৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্পঃ মিনেসোটা দ্য লাগার কুইন অব মিনেসোটাঃ জে. রায়ান স্ট্র্যাডাল || আবদুল্লাহ জাহিদ

আমেরিকার মধ্য—পশ্চিমাঞ্চল বা মিডওয়েস্টÑবিশেষ করে মিনেসোটা স্টেটটি তার হিমশীতল শীতকাল, শান্ত হ্রদমালা, অনাড়ম্বর কিন্তু কঠোর পরিশ্রমী মানুষ এবং পাই (চরব) ও বিয়ারের ঐতিহ্যময় সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। মার্কিন কথাসাহিত্যিক জে. রায়ান স্ট্র্যাডাল তাঁর দ্য ল্যাগার কুইন অব মিনেসোটা উপন্যাসে এই মিনেসোটার আত্মাকেই বন্দি করেছেন এক অসাধারণ পারিবারিক ও শিল্পকেন্দ্রিক উপাখ্যানে। এটি কেবল বিয়ার তৈরির ব্যবসায়িক উত্থান—পতনের গল্প নয়, এটি মূলত দুটি বোনের বিচ্ছেদ, পারিবারিক বঞ্চনা, তিন প্রজন্মের নারীর সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমা ও ভালোবাসার এক গভীর মানবিক দলিল।

উপন্যাসটি পাঠকদের এমন এক জগতে নিয়ে যায়, যেখানে এক গ্লাস সোনালী ল্যাগার বিয়ারের বুদ্বুদের পেছনে লুকিয়ে থাকে বছরের পর বছর ধরে জমিয়ে রাখা অভিমান, আর এক টুকরো রউবার্ব পাইয়ের মিষ্টি সুবাসে মিশে থাকে আত্মত্যাগের অনন্য গল্প। এর প্লট, চরিত্র ও মূল প্রতিপাদ্যের এই পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আপনাকে মিনেসোটার সেই সোনালী ফসলের ক্ষেত আর বিয়ারের সুবাসে ভরা চোলাইখানায় সরাসরি পৌঁছে দেবে।

গল্পের শিকড় প্রোথিত রয়েছে ২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, মিনেসোটার এক গ্রামীণ খামারে। হ্যারল্ড ও তাঁর দুই কন্যা—এডিথ এবং হেলেন।

এডিথ বনাম হেলেনঃ এডিথ জ্যেষ্ঠা কন্যা। সে স্বভাবজাতভাবেই দায়িত্বশীল, কঠোর পরিশ্রমী এবং শান্ত স্বভাবের। বাবার খামারের কাজে তার অবদানই ছিল সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে, হেলেন ছোট মেয়ে, যে শৈশব থেকেই কিছুটা উচ্চাকাক্সক্ষী, আত্মকেন্দ্রিক এবং নিজের উদ্দেশ্য সাধনে অনড়।

উত্তরাধিকারের বঞ্চনাঃ বাবার মৃত্যুর পর ঘটনাচক্রে দেখা যায়, পারিবারিক খামারের সমস্ত জমি ও সম্পত্তি এডিথকে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণভাবে ছোট মেয়ে হেলেনের নামে উইল করে যাওয়া হয়েছে। হেলেন সেই জমি বিক্রি করে দিয়ে প্রাপ্ত বিশাল অর্থ নিজের কাছে রেখে দেয় এবং নিজেকে গড়ে তোলার কাজে লাগায়। এডিথ এই অন্যায় ও চরম বিশ্বাসঘাতকতায় গভীরভাবে আঘাত পায়, কিন্তু সে নীরব থেকে এই অন্যায় মেনে নেয়।

এই একটি সিদ্ধান্ত দুই বোনের জীবনকে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ধারায় প্রবাহিত করে। এডিথ ও তার স্বামী ওলি অত্যন্ত সাধারণ ও অতিপ্রয়াসভিত্তিক জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়, অন্যদিকে হেলেন সেই অর্জিত অর্থ দিয়ে বিয়ারশিল্পের জগতে নিজের নাম লেখার যাত্রা শুরু করে।

বাবার সম্পত্তি বিক্রির টাকা পকেটে নিয়ে হেলেন বিয়ে করে ওর্বিল ব্লোট্জকে, যার পরিবার লাগার বিয়ার তৈরির ব্যবসায় যুক্ত ছিল। হেলেন কেবল একজন গৃহবধূ হিসেবে সন্তুষ্ট থাকার পাত্রী ছিল না। তার মধ্যে ছিল তীব্র ব্যবসায়ী বুদ্ধিমত্তা ও বিপণন দক্ষতা।

হেলেন অনুমিত বাণিজ্যিক ধারার বাইরে গিয়ে বুঝতে পেরেছিল যে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিন কেমন বিয়ার চায়। সে ‘ব্লোট্জ বিয়ার’কে মিনেসোটার সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সাশ্রয়ী লাইট লাগার ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলে।

