লাশ || নাজনীন সীমন নিউইয়র্ক
বিয়ের পর থেকে সব মিলে কতদিন, হয়তো একশ’ দিনেরও কম হবে, কিংবা হতে পারে একটু বেশী; খুব বেশী না—কিঞ্চিৎ এদিক ওদিক; হয়তো দশ বারো কিংবা বিশ পঁচিশ দিন বরের সাথে ছিলো শাহানা। কি করে থাকবে? বর থাকে সেই চট্টগ্রাম শহরে আর সে সেই কত দূরে, ময়মনসিংহ। নানী তাই প্রায়ই বলতো এ কেমন বিয়ে? বর বউকে দেখবে না, যখন খুশী আদর করতে পারবে না, বউ কোনো আহ্লাদ করতে পারবে না—এমন বিয়ের কোনো দরকারই নেই। আদতে তারও মন কেমন করতো সব সময়। কেঁদে কেটে, অনেক করে বুঝিয়ে পাঁচ বছরের মাথায় সে—ও থাকা শুরু করলো যাকে বলে বন্দর নগরীতে, বরের সাথে; সাথে তখন তিন বছরের কন্যা রিমি।
সরকারী চাকুরি না করেও কলোনিতে বসবাসের সুযোগ বের করে নিয়েছিলো মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক। দুই কামরার ছোট ঘরে বেশী সদস্য নিয়ে থাকা সমস্যা বইকি! সে জন্য সুযোগ বুঝে কেউ কেউ বাইরে বাড়ি ভাড়া করে থাকে আর নিজের সরকারী বাসা পরিচিত, বিশ্বস্ত কাউকে ভাড়া দিয়ে দেয়। সেই ফাঁক—ফোকরেই সাত নম্বর বিল্ডিংএর এক তলায় পরিবার নিয়ে মোটামুটি নির্ঝঞ্ঝাট জীবন চলতে থাকে তার। ঝামেলাহীন এজন্য যে সম্ভবত পুরো কলোনিতে একমাত্র এই বিল্ডিংটিতেই এতো পরিমাণে বেসরকারী লোকের বাস। কেবল তাই নয়, সবগুলোতেই মেস করে ভাড়া দেয়া হয়েছে; কোনোটিতে আট জন, কোনোটিতে দশ—এভাবে যে যেমনি পারছে থাকছে, আর যে যেমনি সম্ভব ভাড়া দিচ্ছে কেবল এই একটি ছাড়া যেখানে কি না একটি পরিবার থাকে, গোছালো ছিমছাম সুখী পরিবার যাকে বলে আর কি! যেহেতু এরা সব সকালে বেরিয়ে যায় কাজে, আর ফিরে আসে সন্ধ্যায়, তাই এই অংশটা মোটামুটি বেশ ঠাণ্ডাই থাকে। এর একেবারে উপরে অর্থাৎ চার তলায় থাকেন নাহিদা ভাবী যিনি সারা বছর জুড়ে অ্যালার্জিজনিত হাঁচিতে ভোগেন। অবশ্য সাথে ঠান্ডার আক্রমণ আছে কি না বলা মুশকিল। কোনো মাছও বোধ হয় জীবনে এতো পরিমাণ পানির সংস্পর্শে থাকে না যেমনটা উনি থাকেন। সকাল থেকে শুরু হয় ওনার ধোয়া মোছা এবং মোছা ধোয়া; চলে রাত এগারোটা তক ঘুমাতে যাবার পর্যন্ত। রাতে মেজে রাখা থালা বাসন গ্লাস ইত্যাদি সকালে ওনাকে আবার ঘষতেই হবে ছাই আর ভিম গুঁড়ো দিয়ে। ভাগ্যিস কাচ আর স্টিলের জিনিসপত্র, নইলে সব কিছুর ছাল চামড়া উঠে যেতো। বাড়ির পাপোশ দুই দিন পর পর ধোন উনি। আর বসার ঘরের মেঝেতে পাতার জন্য একটি ছোট কার্পেট কিনে এনেছিলেন ওনার বর। প্রথম কিছু দিন ওটাতে কাপড় মুড়িয়ে আলমারির উপর রেখে দিয়েছিলেন ধুলো পড়বে বলে। বহু পীড়াপীড়ি আর রাগারাগির পর সেটি নামিয়ে পেতেছেন বটে, কিন্তু সপ্তাহে একদিন সেটিকে সাবান শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করান তিনি। এমনকি ছোট বাচ্চাটার পর্যন্ত নিস্তার নেই ওনার হাত থেকে। শীতের দিনেও বারান্দায় এনে তিন চার বার করে গোসল দেন। প্যান্টে কোনো রকম একটু হিসির ফোঁটা লাগলেই হলো, তাকে ডলে মেজে বিশুদ্ধ করতেই হবে। আর নিজে যে কত বার গোসল করেন, তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। সারা দিনই দেখা যায় উনি হয় গামছা দিয়ে চুল ঝাড়ছেন, নতুবা শাড়ি পেটিকোট নাড়ছেন। আর বাড়িতে লোকজন গেলে তো কথাই নেই। স্যান্ডেল খুলতে হবে দরজার বাইরে বা হাতে করে নিয়ে এসে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতে হবে, সোফার গদি, কুশন ইত্যাদি একশ’ বার করে ঝাড়বে লোকের সামনে, বালি খুঁজবে এখানে সেখানে; আরও কত কি! ফলে দিনের বেলাটা একলা থাকলেও এবং হাতে আগাধ সময় থাকলেও শাহানা পারত পক্ষে উপরের বাসায় যায় না। নিজের ঘরে মেয়েকে নিয়ে গান শুনে, টুকটাক সেলাই ফোঁড়াই এর কাজ করে তার সময় দিব্যি চলে যায়। তবে মন তো খারাপ হয়ই। সব ছেড়েছুড়ে একাকী, অচেনা এই শহরে থাকা—খুব একটা সহজ ব্যাপার নয় যদিও সে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করে আব্দুর রাজ্জাকের মতো একজন জীবন সঙ্গী পেয়ে। বাড়িতে থাকা সমস্ত সময় বউ বাচ্চার পেছনে কাটায়, বিকেলে মেয়েকে নিয়ে হয়তো মাঠে গিয়ে বসে যেখানে ছেলেমেয়েরা খেলাধূলা করে অথবা বারান্দার রেলিঙয়ে। মাঝে মাঝে দুই টাকার বাদাম, দুই টাকার শিম বিচি, এক টাকার বুট ভাজা কিংবা এক টাকার গরম গরম সিঙাড়া, দুই তিন মাসে নতুন একটা শাড়ি—এক জীবনে মানুষের আর কি—ই বা লাগে!
