শহীদ কাদরী: খন্ডচিত্র || হাসান ফেরদৌস
শামসুর রাহমান অত্যন্ত অসুস্থÑএ কথা বুধবারই জেনেছিলাম। ইচ্ছা হচ্ছিল শহীদ ভাইকে কথাটা জানাই। দুই সপ্তাহ আগেই শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল। কিন্তু বুধবার তাঁর ডায়ালিসিস থাকে। সপ্তাহে তিন দিন তাঁকে এ ধকল পোহাতে হয়। কয়েক ঘণ্টা হাসপাতালে কাটানোর পর বাসায় ফিরে গল্প করার মন—মানসিকতা আর থাকে না, সে কথা আমি জানতাম। তাই এক দিন পর শহীদ ভাইকে ফোন করলাম।
খানিকটা থমকে গেলেন তিনি। ‘এ তো ভীষণ বিপদের কথা! তুমি কোত্থেকে শুনলে, কে বলল?’ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন।
শহীদ কাদরী ও শামসুর রাহমানের মধ্যে বয়সের ব্যবধান বছর দশেক হবে। কিন্তু সে ব্যবধান সত্ত্বেও তাঁরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সে বন্ধুত্ব কেবল ব্যক্তিগত নয়, পারিবারিক পর্যায়েও। স্থান ও কালের ব্যবধান সত্ত্বেও সে সম্পর্ক অটুট থেকেছে। শামসুর রাহমানের কবিতার তিনি অনুরাগী পাঠকÑসে কথা স্পষ্ট করে বলতে কখনো দ্বিধা করেন না। শামসুর রাহমানের কবিতা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়, এমন লোক যে নেই, তা নয়। শহীদ ভাইকে বরাবর দেখেছি খুব ধৈর্য নিয়ে তাদের বোঝাতেনÑকেন শামসুর রাহমান আসলে শুধু বড় কবি নন, তাঁর সময়ের একজন প্রধান কবি। অন্য যে একমাত্র আধুনিক বাঙালি কবির কথা উঠলে শহীদ ভাইয়ের মুখ আলোকিত হয়ে উঠতে দেখেছি, তিনি বুদ্ধদেব বসু।
টেলিফোনে কথা হচ্ছিল, ফলে তাঁর মুখ দেখা সম্ভব হচ্ছিল না। কিন্তু গলা শুনে বুঝতে পারছিলাম, তাঁর চোখে আঁধার ভিড় করেছে। নিজে থেকেই বললেন রাহমান ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়ের কথা। ১৯৫৬ কি ১৯৫৭ সালে, সে সময় তিনি সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের ছাত্র, বছর দুয়েক হলো কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এসেছেন। সেই অল্প বয়স থেকেই কবিতার প্রতি তাঁর আগ্রহ। গোটাকয় কবিতা লিখে বন্ধুমহলে নামও কিনেছেন। একদিন এক বন্ধু এসে প্রথম তাঁর কাছে শামসুর রাহমানের কথা তুললেন। ‘কবিতা’ পত্রিকায় সে সময় রাহমান ভাইয়ের কবিতা নিয়মিত ছাপা হতো। পুরান ঢাকায় থাকেন তিনি। শহীদ ভাই থাকেন বাংলাবাজারে। বন্ধু প্রতিশ্রুতি দিলেন, শামসুর রাহমানের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবেন।
কিন্তু কী আশ্চর্য ব্যাপার, সে বন্ধুর দূতিয়ালি ছাড়াই একদিন তাঁদের দুজনের দেখা হয়ে গেল সদরঘাটে খান মজলিশের বইয়ের দোকানে। তখন সেটি ঢাকার বনেদি বইয়ের দোকান। ‘স্পন্দন’ পত্রিকায় শহীদ কাদরীর একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল; সেখানে পত্রিকার পাতা উল্টিয়ে নিজের কবিতা পড়ছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর চশমা চোখে ফর্সামতো এক ভদ্রলোক এসে হাজির। তিনিও ‘স্পন্দন’ তুলে নিলেন। দুজনে কিছুক্ষণ একে অপরকে আড়চোখে দেখার পর শামসুর রাহমান, অর্থাৎ ফর্সামতো সেই যুবক, নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনিই শহীদ কাদরী?’
