ধিক্কার জানাই হত্যা ও প্রতারণাকে
পুরো পৃথিবীর কোথাও, আত্মরক্ষার্থে ছাড়া অন্যকে হত্যা করার কোনো অধিকার কারো নেই। প্রায় প্রতিটি দেশের ডোমেস্টিক ল, আন্তর্জাতিক ট্রিটি এবং অন্য যাবতীয় আইনে হত্যা নিষিদ্ধ। শুধু হত্যা নয়, অন্যকে আঘাত করাও আইনত নিষিদ্ধ। প্রধানত মানুষের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য, দুষ্কৃতকারী—মানুষের হাত থেকে মানুষের জানমাল সুরক্ষার জন্য পৃথিবীতে গোত্রে গোত্রে আইনের সূত্রপাত। শেষ পর্যন্ত এই আইন বিশ্ব নিয়ন্ত্রণে এখন প্রধান চালিকা শক্তি। আর মানুষের ক্রোধের বা হিংসার, বা প্রতিহিংসার হাত থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য সংস্কৃতির সূত্রপাত। সূত্রপাত ন্যায়বোধের এবং সহিষ্ণুতার শিক্ষার। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে সে দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থা মানুষকে ন্যায়বোধ শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। যেসব দেশকে আমরা তথাকথিত সভ্য দেশ বলি সেসব দেশে আইন খুবই কঠোর ও তার প্রয়োগ অত্যন্ত দৃঢ়। সে সব দেশে আইন প্রয়োগকারীরাও কঠোর এবং বিচার ব্যবস্থা আপাত সুষম। সে কারণেই এইসব দেশ ‘সভ্য’। তা সত্ত্বেও সেসব দেশকে মানুষের বিবেক বোধ, বুদ্ধি ও সহিষ্ণুতার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়নি। সেসব দেশেও রয়েছে প্রশিক্ষিত পুলিশ এবং আইন—শৃঙ্খলা রক্ষাকারী। তারা মানুষদের রক্ষা করে। আর অশিক্ষিত ও অগণতান্ত্রিক দেশে পুলিশও ভক্ষক। ক্ষমতাসীনদের অন্যায় নির্দেশ পালন করে তারা।
রাজনীতির সূত্রপাতও রাষ্ট্রকে নির্ধারিত নিয়মকানুনের মধ্যে চালিত করে দেশের জনগণকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য, ন্যায় বিচারের জন্য এবং অধিকাংশ মানুষের ইচ্ছায় দেশ চালানোর জন্য। এই নিরাপত্তা যেমন অর্থের, তেমনই খাদ্যের, শিক্ষার, মানবাধিকারের, সর্বোপরি বেঁচে থাকার। কিন্তু খুব কম মানুষ লোভ এবং অন্যায়ের উর্ধে উঠতে পারে। অর্থ ও ক্ষমতার লোভের জন্য রাজনীতিকরা বেশি দুনীর্তিপরায়ণ হয়ে ওঠে। কারণ তাদের হাতে ক্ষমতা থাকে। তারা ভুলে যায় জনগণ তাদের দেশ শাসন করতে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছে, ক্ষমতায় বসে মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা আকড়ে থাকার জন্য নয়। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চলমান থাকলে সরকার যদি (যে কোনো দেশে) জনগণের দাবি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, জনগণের রাস্তায় নেমে আসা গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে জনগণের ভোটে সরকার নির্বাচিত হয়, সেই জনগণের ওপর কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ, এমনকি গুলি করতেও দ্বিধা করে না। এর পরিণতি কখনো ভাল হয় না। আমেরিকায় আইনের কার্যক্রমের বিরোধিতা করতে গিয়ে কয়েকটি প্রাণ গেল মিনিয়াপোলিস সহ অন্য শহরে। এটা দুর্ভাগ্যজনক। এই গুলির কারণে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তায় টান পড়েছে। বাংলাদেশে সরকার বিরোধী বিক্ষোভে গুলির ঘটনা এই দেশটি স্বাধীন হওয়ার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছেÑ সেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির কথা কার না মনে আছে?