আবার কেবল এসবই নয়, একটা মেয়ে যে সব ছেড়ে তার সাথে আছে, ফেলে আসা পরিবারের প্রতি যে তারও দায়িত্ব আছে, তার মন যে কাঁদে, অন্য অনেকের থেকে ভিন্ন রকম ভেবে, আলাদা হয়ে, আব্দুর রাজ্জাক সেটা বুঝতে পারে। তাই মাঝে মাঝে হয়তো শ’ পাঁচেক টাকার একটা মানি অর্ডার করে দেয় শ্বশুর বাড়িতে। ঈদের অন্তত দশ পনেরো দিন আগেই শাহানা ও মেয়েকে পাঠিয়ে দেয় মা বাবার কাছে যেহেতু ঈদের সময়টা বাড়ির ছেলে হিসেবে তাকে থাকতেই হয়। হ্যাঁ, বাড়িতে ঢের কথা শুনেছে সে জন্য। শুধু তো পরিবারের মানুষ নয়, প্রতিবেশীরাও দু’চারটে কথা শুনিয়ে যায় হাসিঠাট্টার ছলে। মুখ ঝামটা দিয়ে আব্দুর রাজ্জাকের বড় ভাবী তার বরকে ভর্ৎসনা করেছে ছোটোলোক, কিপটে এসব বলে। বলেছে ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে শিখতে কিভাবে বউয়ের যত্ন নিতে হয়। সন্দেহ প্রকাশ করেছে তারা আদতেই রক্ত সম্পর্কের ভাই কিনা, নতুবা এই আকাশ পাতাল ফারাক তো হবার কথা নয়। আকাইম্মা, আহাম্মক ছাড়াও আরও কত কত গাল যে দিয়েছে ইয়ত্তা নেই। আবার আব্দুর রাজ্জাককেও বলতে ছাড়েনি! “এমন বৌসোহাগী পুরুষ আমার জীবনেও দেখি নাই। বউয়ের আঁচল ছাড়া থাকতেই পারো না দেখি। কি সুন্দর ম্যানেজ মুনেজ কইরা বউ নিজের খুশীমতো এইহানে ঐহানে যাইতাছে, পয়সাডি ব্যাক ভাঙতাছে”—এ জাতীয় কত শত কথা! আব্দুর রাজ্জাক শোনে মাথা নীচু করে কেবল; কষ্ট পায় কিনা কে জানে! কিন্তু অনুভূতির প্রকাশ বলে কিছু নেই তার, যার জন্য মানুষ বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে ক্ষান্ত দিয়েছে প্রায়। তবে একেবারে যে বউকে সে শ্বশুর বাড়িতে আনে না, তা নয় মোটেও। কোনো কোনো ঈদে সে শ্বশুর বাড়িতেই থেকেছে, সেখানে তার দায়িত্বও পালন করেছে যদিও নানা কথা তাকে শুনতে হয়েছে নানা ভাবে নানা জনের কাছ থেকে। সব ক্ষোভের উৎস একটাইÑপ্রত্যেকেরই ধারণা বাড়ির ছেলেকে সে তাবিজ করেছে। মনে নয়, মুখেও এ কথা বলতে ছাড়েনি। দু’একবার উত্তর করেনি যে তাও নয়। কিন্তু আব্দুর রাজ্জাক তাকে বলেছে, “তাবিজ করছো, কথাটা তো মিথ্যে না। নইলে..” ডান চিবুকে কড়ে আঙুল ঠেকিয়ে কিঞ্চিৎ ঘাড় বাঁকিয়ে ছাদের দিকে চোখ কোণা করে তাকিয়ে বদ্বীপীয় ঠোঁটে অসম্ভব তৃষ্ণা যেন হাজার চুমুকেও মেটার নয় এহেন তীব্র তৃষ্ণা। কেবল কামুকতা নয় যা ছিঁড়ে খুবলে খায়, তারপর নেতিয়ে পড়ে আবার ঘুমভাঙা অজগরের ক্ষুধা নিয়ে; বরঞ্চ মোহনীয় এক আকর্ষণ আছে তাতে যেন অভিকর্ষ বলে বারবার ফিরে আসতে হয় যত ঝুট ঝামেলা বাস্তবতা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাক না কেন। শাহানা তাই সব ভুলে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকে মানুষটির প্রতি যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা সে। মনে মনে ভাবে সে এর চেয়ে ভাল কাউকে কি পাওয়া সম্ভব ছিলো তার! আত্মীয় পরিজন, কত জনেরই তো জীবন দেখেছে সে। শ্বশুর বাড়ি তো দূরের কথা, যে মেয়েটিকে নিজের ঘরে নিয়ে যায় কলেমা পড়ে সমস্ত দায় দায়িত্ব নেবার, সুখে রাখার, রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, তারই সমস্ত সুখ—শান্তি—স্বপ্নের সবচেয়ে বড় হন্তারক হয়ে দাঁড়ায় ‘স্বামী’ নামের ব্যক্তিটি। স্ত্রীকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করাই যেন তার মূল ব্রত। তারই নিজের বোনের দুঃসহ জীবনের কথা শুনে শুনে বিয়েভীতিতে কুঁকড়ে থাকতো সে। অত্যাচার, সে শারীরিকই হোক, বা মানসিকই, মানুষকে তা রক্তাক্ত করে, তার চিন্তা ভাবনাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে, তার মনোজগৎকে কুপিয়ে কুপিয়ে খণ্ডবিখণ্ড করে ঠিক যেমন গরু, খাসি, পাঁঠা, শুয়োর, মহিষ, হরিণ, হাঁস, মাছ, মুরগী, গাছÑযে কোনো কিছুকে মানুষ ইচ্ছে মতো, প্রয়োজনে কিংবা তার অতিরিক্ততেও কাটে, ছাঁটে, পেষে, থ্যাঁতলায়। মনে আছে তার, একবার স্কুলের এক উপরের ক্লাসের গ্রামতুতো বোনের আট ক্লাসে থাকা অবস্থায় বিয়ে হয়ে যায়। প্রায় দুই আড়াইশো লোকের পাত পেড়ে খাওয়া, লাল—নীল—হলুদ—সবুজ কাগজে রাস্তা থেকে বাড়ি পর্যন্ত সাজানো রাস্তা, রুপালি আর হলুদ জরির মালা, গাঁদা ফুল, কলাগাছ, গাছ থেকে পাড়া টাটকা মেহেদীতে রাঙানো হাত, হাপুস নয়নে কান্না ইত্যাদি ইত্যাদি সব শেষে বউ হয়ে চলে যাবার কিছুদিনের মাথায় সেই একই পথে একই উঠোনে যখন এসে দাঁড়ায়, দিনের তখন প্রায় মধ্যভাগ। ঠা ঠা রোদ্দুরে যেন জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে সব; সে রোদের এতোই তাত যে কেউ তাতে খেয়াল করেই উঠতে পারেনি চারপাশ কতটা অন্ধকার হয়ে আসছে, কতটা জলের দাগ শুকিয়ে মেঠো রাস্তার মতো মোটা দাগ হয়ে গেছে দুই গালে, চোখের নীচে কতটা জায়গা জুড়ে অমাবস্যার প্রগাঢ় কালো আঁধার; সেই খটখটে রোদের তীব্রতা এতোটাই প্রকট যে চোখের সামনে দাঁড়ানো জ্বলজ্যান্ত লাশটি সুখের প্রতিচ্ছবি বলে ভ্রম হয়। ফলে কেউ জানতেই পারে না ভাগ্যের কোন দরজা দিয়ে কি পালালো ফেরবার রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে। দিনের আলো নয় তাই, বরং রাতের আলো আঁধারি চিনিয়ে দেয় কষ্টের যত রেখা মুখে আঁকা ছিলো তার, হাতের বলিরেখার মতোই, যা রাস্তা ঘোরাতে ঘোরাতে ঘাড়, বাহু, পিঠ, পেট, পা, ঊরুর নানা জায়গায় হরেক মাপের ক্ষত দেখিয়ে দেয়। আর বোধের ওপর যে আঘাতের চিহ্ন, তার তো কোনো বর্ণনা হয় নাÑসে দাগ প্রকাশের জন্য কোনো শব্দ নেই কোনো ভাষার কোনো অভিধানে, কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, হোক সে আল্ট্রাসনোগ্রাম, এম আর আই, এক্স রেÑকিছুতেই কি তা ধরার উপায় আছে? তাকে বর্ণনায় বন্দী করার ক্ষমতা এমনকি ভুক্তভোগীরও থাকে কি? কিংবা ধরা যাক, নানা শব্দ এবং শব্দের বাইরে হরেক আকার প্রকারে প্রকাশ করা হলেই কি অপর পক্ষ বুঝে নিতে পারে ঠিক কতটা ক্ষতি হয়েছে মানুষটির? আর তার চারপাশে এর যে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে, সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করে, তার কি কোনো প্রতিকার হয়, না তাকে প্রতিরোধ করা যায়? আর এর প্রত্যক্ষ উদাহরণ হয়ে ওঠে শাহানা। বিয়ে তার কাছে গুয়ান্টানামো থেকেও ভয়ঙ্কর কিছুর প্রতিশব্দ হিসেবে প্রতিভাত হয় এবং আব্দুর রাজ্জাকের সময় লেগেছিলো বটে, কিন্তু এসবের কিছু ঘুণাক্ষরে না জেনেও সে তার দয়িতাকে টেনে উঠিয়েছিলো সেই অন্ধকূপ থেকে; আর নিজের অজান্তেই ধীরতিধীরে শাহানাও বুঝতে শিখেছিলো পুরুষ মানেই সন্ত্রাসী, লোভী, নিষ্ঠুর ধর্ষক নয়, বরং পুরুষও মানুষ হতে পারে যদিও চারপাশে তাকালে এ বোধ তার বহু আগেই জাগ্রত হতে পারতো, নিদেনপক্ষে নিজের বাবাকে দেখে তো হতোই। কিন্তু চোখের সামনে যে পর্দা থাকে বোধ ও নির্বোধÑএই দুইয়ের মাঝে শক্ত দেয়াল হয়ে, তা এক নিমেষে সরিয়ে ফেলার মতো দৃঢ়তা সবার থাকে না; শাহানার তো নয়ই। ফলে নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে সে আব্দুর রাজ্জাককে সুখী করতে চায় যেন এটিই তার জীবনের অলিখিত ব্রত। জীবনের সমস্তটা তাই সে দিয়ে রাখে ঐ একটি জায়গাতেই যেন সুখ ব্যাংক ওটা যেখান থেকে ইচ্ছেমতো যখন তখন আনন্দ, স্বস্তি, ভালোবাসা, শক্তি, সাহস, নির্ভরতা উঠিয়ে নেয়া যায় এবং যত নেয়া হয় সুদে আসলে চক্রবৃদ্ধি হারে তা আরো বাড়তেই থাকে, উপচে পড়তে চায়। কিন্তু ডাল চড়ানোর আগে হাঁড়ির মাথায় একটু তেল ছড়িয়ে দিলে যেমন তা উথলে উঠে চারপাশ নষ্ট করে না, কোনো এক অদৃশ্য কারণে তার সুখ ব্যাংকও তেমনি নিপাট থাকে এতোটুকু ছলকে না উঠে। অল্প সময়ের জন্য দূরে থাকতে হলেও তাই তার দিন রাত্রি ওলোট পালোট হয়ে যায়, তীব্র শূন্যতায় ভোগে। আর সে জন্যই ঈদের এক সপ্তাহ আগে বাড়ি যাওয়ার কথায় তার যুগপৎ আনন্দ ও কষ্টের অনুভূতি হতে থাকে। পরিবারের সবার সাথে দেখা হওয়া, প্রিয় পরিবেশে ফিরে যাওয়াতে যে ভালো লাগা, সেটা তো তুলনাহীন কিন্তু আব্দুর রাজ্জাককে ছেড়ে থাকা, সে একদিনের জন্য হলেও, তার জন্য শাস্তিস্বরূপ। তথাপি সমস্ত গুছিয়ে রওনা দেয় সে রিমিকে নিয়ে। এমনকি রিমির বাবার শার্ট, প্যান্ট, লুঙ্গি, গামছা যা যা নেয়ার, সব সে আগে থেকেই কাঁধ ব্যাগে গুছিয়ে রাখে যেন অফিস থেকে ফিরে সোজা রওনা দিতে পারে। খানিকটা গরুর মাংস ভাজা ভাজা করে রেখেছে যেন জ্বাল দিয়ে খেতে পারে কয়েক দিন ধরে। একটু ভাত ফুটিয়ে নিতে হবে তার কষ্ট করে। যদিও সে জানে শেষ দিন অফিস করেই আব্দুর রাজ্জাক রওনা দেবে এবং রাত বারোটার মধ্যেই পৌঁছে যাবে তার কাছে এবং সব মিলিয়ে মাত্র ছয় দিনের ব্যাপার, তবু সে বারবার বলে, “সময়মতো চলে আইসো কিন্তু রিমির বাবা। দেরী করবা না..”