সেই আলাপের শুরু। বইয়ের দোকান থেকে পুরান ঢাকার বিখ্যাত রিভারভিউ রেস্তোরাঁয় শহীদ ভাইই ডেকে নিয়ে গেলেন। তাঁর পকেটে তখন কাঁচা এক টাকা। চা হলো, চকোলেট বিস্কুট হলো, কবিতা পড়াও হলো। সে যাত্রা শহীদ ভাইয়ের কবিতায় বানান ভুল ধরিয়ে দিয়েছিলেন রাহমান ভাই। এরপর শামসুর রাহমান নিজেই বললেন, ‘চলুন, আমার বাসায়।’ বাসায় এসে কবিতার খাতা খুললেন তিনি। ঘণ্টা দুয়েক নিজের কবিতা পড়ে শুনিয়েছিলেন সেবার।
অনেকটা আবেগতাড়িত হয়েই যেন গল্পটা শোনাচ্ছিলেন শহীদ ভাই। এ গল্প আমি আগেও শুনেছি। প্রতিবারই দেখেছি, শামসুর রাহমানের কথা উঠলেই তাঁকে আগলাবার একটা বাড়তি দায়িত্ব যেন স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেন তিনি। শহীদ ভাইয়ের কাছে শুনেছি, সম্ভবত সত্তর সালে ঢাকার ন্যাশনাল বুক সেন্টারের খোলা ময়দানে শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। শুধু ইউরোপীয় নয়, পশ্চিম বাংলার কবিদের প্রভাবের বিস্তর উদাহরণ দিয়ে সে আলোচনায় মান্নান সৈয়দ রাহমান ভাইকে খানিকটা ছোটই করেছিলেন। কেউ কোনো প্রতিবাদ করেনি। অবশেষে শহীদ ভাই উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। এক ঘণ্টা ধরে সব যুক্তি খন্ডন করে প্রমাণ করেছিলেন শামসুর রাহমানের মৌলিকত্ব কোথায়।
একটি শব্দের অথবা কোনো একটি চিত্রকল্পের মিল খুঁজে পেলেই তা অনুকরণ হয়ে গেল বলে দাবি করার যে নকল—পাণ্ডিত্য কারও কারও আছে, শহীদ ভাই তার প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, বাংলা কবিতার ‘ইথোস’ ইউরোপীয় কবিতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কবিকে বুঝতে হলে তাঁর কাব্যের ‘ইথোস’ উদ্ধার করতে হবে। তাঁর পাল্টা যুক্তি শোনার পর কৃতজ্ঞ শামসুর রাহমান তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন।
শামসুর রাহমানের কবিতায় বিদেশি প্রভাব নিয়ে আমার নিজেরও কিছু অজ্ঞতাপ্রসূত পূর্বধারণা রয়েছে। আমি ও শহীদ ভাই একই পাড়ার বাসিন্দা। দুই দিন পর তাঁর বাসায় ফের এসে হাজির হলাম। স্বাভাবিকভাবেই কথা উঠল শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে। নিজের মূর্খতা ঢাকার বদলে আমি বলে বসলাম, আমার বিবেচনায় শামসুর রাহমানের ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’ পর্যায়ের অনেক কবিতায় পশ্চিম ইউরোপীয় কবিতার স্পষ্ট প্রভাব লক্ষণীয়, বিশেষত কাব্যিক ডিকশনের বিবেচনায়। তাঁর কবিতায় এমন অনেক চিত্রকল্প আছে, যা সম্পূর্ণ বিজাতীয়। উদাহরণ হিসেবে প্যারিসের আকাশে উড়ন্ত ইহুদির কথা উল্লেখ করলাম।
