অভিনয়ে শ্যামলের দেড় যুগ

খ্যাতির মোহ নয়, কাজটাই মন দিয়ে করতে চান শ্যামল মাওলা। প্রায় দেড় যুগের অভিনয়জীবনে তিনি বারবার নিজেকে নতুন করে গড়ার চেষ্টা করেছেন। টেলিভিশনে দীর্ঘ সময় কাজ করেও যে স্বীকৃতি অধরা ছিল, ওটিটির বিস্তারে সেটিই যেন ধরা দিয়েছে তাঁর হাতে। তবে এই অর্জনকে শেষ গন্তব্য মনে করেন না তিনি। বরং প্রতিটি নতুন চরিত্রকে নিজের জন্য নতুন পরীক্ষা বলেই মনে করেন।

সম্প্রতি নাকে ছোট একটি অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছিল শ্যামল মাওলাকে। সে কারণে কয়েক দিন অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন। শুক্রবার থেকে আবার কাজে ফিরছেন তিনি। প্রথমেই অংশ নেবেন একটি টার্কিশ সিরিজের বাংলা ডাবিংয়ে। এরপর আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে শুরু করবেন নতুন একটি ওয়েব প্রজেক্টের শুটিং। তবে সেটি নিয়ে এখনই বিস্তারিত জানাতে রাজি নন তিনি।

অভিনয়জীবনের প্রায় দেড় যুগ পার করে পেছনে তাকালে কী দেখেন? হাসতে হাসতে শ্যামল বললেন, ‘ভালো লাগে। আনন্দ করতে করতেই জীবনটা কাটালাম। এখনও জীবনকে উপভোগ করছি। যখন যেভাবেই ছিলাম না কেন, উপভোগ করেই কাজ করেছি। বয়স অনুযায়ী পারফরম্যান্স করে যাচ্ছি। একটা জার্নির মধ্য দিয়েই তো যাচ্ছি।

এই জার্নির শুরুটা কিন্তু অনেক আগে। বাবা ছিলেন থিয়েটারকর্মী। সেই সূত্রেই ছোটবেলা থেকে নাটকের পরিবেশে বেড়ে ওঠা। শিশু থিয়েটারে অভিনয়ের হাতেখড়ি, এরপর বড়দের নাট্যদলে নিয়মিত কাজ। মঞ্চের সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই টেলিভিশন নাটকে অভিষেক। এরপর এক যুগেরও বেশি সময় ছোট পর্দায় কাজ করেছেন। অসংখ্য নাটকে অভিনয় করলেও খুব বেশি আলোচিত চরিত্র তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে কখনও প্রশ্ন ওঠেনিনিজের কাজে তাঁর নিষ্ঠা পরিশ্রম।

ওটিটির আগমনের পরই যেন বদলে যেতে শুরু করে তাঁর ক্যারিয়ারের গতি। ২০১৮ সালে সৈয়দ আহমেদ শাওকীর থ্রিলার ড্রামাক্যাশ’— অভিনয়ের মাধ্যমে নতুন যাত্রা শুরু করেন। এরপর তানিম নূর কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়েরমানি হানিসিরিজ তাঁকে নতুনভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরে। একের পর এক ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে প্রমাণ করেছেন, নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে হাজির করার ক্ষমতা তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।

শ্যামল বলেন, ‘আমি যখন ওটিটিতে কাজ শুরু করি, তখন এই মাধ্যম এতটা জনপ্রিয় ছিল না। এখনকার মতো পরিচিতিও ছিল না। তবে এই মাধ্যম আমাকে ভালো কিছু নির্মাতার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। নিজেকে প্রমাণ করার নতুন একটা জায়গা পেয়েছি। নিজেকে ভাঙার চেষ্টা ছিল সব সময়। জানি না কতটা পেরেছি, তবে চেষ্টা করেছি।

বর্তমানে ওটিটির নির্মাতাদের কাছে তিনি অন্যতম ভরসার নাম। নতুন কোনো সিরিজের পরিকল্পনায় তাঁর নামও চলে আসে আলোচনায়। কিন্তু কাজ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো শর্টকাটে বিশ্বাস করেন না তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘পরিচালক, গল্প চরিত্রএই তিনটি বিষয় সব সময় মাথায় রাখি। এই তিনটির সমন্বয় হলেই কাজ করতে আগ্রহী হই।

ওটিটি সিনেমার ব্যস্ততায় যখন অনেক অভিনেতাই টেলিভিশন নাটক থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, শ্যামল সেখানে ব্যতিক্রম। কারণ তাঁর কাছে মাধ্যম নয়, অভিনয়টাই আসল। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে অভিনয়ই মূল বিষয়, মাধ্যম নয়। ওয়েব, টিভি, থিয়েটার কিংবা রেডিওযেখানেই অভিনয়ের সুযোগ পাই, যদি চরিত্রটি আমাকে টানে, আমি করতে চাই। প্ল্যাটফর্মের চেয়ে গল্প, চরিত্র আর সৃষ্টিশীলতাই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বড় পর্দাতেও ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করছেন শ্যামল। ২০২১ সালে তৌকীর আহমেদেরস্ফুলিঙ্গদিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তাঁর। পরেবনলতা এক্সপ্রেস’— অভিনয় করে প্রশংসা কুড়ান। সম্প্রতি তিনি শেষ করেছেন রবিউল আলম রবির সুরাইয়া ওয়েব ফিল্মের শুটিং। শিবব্রত বর্মণের ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটিতে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছেন নাজিফা তুষি। শহুরে জীবনের রুক্ষ বাস্তবতা মানবিক গল্পের মিশেলে নির্মিত রোমান্টিক ঘরানার ছবিটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেওয়ার পর দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে নির্মাতার।

পরিচালনায় আসার ইচ্ছা আছে কিনা প্রশ্নের জবাবে শ্যামল বলেন, ‘এখনই পরিচালনা নিয়ে ভাবছি না। তবে ভবিষ্যতে হয়তো করব। দীর্ঘদিন অভিনয় করতে করতে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। সময়, পরিকল্পনা আর মানসিক প্রস্তুতি ঠিক হলে একদিন পরিচালনায় আসতে পারি। কিন্তু এখন পুরো মনোযোগ শুধু অভিনয়ে।

বর্তমান সময়ের দর্শকদের রুচির পরিবর্তনও ইতিবাচকভাবে দেখেন তিনি। তাঁর মতে, ‘দর্শক এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা গল্প, অভিনয়, নির্মাণশৈলীসবকিছু বিচার করে। তাদের প্রত্যাশা বেড়েছে। এই প্রত্যাশাই আমাদের আরও ভালো কাজ করতে উৎসাহ দেয়।

কাজের বাইরে শ্যামল মাওলা অবশ্য একেবারে অন্য মানুষ। শান্ত, নিরিবিলি জীবন তাঁর পছন্দ। খুব বেশি মিশুক নন; বরং নিজের সময়, নিজের পরিসর আর ব্যক্তিগত জীবনকে গুরুত্ব দেন।

ওটিটির সাফল্য, সিনেমার নতুন সম্ভাবনা কিংবা জনপ্রিয়তার আলোসবকিছুর মধ্যেও শ্যামল মাওলার লক্ষ্য একই রয়ে গেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর কাজ। তাই খ্যাতির পেছনে ছোটা নয়, প্রতিটি চরিত্রে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার মধ্যেই তিনি খুঁজে পান অভিনয়ের আসল আনন্দ।

Related Posts