গল্প || ঈক্ষণ || রিমি রুম্মান

‘কিউ ফিফটি এইট’ বাসের জানালার ধারের সিটে বসে বাইরে তাকিয়ে থাকে বিশাখা।

শহরটি পেছনের দিকে ছুটে যাচ্ছে। বাড়িঘর, গাছপালা, দোকানের সাইনবোর্ড, শপিং মল, টেনিস কোর্ট, ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, সবকিছুই যেন কোনো অদৃশ্য হাতের টানে দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বিশাখা সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে অতিক্রম করে আসা পথটির দিকে তাকায়। কোনো দৃশ্য চোখে পড়ার আগেই মিলিয়ে যায়। কোনো মুখ এক মুহূর্তের জন্য জানালার ফ্রেমে এসে আবার অদৃশ্য হয়ে যায়।

বাস এগিয়ে চলে সামনে। কিন্তু বিশাখার মন পড়ে থাকে পেছনে। অতিক্রম করে আসা সময়ের দিকে।

পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই বিশাখা মূলত একজন লেখক। এতদিন সে লিখেছে অন্যদের নিয়ে। মানুষের গল্প, সম্পর্কের গল্প, শহরের গল্প। নিজের কথা নয়। নিজের ভেতরের কথাগুলো যেন সবসময়ই তার লেখার টেবিলের বাইরে পড়ে থেকেছে।

একমাত্র সন্তান বিলাস সদ্য কলেজের পড়াশোনা শেষ করেছে। স্বামী, সংসার, সন্তান, আত্মীয়স্বজন, সামাজিকতা, সব মিলিয়ে এতদিনের যে ব্যস্ত জীবন তাকে প্রায় নিঃশ্বাস নেওয়ারও অবকাশ দিত না, ইদানিং তার অনেকটাই বদলে গেছে। বিলাস নিজের জীবনের পথে পা বাড়িয়েছে। সংসারের কিছু দায়িত্ব হালকা হয়েছে। দিনের প্রতিটি মুহূর্ত এখন আর অন্য কারও প্রয়োজন মেটাতে ছুটতে হয় না।

প্রথমদিকে এই অবসর বিশাখার কাছে অচেনা লেগেছিল। তারপর একদিন সে বুঝতে পেরেছিল যে, অন্যের জন্য বেঁচে থাকতে থাকতে মানুষ নিজের জন্যও জীবনের কিছুটা জমিয়ে রাখতে পারে।

সেই থেকেই সকালের এই বেরিয়ে পড়া। নাশতা সেরে, রান্নাঘরের কাজ গুছিয়ে, সংসারের প্রয়োজনটুকু সামলে সে বেরিয়ে পড়ে। শহর পুরোপুরি জেগে ওঠার আগের সময়টুকু তার সবচেয়ে প্রিয়।

নিউইয়র্ক তখন অন্যরকম।

রাতের শেষ অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে যায়। উঁচু ভবনের কাচে সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়ে। গাছের পাতায় রাতের শিশির কেঁপে ওঠে। দূরের কোনো অচেনা গাছ থেকে পাখি ডাকে। ফুটপাতে দু—একজন মানুষ হাঁটে। কোনো কোনো জানালায় আলো জ্বলে ওঠে।

তারপর ধীরে ধীরে শহর জেগে ওঠে।

বিশাখা হাঁটতে হাঁটতে গাছের মগডালের দিকে তাকায়। সকালের রোদ—ভেসে—থাকা পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখে। উঁচু দালানের মাথায় নরম রোদ যেন গা এলিয়ে শুয়ে আছে—সেই দৃশ্যও তাকে থামিয়ে দেয়। 

পাখিরা ফুটপাতে নেমে আসে। জমিন খুঁটে খুঁটে শস্যদানা খায়। বিশাখা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। এত ছোট একটি দৃশ্যও তার কাছে গল্পের মতো মনে হয়। মানুষ দেখতে ভালোবাসে সে। প্রকৃতি দেখতে ভালোবাসে। শহর দেখতে ভালোবাসে। হয়তো সে কারণেই বাসের জানালার পাশের সিটটি তার এত প্রিয়। বাসের জানালার পাশে বসলে পৃথিবীকে একটু দূর থেকে দেখা যায়। কেউ তাকে ডাকে না। কেউ কিছু চায় না। কোনো দায়িত্ব এসে কাঁধে হাত রাখে না। শুধু চলমান পৃথিবী। আর সে।