এবার শিক্ষকের ভূমিকায় নামলেন শহীদ ভাই। বললেন, ‘শোনো, এমন কোনো লেখক বা কবি নেই, যাঁর ওপর তাঁর অগ্রজ লেখক—কবিদের প্রভাব নেই। সে প্রভাবের অর্থ এই নয় যে তিনি অনুকরণ করছেন বা সেই লেখক মৌলিক নন।’ ‘ট্রাডিশন অ্যান্ড দ্য ইন্ডিভিজুয়াল ট্যালেন্ট’ নিয়ে এলিয়ট যে কথা বলেছেন, আমাকে তা স্মরণ করিয়ে দিলেন। বললেন, ‘শুধু লেখক কেন, কবির লেখায় তুমি প্রভাব পাবে। প্রভাব পাবে চিত্রকলায় বা সংগীতে। এমনকি চলচ্চিত্রে। যে কোনো ট্রাডিশনের মধ্যে অনেক স্রোত থাকে, তার অনেক স্তর থাকে। ট্রাডিশনের মধ্যে যে স্তরের সঙ্গে ‘ইন্ডিভিজুয়াল ট্যালেন্ট’ নিজের বোধ ও ভাবনার সাযুজ্য খুঁজে পায়, শুধু তার সঙ্গেই সম্পর্ক গড়ে নেয় সে, গোটা ট্রাডিশনের সঙ্গে নয়। প্রত্যেক লেখকই কোনো না কোনো ট্রাডিশনের অন্তর্গত, কোনো না কোনো ঐতিহাসিক প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত। লেখক সে ট্রাডিশন থেকে নিজের আহার ও পুষ্টি সংগ্রহ করেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বা জীবনানন্দের কবিতায় সে পুষ্টি আহরণের ছাপ আছে, তাই বলে তাঁদের কবিতা নকল বলে বাতিল করা হবে?’
শহীদ ভাই যুক্তি দিয়ে বললেন, শামসুর রাহমানের প্রথম দিকের কবিতায় জীবনানন্দের প্রভাব ছিল, কিন্তু তাঁর কবিতার যে ‘ইনার রিদম’, তা সম্পূর্ণ আলাদা। শামসুর রাহমানের কবিতায় তাঁর যে ব্যক্তিত্ব প্রকাশিত হয়, তা জীবনানন্দ বা ইয়েটসের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিদেশি চিত্রকল্প ব্যবহারের অভিযোগও তিনি বাতিল করে দিলেন। গোটা পৃথিবীর সাহিত্য ও শিল্পভান্ডার থেকে কবি তাঁর রসদ আহরণ করতে পারেন। দেখার বিষয় হলো, সে রসদ তিনি কতটা যোগ্যতার সঙ্গে ব্যবহার করলেন, কীভাবে তাকে নিজের করে নিলেন। উদাহরণ হিসেবে জীবনানন্দের কবিতা স্মরণ করে বললেন, যে নিসর্গের ছবি তিনি আঁকেন, তাতে কখনো কখনো সেই নিসর্গের সঙ্গে সংগত নয়Ñএমন ভায়োলেন্স দেখি; তার বর্ণনায় যে চিত্রকল্প তিনি ব্যবহার করেন, তাও পুরোপুরি বঙ্গীয় নয়। যেমন—‘হরিৎ প্রান্তরে জেব্রার মতো ধাবমান বাতাস।’ এই বাতাস তো বাংলার নয়, আফ্রিকার। কিন্তু বিজাতীয় হলেও এই চিত্রকল্পের ইনটেনসিটি স্পর্শ করে না, এমন পাঠক আছে বলে তো মনে হয় না।
প্যারিসের আকাশে ইহুদির চিত্রকল্প প্রসঙ্গে একটা মজার গল্প বললেন তিনি। এই চিত্রকল্পটি শামসুর রাহমান সংগ্রহ করেছেন শাগালের আঁকা একটি ছবি থেকে। ইউরোপ থেকে ফিরে এসে চিত্রকর রশীদ চৌধুরী শাগাল—ধাঁচের ছবি আঁকা শুরু করেন। শাগাল—প্রভাবিত, শাগালের অনুকরণে নয়। শাগালের টেকনিক সেখানে ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত প্রবাদ ব্যবহারের মাধ্যমে তাঁর হাতে সে ছবি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মাত্রা অর্জন করে। তিনি স্মরণ করলেন, রশীদ চৌধুরীর একটি ছবিতে দেখা যায় গ্রামের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটা লাল মোরগ, আর নিচ থেকে তাকে তাকিয়ে দেখছে একটি শৃগাল। এ ছবি দেখে কি তুমি বলবে, রশীদ চৌধুরী শাগালের ছবি নকল করেছেন?