 হেলেনের কঠোর পরিশ্রম ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের বদৌলতে ব্লোট্জ বিয়ার স্টেট ছাড়িয়ে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। হেলেন উপাধি পায় ‘দ্য লাগার কুইন অব মিনেসোটা’। কিন্তু এই বিশাল অর্থনৈতিক সাফল্য তাকে পারিবারিক বন্ধন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। সে তার বোন এডিথের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়। তার কাছে বিয়ার ছিল একটি পণ্য, বাজার দখলের অস্ত্র এবং নিজের ক্ষমতা জাহির করার মাধ্যম।

অন্যদিকে এডিথের জীবন কাটছিল অভাব ও সংগ্রামের মধ্যে। কিন্তু এডিথ ভেঙে পড়েনি। তার কাছে ছিল অন্য এক জাদুÑরান্না ও পাই তৈরির অসাধারণ নৈপুণ্য।

এডিথ মিনেসোটার বিভিন্ন স্থানীয় নার্সিং হোম, ডাইনার ও বৃদ্ধাশ্রমে কাজ শুরু করে। তার হাতে তৈরি পাইÑবিশেষ করে রউবার্ব, অ্যাপল ও ব্লুবেরি পাই স্থানীয় মানুষদের কাছে এক পরম স্বস্তির খাবার হয়ে ওঠে। এডিথ কখনো ধনকুবের হতে চায়নি, তার লক্ষ্য ছিল মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং সততার সাথে জীবনযাপন করা।

হেলেনের সাফল্য যখন সংবাদপত্রের শিরোনাম হতো, এডিথ তখন চুপচাপ তা দেখত। তার মনে ক্ষোভ ছিল, কিন্তু সে নিজের দারিদ্র্যকে কখনোই নিজের ব্যক্তিত্ব ধ্বংস করতে দেয়নি। এডিথ ও তার স্বামী ওলি তাদের মেয়ে ও নাতনি ডায়ানাকে সৎ মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে বড় করে তুলতে চেয়েছিল।

উপন্যাসের সবচেয়ে গতিশীল ও আকর্ষণীয় চরিত্র হলো এডিথের নাতনি ডায়ানা। ডায়ানার কৈশোর ও প্রারম্ভিক যৌবন মোটেও মসৃণ ছিল না।

ডায়ানা ছোটবেলায় কিছুটা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিল। চুরি এবং অনিয়ন্ত্রিত আচরণের কারণে সে আইনি ঝামেলাতেও জড়ায়। কিন্তু তার ভেতরে ছিল এক সুপ্ত প্রতিভা—গন্ধ ও স্বাদের অবিশ্বাস্য তীব্র অনুভূতি।

ডায়ানা একটি স্থানীয় রেস্তোরাঁয় কাজ শুরু করে এবং ধীরে ধীরে বিয়ার তৈরির রাসায়নিক ও নান্দনিক প্রক্রিয়ার প্রেমে পড়ে যায়। সে খেয়াল করে, তার ঠাকুমা হেলেন যে ধরনের বাণিজ্যিক বিয়ার বানায়, বাজারে তার বাইরেও এক নতুন জোয়ার আসছেÑযা হলো ‘ক্রাফট বিয়ার’ বা হাতে তৈরি বিশেষ স্বাদের বিয়ার।

ডায়ানা তার ঠাকুমা এডিথের তৈরি রউবার্ব পাইয়ের স্বাদ ও সুবাস দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এক অভিনব বিয়ার উদ্ভাবন করেÑ‘গ্র্যান্ডমাস রউবার্ব পাই আইপিএ/এল্’। সে তার সহকর্মীদের সাথে মিলে নিজস্ব একটি ক্ষুদ্র চোলাইখানা খোলে, যার নাম দেয় ‘শটগান গ্র্যান্ডমা’। ডায়ানার তৈরি স্বাধীন ক্রাফট বিয়ার দ্রুত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।

উপন্যাসে স্ট্র্যাডাল অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মার্কিন বিয়ার শিল্পের দুটি ভিন্ন যুগের সংঘাত ও রূপান্তর তুলে ধরেছেন:

হেলেনের বড় সাম্রাজ্য যখন ধীরে ধীরে নতুন যুগের ক্রাফট বিয়ারের জোয়ারে কিছুটা বাজার হারাচ্ছিল, তখন সে খেয়াল করে যে তার নিজের রক্তের উত্তরাধিকারীÑযাকে সে কোনোদিন স্বীকার করেনি, সেই ডায়ানাই এখন ক্রাফট বিয়ারের জগতে নতুন তারা হয়ে উঠেছে।

বয়সের সায়াহ্নে এসে হেলেন উপলব্ধি করতে শুরু করে যে বিশাল অর্থ, বিয়ারের সাম্রাজ্য এবং ‘লাগার কুইন’ খেতাবÑকোনো কিছুই জীবনের শেষ দিনগুলোতে একাকীত্ব মেটাতে পারে না। সে তার জীবনের বড় ভুল এবং বোন এডিথের প্রতি করা অন্যায়ের অনুশোচনায় ভুগতে থাকে।