বাসস্টপে পৌঁছাতে তাকে এখন কিছুটা হাঁটতে হয়। কয়েকটি স্টপেজ বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আগে বাড়ির কাছ থেকেই বাসে ওঠা যেত। বিশাখার অবশ্য এতে আপত্তি নেই। বরং হাঁটার পথটুকু তার নিজের। 

বাস এলে সে উঠে পড়ে। জানালার ধারের সিটের প্রতি তার অন্যরকম এক আগ্রহবোধ ও কৌতূহল কাজ করে। সে জানালার পাশের সিটে বসে। যাত্রীরাও একে একে ওঠে। কারও হাতে কফির কাপ, কারও কাঁধে ভারী ব্যাগ, কেউ ফোনের পর্দায় চোখ রেখে হাঁটছে, কেউ ঘড়ি দেখছে। সকালের অফিস—আওয়ার। সবারই যেন কোথাও পৌঁছানোর তাড়া। শুধু বিশাখার নেই।

‘হ্যালো, গুড মর্নিং, এভরিওয়ান।’

চালকের কণ্ঠে নতুন যাত্রীদের দিকে ছঁুড়ে দেওয়া সকালে এক টুকরো সাদর সম্ভাষণ। কেউ হেসে তাকায়। কেউ মাথা নাড়ে। কেউ শোনেই না। বাসের দরজা বন্ধ হয়। বাস চলতে শুরু করে। বিশাখা জানালার দিকে মুখ ফেরায়। শহর পেছনে ছুটতে থাকে। এই দৃশ্য তার প্রতিদিনের। তবু প্রতিদিনই নতুন।

কখনো কোনো বৃদ্ধা রাস্তা পার হন। কখনো এক শিশু মায়ের হাত ধরে স্কুলে যায়। কখনো কোনো মানুষ ফুটপাতে দাঁড়িয়ে একা কফি পান করে। কিংবা কোনো ভবনের কাচে হঠাৎ সূর্যের আলো এমনভাবে পড়ে যে বিশাখার মনে হয়, কেউ যেন আকাশের এক টুকরো আলো এনে শহরের গায়ে মেখে দিয়েছে।

এভাবেই গল্পের রসদ জমে।

কিন্তু আজ সে গল্পের রসদ সংগ্রহ করতে বের হয়নি। আজ সে নিজের জীবন পড়তে বসেছে। চালকের দিকে তাকাতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল বিশাখার চোখ। একজন তরুণী। বয়স ত্রিশের বেশি হবে না। হালকা গড়ন। ছোটখাটো শরীর। বড়জোর পাঁচ ফুট। বিশাখা বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল। এত বড় বাস! এতজন যাত্রী! আর এই সামান্য শরীরের মেয়েটি কী অনায়াসে বাসটি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে! তার হাত স্টিয়ারিংয়ে স্থির। চোখ সামনের রাস্তায়। বাস থামছে, যাত্রী উঠছে, নামছে, আবার ছুটছে। কোথাও কোনো অস্থিরতা নেই। বিশাখা আরও কয়েকবার তাকাল। তার বুকের ভেতর বহুদিনের ঘুমন্ত একটি ইচ্ছা যেন হঠাৎ নড়ে উঠল। সে যদি এই শহরের বাসচালক হতে পারত! 

