অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশ
স্পোর্টস প্রতিবেদনঃ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ম্যাচ জেতা ক্রিকেটের দুরূহতম কাজগুলোর একটি। সেই কাজটিই এবার করে দেখাল বাংলাদেশ দল। ডারউইন টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে চারদিনের মধ্যে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল টাইগাররা। নাজমুল হোসেন শান্তরা পরাশক্তি হিসেবে অস্ট্রেলিয়া দল, তাদের বিশ্বখ্যাত বোলিং অ্যাটাক কিংবা কন্ডিশন—কোনোটিকেই ভয় পাননি। তাই তো প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে গুটিয়ে গিয়ে ইনিংস ব্যবধানে হারের এক সপ্তাহের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াল টাইগাররা। টেস্ট রঞ্ঝাংকিংয়ের ৯ নম্বর দল বাংলাদেশের কাছে হারল শীর্ষ রঞ্ঝাংকধারী অজিরা।
অস্ট্রেলিয়ার মাঠে এটাই বাংলাদেশের প্রথম জয় এবং সাতবারের মুখোমুখিতে দ্বিতীয় জয়। প্রথম জয়টি এসেছিল ২০১৭ সালে ঢাকার মিরপুরে। এবার ডারউইনে সগৌরবে জয়োৎসব করলেন শান্ত ও তার সতীর্থরা।
লড়াইটা এতদিন ছিল প্রায় একপেশে। আগের ছয় ম্যাচের তিনটিতেই ইনিংস ব্যবধানে হেরে যায় বাংলাদেশ। ২০০৩ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে দুটি ম্যাচেই ইনিংস ব্যবধানে হেরে যায় ওই সময় টেস্টের নবাগত দলটি। সেই পরাজয়েই কিনা ২৩ বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলার সুযোগ পাচ্ছিল না টাইগাররা। প্রায় দুই যুগ পর অস্ট্রেলিয়ার মাঠে খেলতে নেমেই এবার অজিদের মাটিতে নামাল শান্তর দল।
দুর্দান্ত বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে ও দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮৪ রানে অলআউট করে দেয় বাংলাদেশ। বোলারদের গড়ে দেয়া ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে প্রথম ইনিংসে দলকে ৪২৬ রান এনে দেন তানজিদ হাসান, মেহেদী হাসান মিরাজরা। প্রথম ইনিংসে পাওয়া ২২৮ রানের লিডই টাইগারদের এগিয়ে রাখে। ফলে অস্ট্রেলিয়া ২৮৬ রানে অলআউট হয়ে গেলে অতিথিদের সামনে জয়ের টার্গের দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রানের। শুধু তানজিদের উইকেট হারিয়ে ১৫ ওভারের মধ্যে এ রান তুলে নিয়ে ঐতিহাসিক এক জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। মুমিনুল হক সৌরভ ৩০ ও সাদমান ইসলাম ২৫ রানে অপরাজিত থাকেন।
এ জয় হয়তো দুই যুগের অবহেলার জবাব। অস্ট্রেলিয়ার দুর্গে গত এক দশকে ভারত ছাড়া বাংলাদেশই দ্বিতীয় এশিয়ার দল, যারা টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছে। শ্রীলংকা এখনো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জিততে পারেনি। পাকিস্তানও দেশটিতে সর্বশেষ জিতেছে ১৯৯৫ সালে। সে হিসেবে বাংলাদেশের এ জয় গৌরবের।
দলগত নৈপুণ্যে এসেছে ঐতিহাসিক এ জয়। হাসান মাহমুদ প্রথম ইনিংসে ৫৫ রানে ৬টি ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৬ রানে ৩ উইকেট নেন। সব মিলিয়ে ১১১ রানে নেন ৯ উইকেট, যা বিদেশে কোনো বাংলাদেশী বোলারের সেরা বোলিং ফিগার। মিরাজ ৬৬ রানে ৫ উইকেট নেয়ার আগে ব্যাট হাতে ৬৫ রান করে অবদান রাখেন। তানজিদ এশিয়ার দ্বিতীয় ব্যাটার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরি করার কৃতিত্ব দেখান।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ে ব্যাটে—বলে দুর্দান্ত অবদান রেখে দারুণ কীর্তি গড়েছেন মিরাজ। দ্বিতীয় ইনিংসে তার ঘূর্ণি জাদুতে মাত্র ২৮৪ রানে গুটিয়ে যায় স্বাগতিকরা। ১৪ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম কোনো স্পিনার হিসেবে ৫ উইকেট নেন তিনি। এর আগে ২০১২ সালে সর্বশেষ সফরকারী স্পিনার হিসেবে এমন কীর্তি গড়েছিলেন সাবেক শ্রীলংকান তারকা রঙ্গনা হেরাথ (৫/৯৫)। এছাড়া, অস্ট্রেলিয়ায় সর্বশেষ ২০১৯ সালে ৫ উইকেট নেয়া স্পিনার ভারতের কুলদীপ যাদব।