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের উদাহরণও তিনি আমাকে দিলেন। তাঁর কবিতায় রবীন্দ্রনাথের অনেক পংক্তির অনুরণন, এমনকি অবিকল ব্যবহারও রয়েছে। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলতে আমরা রবীন্দ্রনাথের সেই টুকরোগুলোকে বুঝি না। রবীন্দ্রনাথ যেখানে প্রায়—আধ্যাত্মবাদী একজন কবি, সুধীন্দ্রনাথ সেখানে নাস্তিক। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় নাস্তিকতার যে আর্তনাদ শুনি, রবীন্দ্রনাথে তা নেই। ব্যক্তিত্বের বিচারে এই দুই কবির ভেতর আকাশ—পাতাল প্রভেদ।
আমি নাছোড়বান্দা, পুরনো কুতর্কে ফিরে যাই। বলি, শামসুর রাহমান তাঁর সেরা কাজগুলো করেছেন সত্তর সালের ভেতর। এই সময় তাঁর কবিতায় যে নাগরিক নেতিবাদ দেখি, তা বাংলা কবিতার নিজস্ব ট্রাডিশন—ভিত্তিক নয়। তাতে যে বিষণ্ণ বিচ্ছিন্নতাবোধ শুনি, তাও সমসাময়িক বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। একাত্তরের পর শামসুর রাহমানের কবিতার পালাবদল ঘটেছে, কিন্তু এই পর্যায়ে তিনি কিছু ভালো কবিতার পাশাপাশি বিস্তর বাজে কবিতাও লিখেছেন। তাছাড়া কবির একটিভিস্ট হওয়া উচিত নয়, এমন একটি প্রতিক্রিয়াশীল কথাও আমি বলে বসি।
দুই
এক বন্ধুকন্যার গ্র্যাজুয়েশন পার্টিতে আমরা জ্যাকসন হাইটসে এসেছি। এটি নিউইয়র্কের প্রধান বাঙালিপাড়া। শহীদ ভাইও এসেছেন সস্ত্রীক। ইদানীং এসব ভিড়ভাট্টায় তাঁকে খুব একটা দেখা যায় না। বুঝলাম, উপরোধে তাঁকে ঢেঁকি গিলতে হয়েছে। পার্টি হলের শেষ দিকে, প্রায় নির্জন এক কোণায় বসে আছেন তিনি। একাই ছিলেন, আমি এসে পাশে বসলাম।
স্বাভাবিকভাবেই কবিতা নিয়ে কথা উঠল। এর আগের সপ্তাহে কলকাতার কবি—দম্পতি মল্লিকা সেনগুপ্ত ও সুবোধ সরকার এসেছিলেন, সে কথা তাঁকে জানালাম। খুব আগ্রহ করে জানতে চাইলেন, কেমন তাঁদের কবিতা, কী তাঁরা বললেন। আমি রাখঢাক ছাড়াই বললাম, ভালো, কিন্তু বড় উচ্চকণ্ঠের কবিতা। কোনো আড়াল নেই; পাঠক সে কবিতা থেকে কোনো অর্থ খুঁজে নেবে, তার প্রয়োজন নেই। সব কথাই খোলামেলাভাবে বলা হয়ে যায়। খুব স্পষ্টভাবে রাজনৈতিকÑএত ডিক্লারেটিভ কবিতা আমাকে স্পর্শ করে না।
শহীদ ভাই মাথা নাড়লেন। বললেন, কবিতা রাজনৈতিক হওয়া কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু সে কবিতা কবিতা হয়ে উঠল কি না, সেটাই আসল বিষয়। এলুয়ার রাজনৈতিক কবিতা লিখেছেন, নেরুদার অনেক রাজনৈতিক কবিতাও অসাধারণ। কবি শুধু নিজেকে নিয়ে আত্মমগ্ন হবেন, তেমন কবির কবিতায় তিনি বিশ্বাস করেন না। কবিতার পরিমণ্ডল আরও ব্যাপক হওয়া চাই। কিন্তু কবি যদি শুধু পাঠকের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক চাহিদা মাথায় রেখে কবিতা লেখেন, তাহলে তাঁর কবিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যদি কবিতা শুনে মনে হয় এটা ‘হলো’, তাহলে তা দক্ষতাপূর্ণ বা ‘ক্রাফটি’ কবিতা হলেও ‘জেনুইন’ হবে না। ঠিক সে জন্যই লেখকের বা কবির সততা এত জরুরি।
