৮টি ভিন্নস্বাদের নাটক ও নাটকের গান নিয়ে || শেষ হল কৃষ্টির তিন দিনের নাট্যোৎসব

বিশেষ প্রতিবেদনঃ বিদেশের মাটিতে বাংলা নাটকের চর্চাকে উৎসাহিত করার উদ্দেশে কৃষ্টি ইনক্, ইউএসএ আয়োজনে ১৪ থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত নিউইয়র্কে তিনদিন ব্যাপী নাট্যোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে গেল কুইন্সের জ্যামাইকা সেন্টার ফর আর্টস্ এন্ড লার্নিং (জেক্যাল) থিয়েটারে। এটি ছিল কৃষ্টির দ্বিতীয় নাট্যোৎসব। তিনটি সন্ধ্যায়ই জেক্যাল নাট্যমঞ্চ হয়ে উঠেছিল স্মৃতি, ভাষা, সংগীত, সম্মাননা অভিনয়ের এক সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি। নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরের নাট্যকর্মী দর্শকদের একত্র করেভয়েসেস রাইজিং থ্রু থিয়েটারপ্রতিপাদ্যে কৃষ্টি আয়োজন করে থিয়েটার ফেস্টিভ্যালের। এই উৎসব উৎসর্গ করা হয় অভিনেতা নাট্যব্যক্তিত্ব জামালউদ্দিন হোসেনের স্মৃতির প্রতি।

কৃষ্টির এই তিনদিনের নাট্য উৎসবে প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নাটকের গান, আলোচনা, স্মারক বক্তৃতা, সম্মাননা এবং নাটক পরিবেশিত হয়। ২০২৫ সালে একই মঞ্চে অনুষ্ঠিত কৃষ্টির তিনদিনের উৎসবে ছিল ছয়টি নাটক, একটি সেমিনার নাটকের গান; সে উৎসবটি উৎসর্গ করা হয়েছিল প্রয়াত নাট্যকর্মী ইশরাত নিশাতের স্মৃতির উদ্দেশে। 

১৪ আগস্ট, শুক্রবার উৎসবের সূচনা হয় লুৎফুন নাহার লতা, নায়লা আজাদ, কথা কেটো, ডোনাল্ড প্রেস্টন কেটো এবং মেগান সিমকক্সের অংশগ্রহণে একটি আলোচনা পর্বের মধ্য দিয়ে। এরপর থেকেই প্রথম সন্ধ্যার পরিবেশনাগুলো উৎসবটির বহুমাত্রিক শিল্পচরিত্র স্পষ্ট করে তোলে। এরপর নিউইয়র্কের আট জন নাট্যকমীর্র প্রতি অভিবাদন সম্মাননা জ্ঞাপন করা হয়। এরা হলেন রিপা আহমেদ, আলমগীর চঞ্চল, আনোয়ার সেলিম, শুক্লা রায় চুমকি, প্রতিমা রায় সুমি, শরীফ হোসেইন, ফিলিপস্ লিটন এবং সোনিয়া কবীর পান্না। অনুষ্ঠানমালার শুরুতেই . জীবন বিশ্বাসের পরিচালনায় কৃষ্টির পরিবেশনায় হয় নাটকের গান। কণ্ঠশিল্পী হিসেবে অংশ নেন . জীবন বিশ্বাসসহ মুক্তা ধর, ফিলিপস লিটন, খ্রীস্টেলা কুইয়া, শিপ্রা দেব আর সুমন। তবলা, ঢোল খোলে সংগত করেন স্বপন দত্ত সীতেশ ধর। নাটকের মধ্যবর্তী বিনোদন হিসেবে নয়, বরং বাংলা নাট্যস্মৃতির স্বতন্ত্র এক ধারাবাহিক উত্তরাধিকার হিসেবেই এই পরিবেশনায় নাটকের গানকে উপস্থাপন করা হয়। এর পরেই বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টস বাফা পরিবেশন করে আয়না নামের আলেখ্য। এটির নির্দেশনা নৃত্যপরিকল্পনায় ছিলেন মারজিয়া স্মৃতি।

প্রথম সন্ধ্যায় কৃষ্টির আরেকটি প্রযোজনা ছিল হ্যামলেট এন্ড ওফেলিয়া। সৈয়দ শামসুল হকের অনুবাদ অবলম্বনে নাটকটির রূপান্তর নির্দেশনা দেন মাসউদ সুমন। অভিনয়ে ছিলেন মাসউদ সুমন, মুমু মাসউদ, লিটন ফিলিপস, শেখ তানভীর আহমেদ, শ্যাম ঘোষ . জীবন বিশ্বাস। সংগীত রচনা করেন পিন্টু ঘোষ, সংগীত প্রক্ষেপণে ছিলেন সিফাত উদ্দিন পলক এবং মঞ্চসজ্জায় ছিলেন বিশ্বজিৎ চৌধুরী মাহমুদুল হাসান রোকন। প্রথম দিনের শেষ পরিবেশনা ছিল শিল্পাঙ্গনের রক্তকরবী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক অবলম্বনে যার নির্দেশনা দেন শিরীন বকুল। 

১৫ আগস্ট, শনিবার উৎসবের দ্বিতীয় দিন ইতিহাসের স্মৃতিকে সমকালীন নাট্যোৎসবের সঙ্গে যুক্ত করে। আলোচনায় অংশ নেন সোরায়া সসম্যান, মারিয়া ইসাবেলা রোহাস সাধনা আহমেদ। বিশিষ্ট নাট্যকার, নির্দেশক অভিনয়শিল্পী সাধনা আহমেদেরবঙ্গবন্ধুর প্রেরণাময় যাত্রাস্মারক বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের প্রচলিত বিবরণের বাইরে তাঁর নেতৃত্বকে বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা জাতিসত্তার জাগরণের ইতিহাস হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি তার অভিনয়শৈলী দিয়ে বক্তৃতাটিকে মঞ্চে উপস্থাপন করেন। লেখকের দৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর যাত্রা এবং বাঙালির নিজের ভাষা, সংস্কৃতি স্বদেশকে আবিষ্কারের যাত্রা মূলত একই ইতিহাসের দুটি সমান্তরাল ধারা।

এর পরেই ইতিহাসের সেই সূত্র ধরে কৃষ্টি পরিবেশন করে ইমপ্রিজনমেন্ট ৪৬৮২Ñ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী অবলম্বনে একটি পাঠাভিনয়। গবেষণা, ভাবনা নির্দেশনায় ছিলেন মাসউদ সুমন এবং সংগীত পরিচালনায় . জীবন বিশ্বাস। অভিনয়ে ছিলেন মাসউদ সুমন, মাহজাবিন মাহবুব, লিটন ফিলিপস শ্যাম ঘোষ। গান পরিবেশন করেন . জীবন বিশ্বাস, মুক্তা ধর, শিপ্রা দেব খ্রীস্টেলা কুইয়া। পোশাক পরিকল্পনায় মাহজাবিন মুমু এবং ভিজ্যুয়াল প্রক্ষেপণে ছিলেন রুবেল শংকর। 

এরপর নাট্যভাষা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মনোস্তাত্ত্বিক অঞ্চলে প্রবেশ করে সাইকোসিস মঞ্চায়নের মাধ্যমে। স্যারাহ কেইনের মূল রচনা অবলম্বনে আনিকা মাহিন একার অভিযোজনে সাইকোসিসে এককভাবে অভিনয় করেন এবং নির্দেশনা দেন রোকেয়া রফিক বেবী। সংগীতে ছিলেন পাপি মোনা আনিকা মাহিন একা, সংগীত প্রক্ষেপণে ফাহমিদা শিল্পী এবং প্রযোজনা সহযোগিতায় এক্সাইল কালেকটিভ।

একই সন্ধ্যায় সূচনা থিয়েটার মঞ্চস্থ করে মামুনুর রশীদের লেখা অমানুষ নাটক। নির্দেশনায় জান্নাতুল টুম্পা। অভিনয়ে হীরা চৌধুরী মিতালী দাস। এরপর নাট্যসংঘ, কানাডা পরিবেশন করে সুব্রত পুরুর রচনা নির্দেশনায় দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড ডগ। সাম্প্রতিক ২৪এর ইতিহাস, সামাজিক রাষ্ট্রিক সংকট এবং মনোজগতে এর অভিঘাতের কারণে সৃষ্ট সমাজবাস্তবতার মধ্যে এদিনের নাট্যসূচি একটি বিস্তৃত নান্দনিক পরিসর নির্মাণ করে।