। রিক্সায় উঠতে গিয়ে পড়ে যাওয়ার মতো হলে আব্দুর রাজ্জাক তাকে হাত ধরে পিঠে ধাক্কা দিয়ে উঠিয়ে দেয় যদিও তার মন খচখচ করতে থাকে। কেন যেন একটা বিপদ বিপদ গন্ধ নাকের চারপাশে ঘোরাঘুরি করে। তাড়াহুড়োতে আর কিছু বলা হয় না তার; এক হাতে রিমিকে ধরে অন্য হাতে রিক্সার পেছনে ঝোলানো রেক্সিন উঠিয়ে দেখে নিতে নিতে ‘সাবধানে থাইকো’ আর ‘তাড়াতাড়ি চইলা আইসো’ বলে, আর দেখতে থাকে, দেখতেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না দৃষ্টির সীমানা পার হয়ে আব্দুর রাজ্জাক দিনের আলোতেই অন্ধকারে হারিয়ে যায় রিক্সার বাঁক ঘোরার পর, ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত। “সুবহানাল্লাজি সাখ্খারা লানা হাজা ওয়া মা কুন্না লাহু মুক্বরিনিন” পড়তে পড়তে শাহানা এগোয় প্রিয় গন্তব্যের দিকে প্রিয়তম মানুষের সান্নিধ্য পাবার জন্য প্রিয়তমকে ছেড়ে। বড় বিচিত্র এ দোলাচল! হৃৎপিণ্ডের একটি অংশ যেন সাহারার শুষ্কতা নিয়ে পরিজনের কাছে যেতে চাইছে, আর অন্য খণ্ডটি যেন সমান্তরালে সংসার আর গৃহী মানুষটিকে ছেড়ে আসার শূন্যতা নিয়ে গ্রাস করতে চাইছে সমস্তটা। জীবনের চরম বৈপরীত্যপূর্ণ এই যে ঘনঘটা, যেন দুই পা দুই মেরুতে—পূর্ব ও পশ্চিম কিংবা উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে, না এ পারে শান্তি, না ও পারে স্বস্তি, এর মধ্য দিয়ে যে না যায়, তার কি ধারণা থাকতে পারে কোন বোধ সমস্ত বোধ অতিক্রম করে নির্বোধ করে তুলতে পারে মানুষকে, ডোবাতে পারে চিন্তার মহাসমুদ্রে? এ কি কেবলই নারীর জীবনের প্রতিচ্ছবি কিংবা আরো নির্দিষ্ট করে বললে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের নারীর নারী হয়ে ওঠার গল্প, না কি দেশ কাল পাত্র নির্বিশেষে এ এক সর্বজনীন চালচিত্র? আব্দুর রাজ্জাকেরও কি এখন সব ছেড়ে ছুটতে ইচ্ছে করছে না কন্যা ও সহধর্মিণীর সাথে যেতে? তারও কি স্ত্রী এবং সন্তানের সাথে থাকার সময় মায়ের মুখ মনে পড়ে না, এক দৌড়ে যেতে ইচ্ছে করে না চেনা বসত ভিটায় প্রিয় মুখগুলোর কাছে? হয়তো এমন দোটানায় সেও পড়ে প্রায়শই; এখন তো বটেই। জীবনের প্রয়োজনে চাকরিটা তার যতটা প্রয়োজন, বেতন ও বোনাসের অর্থ যত প্রিয় তার কাছে, ঠিক ততখানিই লোভ তার পরিবারের সঙ্গ নিতে, পরিজনকে সময় দিতে। আর সেজন্যই অনেকখানি শূন্যতার সাথে আনন্দঘন সময়ের স্বপ্ন মাখামাখি হয়ে বুকের খুব গভীর থেকে অত্যন্ত দীর্ঘ একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার যেন আগুনের লেলিহান শিখাকেও নিভিয়ে দিতে পারে তা এবং তাকে পেছনে ফেলেই শূন্য ঘরের দিকে পা বাড়ায় সে। খাবার খেয়ে এবং দুপুরেরটা নিয়ে ছুটতে হবে অফিসে, যদিও সব কিছু শাহানা ঠিক করে রেখে গিয়েছে, ভাত ছাড়া। স্নানঘরে ঢোকার আগে হিটারে বসিয়ে দিলেই বেরিয়ে আসতে আসতে ঠিক হয়ে যাবে। শাহানাই করে যেতে চেয়েছিলো, কিন্তু একটি মাত্র চুলোতে সকাল সকাল অতো কিছু করে উঠতে পারেনি বেচারি।
সময় যে কেন এতো দৌড়ায়, খেয়ে না খেয়ে দৌড়ায়, বুঝে উঠতে পারে না আব্দুর রাজ্জাক। চাল ধোয়াতেই যেন সময় ঘড়িকে গিলে খেলো। তাড়াহুড়ো করে কোনো রকমে গা মুছে লুঙ্গিটা পরে ভেজা গামছা আর ধোয়া লুঙ্গি হাতে নিয়ে রান্নাঘরে উঁকি দিতেই দেখে ভাতের মাড় হাঁড়ি উপচে পড়ছে আর ফটফট চটচট শব্দ হচ্ছে। দৌড়ে যেতেই এক পায়ের স্পঞ্জের স্যান্ডেলের ফিতা ছিঁড়ে উল্টে পড়ার দশা তার। কোনো মতে সামলে এক স্যান্ডেল নিয়ে ভাতের হাঁড়ির কাছে গিয়ে পিতলের খুন্তি দিয়ে ভাত নাড়তে যায় সে ঠিক যেমনটা ছোটোবেলায় মায়ের পাশে পিঁড়িতে বসে মাকে করতে দেখেছে বহুবার। উথলে ওঠা মাড় বা ডালের ফেনা কেমন নেতিয়ে যেতো, ভাটার টানে যেমন নদীর জল ধীরে ধীরে নেমে যায় তেমনি সেঁধিয়ে যেতো হাঁড়ির গহ্বরে খুন্তি বা নাহোড় দিয়ে নাড়ার পর আর তা দেখে হাতে তালি দিতো সে আনন্দ এই ভেবে যে মা বুঝি জাদু জানে।
