গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— তেত্রিশ যে কণ্ঠে জেগেছিল পৃথিবীর ডাকঃ শিল্পী সত্য চৌধুরী
ড. জীবন বিশ্বাসঃ শিল্পী সত্য চৌধুরীর সবচেয়ে স্মরণীয় গানের একটি শুরু হয় পৃথিবীর আহ্বানেÑ ‘পৃথিবী আমারে চায়, রেখো না বেঁধে আমায়’। অথচ সময়ের স্রোতে শিল্পী নিজেই যেন ধীরে ধীরে সেই গানের আড়ালে চলে গেছেন। সুরটি রয়ে গেছে, পংক্তিটি বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে, পরবতীর্ বহু শিল্পীর কণ্ঠে গানটি নতুন জীবন পেয়েছে। কিন্তু যে কণ্ঠ প্রথম তাকে এমন প্রবল জনপ্রিয়তায় পৌঁছে দিয়েছিল, সেই কণ্ঠের নাম আজ তুলনামূলকভাবে কম উচ্চারিত হয়। তাই সত্য চৌধুরীর জীবন শুধু একজন প্রতিভাবান গায়কের জীবনী নয়, এটি রেকর্ডে সংরক্ষণ এবং ইতিহাসে বিস্মরণেরও গল্পÑগ্রামোফোন, বেতার, মঞ্চ ও চলচ্চিত্রের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কণ্ঠের গল্প। চল্লিশের দশকের অস্থির অথচ সৃষ্টিশীল বাংলার সংগীতজীবনের গল্প।
শিকড়, পরিবার ও সংগীতের উত্তরাধিকার
সত্যরঞ্জন চৌধুরীর জন্ম ১৯১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর কলকাতার গ্রে স্ট্রিটে, মৃত্যু ১৯৯৩ সালের ৫ ডিসেম্বর। বাবা যতীন্দ্রমোহন চৌধুরী ছিলেন কলকাতা উচ্চ আদালতের আইনজীবী। পিতৃপুরুষের আদি নিবাস ছিল পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) রাজশাহী অঞ্চলে। মা বিমলা দেবী বেড়ে উঠেছিলেন সমৃদ্ধ সংগীত—সাংস্কৃতিক পরিবেশে। পারিবারিক ইতিহাসের একটি সূত্র তাঁকে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়—দিলীপকুমার রায়ের বৃহত্তর আত্মীয়বৃত্তের সঙ্গে যুক্ত করে। তাঁর পিতৃকুল ও মাতৃকুলÑদুই দিকেই সংগীতচর্চার পরিবেশ ছিল; বিমলা দেবী নিজেও সুকণ্ঠী ছিলেন এবং রজনীকান্ত সেনের গান শিখেছিলেন বলে পারিবারিক স্মৃতিতে উল্লেখ আছে।
সংগীতসাধনার পথে
সত্য চৌধুরীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও যথেষ্ট সুদৃঢ়। পদ্মপুকুর ইনস্টিটিউশন থেকে মিত্র ইনস্টিটিউশনে গিয়ে ১৯৩৫ সালে প্রবেশিকা পাস করেন। পরে আশুতোষ কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংগীতই হয়ে ওঠে তাঁর গভীরতর সাধনার ক্ষেত্র। কৃষ্ণচন্দ্র দে ও শচীন দেববর্মণের কাছে তিনি গান শেখেন। আন্তঃকলেজ এবং নিখিল বঙ্গ সংগীত সম্মেলনের প্রতিযোগিতায়ও সাফল্য অর্জন করেন। সমসাময়িক স্মৃতিচারণে তাঁর কণ্ঠের শক্তির পাশাপাশি যে গুণটির কথা বিশেষভাবে উঠে আসে, তাহলো গানের নাট্যবোধÑকোন শব্দে কতখানি জোর, কোথায় সামান্য বিরতি, কোথায় সুরের উত্তরণ গানের অন্তর্নিহিত আবেগকে উন্মুক্ত করবে, সে বিষয়ে তাঁর সূক্ষ¥ উপলব্ধি ছিল।
দরাজ কণ্ঠে আবেগের বহুরূপ
এই গুণই তাঁকে কাজী নজরুল ইসলামের সংগীতবৃত্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছিল। সত্য চৌধুরী সেই প্রজন্মের শিল্পী, যাঁরা কবির সক্রিয় সংগীতজীবনের শেষপর্বে তাঁর প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে রেকর্ড করার সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রামাণ্য রেকর্ড—তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৪২ সালের আগস্টে এইচএমভির একটি নজরুলসংগীত রেকর্ডে সত্য চৌধুরী, জগন্ময় মিত্র ও প্রতিভা ঘোষ অংশ নিয়েছিলেন, নজরুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার ঠিক পূর্বপর্বে। পরবতীর্ বছরগুলোতেও সত্য চৌধুরী বারবার ফিরে গেছেন নজরুলের দেশাত্মবোধক, ভক্তিমূলক, প্রেমের ও নাট্যসংগীতে। কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের সংরক্ষিত তথ্যেও ‘মোরা আর জনমে হংসমিথুন ছিলাম’ এবং ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার’—এর মতো গানে তাঁর ঐতিহাসিক পরিবেশনের স্বীকৃতি পাওয়া যায়। সত্য চৌধুরীর কণ্ঠ ছিল দরাজ, গভীর ও শক্তিমান। কিন্তু কেবল কণ্ঠের আয়তন তাঁকে ব্যাখ্যা করে না। দেশাত্মবোধক গানে সেই স্বর উদ্দীপ্ত, অথচ কর্কশ নয়; ভক্তিগানে নিবেদিত, কিন্তু ভারাক্রান্ত নয়; প্রেমের গানে কোমল, অথচ স্বরের স্বাভাবিক দৃঢ়তা হারাত না। ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’—তে তাঁর বাক্যবিন্যাসে প্রেমের মাধুর্য, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’—তে একই কণ্ঠে সমবেত অভিযাত্রার তীব্রতা, আবার ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার’—এ সেই প্রবল স্বরই নিজেকে সংযত করে বেদনার জায়গা তৈরি করে। তাঁর বহুমুখিতা তাই শুধু নানা ধরনের গান গাওয়ার মধ্যে নয়; একই কণ্ঠকে গানের ভাব অনুযায়ী ভিন্ন আবেগের ভার বহন করাতে পারার মধ্যে।
‘পৃথিবী আমারে চায়’ গানটির অন্তর্গত দ্বৈত অর্থ
তাঁর সমগ্র শিল্পীজীবনকে ছাপিয়ে যে গানটি প্রায় একক প্রতীকে পরিণত হয়েছে, তার জন্ম আরেক স্মরণীয় ত্রয়ীর হাতে। মোহিনী চৌধুরীর কথা, কমল দাশগুপ্তের সুর, সত্য চৌধুরীর কণ্ঠÑ‘পৃথিবী আমারে চায়’। নির্ভরযোগ্য স্মৃতিচারণমূলক সূত্র গানটির মূল এইচএমভি প্রকাশকাল ১৯৪৫ সালের অক্টোবরের পূজার সময় বলে উল্লেখ করে। গানটি এসেছিল এমন এক সময়ে, যখন বাংলার পেছনে দুর্ভিক্ষ ও বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত, সামনে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের তীব্র আন্দোলনÑত্যাগ, স্বাধীনতা ও বৃহত্তর মানবিক দায় তখন জনজীবনের ভাষারই অংশ। গানটির অসাধারণত্ব এখানেই যে ব্যক্তিগত প্রেম ধীরে ধীরে বৃহত্তর সামাজিক দায়ে উন্মুক্ত হয়ে যায়। প্রেমিক প্রিয়াকে বাহুডোর খুলে দিতে বলছেÑকারণ বাইরে অসহায় মানুষের পৃথিবী তাকে ডাকছে। সত্য চৌধুরী এই দ্বৈত আবেগের স্বরটি ধরতে পেরেছিলেন। তিনি গানটিকে কেবল দেশাত্মবোধক ঘোষণা করেননি, আবার নিছক প্রেমবিরহেও সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর দরাজ কণ্ঠে ব্যক্তিগত আবেদন ধীরে ধীরে সমষ্টির আহ্বানে বিস্তৃত হয়েছে। সম্ভবত এ কারণেই গানটি তার তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সময় পেরিয়েও টিকে গেছেÑআজও তার আহ্বান একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও সামাজিক।
গ্রামোফোন, বেতার, মঞ্চ ও চলচ্চিত্রের সংযোগস্থলে