ভাবনাটা আসতেই বিশাখার নিজেরই একটু হাসি পেল। পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই বয়সে এসে এমন ইচ্ছা কারও কাছে বললে হয়ত অদ্ভুতই শোনাবে। কিন্তু ইচ্ছেটা নতুন নয়। বহু বছরের পুরনো। 

এই ইচ্ছার শুরুটা ঠিক কবে, বিশাখা মনে করতে পারে না। তবে বাসে বসে শহর দেখতে দেখতে বহুবার তার মনে হয়েছে, বাসচালকের জীবনটা অদ্ভুত সুন্দর। একই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন যাওয়া, অথচ প্রতিদিনই অন্যরকম কিছু দেখা। একই শহর, কিন্তু বদলে যাওয়া আলো, বদলে যাওয়া মুখ, বদলে যাওয়া ঋতু। একজন চালক যেন শহরটাকে শুধু চালিয়ে নিয়ে যায় না, শহরের প্রতিদিনের জীবনের মধ্য দিয়েও হেঁটে যায়।

কখনো কোনো বাসচালককে সে দেখেছে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধের দিকে হাত তুলে অভিবাদন জানাতে। কখনো দেখেছে, দৌড়ে আসা কোনো যাত্রীর জন্য দরজা খুলে অপেক্ষা করছেন। কখনো কোনো শিশু জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে দেখে চালকের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠেছে। এই ছোট ছোট দৃশ্যগুলো বিশাখার চোখ এড়ায় না। তার মনে হয়েছে, বাসচালক হওয়া মানে শুধু স্টিয়ারিং ঘোরানো নয়। মানুষ আর শহরের মাঝখানে বসে থাকা। প্রতিদিন শত শত মানুষের মুখের ভেতর দিয়ে অগণিত গল্পের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া। কারও গন্তব্য জানা নেই, কারও গল্প জানা নেই, তবু কিছুক্ষণের জন্য সবাই একই যাত্রার অংশ।

লেখক হওয়ার কারণে হয়তো এই ব্যাপারটাই তাকে টানত। মানুষ দেখতে তার ভালো লাগে। মানুষের অজানা গল্প কল্পনা করতে ভালো লাগে। জানালার পাশে বসে সে যেমন শহরকে দেখে, চালকের আসনে বসলে হয়তো শহরটাকে অন্য দিক থেকে দেখা যেত। আর ছিল অবাধ স্বাধীনতার ব্যাপারটি। বাসটি চলবে তার নিজের হাতে। কখন থামবে, কখন গতি কমাবে, কখন বাঁক নেবে, সবকিছুর সঙ্গে তার নিজের সিদ্ধান্ত জড়িয়ে থাকবে। কেউ তাকে বলবে না, এখন রান্নাঘরে যেতে হবে, এখন বাজারে যেতে হবে, এখন অমুকের বাড়িতে যেতে হবে। সে থাকবে একটি চলন্ত পৃথিবীর মাঝখানে। সামনে রাস্তা থাকবে। পাশে শহর। পেছনে অগণিত মুখ।

হয়তো এ কারণেই ইচ্ছেটা এতদিন পরও মরে যায়নি।

এক বসন্তের বিকেলে বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে অহমকে বলেছিল,

‘শুনছো, আমার খুব ইচ্ছে এই শহরের বাসচালক হই।’

অহম তখন পত্রিকা পড়ছিল।

মুখ তুলে কিছুক্ষণ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলেছিল।

‘হঠাৎ এমন ইচ্ছে কেন?’

‘হঠাৎ নয়। অনেক দিনের সুপ্ত বাসনা। সংকোচে বলা হয়নি কখনো।’

‘তাহলে হও।’

বিশাখা হেসে বলেছিল,

‘হওয়া কি এত সহজ?’ 

‘কঠিন কী?’

‘আমি?’

অহম কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিল,

‘তুমি কেন পারবে না?’

সেদিন কথাটা সেখানেই শেষ হয়েছিল। বিশাখা আর বলেনি, তার ভয় কোথায়। বাসচালক হওয়ার নয়। নিজের ইচ্ছের কথা উচ্চারণ করার ভয়। কেউ হয়ত হাসবে। কেউ বলবে, এ বয়সে? কেউ বলবে, লেখালেখি করো, সেটাই বেশ। এসব কী?

বিশাখা কখনোই অন্যের মনঃকষ্টের কারণ হতে চায়নি। এই একটি স্বভাব তাকে কতবার নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে! কতবার ‘না’ বলতে চেয়েও ‘আচ্ছা’ বলেছে। কতবার যেতে ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও নিমন্ত্রণে গিয়েছে। কতবার অপমানিত হয়েও হেসেছে। নিজের পছন্দকে গুটিয়ে অন্যের স্বস্তিকে জায়গা দিয়েছে। সে কি ভালো মানুষ ছিল? নাকি কেবল নিজের জন্য কঠোর হতে পারেনি?