জাদু! জাদু! জাদু! নিশ্চয়ই জাদু জানে আব্দুর রাজ্জাক, নতুবা শাহানা কেন এক মুহূর্তের জন্য তাকে ভুলতে পারবে না! প্রতি ক্ষণে তার ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে। আফসোস করে মরছে এমনকি সকালে ভাতটাও রেঁধে রেখে আসতে পারলো না বলে অথচ বিয়ের আগে, মানে মাত্র কিছু দিন আগেও আব্দুর রাজ্জাক নিজেই রান্না করে খেয়েছে। মেয়ের বিষণ্ণ ভাবে মা সান্ত্বনা দেয় এই তো জামাই এলো বলে। শাহানাও ভাবে এতোটা ছেলেমানুষী করে লাভ নেই। কিন্তু কেন যে তার মন ছটফট করে আবারও, ভেবে পায় না সে। ভোর রাতে কি সব স্বপ্ন দেখে ধড়ফড়িয়ে ওঠেÑখানিকটা মনে আসে তার, কিছুটা তালগোল পাকিয়ে যায়। মনে যা করতে পারে তাতে কালো কুচকুচে কম্বল আর পাঁক দিয়ে ওঠা ধোঁয়ার কুণ্ডলী রয়েছে যাতে তার মনে হয় অশুভ কিছুর সঙ্কেত এটি। কোথায় যে কোন বিচ্যুতি ঘটবে হিসেব করতে বসে সে আর ডুকরে ডুকরে কাঁদে এই ভেবে যে ভোর রাতের স্বপ্ন সত্য হয়। সত্যিই ভোর রাতের স্বপ্ন সত্যি হয়? কতবার তো ভালো কিছু দেখেছে নিঃসন্দেহে। সেগুলো ফলেছে কি? এই সব ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে পড়ে সে। তারপর সারাদিনের ব্যস্ততায় সব ভুলে যায় সে। ঈদের আয়োজন বলে কথা! গরু রাখার ঘর ঠিক করা, দরজা জানালায় নতুন পর্দা লাগানো, বিছানার চাদর বালিশের ওয়াড় বদলানো থেকে শুরু করে ঘরের ঝুল ঝাড়া, নানা ধরনের মিষ্টি পদ করা, মশলা বাটা, কাচের প্লেট গ্লাস জগ বাটি বের করাÑকাজের কি শেষ আছে! সব আগে থেকে তৈরি না থাকলে ঈদের দিন ভজঘট তো হবেই, দম নেয়ার সময় পাওয়া যাবে না। কোরবানীর ঈদ বলে কথা! আবার গরুর দেখাশোনা আছে। তাই মাঝখানে গোটা তিন তিনটে দিন থাকলেও নাভিশ্বাস উঠে যায় শাহানাসহ বাড়ির সকলের। রাতে বসে বসে আঙুল গুনতে ভুল করে না সে যদিও। ঈদের দিনটা বাড়িতে কাটিয়েই আব্দুর রাজ্জাক আসবে শ্বশুর বাড়ি। তারপর একরাত থেকে আবার তার শ্বশুর বাড়ি। তবে রাতে এখন থেকে সে বেশী করে দোয়া দরুদ পড়ে ঘুমানোর আগে। অমন দুঃস্বপ্ন কে—ই বা দেখতে চায়! আর যদিও দেখেনি, ভিতরে ভিতরে একটা কেমন খচখচ করে তার: ভয়ে ভয়েও থাকে খানিকটা।
ঈদের দিন তার চাঁদ রাতের মতো আনন্দ হয় কেননা ঠিক পরের দিন যেমন ঈদ আসে খুশী নিয়ে, তার চেয়ে সম্ভবত ঢের গুণ ভালো লাগার অনুভূতিতে ভাসে সে আব্দুর রাজ্জাক আসবে বলে। মনে মনে এবার প্রতিজ্ঞাও করে যে আর কখনও একা আসবে না; দু’দিন হোক বা চার দিন, এক সাথে আসবে এবং এক সাথেই যাবে—ছাড়াছাড়ি আর নয়। তুমুল ব্যস্ততায়, তাজা রক্তের গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য, ছিন্ন রক্তনালী নিয়ে ছটফট করতে করতে কালো গরুটির এক পাশে কাঁত হয়ে স্থির হয়ে যাওয়ার ছবি, ছুরির পোঁচে পোঁচে মোটা চামড়া আলাদা করা আর হাড্ডিসহ মাংস বড় বড় কোপে কাটার শব্দ, হয়তো নির্জীব প্রাণীটির অঙ্গ প্রত্যঙ্গ থেকে তার জীবন চলে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে চারপাশ থেকে ধীরে ধীরে মিইয়ে আসা কেমন একটা গরম ভাপে, রক্ত—মাংসে মাখামাখি একটা গা গুলানো গন্ধে দিনটা কেটেই গেলো তার। পরের দিন ভোর থেকে তার অপেক্ষা। এতো দীর্ঘ যে প্রতীক্ষা হতে পারে, বোঝেনি সে কখনও। সেকেণ্ডের কাঁটাও যেন ঘুরতে চাইছে না। সময়ের যেন ধ্যানমগ্ন, স্থির হবার সময় আজ। ঘর বার করতে করতে সকাল পেরোলো। নাস্তায় তৈরি আব্দুর রাজ্জাকের প্রিয় খাবারগুলো কাঠের মিটসেফে উঠে গেলো। দুপুরের রান্নায় মাকে সাহায্য করতে করতে উঠোন পেরিয়ে স্যান্ডেলের ঘষায় ধুলো ওড়ার জন্য দৃষ্টি প্রসারিত করে সে বারবার। নাহ! কোনো চিহ্নও নেই কারো আসার! না কি এ পাড়া আজ ধূলিশূন্য হয়েছে, কে জানে! দুপুর পেরোলো একই তৃষ্ণা নিয়ে। এতো মানুষের চলা বলার শব্দের মাঝেও কেমন এক সুনসান স্তব্ধতা। অভিমান জমতে শুরু করে তার মধ্যে ভালোবাসার ভাঁজে ভাঁজে ঠিক যেমন পাটিসাপটার ভিতরে থাকে ক্ষীরের পুর। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলে গরম চায়ের ধোঁয়ার সাথে যেন তার তীব্র কষ্ট, অসহ্য যন্ত্রণা বোধ আর ভয় বেরিয়ে আসতে শুরু করে। সারা দিন ধরে প্রায় না খাওয়া শরীর গোলাতে শুরু করে। সন্ধ্যাও দ্রুত শেষ হয়ে রাতে পরিণত হয়, সোমত্ত রাত দীর্ঘায়ু নিয়ে আসে ঝুপ করে যেন দীর্ঘতম নীলনদ থেকেও বড় সে, যেন কখনোই সে শেষ হবে না।
