ফাইব্রয়েড টিউমার কি কি ক্ষতি হয়
ডাঃ শাহজাদা সেলিমঃ মেয়েদের শরীরে মাতৃত্ব ধারণের শত্রু, ফাইব্রয়েড—এর ভূমিকা খুবই উল্লেখযোগ্য। এই রকমই একটি সমস্যা নিয়ে আমার চেম্বারে এসেছিলেন শাশুড়ি অপর্ণা চট্টোপাধ্যায় ও তার বউমা মিতালি। সমস্যা— বারবার মিসক্যারেজ। মিতালির জরায়ুর ভেতরে কয়েকটি ফাইব্রয়েড আছে। মিতালির জরায়ুর অন্তঃত্বকে ফাইব্রয়েড থাকার জন্যেই বারবার গর্ভপাত হয়ে যাচ্ছে। যদিও শাশুড়ির ধারণা ছিল, ‘একটু বেশি বয়সে মা হতে চাইছে বউমা, তার ওপর চাকরিজীবী হওয়ার দৌড়ঝাঁপ করায় হয়ত বারবার মিসক্যারেজ হয়ে যাচ্ছে’। মিতালি ও তার শাশুড়িকে আমি যে দু’টি বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছিলাম তা হলোÑ
১) ফাইব্রয়েড এক ধরনের টিউমার। কিন্তু এই টিউমার থেকে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা এক শতাংশেরও কম।
২) অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপারেশন না করেই চিকিৎসা করা সম্ভব এবং সন্তান নেয়ার আগে অপারেশন না করে শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিলেই হবে। তবে সন্তান প্রসবের পর ফাইব্রয়েড সারিয়ে ফেলতে হবে।
ফাইব্রয়েড কি এবং কোথায় সৃষ্টি হয়?
ফ্রাইব্রয়েড হলো নারীদেহের অত্যন্ত কমন টিউমার। নীরবে ও সন্তর্পণে বিভিন্ন আকৃতিতে এই ফাইব্রয়েড বেড়ে ওঠে। প্রতি পাঁচজন মহিলার মধ্যে অন্তত একজনের শরীরে এই অসুস্থতা দেখা যায়। প্রায় ২৫% মহিলার দেহে ফাইব্রয়েড থাকতে পারে। পনেরো—ষোলো বছর বয়স থেকে শুরু করে পঞ্চাশ বছর বয়সী যে কোন মহিলার দেহে ফাইব্রয়েড হতে পারে। তবে ২০ বছরের কম বয়সী মেয়েদের দেহে এর উপস্থিতি কম। ৩০—৪০ বছর বয়সীদের মধ্যেই ফাইব্রয়েডে আক্রান্তের হার বেশি।
কোথায় এবং কেন ফাইব্রয়েড সৃষ্টি হয়?
মূলত মহিলার জরায়ুতে ফাইব্রয়েড হয়ে থাকে। তবে জরায়ুর পেশিতে ও অন্তঃত্বকে অনেক সময় ফ্যালোপিয়ান টিউবের মুখে, ব্রড লিগামেন্ট ও ডিম্বাশয়ের পাশেও ফাইব্রয়েড সৃষ্টি হতে পারে। ২০—৫০% মহিলার দেহে এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হতে পারে। কিন্তু কেন শরীরের অভ্যন্তরীণ একাধিক অঙ্গে এই ফাইব্রয়েড সৃষ্টি হয় তার প্রকৃত কারণ এখনও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জানতে পারেননি। অনুমান করা হয়, যৌনবতী মহিলাদের দেহে ইস্ট্রোজেন হরমোন নিঃসরণের সঙ্গে এই ফাইব্রয়েড সৃষ্টির কোন সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। কারণ, নারীর দেহে যখন ইস্ট্রোজেন সর্বাপেক্ষা বেশি ক্ষরণ হয় সেই সময়, অর্থাৎ ২৫—৪০ বছর বয়সে ফাইব্রয়েড তৈরি হয়। আবার মেনোপজ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফাইব্রয়েডের বৃৎিদ্ধ থেমে যায়।
কি করে বুঝবেন?
একটু গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ্য করলেই যে কোন মহিলা বুঝতে পারবেন তার শরীরে নীরবে এই মারাত্মক শত্রু হানা দিয়েছে। শরীরে এই অসুস্থতা সৃষ্টি হলেই মহিলারা দেহে কতগুলো লক্ষণ ফুটে ওঠে। আবার অনেক সময় মহিলাদের শরীরে এই অস্বাভাবিক অসুস্থতা নীরবে থাকায় রোগী বুঝতেই পারেন না। লক্ষণগুলো হলো—
ক) ঋতুকালীন সময়ে অতিরিক্ত রক্তস্রাব।
খ) নির্দিষ্ট সময় অন্তর মাসে একবারের পরিবর্তে দশ—পনেরো দিন পর পর হঠাৎ হঠাৎ করেই রক্তস্রাব।
গ) তলপেটে ভারি কিছু থাকার অনুভূতি।
ঘ) ঋতুস্রাবের সঙ্গে পেটে অস্বাভাবিক ব্যথা।
কি কি ক্ষতি হয়?
স্বাভাবিক মা হওয়ার পথে ফাইব্রয়েড অনেকটাই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কখনও কখনও কোথায় ফাইব্রয়েড হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে অসুস্থতা। এগুলো হলো—
ক) সবসময় শরীরে একটা অস্বস্তির অনুভব হয়।
খ) জরায়ুর অন্তঃত্বকে হলে অকাল গর্ভপাত হয়।
গ) জরায়ুর ভেতরে হলে রক্তস্রাবে সমস্যা হয়।
ঘ) জরায়ুর মাংসপেশিতে হলে ঋতুকালীন সময়ে পেটে প্রচণ্ড ব্যথা হয়।
ঙ) কোষ্ঠকাঠিন্য ও রক্ত স্বল্পতা (অ্যানিমিয়া)।
চ) স্থায়ী বন্ধ্যত্ব, সাময়িক বন্ধ্যত্বও হতে পারে।
ছ) অনেকের ক্ষেত্রে মূত্রথলিতে সংক্রমণও হয়।
ফাইব্রয়েড হলে চিকিৎসা কি হবে?
অনেক মহিলার শরীরে ফাইব্রয়েড থাকলেও সারাজীবন তেমন কোন সমস্যা অনুভূত না হওয়ায় চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হয় না। আবার অনেকে এক বা দু’টি সন্তান জন্মের পর এই সমস্যায় ভোগেন বলে খুব একটা গুরুত্ব দেন না।