‘হ্যালো ডিয়ার, আমি মিস রেনে। আশা করি তোমাদের সঙ্গে আমার ভ্রমণটি আনন্দের হয়েছে।’

বাস—চালকের এনাউন্সে ধ্যান ভাঙে বিশাখার। সে চালকের দিকে দৃষ্টিপাত করে। চালক বাক্যটি বলেই ফ্রন্ট মিররে পেছনের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলল,

‘এটা লাস্ট স্টপেজ। আশা করি কোনো এক ব্যস্ত দিনে আবারও দেখা হবে। শুভ সময়। বিদায়।’


কথাগুলো খুব সাধারণ। তবু বিশাখা মুগ্ধ হল। তার মনে হলো, এই সাধারণ কথাগুলোর মধ্যে অদ্ভুত এক উষ্ণতা আছে। এতদিন কত বাসে উঠেছে সে। কত চালক দেখেছে। কেউ কখনো এমনভাবে যাত্রীদের বিদায় জানায়নি। সবাই যেন কেবল একটি কাজ শেষ করে আরেকটি কাজের দিকে চলে যায়। কিন্তু এই মেয়েটি যেন মানুষগুলোকে মানুষ হিসেবেই দেখল।

বিশাখা নামার আগ মুহূর্তে চালকের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

চোখে চোখ পড়ল দুজনের।

‘তোমার কথাগুলো অসাধারণ সুন্দর’ বলল বিশাখা। ‘তুমি কি সাহিত্যের ছাত্রী ছিলে?’

তরুণী হেসে উঠল।

বৃষ্টির পর ধুয়ে যাওয়া পৃথিবীর মতো স্বচ্ছ সেই হাসি। 

‘ছিলাম। আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য পড়াতাম।’ 

‘এখন পড়াও না?’

‘না।’

‘কেন?’

মিস রেনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

‘এখন মানুষ পড়ি।’

বিশাখা একটু অবাক হলো।

‘মানে?’

‘ছাত্র পড়ানোর চেয়ে মানুষ পড়তে আমার বেশি ভালো লাগে।’

তরুণীর চোখে তখন শিশুর মতো কৌতূহল।

‘প্রতিদিন শত শত মানুষ দেখি। প্রত্যেকের আলাদা মুখ, আলাদা গল্প। কেউ খুব তাড়াহুড়ো করে। কেউ সারাক্ষণ ফোনে কথা বলে। কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। কেউ চুপচাপ বসে থাকে। তাদের দেখি। শহর দেখি। প্রকৃতি দেখি। আমার কাছে এই কাজটা একটা চলন্ত বই পড়ার মতো।’

বিশাখা নিঃশব্দে শুনছিল। মিস রেনে একটু থেমে বলল,

‘মানুষের জীবন খুব ছোট। আর তা একবারই পাওয়া যায়। আমার মনে হয়, প্রত্যেক মানুষেরই এমন কিছু করা উচিত, যা তাকে আনন্দ দেয়।’

বিশাখার বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন একটা অদ্ভুত শব্দ হলো।

যেন বহুদিন বন্ধ থাকা দরজার ভেতর থেকে কেউ কড়া নাড়ল।

‘অবশ্যই,’ খুব আস্তে করে বলল সে।

বাস থেকে নেমে কয়েক পা এগিয়ে আবার পেছনে তাকাল।

মিস রেনে তখনও চালকের আসনে।

বিশাখা মনে মনে বলল, নিজেকে পড়া যায়? হয়তো যায়। কিন্তু এতদিন সে কি কখনো নিজেকে পড়েছে?