 ডায়ানা যখন তার নতুন স্বাধীন বিয়ারের ব্যবসা প্রসারিত করতে গিয়ে তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে এবং দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়, তখন নেপথ্যে এগিয়ে আসে হেলেন। সে ডায়ানাকে সরাসরি নিজের পরিচয় না দিয়ে বা নিজের অহংকার সামনে না এনে বেনামে অর্থ সংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়, যাতে ডায়ানার স্বপ্নের বিয়ার কারখানাটি বেঁচে যায়।

জীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে এডিথ ও হেলেনের সাক্ষাৎ ঘটে। এত বছরের জমে থাকা বরফ, বঞ্চনার বেদনা এবং নীরবতার প্রাচীর অবশেষে ভেঙে পড়ে। এডিথ তার স্বভাবজাত উদারতা দিয়ে হেলেনকে ক্ষমা করে। তারা বুঝতে পারে যে তাদের রক্তে যে জেদ ও সৃজনশীলতা ছিল, তা—ই ডায়ানার মাধ্যমে নতুন রূপ পেয়েছে।

দ্য লাগার কুইন অব মিনেসোটা মূলত নারীদের গল্প। এমন এক শিল্পে (বিয়ার ব্যবসা) যেখানে ঐতিহাসিকভাবে পুরুষদের আধিপত্য ছিল, সেখানে তিন প্রজন্মের তিন নারীÑহেলেন, এডিথ এবং ডায়ানা নিজের নিজের যোগ্যতায় নিজেদের স্থান করে নেয়। হেলেন দেখিয়েছে কীভাবে ব্যবসা গড়ে তুলতে হয়, এডিথ দেখিয়েছে কীভাবে প্রতিকূলতায় টিকে থাকতে হয়, আর ডায়ানা দেখিয়েছে কীভাবে অতীতকে সম্মান জানিয়ে নতুনকে গ্রহণ করতে হয়।

লেখক স্ট্র্যাডাল খাদ্য ও পানীয়কে কেবল উপজীব্য হিসেবে ব্যবহার করেননি, সেগুলোকে চরিত্রের আবেগের বাহক বানিয়েছেন।

ক্স হেলেনের লাগার বিয়ার তার শীতল, বাণিজ্যিক ও প্র্যাকটিক্যাল মানসিকতার প্রতীক।

ক্স এডিথের পাই ভালোবাসা, সেবা ও ঐতিহ্য রক্ষার প্রতীক।

ক্স ডায়ানার রউবার্ব পাই এল্ হলো এই দুইয়ের এক অপূর্ব মিলনÑঠাকুমার পাইয়ের মিষ্টি স্মৃতির সাথে বিয়ারের তিক্ততার এক চমৎকার মিশ্রণ।

উপন্যাসটি আমাদের শেখায় যে ভুল বোঝাবুঝি বা বঞ্চনা যত বড়ই হোক না কেন, জীবনের শেষ সত্য হলো সম্পর্ক। রক্ত ও ভালোবাসার টানে মানুষ শেষ পর্যন্ত এক জায়গায় এসে মেলে। অন্যায়কারী হেলেন যেমন অনুশোচনার মাধ্যমে নিজেকে শোধন করেছে, তেমনি ভুক্তভোগী এডিথ ক্ষমার মাধ্যমে নিজের আত্মাকে মুক্ত করেছে।

জে. রায়ান স্ট্র্যাডালের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার আঞ্চলিক আবহ তৈরির ক্ষমতা। তিনি মিনেসোটার আবহাওয়া, মানুষের কথা বলার ধরন (যেমন: বিখ্যাত "গরফবিংঃবৎহ হরপব"), গির্জার ভুরিভোজ, মেলা এবং চোলাইখানার পরিবেশ এত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে পাঠক যেন চোখের সামনে আস্ত মিনেসোটা স্টেটকে দেখতে পান।

লেখকের ভাষা অত্যন্ত সরল অথচ আবেগঘন। হালকা রসবোধ বা হাস্যরসের মধ্য দিয়ে তিনি জীবনের কঠিন সত্যগুলোকে সহজভাবে প্রকাশ করেছেন। প্লটে কোনো কৃত্রিম নাটকীয়তা নেই, প্রতিটি ঘটনার পরিণতি ঘটেছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার নিয়মেই।

লেখক পরিচিতি:

জে. রায়ান স্ট্র্যাডাল যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার হেস্টিংসে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন। পরবর্তীতে তিনি নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে চলচ্চিত্র ও কথাসাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

তার গল্প ও উপন্যাসগুলোতে আমেরিকার মিডওয়েস্ট অঞ্চলের জীবনযাপন, স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি, পারিবারিক সম্পর্ক এবং নারীদের জীবনসংগ্রামের জীবন্ত প্রতিফলন দেখা যায়।

Related Posts