..ওরকমটা মনে হয় বটে কিন্তু চিন্তায়, অস্বস্তিতে, আচ্ছন্নতায় ঠিকই অন্ধকার কেটে আবার নতুন দিনের শুরু। দুপুর বারোটা পর্যন্ত আব্দুর রাজ্জাকের জন্য অপেক্ষা করে বাবাকে বলে লোক পাঠায় শ্বশুর বাড়িতে। বিপদআপদ তো হতেই পারে। নিশ্চয়ই কারো না কারো শরীর খারাপ করেছে আচমকা। অভিমান, কষ্ট সব যেন সূর্য ওঠার সাথে সাথে কালো রাত মিলিয়ে যাবার মতো উবে গেলো; তার জায়গায় জমা হলো জমাট বরফের মতো ভয়। শরীর তার শিউরে উঠতে লাগলো না জানা বিপদের আশঙ্কায়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত বড় হতে হতে মধ্যরাতে পোঁছানোর আগেই খবর নিয়ে আসে খবর আসতে যাওয়া মানুষটি। আদতে সেটি কোনো খবরই নয় কেননা সে জানায় আব্দুর রাজ্জাকের কোনো খবর নেই, ঐ বাড়িতে সে যায়নি। তারা বরং ভেবেছে যে এবার শ্বশুর বাড়িতেই ঈদ করছে সে। ‘হায় আল্লাহ’ বলে চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠে শাহানা। বুকের পাঁজর ভেঙে হৃৎপিণ্ড যেন তার ধপাস করে লেপা উঠোনে পড়ে আর তারপর সকালে ছয়জনে হাত পা ধরে ধারালো লম্বা ছুরিতে অমন শক্তপোক্ত কালো গরুটার গলার নালী কেটে দিলে যেমন তড়পাচ্ছিলো, ঠিক তেমনই যেন ছটফট করতে থাকে; রক্ত যেন তিরতির করে বেরোতে থাকে। কয়েকজন ধরাধরি করে অজ্ঞান তাকে ঘরে এনে খাটে শুইয়ে দেয়। জলের ছিটায়, পাখার বাতাসে আর হাত পা সরষের তেলের মালিশে জ্ঞান ফিরে এলেই বাসায় যাওয়ার বায়না করতে শুরু করে। অসংখ্য শান্ত করার যুক্তিতে সে অবশেষে আগামী কাল নাগাদ আব্দুর রাজ্জাক না এলে পরশুই সে রওনা দেবে বাবার সাথে, এ কথায় একটু স্থির হয়। তাছাড়া বাবা যখন জিজ্ঞেস করে ঘরের চাবি তার কাছে আছে কি না, তখন তার মাথায় ঢোকে যে শহরে ঘরের একমাত্র চাবিটি আব্দুর রাজ্জাকের কাছেই। ফলে যদি সে কোনো কারণে আটকে পড়ে বাড়ি আসতে না পেরে থাকে এবং তার পৌঁছানোর মুহূর্তে যদি সে না থাকে, তবে তার কোনো উপায় থাকবে না আব্দুর রাজ্জাক ঘরে না ফিরে আসা পর্যন্ত। তাই একটা দিন সে দেখার জন্য নেহায়েত না পেরেই রাজী হয়।
এক দুই তিন, ছয় সাত আট, বারো এক দুই, পাঁচ ছয় সাত—ঘণ্টা এগুতে থাকে শামুকের চেয়েও ধীরগতিতে। মাঝ রাত পেরিয়ে সকাল, সেখান থেকে দুপুর, তা গড়িয়ে বিকেল, তারপর ধূসর সন্ধ্যা ছাড়িয়ে ঘন কালো রাতÑকতটা দুর্বিষহ, সে ছাড়া কেউ কি জানে! মুখে বললেই কিংবা পাশে থাকলেই কি বোঝা যায় বুকের ভিতরের সুনামি? এমনকি ঈশ্বরেরও ক্ষমতা থাকে না মানুষের গভীর দহন অনুভব করারÑবোঝা আর অনুভবে বিস্তর তফাৎ যেহেতু। সবার মাঝে থেকেও তাই দলছুট ছোট্ট হাঁসছানার মতো কিংবা ডানা ভেঙে যাওয়া পাখির মতো খুব নিঃসঙ্গ হয় মানুষ। রাত হলে সবাইকে ঘরে পাঠিয়ে সত্যিকার অর্থেই সে একাকী হয়; সবার সান্ত্বনা, প্রবোধ ইত্যাদির হট্টগোলে আসল ঘটনা যেন কেমন ভাসা ভাসা ছিলো এতো সময়; নিস্তব্ধতায় এখন তা সশব্দে বিস্ফারিত হয়, হাজার ধরনের বিপর্যয়ের হরেক বিভীষিকার চিত্র সম্ভাব্যের তালিকায় ঘোড়দৌড় চালায় তার চোখের সামনে। বায়োস্কোপের মতো একটার পর একটা বিপদের মুহূর্ত আসে এবং কাঁপিয়ে দিয়ে যায় আমূল। তারপর আবার মনে হয় উপরওয়ালা আছেনÑকোনো খারাপ তার সাথে হতে পারে না; হয়তো সাময়িক পরীক্ষা, ঐ মাসিক বা ষান্মাসিক পরীক্ষা যাকে বলে আর কি, ঈমানের জোর দেখার জন্য। ফলে সে চার রাকাত নফল নামাজ আদায় করে তজবিহ নিয়ে বসে। “লা হাওলা..” পড়তে থাকে সে, পড়তেই থাকে এবং আওড়াতে আওড়াতে তার হয়তো খানিকটা ঝিমুনি আসে। ঘুমিয়ে সে দেখে চাটাই ভিজে আছে রক্তে, শিংসহ গরুর মাথাটা কাত হয়ে যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে যেখানে সে চুলোর আগুনে শিকে গেঁথে মাংস পোড়াচ্ছে এবং খুব চেষ্টা করছে যেন পুড়ে না যায়; কিন্তু ঢিমে আঁচ থাকা সত্ত্বেও বারবার পুড়ে কয়লা হয়ে যাচ্ছে, আর কোনোটা পুড়ে শিকে লেগে না থেকে ঝুপ করে পড়ে যাচ্ছে জ্বলন্ত চুলোর গহ্বরে আরো পোড়ার জন্য। আর সেই গন্ধ তার নাকে যেন প্রবল বেগে ধাক্কা মেরে একেবারে বৃহদন্ত্র পর্যন্ত পৌঁছে যায় নিমেষেই। শরীর গুলিয়ে ওঠে; বমি পায় তার। হাতের শিক ফেলে দৌড়ে বাথরুমে যেতে গিয়ে ঘুম ভাঙে তার এবং জপতে থাকা তজবিহ মেঝেতে খুঁজে পায়। দ্রুত সেটা উঠিয়ে চুমু খেতে খেতে এমন স্বপ্নের মানে বোঝার চেষ্টা করে সে এবং পরিবর্তে মাথা চক্কর দিয়ে ওঠা টের পায়। পোড়া গন্ধ যেন তার মাথার খুলিতে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে, কান দিয়ে গরম ছাইরঙা ধোঁয়া বেরোয়। স্বপ্ন যে দেখেছিলো আর সেটা নিয়ে সে ভাবছিলো, সব আবছা হয়ে আসে ধোঁয়ার কুণ্ডুলিতে। তাছাড়া