ব্যাপক পরিমণ্ডলের ব্যাপারটা কী, আমি বোঝার চেষ্টা করি। শিক্ষকের মতো ধৈর্য নিয়ে তিনি আমাকে বোঝালেন, যেকোনো বড় বা মহৎ কবি তাঁর সময় ও পরিপার্শ্বের সঙ্গে তিন স্তরে নিজেকে প্রকাশ করেন। প্রথম স্তরে প্রকাশিত হয় কবির নিকটবর্তী সময় ও পরিবেশ। দ্বিতীয় স্তরে থাকে তাঁর দেশ ও সমকাল। আর শেষ স্তরে পৃথিবী ও ইতিহাস। একটু ভেবে যোগ করলেন, শুধু পৃথিবী নয়, কসমসের সঙ্গেও তাঁর পরিচয়। এই বিভিন্ন স্তরে নিজেকে প্রকাশে সক্ষম যে কবি, মহাকাল তাঁকেই স্মরণে রাখবে।
কিঞ্চিৎ আপত্তি করলাম। বললাম, আপনি কি কবিকে বড় বেশি দায়িত্ব দিয়ে ফেলছেন না? কবি ইতিহাসবেত্তাও নন, দ্রষ্টাও নন। কবি যদি গোটা পৃথিবীর দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন বা একটিভিস্ট হওয়ার চেষ্টা করেন, তো তাঁর কবিতার বারোটা বাজা ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
শহীদ ভাই আমাকে কবিতার ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। বললেন, কবি বিভিন্ন স্তরে নিজেকে প্রকাশ করেনÑসে কথার অর্থ হলো, তিনি গোটা জীবনকে ধরার চেষ্টা করেন। পৃথিবীর সব বড় কবিই সে কাজ করেছেন। জীবনের সব দিক দেখার ক্ষমতা আছে বলেই না তাঁরা বড় কবি। তবে তিনি স্বীকার করলেন, কবি একটিভিস্ট হন, বড় বড় স্টেটমেন্ট দিয়ে বেড়ানÑতা তিনি চান না। কবি একটিভিস্ট হয়ে পড়লে তাঁর চোখে এক ধরনের ‘ব্লিঙ্কার্স’ ঠেসে বসে; তাঁর কাছে যে নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টি আশা করি, দেখার সেই চোখ বন্ধ হয়ে যায়। তিনি হয় শুধু আলো দেখেন, নয়তো শুধু অন্ধকার। জীবনে আলোর দিক যেমন আছে, তেমনি আছে অন্ধকার। যেমন আছে আরোহণ, তেমনি আছে পতন। উদাহরণ হিসেবে বিষ্ণু দের কথা বললেন। মার্কসবাদী নাস্তিক এই কবি তাঁর মার্কসবাদী চোখে প্রকৃতিকে দেখেছেন, বৃষ্টি দেখেছেন, বিবর দেখেছেন, মৃত্যু দেখেছেন। টুকরো টুকরো করে গোটা জীবনকেই তিনি দেখেছেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনেক আধুনিক সমালোচকের আপত্তি তো এখানেই যে, তাঁর লেখায় জীবনের অন্ধকার দিক নেই। এলিয়টের কথা উদ্ধৃত করে বললেন, কবিতা হবে ‘অব দ্য বোরডম অ্যান্ড দ্য গ্লোরি অব লাইফ’। কবি জীবনকে কেবল তার বহিরঙ্গ থেকে দেখবেন না, দেখবেন তার অপ্রকাশিত, অন্তরঙ্গ রূপ থেকেও; দেখবেন তার নিঃস্বতায় ও পূর্ণতায়।
আমাদের আলোচনায় বাধা পড়ে। যে বন্ধুর আমন্ত্রণে আমরা এসেছি, তিনি এসে শহীদ ভাইকে বলেন, ‘এবার আপনি অতিথিদের উদ্দেশে কিছু বলুন।’ আঁতকে ওঠেন শহীদ ভাই। ‘বলেন কী, আমি?’
