মানসিক কারণেও হয় হাইপারটেনশন

ডা. এস এম ইয়ার মাহাবুবঃ এক নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন। প্রায় ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন, যাঁদের অনেকে জানেনই না যে তাঁদের শরীরে অজান্তেই বাসা বেঁধেছে উচ্চ রক্তচাপ। যেহেতু তাঁদের শরীরে বাড়তি ওজন নেই, কোলেস্টেরলের সমস্যা নেই, তাই তাঁরা ধারণাও করতে পারেন না হাইপারটেনশন তাঁদেরও হতে পারে। দৈনন্দিন জীবনের আর্থিক সমস্যা, কাজের চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং শহুরে জীবনযাত্রার মানসিক চাপে সমস্যাটি হতে পারে বা বাড়তে পারে এর মাত্রা। একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এটি প্রমাণিত যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ সরাসরি উচ্চ রক্তচাপের জন্য দায়ী। 

মানসিক চাপ কিভাবে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করে?

দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে থাকলে শরীরের সিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম অতি সক্রিয় হয়ে পড়ে এবং অ্যাড্রেনালিন কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এর ফলে রক্তনালি সংকুচিত হয় (ভ্যাসোকনস্ট্রিকশন) এবং হৃত্স্পন্দন বেড়ে যায়। এই দুটি সমন্বিতভাবে সাময়িকভাবে দেহের রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, শরীরকেফাইট অর ফ্লাইটরেসপন্সের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। প্রতিটি মানুষ ক্রমাগত অর্থনৈতিক সামাজিক চাপে থাকে। মানসিক চাপ কমার তেমন সুযোগ হয়ে ওঠে না। তখন সাময়িক অবস্থাটি স্থায়ী রূপ নেয় এবং রক্তনালি সংকোচন উচ্চ হৃত্স্পন্দন আর কমে না। এর ফলে রক্তনালির প্রাচীরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ধমনি শক্ত হয়ে যায় এবং প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা সবই উচ্চ রক্তচাপের মূল কারণগুলোর মধ্যে পড়ে। এর পাশাপাশি মানসিক চাপ থেকে নিস্তার পেতে অনেকে বেছে নেন অস্বাস্থ্যকর কিছু অভ্যাস। এর মধ্যে আছে খাবারের সঙ্গে বাড়তি লবণ যোগ করা, ধূমপান অ্যালকোহল গ্রহণ, পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম ব্যয়াম না করা এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ না ঘুমানো। এসব অভ্যাস কিছু সময়ের জন্য মানসিক চাপ কমায় ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ সময়ের পর উচ্চ রক্তচাপকে আরো বাড়িয়ে তোলে। ঢাকার পরিচালিত ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব অফিসকর্মী উচ্চ চাপের মধ্যে কাজ করেন, তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি।

একটি বাস্তব উদাহরণ : শহুরে জীবনের চাপ

৪৫ বছর বয়সী আবদুর রহমান (ছদ্মনাম) ঢাকার একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা।

চাপযুক্ত চাকরি, যানজটে দীর্ঘ সময় কাটানো এবং পারিবারিক দায়িত্ব তাঁকে ক্রমাগত মানসিক চাপে রাখে। তিনি ব্যায়াম করতেন না, প্রক্রিয়াজাত খাবার খেতেন এবং প্রতিদিন মাত্র পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতেন। একটি ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পে তাঁর রক্তচাপ মাপা হলে দেখা যায়

১৬০/১০০ সসঐম  যা স্বাভাবিকের (১২০/৮০ সসঐম) চেয়ে অনেক বেশি। চিকিৎসকরা তাঁকে সতর্ক করেন যে এখনই জীবনযাত্রা পরিবর্তন না করলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হতে পারে। তাঁর মতো অসংখ্য শহুরে পেশাজীবী আজ বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের শিকার।

প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ

জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে সম্ভব রোগটি প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণে রাখা। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভ্যাসগুলো ধরে রাখা জরুরি। উপসর্গ কমলে ছেড়ে দেওয়া যাবে না।

খাদ্যাভ্যাস : লবণ কম খাওয়া, কলা, পালং শাকের মতো পটাসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার বাড়ানো এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়ানো। 

ব্যায়াম : দিনে মাত্র ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা রক্তচাপ সসঐম  কমাতে পারে। 

মানসিক চাপ কমানো : মেডিটেশন, গভীর শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং যোগব্যায়াম কর্টিসল হরমোন কমাতে সাহায্য করে। 

যাঁদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন, তাঁদের ক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসকরা স্বল্প বা মাঝারি মাত্রার কিছু ওষুধ দিয়ে থাকেন। প্রতিটি রোগীর প্রয়োজন আলাদা, সে অনুযায়ী চিকিৎসক নির্ধারণ করেন কেমন ওষুধ প্রয়োজন।

Related Posts