স্বপ্নের কি আর আসলেই কোনো মানে হয়? আকস্মিকই তার দস্তয়ভস্কির নাম মনে পড়ে। আব্দুর রাজ্জাক তাকে শুনিয়েছিলো তাঁর লেখা থেকে। অতো কিছু সে বোঝেনি যদিও কিন্তু স্বপ্নের যে কত রকমের ব্যাখ্যা হতে পারে, মুখে হাত লাগিয়ে শুনতো সে যেন আরব্য রজনীর গল্প শুনছে! আর মনে হতো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী লোকটির পাশে বসে আছে সে। পোড়া গন্ধটা তাকে তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে এমন ভাবে যেন তার সব কোষ পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে; অবর্ণনীয় অনুভূতিতে মেজাজ, মন সব তেতো হয়ে থাকে। মাথা ঘোরা থেকে বাঁচার জন্য সে শুয়ে পড়ে, একটু পর উঠে পড়বে ভেবে। কিন্তু গভীর ঘুম জেঁকে ধরলে ফজরের আজান শুনতে পায় না সে, পাখির কিচিরমিচির, কাকের তারস্বরে কা কা ডাক, মুরগীর কুককুরুক্কু, গরুর হাম্বা করা, কুকুরের ঘেউ ঘেউ, ছানা বিড়াল আর তাদের মায়ের মিঁউ মিঁউ, কলতলায় বাসনকোসনের শব্দ কিছুই তার কানে যায় না। নয়টা নাগাদ সে হুড়মুড় করে উঠে তৈরি হয়ে নেয় বাবার সাথে বাস ধরবে বলে। কিন্তু ঐ যে বলে বিপদ আসে চৌদ্দ গুষ্টি নিয়ে। হেলপারের সাথে তর্ক বিতর্ক হওয়ায় বাস চলাচল বন্ধ। আবার শোনা গেলো সামনে গ্রামের লোকেরা রাস্তা বাঁশ দিয়ে আটকে রেখেছে। কেউ কেউ আবার ফিসফিস করছে লাঠিসোঁটা নিয়ে আক্রমণের। আসন্ন বিপদের কথা চিন্তা করে শাহানার বাবা ফিরে যান বাড়িতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় কন্যাকে নিয়ে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে লোক পাঠিয়ে খবর নেবেন তিনি এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই তিনি আবার রওনা দেবেন। বার কয়েক লোক পাঠিয়েও সমাধানের কোনো খবর না পেলে অপেক্ষা ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকে না কারো। অনন্তকালের প্রতীক্ষা! ঘড়ির কাঁটা কোনো মতেই এগুতে চায় না; যেন তার শিকড় জন্মেছেÑসরা উচিৎ, নড়া দরকার কিন্তু পারছে না। অবশেষে বেলা চারটে নাগাদ খবর এলো কোনো এক ধরনের সমঝোতা হয়েছে, বাস চলবে, বাঁশ সরবে এবং এ খবরের সাথে সাথে সময়ও নড়তে শুরু করলো। তাড়াহুড়ো করে বেরোতে গিয়ে বাম পায়ের নখ প্রায় উল্টে গিয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড। শাহানার মায়ের মনে কু ডেকে উঠলো এতো বাধা কেন ভেবে! কোনো দিকে ভ্রম্নক্ষেপ করার সমস্ত বোধ শাহানার ততক্ষণে লুপ্ত। এমনকি ব্যথার কোনো ছাপও নেই তার মুখে, কেবল আছে ভয়ের এক পুরু আস্তরণ সমস্ত অবয়ব জুড়ে যা ভেদ করে অন্য কোনো অনুভূতি তার কাছে পৌঁছানো পুরোপুরি অসম্ভব। যেন কোনো এক যাদুর টানে সে এগিয়ে চলে। পুরোটা পথে সিটে হেলান দিয়ে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন গুরুতর চিন্তার বীজতলায় কাজ করছে সে মগ্ন হয়ে; আদতে কিন্তু তার দৃষ্টি শূন্য, চিন্তার জগৎ হিমে জমাটÑকোনো সাড়া নেই তাতে। এমনকি বাবা কিছুক্ষণ বাদে বাদে সে ঠিক আছে কি না, কিছু লাগবে কি না জানার জন্য ডাকলে সাড়া না পেয়ে হাতে মৃদু ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করলে সে তাকায় বটে, মাথাও নাড়ে কিন্তু তাতে কোনো বোধ প্রকাশ পায় না, যেন অনেকটা চাবি দেয়া পুতুলের মতো ঘাড় ঘোরায়, হাত নাড়ালেও অনুভূতির বিন্দুমাত্র গন্ধ বাতাস তাতে থাকে না। এমনকি পুরো পথে বারবার বলেও বাবা তাকে কিছুই খাওয়াতে পারে না।
এই নির্বাক, শেষ হতে না চাওয়া পথ চলা শেষ হলে বাসস্ট্যান্ড থেকে রিক্সা নিয়ে যখন তারা বাসার দিকে এগোয়, তখন তার বোধে যেন টোকা পড়ে। হেঁচকি তোলা কান্না গিলে ফেলে বাঁ হাতের তালু দিয়ে চোখ মোছে সে। আশ্চর্যজনকভাবে পুরো রাস্তায় এই প্রথম তার মনে পড়ে মেয়ের কথা এবং আরো অবাক করা বিষয় অতোটুকু বাচ্চাও কেমন যেন এই পরিস্থিতির সবটুকু আঁচ করতে পেরে পুরো রাস্তাই চুপচাপ থাকে। মানুষেরও কি ঘ্রাণশক্তি থাকে বিপদ বোঝার? রিক্সা এগোয় ধীরে ধীরে তিনজন মানুষের ভার নিয়ে আর একজন মানুষের বুকের পাঁজর থেকে ফুসফুস প্রায় বেরিয়ে আসার মতো পরিশ্রমে। এই প্রথম শাহানা বলে ওঠে, “আব্বা, চাবি তো নাই। উনি যদি ঘরে না থাকেন?”