তিন
শহীদ ভাই আমেরিকায় আছেন প্রায় আড়াই দশক, যার অধিকাংশই কাটিয়েছেন বস্টন শহরে। এই দীর্ঘ সময়ে বলতে গেলে কিছুই লেখেননি। কেন, জিজ্ঞেস করলে তাঁর উত্তর: আলস্য। নিজের লেখা নিয়েও তাঁর প্রবল তাচ্ছিল্য। ‘বালক বয়সের দুর্মতি’ বলে তা সরাসরি বাতিল করে দেন। বছর দুয়েক আগে আমরা গিয়েছিলাম বুদ্ধদেব বসুর কন্যা মীনাক্ষী ও জামাতা জ্যোতির্ময় দত্তের নিউইয়র্কের বাসায়। তাঁরা দুজনেই শহীদ কাদরীর কবিতার অসম্ভব ভক্ত। ভীষণ জোরাজুরি করলেন তাঁরা, শহীদ ভাই যেন তাঁর একটি কবিতা পড়ে শোনান। ‘দূর দূর’ বলে হেঁকে উঠলেন শহীদ ভাই।
কোনো কপট বিনয় নয়, নিজের কবিতা নিয়ে আসলেই বিন্দুমাত্র অহংকার তাঁর নেই। কবিতা নিয়ে আলাপে এখনো তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতে রাজি, কিন্তু নিজের কবিতা নিয়ে কথা বলতে ঘোর আপত্তি। তাঁর স্মৃতি এখনো আগের মতো তীক্ষè। রবীন্দ্রনাথ বা বুদ্ধদেবের কবিতা বিনা যতিতে শুনিয়ে দেবেন। এলিয়ট বা এলুয়ার থেকে উদ্ধৃতি দেবেন এন্তার। কিন্তু তাঁর নিজের কবিতা নিয়ে প্রশ্ন করুন, মুখ গম্ভীর করে প্রসঙ্গ বদলাবেন।
নির্বাসনের এই বিশ বছরে কবিতা যে একদম লেখেননি, তা কিন্তু নয়। কবিতার দুটো খসড়া খাতা ছিল। অগোছালো মানুষ, দুটো খাতাই হারিয়েছেন। বস্টনের কবিবন্ধু বদিউজ্জামান নাসিমের বাসায় আরও একটি কবিতার খাতা ছিল; গত বছর তাঁর বাড়ি আগুনে পুড়ে গেলে সে খাতাও উদ্ধারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ইদানীং ‘কালি ও কলম’ পত্রিকার সম্পাদক আবুল হাসনাতের চাপে পড়ে তাঁকে কিছু কিছু কবিতা লিখতে হয়েছে। অন্ততপক্ষে দুটো একদম আনকোরা কবিতা তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার করে নিয়েছেন তিনি। তার একটি ‘বিবৃত সংলাপ’। তাতে অনায়াসে পুরনো শহীদ কাদরীকে খুঁজে পাওয়া যায়। সেই পরিহাসপ্রিয়তা, শব্দের সেই পরিমিত প্রয়োগ, সেই আলোকিত আশাবাদ। কবিতাটি পড়ে আমি তাঁকে বলেছিলাম, ‘এ যে দেখছি একদম নারীবাদী কবিতা।’ সত্যি বলছি, শহীদ ভাই লজ্জা পেয়েছিলেন এবং সলজ্জে তাঁর স্ত্রী নীরার দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছিলেন।
