্থা করা এমনকি এসব বিশ্বাসভিত্তিক সনদে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার কী অর্জন করলো তা দেশবাসী দেখেছে। বাংলাদেশের মানুষ এমনিতেই অত্যন্ত ধর্মভীরু। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা যতই আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করুক না কেন দিনশেষে তারাও ধর্মভীরু। এরকম একটা ধমীর্য় উর্বর পরিবেশে হাজার হাজার মাদ্রাসা শিক্ষিত তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই এই উর্বর ভূমিতে চাষাবাদ শুরু করে দিলো। ফসলও ফললো আশাতীত। পরের ঘটনা প্রবাহ সকলেরই জানা।
কট্টর সাম্প্রদায়িক দলসমূহ ও তাদের মাদ্রাসা শিক্ষিত তরুণ শক্তির সাথে আঁতাত করে আওয়ামী লীগ সরকার ভেবেছিলো তারা চরম বাঁচা বেঁচে গেছে। কিন্তু তারা বেমালুম ভুলে গেছে, আগুন যেমন মান্দার কাঠকে পোড়ায় তেমনি চন্দন কাঠকেও পোড়াতে ছাড়ে না। আগুনের সাথে আঁতাত করলে এই ফলই হয়— এই শিক্ষা জাতি আরেকবার পেলো।
এই কথা জ্ঞানী গুণীজন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে বলেছে, দেশের স্কুলগুলোর চেয়ে কয়েক হাজার বেশী মাদ্রাসাগুলোকে সাধারণ শিক্ষার আওতায় আনা দরকার। কাজটি কঠিন তবে বিগত সতের বছরে তেমন কোনো উদ্যোগ আমরা দেখিনি। এর দুটি কারণঃ
এক. মাদ্রাসার শিক্ষক ও আলেম সমাজ আধুনিক শিক্ষার ঘোর বিরোধী। কারণ এরা আধুনিক শিক্ষাটাই জানে না। মাদ্রাসায় প্রকৃত অর্থে অংক, ইংরেজি, বিজ্ঞানÑ এসব বিষয় তো তারা পড়াতে পারবে না। ফলে পেশাগত অনিরাপত্তা ও আতংক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুই. এসব মাদ্রাসার পরিচালনা ব্যয়ের সিংহ অংশ যেহেতু সরকারকে বহন করতে হয় না সেহেতু সরকার জামায় বাতাস লাগিয়ে ভালোই সময় ক্ষেপন করার মওকা পায়। তাছাড়া এমনটাও হয়তো ভেবেছে যে, জাতির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষার আলোক বিহীন থাকলে এদের শাসন কোশন করায়ও এন্তার সুবিধা। কারণ রাজরক্ত সবসময়ই ‘সিংহের প্রশংসা করে অথচ গাধাকেই অধিক পছন্দ করে’।
কারণ যাই হোক, এই বঙ্গ—ওই বঙ্গ কোনো বঙ্গেই আঁতাত টিকলো না। পাশাপাশি দুটি বঙ্গে প্রায় একই সময়ে একই ঘটনা ঘটায় তেলাপোকাদের প্যারোডি খাপে খাপ মিলে গিয়ে জনপ্রিয় হয়েছে।
জনপ্রিয় সরকারগুলো জনগণের বিপুল সমর্থনে বিজয়ী হয়ে দিন শেষে সেই জনগণের প্রতি আস্থা হারিয়ে রীতিমতো শত্রুপক্ষের সঙ্গে আঁতাত করে মান ইজ্জত, জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতা সবই খুইয়ে পথে বসে।
এটা ভবিষ্যত সরকারগুলোর জন্য একটা শিক্ষা হয়ে থাকুক। আঁতাত যদি করতেই হয় সেটা জনগণের সাথেই করা ছাড়া বিকল্প নেই। আর যারা জনগণকে বাদ দিয়ে বিকল্পের সাথে আঁতাত করেছে আখেরে তারা সবাই জাতকুল হারিয়ে পথে বসেছে, ভবিষ্যতেও বসবে।
