নির্দয়তম মাস আগস্ট

কবি টি.এস. এলিয়ট তার বিখ্যাত কবিতাওয়েস্টল্যান্ডশুরু করেছিলেনএপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মানথপংক্তি দিয়ে। বাঙালিদের জন্য সবচেয়ে শোকার্ত মাস আগস্ট। বাংলা ভাষার কোনো কবি কি এই রকম কোনো পংক্তি রচনা করেছেন?

আগস্ট মাস জুড়ে কাঁদলেও বাঙালির অশ্রম্ন শেষ হবে না। এই মাসে বাংলা ভাষার চার কবিই শুধু মৃত্যুবরণ করেনি, এই মাসেই শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে কিছু নির্দয় ষড়যন্ত্রকারী। এই মাসেই বাংলাদেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় একজন মহিয়সী রাজনীতিক আইভি রহমানসহ ২৪ জনকে। যাকে হত্যা করা মূল উদ্দেশ্য ছিল সেই শেখ হাসিনা বেঁচে যান। এই মাসেই ২০২৪ সালে হত্যার শিকার হয় প্রায় ১৪০০ ছাত্রজনতাপুলিশ (জাতিসংঘের ভাষ্যমতে)

যে তিন জন ব্যক্তি বিবিসির ২০০২ সালে করা বিশ্বব্যাপি জরিপে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হন সেই প্রথম তিনজনই মৃত্যুবরণ করেন এই মাসে। এরা হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১০০ জনের প্রথম, দ্বিতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তৃতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এর বাইরে বাংলা ভাষার দুই কবি শামসুর রাহমান এবং শহীদ কাদরী প্রয়াত হন এই মাসে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানঃ তিনি বাঙালিদের জাতির পিতা। তিনি আজীবন নিরাপোষ থেকে ৫৫ বছরের জীবনকালে প্রায় ১৩ বছর অর্থাৎ ৪৬৮২ দিন কারান্তরালে থেকে সহ¯্র বছরের জানা ইতিহাসে বাঙালি জাতির প্রথম স্বাধীনতা এনে দেন। সরকারি বাড়িতে না থেকে দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও নিজের বাড়িতে বাস করতেন আর দশজন মধ্যবিত্ত বাঙালির মত। বাঙালিদের প্রতি প্রবল বিশ্বাসের কারণে তিনি রাজনীতিক হিসাবে প্রজ্ঞাবান হলেও ষড়যন্ত্রকারীদের কুটিলতা বুঝতে অক্ষম ছিলেন। ফলে নিরস্ত্র এই মহান ব্যক্তিকে তার স্ত্রী, শিশুপুত্রসহ দুই পুত্র এবং পুত্রবধূদের হত্যা করে নির্দয় দুষ্কৃতকারীরা রাতের অন্ধকারে। এই হত্যা বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরঃ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেশ হিসাবে আগে থেকেই বাংলার পরিচয় ছিল বিশ্ব দরবারে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে সেই পরিচিতিকে অন্য এক স্তরে নিয়ে যান। তারই লেখা গান, যেটির সুর বাংলাদেশের বাউলসংগীতের এবং লেখাও হয় শিলাইদহে, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত করেন। তিনিই প্রথম কোনো এশীয় লেখক সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ পান গীতাঞ্জলি গীতিকাব্যের জন্য। গীতাঞ্জলির অধিকাংশ কবিতা হয় পূর্ববঙ্গে বসে লেখেন, নয়ত পদ্মায় বোটে অনুবাদ করেন ইংরেজিতে। তিনি এখন পর্যন্ত একমাত্র বাংলাভাষী এই পুরস্কার পেয়েছেন। সব্যসাচী হিসাবে যদি কাউকে আখ্যায়িত করা হয়, তিনি রবীন্দ্রনাথই। এই কবি এবং দার্শনিক মৃত্যুবরণ করেন ১৯৪১ সালের আগস্ট।

কবি কাজী নজরুল ইসলামঃবিদ্রোহীকবিতা লিখে ধূমকেতুর মত বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব তাঁর। এসেই শুধু বাংলা কবিতার জগত নয়, তিনি প্রকম্পিত করেন ঔপনিবেশিক বৃটিশ শাসকদেরও। রাস্তার বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনকে কবিতার ছন্দে ছন্দে পৌঁছে দেন ঘরে ঘরে। তিনি বাঙালিদের শোনান সাম্য অসাম্প্রদায়িকতার অন্য এক স্বর। তার সাথে মানবিকতা প্রেমেরও। অসামান্য গান লিখে সুর দিয়েও তিনি অমর হয়ে আছেন। দীর্ঘ নির্বাক অসুস্থ জীবন শেষে তিনি ঢাকায় শেষ শয্যা গ্রহণ করেন ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট।