সে রাস্তা পেরিয়ে পরবর্তী বাসে উঠে বসলো। বাসটি প্রায় ফাঁকা। বিশাখা উঠে জানালার পাশের সিটে বসল। চালক একজন বিশালদেহী কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ। তাকে মৃদু হেসে স্বাগত জানালেন। বাস চলতে শুরু করল। ডানে মোড় নিল। ধীরে ধীরে গতি বাড়ল। জানালার বাইরে পরিচিত দৃশ্যগুলো আবার পেছনে ছুটতে শুরু করল।

বাড়ি। গাছ। শপিং মল। টেনিস কোর্ট। রাস্তা। মানুষ। 

আর বিশাখার ভেতরে খুলে গেল বহু বছরের পুরনো দরজা। অহমের কথা মনে পড়ল। এই দেশে আসার শুরুর দিনগুলো। নাবিক জীবন। তরী ভিড়লে বুকভরা বেপরোয়া সাহস নিয়ে মার্কিন দেশে নেমে পড়া। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। অচেনা শহর। অচেনা মানুষ। কোনোকিছুই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না।

অহম নিজের ভাগ্য নিজেই গড়েছিল। ছোটবেলায় নতুন খেলনা গাড়ি পেলেই নাটবল্টু খুলে ভেতরের মেকানিজম দেখার চেষ্টা করত। বাবা—মা’র বকুনি খেয়েছে খুব। মারও খেয়েছে। তবু থামেনি। নিউইয়র্কে এসে রেস্তোরাঁয় বাস—বয়ের কাজ পেয়েছিল। কফি মেশিন নষ্ট হলে খুলে ফেলত। আইস—ব্রেকিং মেশিন বন্ধ হয়ে গেলে মেকানিজমে হাত দিত। মেরামত করে ফেলত। এই দক্ষতায় মালিকের নজরে পড়েছিল। পদোন্নতি হয়েছিল। বেতন বেড়েছিল। তবু চাকরিটি শেষ পর্যন্ত তাকে আটকে রাখতে পারেনি। কারণ কাজটি তাকে আনন্দ দিত না। ঝড়, বৃষ্টি, তুষারপাত—যাই থাকুক, একই সময়ে কাজে পৌঁছানো। একই নিয়ম। একই শৃঙ্খল। অহমের কাছে জীবনটা ধীরে ধীরে যন্ত্রের মতো হয়ে উঠছিল।

সে স্বাধীনতা চেয়েছিল। তাই ট্যাক্সি চালানো শুরু করেছিল। প্রথমদিকে দেশ থেকে আসা শিক্ষিত আত্মীয়রা মুখ বাঁকিয়ে বলেছিল, ‘এত শিক্ষিত পরিবারের ছেলে হয়ে বিদেশে গিয়ে ট্যাক্সি চালায়?’ অহম হেসেছিল। কারও সঙ্গে তর্ক করেনি। সে জানত, কাজের সম্মান অন্যের চোখ দিয়ে মাপতে নেই। ধীরে ধীরে কয়েকটি ট্যাক্সির মালিক হয়েছিল সে। ব্যবসা দাঁড়িয়েছিল।

তবু একদিন সন্তান বিলাস যখন একটি ফর্মে বাবার পেশা লিখেছিল ‘ঞধীর উৎরাবৎ.’

বিশাখা অবাক হয়ে বলেছিল, ‘ইঁংরহবংংসধহ লিখতে পারতে।’ বিলাস মাথা তুলেছিল।

‘কেন?’ 

‘এখন তো তোমার বাবা কয়েকটি ট্যাক্সির মালিক।’

বিলাস হেসেছিল।

‘কিন্তু বাবা তো ট্যাক্সি চালিয়েই শুরু করেছে।’

কথাটি এত সরল ছিল যে বিশাখা আর কিছু বলেনি।

আজ সেই কথাটাই তার মনে ফিরে এল। মানুষ নিজের পরিচয়কে অন্যের চোখে সুন্দর দেখানোর জন্য বদলাতে পারে। অহম বদলায়নি। বিলাসও নয়। তাহলে সে কেন বদলেছে?

কেন নিজের ইচ্ছেগুলোকে এতদিন অন্যের সুবিধামতো সাজিয়েছে?