। সমস্ত অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তার পরও যেন তার বাবার একটু স্বস্তি মেলে মেয়ের প্রশ্ন শুনে বোধজ্ঞান ঠিক আছে ভেবে। তিন চাকা যত এগোয়, শাহানার হৃৎপিণ্ড যেন পাল্লা দিয়ে সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হতে থাকেÑএতো দ্রুতগতিতে যে মনে হয় সে কোনো সময় ছিটকে বেরিয়ে আসতে পারে, আছড়ে পড়তে পারে পিচঢালা রাস্তায় এবং পারে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে ছড়িয়ে পড়তে চারপাশে। অজ্ঞাতসারেই সে বাবার বাহু চেপে ধরে এতো জোরে যে ছোটবেলায় সাপে কামড়ানোয় তাঁর বাবা দড়ি দিয়ে যেমন করে তাঁর পা বেঁধে দিয়েছিলেন শক্ত করে সে ছবি চোখে ভেসে উঠলো তৎক্ষণাত। মেয়ের হাতের উপর খুব আস্তে হাত রাখলেন। নির্ভরতার তো কোনো শব্দ হয় না; বরং নির্জনতার মতোই তা নিঃশব্দ হয় অথবা অরণ্যে মর্মরের মতোই হয় যাতে এক মোলায়েম ছন্দ থাকে যার জন্য কান উদগ্রীব হয়, যে কারণে কখনও মানুষ কারো চোখে, কারো মুখের হাসিতে, স্পর্শে, আলতো ছোঁয়ায়, কাঁধের উপর দৃঢ় সবল হাতে, হৃৎপিণ্ডের ওঠানামায়, অথবা ‘আছি তো আমি’ ধরনের ছোট্ট কথায় কতটা যে স্বস্তি মেলে মানুষের তা যে পেয়েছে একমাত্র সে—ই বলতে পারবে। আর বাবা তো বাবাই। তার নির্ভরতার কত যে ধরন, কেউ বোধ হয় হিসেব করে উঠতে পারেনি, পারবেও না কোনো দিন। দুশ্চিন্তার কালো চাকা ঘুরতে ঘুরতে রিক্সার চাকায় ভর করে তারা কলোনির গেটে যখন পৌঁছায়, রাত তখন প্রায় এগারো। ভিতরে এসে রিক্সা মিনিট দুয়েক চলতেই শাহানা তাদের বাসার মোড় দেখতে পেয়ে প্রায় লাফিয়েই নেমে যেতে উদ্যত হলে বাবা হাত চেপে ধরেন তার। বাঁক ঘুরতেই আলো আঁধারি ঠেলে মানুষের জটলা দৃশ্যমান হয় দু’জনের কাছেই। ঠিক তাদের বাসার সামনেই। আর বোঁটকা গন্ধে গা গুলিয়ে আসতে থাকে। আঁচল টেনে নাক মুখ চেপে ধরলে যা যা প্রশ্ন করে বা যা যা বলে কিংবা বলতে চায়, তার কিছুই অর্থবহ শব্দমালা হয়ে পৌঁছায় না কারো কানেই। ভিড়ের শুরু যেখান থেকে রিক্সা সেখানেই থেমে গেলে নেমে এগোতে থাকে শাহানা, পেছনে বাবা, বাবার কোলে তার আত্মজাÑদুর্গন্ধেরও যেন সম্মোহনী শক্তি থাকে যা তাকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে ঘটনাস্থলের কেন্দ্রের দিকে যদিও পা তার চলতেই চায় না যেন। চারপাশ থেকে অনেক গুঞ্জন শুনতে পায় সেÑএকলা ছিলো, কখন হইছে কে জানে, এই দিক দিয়ে যাইতেই পারতাম না, কয়দিন ধইরা খালি গন্ধ পাই, আমি মনে করছি কোরবানীর ময়লাটয়লার গন্ধ, আমাদের তো জানালা বন্ধ করে রাখি গত কয়দিন, হিটারে মনে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি নানা স্পষ্ট ও অর্ধস্পষ্ট কথা কানে আছড়ে পড়ে তার; অর্থ করতে চায়, কিন্তু মরীচিকার মতো মিলিয়ে যায় সব। ভিড়ের মধ্য দিয়ে গা বাঁচিয়ে বিল্ডিংয়ের সামনে আসতেই দেখে চাটাইতে মুড়ে তিনজন কিছু একটা নিয়ে আসছে বাইরে। পুলিশের গাড়ি এক পাশে। আর আছে অ্যাম্বুলেন্স। ঘাসের উপর রাখতেই মোড়ানো চাটাই খুলে গেলে সবাই ছিটকে দূরে চলে আসে উল্কাপিণ্ডের টুকরোর মতো। বিকট গন্ধ প্রকট হতেই ওয়াক ওয়াক করে ওঠে কেউ কেউ। কেবল যে ক’জন বয়ে নিয়ে এসেছিলো, কোনো বিকার দেখা যায় না তাদের। কালো একটা লম্বাটে কিছুর পাশে বসেই বোতল খুলে ঢকঢক গিলে নেয় আবারও। পুলিশের তাড়ায় দড়ি দিয়ে চাটাই বাঁধতে গেলে যেন পোড়া মাংস খুলে খুলে এদিক ওদিক দিয়ে বেরিয়ে পড়তে চায়। যতবার তারা গিঁট দিতে যায় ততবারই একই দশা হলে পা আর মাথার উপরের খালি অংশের চাটাইয়ের মুখ দড়ি দিয়ে বেঁধে দু’পাশে দুই ডোম আর মাঝখানটা একজন উঁচু করে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর জন্য এগোলে মাঝখানের নরম অংশ আবারও বেরিয়ে এসে পড়ে ঘাসের উপর। চারপাশে লোকজন আবারও ওয়াক, ও মাগো বলে দূরে ছিটকে পড়ে। নাকে কাপড় দিয়েই এই ফাঁকে শাহানা দৌড় দেয় ঘরের দিকে। একটি পোড়া লাশ সকলকে এতোটাই মোহাবিষ্ট করে রাখে যে কেউ তাকে খেয়ালই করে না। বিদ্যুৎগতিতেই সে আবার বেরিয়ে আসে বাইরে, ‘আল্লাহ গো’ বলে চিৎকারে চতুর্পাশ প্রকম্পিত করে জ্ঞান হারায় সে। ভিড় জমানো লোকেরা সার্কাস শেষে যে যার ঘরের দিকে পা বাড়ায়। সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স তখন গন্ধযুক্ত পুড়ে যাওয়া লাশ নিয়ে বেরিয়ে যায় ফাঁকা রাস্তায়। গন্তব্য? হয়তো লাশকাটা ঘর।