কবি শামসুর রাহমানঃ বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা কবিতার পথিকৃত কবি শামসুর রাহমান সেই ভাষা আন্দোলন থেকে নব্বইএর দশকে মৌলবাদের উত্থান পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনাকে তুলে এনেছেন তার কবিতার ভাবে শরীরে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়েও তার মত এত কবিতা আর কেউ লেখেননি। এই অসাম্প্রদায়িক মানবিক কবি প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, বন্দীশিবির থেকে, আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি, অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ, বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়, ধ্বংসের কিনারে বসে মত কাব্যের নামকরণের মধ্য দিয়ে পৃথক নিজস্ব স্বর সৃষ্টি করেছেন। শামসুর রাহমানের প্রয়াণ হয় ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট।

কবি শহীদ কাদরীঃ বাংলাদেশের কবিতার নিরেট নাগরিক কণ্ঠস্বর শহীদ কাদরী মাত্র ২৫ বছর বয়সে উত্তরাধিকার কাব্য প্রকাশিত হওয়ার আগেই জানান দিয়েছিলেন তিনি আসছেন নতুন উত্তরাধিকার নিয়ে। তারপর তিনি সদ্য স্বাধীন দেশকে নতুন প্রতীকে প্রিয়তমা বলে অভিবাদন জানালেন। তৃতীয় কাব্য কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই। জীবনের শেষার্ধে ইয়োরোপ এবং আমেরিকায় কটিয়ে থিতু হন নিউইয়র্কে। নির্বাসিত জীবনের ভেতরবাহির উন্মোচন করেছেন তিনিআমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাওকাব্যে। নিউইয়র্কে তিনি জীবনকে বিদায় অভিবাদন জানান ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাঃ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার জনবহুল বঙ্গবন্ধু এভেন্যুতে আওয়ামী লীগের জনাকীর্ণ জনসভায় দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা করলে ২৪ জনের মৃত্যু হয়। জখম হয় পাঁচ শতাধিক। প্রায় ২০,০০০ মানুষের এই সমাবেশে ১৩টি গ্রেনেড ছোঁড়া হয় নিকটস্থ বিল্ডিংএর ছাদ থেকে। এই ২৪ জনের মধ্যে অন্যতম মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী আইভি রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরে এটা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাকান্ড।

জুলাইআগস্ট হত্যাকান্ডঃ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্ররা প্রথমে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু করলেও পরে তা সরকার পতন আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। আন্দোলনকারীদের দমন করতে পুলিশ গুলি চালালে জনরোষ ফেটে পড়ে। সরকারের পতন হয়। কিন্তু অচিরেই ফাঁস হয়ে যায় এটা শুধু সরকার পতনের আন্দোলন ছিল না, ছিল বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় অসামান্য অবদানের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র। সে কারণে বীরশ্রেষ্ঠসহ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য এবং মুজিব নগর সরকারের স্কাল্পচার গার্ডেন এমন কি মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার হিসাবে পরিচিত বঙ্গবন্ধুর বাসভবন যা পরবতীর্তে মিউজিয়মে রূপান্তর করা হয় তাও ধ্বংস করা হয়। আজ পর্যন্ত এই অপরাধীদের শনাক্ত করে গ্রেফতারপূর্বক বিচারের আওতায় আনা হয়নি। 

তবে সবচেয়ে দুঃখজনক হলো এই আন্দোলনে ৮০০ জন ছাত্রজনতা ৬০০ জন পুলিশের মৃত্যু হয় বললেও কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারছে না সব হত্যাই চালিয়েছে পুলিশ। বিষয়টি আরো সন্দেহজনক করে তোলে যখন সেই অন্তর্বতীর্ সরকারের এক উপদেষ্টা, যিনি সাবেক মিলিটারি কর্মকর্তা, এক বিশেষ ধরনের গুলির কথা উচ্চারণ করে সরকারের তোপের মুখে পড়েন। এবং সন্দেহ ঘনীভূত করেন।

যে কোনো হত্যা হত্যাই। তবে যারা হত্যা করে তাদের শনাক্ত না করা, গ্রেফতার না করা, বিচার না করাও অপরাধ। কারণ বিচারহীনতা আরো অবিচারের জন্ম দেয়।

তাই বাঙালি জাতির কাছে আগস্ট সত্যিইক্রুয়েলেস্ট মানথবা নির্দয়তম মাস। এমন মাস যেন আর না আসে কখনো।

Related Posts