বাংলাদেশের জলাবদ্ধতার জলতাত্ত্বিক গতিবিদ্যা—২২ || ড. আনিস রহমান
বর্ষা ও হিমালয় পর্বতমালার ভৌত বিজ্ঞান এবং জলতাত্ত্বিক প্রভাব
বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতির তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং ধরন মূলত দুটি প্রধান বাহ্যিক ও প্রাকৃতিক ফ্যাক্টর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও চালিত হয়: দক্ষিণ এশীয় গ্রীষ্মকালীন মৌসুমী বায়ু এবং হিমালয় পর্বতমালার অনন্য ভূ—সংস্থান ও ক্রায়োস্ফিয়ার (তুষার ও হিমবাহ) গতিবিদ্যা। এই দুটি নিয়ামকের জটিল ভৌগোলিক ও ভৌত মিথস্ক্রিয়া নিচে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
দক্ষিণ এশীয় মৌসুমী বায়ুর বায়ুমণ্ডলীয় ভৌত গতিবিদ্যা
দক্ষিণ এশীয় গ্রীষ্মকালীন মৌসুমী বায়ু হলো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিশালাকার বায়ুমণ্ডলীয় জলবায়ু ব্যবস্থা, যা মূলত স্থলভাগ ও সংলগ্ন মহাসাগরের মধ্যকার তাপীয় বৈপরীত্যের কারণে সৃষ্টি হয়। গ্রীষ্মকালে (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) এশিয়ার মূল ভূখণ্ড, বিশেষ করে তিব্বতীয় মালভূমি এবং উত্তর ভারতের সিন্ধু—গঙ্গা সমভূমি অঞ্চল সূর্যের তীব্র তাপে অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর বিপরীতে, ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগরের পানি ধীরগতিতে তাপ গ্রহণ করার ফলে সেখানে তুলনামূলকভাবে শীতল ও উচ্চচাপ বলয় বিরাজ করে।
এই সুস্পষ্ট তাপমাত্রা এবং বায়ুচাপের পার্থক্যের কারণে একটি শক্তিশালী অনুভূমিক চাপ নতি বল (ঐড়ৎরুড়হঃধষ চৎবংংঁৎব এৎধফরবহঃ ঋড়ৎপব — ঋচএঋ) সৃষ্টি হয়, যা বাতাসকে মহাসাগর থেকে স্থলভাগের দিকে চালিত করে। সমীকরণ অনুযায়ী:
ঋচএঋ=—১∇চ
এখানে হলো বাতাসের ঘনত্ব এবং ∇চ হলো বায়ুচাপের নতি বা গ্রেডিয়েন্ট। এই বায়ুপ্রবাহ যখন নিরক্ষরেখা অতিক্রম করে উত্তর গোলার্ধে প্রবেশ করে, তখন পৃথিবীর ঘূর্ণনজনিত কোরিওলিস বলের (ঈড়ৎরড়ষরং ঋড়ৎপব) প্রভাবে তা ডানদিকে বেঁকে দক্ষিণ—পশ্চিম মৌসুমী বায়ু হিসেবে বঙ্গোপসাগর হয়ে সরাসরি ভারতীয় সাবকন্টিনেন্ট ও বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কোরিওলিস ত্বরণের সমীকরণ:
ধপ=—২া
এখানে হলো পৃথিবীর আবর্তনের কৌণিক বেগ এবং া হলো বায়ুর গতিবেগ ভেক্টর। বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ জলভাগের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় এই অত্যন্ত আর্দ্র বায়ুপ্রবাহ বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প শোষণ করে, যা বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরে অতি উচ্চ মাত্রার অনার্দ্রতা এবং উচ্চ আর্দ্র এন্ট্রপি (ঝঁনপষড়ঁফ গড়রংঃ ঊহঃৎড়ঢ়ু) তৈরি করে।
এই আর্দ্র বাতাস যখন বাংলাদেশের সমতল ও সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলে পৌঁছায়, তখন তা তীব্র পরিচলন প্রক্রিয়ার (ঈড়হাবপঃরাব চৎড়পবংং) মাধ্যমে উপরে উঠে প্রসারিত হয় এবং রুদ্ধতাপীয়ভাবে শীতল (অফরধনধঃরপ ঈড়ড়ষরহম) হয়ে ঘনীভূত হয়:
ফঞফু=—স
এখানে স হলো আর্দ্র রুদ্ধতাপীয় ল্যাপস রেট (গড়রংঃ অফরধনধঃরপ খধঢ়ংব জধঃব)। এই জলীয় বাষ্পের দ্রুত ঘনীভবন প্রক্রিয়া প্রচুর পরিমাণে সুপ্ত তাপ (খধঃবহঃ ঐবধঃ ড়ভ ঈড়হফবহংধঃরড়হ) মুক্ত করে বায়ুমণ্ডলকে আরও উত্তপ্ত ও অস্থির করে তোলে, যার ফলে প্রবল বর্ষণ ঘটে। এই মৌসুমী অতিবৃষ্টিই বাংলাদেশের বন্যার প্রধান উৎস, কারণ দেশের বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাতের ৭০% থেকে ৮০% এরও বেশি ঘটে থাকে কেবল জুন থেকে সেপ্টেম্বর, এই চার মাসের মধ্যে।
হিমালয় পর্বতমালার ভূ—সংস্থানিক প্রভাব ও ক্রায়োস্ফিয়ার গতিবিদ্যা