অনেকেই বলেন, এ কী করে সম্ভব যে শহীদ কাদরীর মতো লোক আজকাল আর লেখেন না, বা লিখলেও তা অতি কদাচিৎ। পাঁচ—সাত বছর আগের কথা জানি না, কিন্তু এখন যে কঠোর চিকিৎসার নিয়মকানুন তাঁকে মেনে চলতে হয়, কবিতা লেখার ফুরসত সেখানে জোটানো সহজ নয়। তাঁর দুটো কিডনিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই বছর ধরে চিকিৎসা চলছে। কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের তালিকায় তাঁর নাম আছে, কিন্তু আরও কিছু সময় তাঁকে সে সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হবে। এক দিন পরপর, সপ্তাহে তিন দিন তাঁর ডায়ালিসিস; প্রচণ্ড ধকল যায় সে তিন দিন। এরপর কবিতা আসার কথা নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাঝেমধ্যে কবিতা লেখার কথা বলেন, পুরোনো খসড়া ঝাড়পোঁছ করে কবিতা বাছাই শুরু করবেন বলে আমাদের প্রতিশ্রুতি দেন।
বছর কয়েক আগে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নিউইয়র্কে এসেছিলেন। চল্লিশ বছরের পুরনো বন্ধুত্ব, দুজনে মিলে আমার ঘরে তাঁদের তুমুল আড্ডা। কবে বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডায় এক মহিলা কবির আগমনে কে আগে তাঁকে ‘ইমপ্রেস’ করবেন, তার প্রতিযোগিতা; কবে কোন এক বড় কবি নিজের স্ত্রীর উরুকে বিশ্বের সেরা উরু বলে দাবি করেছিলেন, আর তা শুনে শহীদ ভাই জনসমক্ষে সে মহিলার উরু যাচাই করার দাবি তুলেছিলেনÑএ রকম অসংখ্য গল্প। সায়ীদ স্যার প্রস্তাব করেছিলেন, ‘শহীদ, তুমি স্মৃতিকথা লেখো।’
নিমরাজি হয়েও ছিলেন সেবার, কিন্তু কিডনি সমস্যায় পড়ে সব গুবলেট হয়ে গেল। আমি দিন কয়েক আগে তাঁকে সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম। ইতস্তত করে বললেন, ‘কী দরকার পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে?’
জীবনে অনেক আঘাত পেয়েছেন; স্মৃতিকথা লিখতে গেলে সে সব এড়ানো কঠিন। স্মৃতিকথা না লিখে তিনি কবিতা নিয়ে টীকা—টিপ্পনী লেখার কথা ভাবছেন। আমি তাঁর সিদ্ধান্তে সম্মতি দিই। শুধু বাংলা কবিতা নয়, বিশ্বের কবিতা নিয়ে তাঁর যে পাণ্ডিত্য, খুব বেশি লোকের ভেতর তা আমি দেখিনি। শহীদ ভাই টীকা—টিপ্পনী লিখলে আমরা, যারা কবিতা ভালোবাসি কিন্তু সব সময় তার গূঢ়ার্থ বুঝি না, ভীষণ কৃতজ্ঞ হব।
আমার বিশ্বাস, শহীদ ভাই তাঁর সে কথা রাখবেন। তিনি শুধু কবিতার ভাষ্যই লিখবেন না, কবিতাও লিখবেন। এ কথা বলছি শুধু এই জন্য নয় যে শহীদ কাদরী ভীষণ কাব্যপ্রেমী। তিনি আবার কবিতা লিখবেন এই কারণে যে তিনি জীবনকে ভালোবাসেন।
নিউইয়র্ক, ১৩ আগস্ট ২০০৬
(নীরা কাদরীর সৌজন্যে। লেখকের অঙ্গনে পঠিত)