চল্লিশের দশক তাঁকে একসঙ্গে কয়েকটি সংগীতমাধ্যমের কেন্দ্রে এনে দিয়েছিল। গ্রামোফোন কণ্ঠকে পুনরাবৃত্তির ক্ষমতা দিল; বেতার একই মুহূর্তে দূরবর্তী ঘরে ঘরে পৌঁছে দিল; চলচ্চিত্র কণ্ঠকে দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত করল; মঞ্চ চাইল সরাসরি উপস্থিতির শক্তি। সত্য চৌধুরী এই চার জগতেই বিচরণ করেছেন। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভের নথিতে ১৯৪৭ সালের শরৎচন্দ্র—রূপায়িত পথের দাবী ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর নেপথ্যকণ্ঠের উল্লেখ রয়েছে। অন্য চলচ্চিত্রেও তিনি গান করেছেন, অভিনয় করেছেন, সুর ও সংগীত পরিচালনায় যুক্ত হয়েছেন। পরবতীর্ জীবনে আকাশবাণীতে ঘোষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বাণিজ্যিক রেকর্ডিং কমে যাওয়ার পরও বেতারের সংগীতপরিবেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট ছিল। বেতার—ইতিহাসেও তাঁর কিছু প্রায়—বিস্মৃত চিহ্ন রয়েছে। মহালয়ার মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানের প্রথমদিকের পরিবেশনায় ‘জাগো তুমি জাগো’ তাঁর কণ্ঠেই জনপ্রিয় হয়েছিল। পরবতীর্ সময়ে গানটি অন্য শিল্পীদের কণ্ঠে নতুন পরিচিতি লাভ করে। আবার আকাশবাণীর জনপ্রিয় ‘অনুরোধের আসর’—এর সূচনায় একসময় ব্যবহৃত হতো তাঁর ‘তোমায় যে গান শোনাব’—এর সুর।
সুরকার সত্য চৌধুরী
সুরকার সত্য চৌধুরীকেও আলাদা করে স্মরণ করা প্রয়োজন। নজরুলসংগীতের প্রামাণ্য তথ্যভাণ্ডারে ১৯৫০ সালের একটি এইচএমভি রেকর্ডে নজরুলের গানে সুরকার হিসেবে সত্য চৌধুরীর নাম সংরক্ষিত আছে। তাঁর আধুনিক গানের ভাণ্ডারেও নিজের সুর করা গান রয়েছেÑ‘নীল পাখি নীল পাখি’ তার একটি উদাহরণ। অর্থাৎ তাঁকে শুধু অন্যের সুরের ব্যাখ্যাকার হিসেবে দেখলে তাঁর সংগীতজ্ঞ পরিচয়ের একটি বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়। তিনি এমন এক যুগের মানুষ, যখন গায়ক, সুরকার, অভিনেতা, বেতারকর্মী ও সংগীত পরিচালকÑএই পরিচয়গুলো পরস্পর থেকে এত কঠোরভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল না।
সত্য চৌধুরীর ২৫টি স্মরণীয় বাংলা গান
১। পৃথিবী আমারে চায়, ২। যুগ যুগান্ত পার হয়ে, ৩। যেথা গান থেমে যায়, ৪। দূর থেকে তুমি ধরা দিলে, ৫। দিয়ে যাব ফাল্গুন রাতে, ৬। ঝরে গেছে ফুল আঁধারে, ৭। সেদিন চাঁদিনী রাতে, ৮। ভুলে গেছ জানি, ৯। সেই চম্পা বকুল তলে, ১০। পথে পথে ওই বকুল পড়িছে ঝরিয়া, ১১। হৃদয় যমুনা তারই দুই তীরে, ১২। পথ ছেড়ে দাও প্রিয়া, ১৩। কত যে ব্যথা ভুলালে, ১৪। সেই ভালো মা এমনি করেই, ১৫। কে তোরে কী বলেছে মা, ১৬। নীল পাখি নীল পাখি, ১৭। তোমারে যে গান শোনাব, ১৮। মনহংসীরে ভাসাব না আর, ১৯। শয়নশিয়রে ভীরু দীপ, ২০। যদি কভু মোরে, ২১। প্রিয় তুমি হও ফুলমালা, ২২। এলোমেলো বাদল, ২৩। দূরে তুমি নাহ, ২৪। হে অপরাজিতা, ২৫। কেমনে কেমনে ভুলি।
পরিশেষ
সত্য চৌধুরীর উত্তরাধিকারের মধ্যে রেকর্ড—সংগীতের এক অদ্ভুত উদারতা ও নির্মমতা একই সঙ্গে কাজ করেছে। মানুষের মৃত্যুর বহু পরে তার কণ্ঠকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে রেকর্ড। আবার কখনো সেই গানই এত বড় হয়ে ওঠে যে প্রথম শিল্পীর নাম ধীরে ধীরে তার আড়ালে চলে যায়। সত্য চৌধুরীর ক্ষেত্রেও কিছুটা তা—ই ঘটেছে। কিন্তু আর একবার ‘পৃথিবী আমারে চায়’ শুনলে সেই আড়াল সরে যায়। তিনি ছিলেন বেতারের, গ্রামোফোনের, নজরুলের গানের, আধুনিক গানের, চলচ্চিত্রের ও মঞ্চের মানুষ। কিন্তু তারও আগে তিনি ছিলেন এমন এক যুগের শিল্পী, যখন তিন মিনিটের একটি রেকর্ডের মধ্যে একজন গায়ককে কখনো কখনো গোটা পৃথিবীর আবেগ বহন করতে হতো। একদিন পৃথিবী তাঁকে ডেকেছিল। আজও সেই ডাকে তাঁর রেকর্ড উত্তর দেয়।