শুধু ছাত্র—জনতা নয়, দেশে দেশে, পছন্দ না হলে দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করতেও ছাড় দেয় না এক শ্রেণীর দুবৃর্ত্ত বা মিলিটারি। কেবল উপমহাদেশেই কত জন জাতির পিতা বা রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা হয়েছে, ভাবলে মানব সমাজের প্রতিই বিবমিষা তৈরি হয়। সেই মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী দিয়ে শুরু। তারপর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান (১৬ অক্টোবর, ১৯৫১), বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৫ আগস্ট, ১৯৭৫), পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো (৪ এপ্রিল, ১৯৭৯) (তাঁকে ফাঁসি দেয়া হয়), বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান (৩০ মে, ১৯৮১), ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী (৩১ অক্টোবর, ১৯৮৪), ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী (২১ মে, ১৯৯১), শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট রানাসিংহ প্রেমদাস (১ মে, ১৯৯৩), নেপালের রাষ্ট্রপ্রধান কিং বীরেন্দ্র (১ জুন, ২০০১) এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো (২৭ ডিসেম্বর, ২০০৭)। যদি ষড়যন্ত্র হয়, তাহলে পাকিস্তানের মিলিটারি শাসক প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকও। তিনি বিমান ‘দুর্ঘটনায়’ মৃত্যুবরণ করেন (১৭ আগস্ট, ১৯৮৮)।
সম্ভবত পৃথিবীর আর কোনো অঞ্চলে এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এতজন জাতির পিতা, রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানকে হত্যা করা হয়নি। ভারতবর্ষের ইতিহাস হাজার হাজার বছরের। ঐতিহ্যও অনির্বচনীয়। এই অঞ্চলের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি দিয়েছে পৃথিবীর নানা অঞ্চলের শাসকরা। আর্যরা সেই প্রায় খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ সনে ভারতে আসে মধ্য এশিয়া থেকে, গ্রীক বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ভারতে এসে ফিরে যান, টার্কিশ—আফগানরা আসে দ্বাদশ শতাব্দীতে, মধ্য এশিয়া থেকে মোগলরা এসে সা¤্রাজ্য স্থাপন করে। এরপর আসে আর্মেনিয়ান, পতুর্গীজ, ওলন্দাজ এবং বৃটিশরা। ইতিহাস বলে খ্রিস্টোফার কলম্বাস ভারতে আসার উদ্দেশেই জাহাজে রওনা হয়েছিলেন স্পেন থেকে। কিন্তু ভুল করে তিনি আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে পৌঁছান মধ্য আমেরিকার বাহামায়। তিনি সেখানকার মানুষদের ভারতীয় মনে করে ‘ইন্ডিয়ানস’ হিসাবে উল্লেখ করেন।
হাজার হাজার বছর ধরেই ভারতবর্ষের এই গুরুত্ব ছিল। সবচেয়ে গৌরবের ব্যাপার হলো বৃটিশ, আইরিশরা আমেরিকা, ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকায় খুঁটি গেড়ে বসে সেসব দেশের আদিবাসীদের উচ্ছেদ বা অবদমন করে। কিন্তু ১৯০ বছর শাসন করেও ভারতবর্ষের জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ব্যবসায়ী হিসাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছদ্মবেশে ভারতে ঢুকে পড়ে প্রতারক বাঙালিদের (মিরজাফর, জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ প্রমুখ) সহায়তায় ক্ষমতা দখল করে ঔপনিবেশিক শাসনের যাত্রা শুরু করে বাংলা থেকেই সেই ১৭৫৭ সালে। আর শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রধানত বাঙালি নেতৃবৃন্দের দুর্দান্ত আন্দোলনেই এবং দীনবন্ধু মিত্র ও নজরুলের মত লেখক কবিদের সাহসী লেখনীসহ সার্বিক কারণে নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলে ‘পরম পরাক্রমশালী’ বৃটিশ ঔপনিবেশিক রাজা—মহারাজারা। এই ভারতবর্ষ ভেঙে দুটি দেশ হয়। পাশে ছিল শ্রীলংকা। ভাবলে বিস্ময় জাগে সেই ভারতের মহান নেতা, টাইম ম্যাগাজিন যাকে বিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর তিন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির একজন করে, সেই গান্ধীকে হত্যা করা হয় ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি। আর বাংলাদেশের জাতির পিতাকে হত্যা করা হয় দেশ স্বাধীনতা অর্জনের সাড়ে তিন বছরের মাথায়।
যে কোনো হত্যা হত্যাই। একজনই হোক, ৩০ লক্ষই হোক আর ৮০০ জনই হোক। হোক সাধারণ ছাত্রজনতা বা জাতির পিতা। হত্যা আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে কোনো সমস্যার সমাধান দিতে পারেনি। ১৯৭১ সালে যে পাকিস্তানি জেনারেলরা দম্ভ করে বলেছিল, তারা মানুষ চায় না, চায় কেবল পূর্ব পাকিস্তানের মাটি, সেই পাকিস্তানের ৯৪ হাজার সৈন্যকে অস্ত্র ও বেল্ট—ব্যাজ খুলে বাংলাদেশের মাটিতে আত্মসমর্পন করে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ফিরে যেতে হয়। প্রতারণা করে, মিরজাফরদের দিয়ে বেঈমানি করে ক্ষমতা দখল করলেও বৃটিশদের চলে যেতে হয়েছে, হয়ত এর জন্য ১৯০ বছর লেগেছে।
প্রতারণা এবং হত্যাÑ দুটিই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও নেপালের জনগণ, রাজনীতিক এবং মিলিটারি এই দুইটি বিষয়কে তাদের দেশের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করে যে ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ করে চলেছে, তাকে ধিক্কার জানাই। ধিক্কার জানাই রাজনীতির জন্য এবং বাইরে সকল হত্যাকান্ডকে।
আমরা যুদ্ধহীন, হত্যাবিহীন, প্রতারণাহীন আগামী চাই।