হিমালয় পর্বতমালা দক্ষিণ এশীয় মৌসুমী বায়ুর গতিপথের সম্মুখে একটি দুর্ভেদ্য এবং বিশাল প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে অবস্থান করছে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ দক্ষিণ—পশ্চিম মৌসুমী বায়ু যখন উত্তর দিকে অগ্রসর হয়, তখন তা হিমালয় পর্বতমালা এবং ভারতের মেঘালয় মালভূমির খাসিয়া—জয়ন্তীয়া পাহাড়ে সরাসরি বাধাপ্রাপ্ত হয়। এই তীব্র যান্ত্রিক বাধার কারণে বায়ু বাধ্য হয়ে খাড়া ঢাল বেয়ে দ্রুত উপরে উঠে যায়, যাকে ভূ—সংস্থানিক উত্তোলন (ঙৎড়মৎধঢ়যরপ খরভঃরহম) বলা হয়।
এই উত্তোলনের ফলে পর্বতপাদদেশীয় অঞ্চল যেমন ভারতের চেরাপুঞ্জি বা মৌসিনরামে বিশ্বের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত (বার্ষিক গড় প্রায় ১২,০০০ মিমি) ঘটে থাকে। এই অতিবৃষ্টির পানি অত্যন্ত খাড়া পাহাড়ি ঢাল বেয়ে প্রকাণ্ড গতিতে নেমে এসে বাংলাদেশের উত্তর—পূর্বাঞ্চলীয় সুরমা ও কুশিয়ারা নদী এবং উত্তরাঞ্চলীয় তিস্তা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদী অববাহিকায় প্রবেশ করে তাৎক্ষণিক বন্যা সৃষ্টি করে।
হিমালয় অঞ্চলের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ভৌত প্রক্রিয়া হলো তুষার ও হিমবাহের গলন (ঝহড়ি ধহফ এষধপরবৎ গবষঃ)। ব্রহ্মপুত্র নদ তিব্বতের চিমায়ুংদুং হিমবাহ থেকে আনুমানিক ৫,৩০০ মিটার উচ্চতায় উৎপন্ন হয়ে প্রায় ১,৯৯৫ কিমি পথ তিব্বতের মালভূমিতে (ইয়ারলুং জাংবো নামে) প্রবাহিত হওয়ার পর খাড়া হিমালয় পর্বতমালা ভেদ করে ভারতের অরুণাচল ও আসামের মধ্য দিয়ে ৯৮৩ কিমি প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে ২৩০ কিমি পথ অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।
তাত্ত্বিকভাবে, মে থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে গ্রীষ্মকালীন বর্ষার সাথে সাথে এই হিমবাহ ও তুষার গলন প্রক্রিয়া তীব্রতর হয়। তুষার ও হিমবাহ গলনের শক্তির ভারসাম্য সমীকরণ নিম্নরূপ:
ঊসবষঃ=১—αঝ+খ—খ+ঐং+ঐষ+এঢ়
এখানে হলো অ্যালবেডো (অষনবফড়), ঝ হলো আপতিত স্বল্প তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সৌর বিকিরণ, খ ও খ হলো যথাক্রমে আপতিত ও নির্গত দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ, ঐং ও ঐষ হলো যথাক্রমে সংবেদনশীল ও সুপ্ত তাপের প্রবাহ, এবং এঢ় হলো ভূমির তাপীয় প্রবাহ। অ্যালবেডো (অষনবফড়) হলো কোনো তলের ওপর আপতিত মোট সৌর বিকিরণ এবং সেই তল থেকে প্রতিফলিত বিকিরণের অনুপাত। এটি একটি মাত্রাহীন রাশি যা সাধারণত ০ থেকে ১—এর মধ্যে থাকে। হিমালয় অঞ্চলে তুষার ও বরফের অ্যালবেডো খুব বেশি থাকে, কারণ সাদা বরফ সূর্যের আলোকে প্রচুর পরিমাণে প্রতিফলিত করে। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে যখন এই বরফ গলে যায় বা এর ওপর ধুলোবালি জমে, তখন এর অ্যালবেডো হ্রাস পায়। অ্যালবেডো কমে যাওয়ার অর্থ হলো তলটি আগের চেয়ে বেশি সৌরশক্তি শোষণ করছে, যা তুষার বা হিমবাহ গলনের প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে। প্রাক—বর্ষা মৌসুমে (এপ্রিল—মে) তিব্বতীয় মালভূমির তুষার আচ্ছাদন এবং মৌসুমী বায়ুর তীব্রতার মধ্যে একটি ঋণাত্মক সম্পর্ক (ওহাবৎংব ঝহড়ি—গড়হংড়ড়হ জবষধঃরড়হংযরঢ়) পরিলক্ষিত হয়। তিব্বতে প্রাক—বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত তুষারপাত ঘটলে তা স্থলভাগের তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়, যা স্থল ও সমুদ্রের মধ্যকার তাপীয় বৈপরীত্য হ্রাস করে এবং মৌসুমী বায়ুকে দুর্বল করে দেয়। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এই ভৌত ভারসাম্যে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটেছে।