বিভিন্ন ফরম্যাটে বাংলাদেশের বহু স্মরণীয় জয় থাকলেও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এ জয়টাকে আলাদা উচ্চতায় রাখছেন শান্ত। তিনি বলেন, ‘এটা এখন পর্যন্ত যেকোনো ফরম্যাটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়।’
এ জয়কে টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের মানসিকতার পরিবর্তনের ফল হিসেবে দেখছেন শান্ত। একসময় টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রধান ভরসা ছিল স্পিন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সে চিত্র বদলেছে। ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে শান্ত বলেন, ‘আমি খুবই খুশি। ছেলেরা যেভাবে খেলেছে, তাতে আমি গর্বিত। আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি। টেস্ট ফরম্যাটে বাংলাদেশের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। পাঁচ বছর আগেও পেসাররা টেস্ট খেলতে চাইত না; কিন্তু আমরা এখন অনেক টেস্ট ক্রিকেট খেলছি এবং তারা টেস্ট ফরম্যাটকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা খেলতে চায়, পারফর্ম করতে চায়, বিশ্বমানের হতে চায়। এখন তাদের মানসিকতাই এমন।’
শান্তর মতে, দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের ভূমিকাও কম নয়। বিশেষ করে মুশফিকুর রহিম ও মুমিনুল হকের মতো সিনিয়র ক্রিকেটাররা তরুণ পেসারদের টেস্ট ক্রিকেটে আরো বেশি মনোযোগী হতে উৎসাহ দিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তরুণ তানজিদ। সাদা বলের ক্রিকেটে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত এ ওপেনার টেস্টে দেখিয়েছেন পরিণত মানসিকতা। শান্ত বলেন, ‘তানজিদ সাদা বলের ক্রিকেটে আক্রমণাত্মক খেলে। কিন্তু এ টেস্টে সে শান্ত ছিল এবং বলের মেধা অনুযায়ী শট খেলেছে। একজন টপ—অর্ডার ব্যাটারের কাছে আমরা এমন প্রভাব চাই, আর সে সেটা করতে পেরেছে।’
সাহসী ক্রিকেট খেলে পাওয়া এ জয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে ১—০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট শুরু হবে ২২ আগস্ট ম্যাকেতে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস: ১৯৮/১০ (স্মিথ ৭১, ওয়েদারল্ড ২৩, হেড ২২, কেরি ১৯, গ্রিন ১৩, ওয়েবস্টার ১২; হাসান ৬/৫৫, তাসকিন ২/৫৫, এবাদত ২/৩৯)।
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ৪২৬/১০ (১৩৮ ওভার) (মুমিনুল ৪৯, তানজিদ ১০১, শান্ত ৮৪, মুশফিক ৩৬, মিরাজ ৬৫, হাসান ১৪, তাইজুল ১৭, তাসকিন ১৪*; হ্যাজলউড ৬/৮৯, স্টার্ক ২/৭৯)।
অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংস: ২৮৪/১০ (৯৫.১ ওভার) (ওয়েদারল্ড ০, হেড ১৭, লাবুশেন ৩১, স্মিথ ৪৪, ১০৪, ক্যারি ৩০, স্টার্ক ১৮; হাসান ৩/৫৬, তাইজুল ১/৫১, মিরাজ ৫/৬৬)
বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস: ৫৭/১ (ওভার) (তানজিদ ০, মুমিনুল ৩০*, সাদমান ২৫*; হ্যাজলউড ১/৩)
ফলাফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী
প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ: হাসান মাহমুদ (বাংলাদেশ; ৯/১১১)।
সিরিজ: দুই ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১—০তে এগিয়ে।