১৬ আগস্ট, রবিবার শেষ দিনের সূচনা হয় ঢাকা ড্রামার নাটকের গান দিয়ে, নেতৃত্বে ছিলেন গোলাম সারওয়ার হারুন গার্গী মুখার্জি। গান এবং নাটককে একীভূত করে তারা গায়নের সাথে সাথে অভিনয় করেও দর্শকদের মুগ্ধ করেন। তাদের সাথে ছিলেন ঢাকা ড্রামার শিল্পীবৃন্দ। এরপর ড্রামা সার্কেল পরিবেশন করে হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্ন, নির্দেশনায় জহির মাহমুদ এবং অভিনয়ে আবীর আলমগীর কান্তা আলমগীর।

উৎসবের শেষ পূর্ণাঙ্গ নাট্যপ্রযোজনা ছিল ভার্জিনিয়ার ডিসি মেট্রো থিয়েটারের দেওয়ান গাজীর কিস্সা। বের্টোল্ট ব্রেখ্টের নাটক অবলম্বনে আসাদুজ্জামান নূরের অভিযোজন এবং জাফর রহমানের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ এই প্রযোজনায় অভিনয় করেন জাফর রহমান, জুয়েল গোমেজ, ওয়াসিউল ইসলাম, অপর্ণা মিত্র, সারাহ লুদমিলা, শান্তনা গোমেজ, রাশেদুর রহমান, হিমু রোজারিও সজীব খান। সংগীত কণ্ঠে ছিলেন সারাহ লুদমিলা, শান্তনা গোমেজ, আবু রুমি, হিমু রোজারিও।

মঞ্চের দৃশ্যমান শিল্পকর্মের পেছনে ছিল আরেকটি বিস্তৃত সম্মিলিত শ্রম। তিনদিনের সব নাটক অনুষ্ঠানের আলোক পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনায় ছিলেন বিশিষ্ট নাট্যকর্মী আলোক নির্দেশক বাবর খাদেমী। ভিন্ন ভিন্ন নাটকের প্রযোজনাগুলোর মধ্যেও তাঁর আলোকপরিকল্পনা উৎসবজুড়ে একটি দৃশ্যগত ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করে। মিথুন আহমেদ নির্মাণ করেন উৎসবের লোগো, পোস্টার এবং প্রকাশনার সামগ্রিক নকশা; তাঁর শিল্পভাবনা উৎসবকে একটি সুসংহত দৃশ্যপরিচয় দেয় এবং একই সঙ্গে নাটক, শিল্পী সাংগঠনিক তথ্যকে নান্দনিকভাবে লিপিবদ্ধ করে।

উৎসবের সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন কৃষ্টির সভাপতি সীতেশ ধর। তাঁর সঙ্গে কাজ করে ১৪ সদস্যের উৎসব কমিটি। এরা হলেন, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, . জীবন বিশ্বাস, মাসউদ সুমন, মুক্তা ধর, মুমু মাসউদ, শেক তানভীর আহমেদ, লিটন ফিলিপস, শ্যাম ঘোষ, তামিমা তিথি, সিফাত উদ্দিন পলক, সত্যম ধর, পিপিতা, বসুনিয়া সুমন। তিনদিনের অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন রূপন্তী ওয়াজিদ, প্রতিমা রায় সুমি শুক্লা রায় চুমকি।

মাসউদ সুমন সীতেশ ধরের সমাপনী বক্তব্যের পর বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তিনদিনের উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। সমাপ্তির মুহূর্তটি ছিল আনুষ্ঠানিক; কিন্তু উৎসবের গভীরতর তাৎপর্য নিহিত ছিল তার আগের তিন দিনের শিল্পসংলাপেযেখানে বাংলা নাট্যমঞ্চের সঙ্গে পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছে শেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথ, ব্রেখ্ট, সারা কেইন, হুমায়ূন আহমেদ, মামুনুর রশীদ, সাধনা আহমেদ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতি। সেই প্রেক্ষাপটে কৃষ্টির দ্বিতীয় নাট্যোৎসব প্রবাসী নাটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রবাসে নাট্যচর্চা শুধু উত্তরাধিকারকে সংরক্ষণ করে না; তার সবচেয়ে সৃজনশীল মুহূর্তে সেই উত্তরাধিকারকে নতুন ভাষা, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রজন্মের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

Related Posts