তার মনে পড়ল এক বাড়ির কথা। শহরের শেষপ্রান্তে এক পরিচিত নারীর বাড়ি। বাড়িটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন। কিন্তু অতিথিদের জন্য অদ্ভুত কিছু নিয়ম। জুতো খুলে ঢুকতে হবে। শাড়ি পরা নারীরা হাইহিল খুলে খালি পায়ে হাঁটবে। অস্বস্তি হলেও কেউ কিছু বলবে না। বিশাখাও বলেনি।

আরেকটি নিমন্ত্রণে গিয়ে দেখেছিল, অতিথিদের কেউ কেউ তখনও এসে পৌঁছায়নি অথচ খাবার শেষ। গৃহকর্ত্রী তখন ব্যাকইয়ার্ডে নিজের ছবি তুলতে ব্যস্ত। বিশাখা সেদিনও চুপ ছিল।

বাড়ি ফিরে নিজের ওপরই রাগ হয়েছিল। কেন সে ‘না’ বলতে পারে না? কেন সরাসরি বলতে পারে না, ‘আমি অস্বস্তি বোধ করছি’? কেন অন্যের অস্বস্তির ভয় নিজের অস্বস্তির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে?

একদিন সে অহমকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘মানুষ কি বিদেশে এসে ভদ্রতা ভুলে যায়?’

অহম বলেছিল, ‘ভদ্রতা দেশ বদলালে বদলায় না। ভদ্রলোক হতে কয়েক প্রজন্মের পারিবারিক শিক্ষা লাগে।’

কথাটা বিশাখার মনে ধরেছিল। আজও ধরল। কিন্তু আজ তার মনে আরেকটি প্রশ্ন জেগে উঠল, নিজেকে মুছে ফেলার নাম কি ভদ্রতা? অন্যকে খুশি করতে গিয়ে নিজের ইচ্ছাকে প্রতিদিন একটু একটু করে হত্যা করার নাম কি ভালো মানুষ হওয়া? 

বিশাখা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। মনে পড়ল একটি শব্দ—ঈক্ষণ।

কোনো এক বইয়ে পড়েছিল সে, তাড়া—খাওয়া হরিণী দ্রুত ছুটতে ছুটতে হঠাৎ থেমে পেছনে ফিরে তাকায়। সেই ফিরে তাকানোই ঈক্ষণ।

কী আশ্চর্য!

মানুষও তো সারাজীবন ছুটে চলে। সামনে। শুধুই সামনে। তারপর একদিন থামে। পেছনে তাকায়। তাকিয়ে দেখে, কতটা পথ পেরিয়েছে। কোথায় ভুল করেছে। কী হারিয়েছে। কী পেয়েছে। কোথায় নিজের কথা বলার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও বলেনি। কোথায় অন্যের জন্য নিজেকে সরিয়ে রেখেছে।

কিন্তু আজ বিশাখার মনে হলো, পেছনে ফিরে তাকানো মানেই আক্ষেপ নয়। পেছনে তাকানো মানে নিজের পথটাকে বোঝা। নিজেকে ক্ষমা করা। অতীতকে তার জায়গায় রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া। হয়তো এটাই ঈক্ষণ।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে বিশাখা অনেকদিন পর নিজের লেখার টেবিলে বসে। টেবিলের ওপর সাদা কাগজ। কলম। অনেকক্ষণ সে কিছু লেখে না। তারপর লিখতে শুরু করে—

‘আমি বাসচালক হতে চেয়েছিলাম।’

একটি বাক্য। তারপর দীর্ঘ বিরতি। তারপর আরও একটি। সে লিখতে থাকে। বাসের জানালা। মিস রেনে। অহম। বিলাস। নিজের না—বলা কথা। নিজের ছোট ছোট পরাজয়। নিজের অদ্ভুত সব ইচ্ছা। আর শেষে লেখে—

‘জীবনের কিছু পথ আমাদের কোনো গন্তব্যে নিয়ে যায় না। তারা কেবল আমাদের নিজের কাছেই ফিরিয়ে আনে।’

লেখা শেষ করে বিশাখা অনেকক্ষণ কাগজটির দিকে তাকিয়ে থাকে।

তারপর গল্পটির নাম দেয় ‘ঈক্ষণ’।

কয়েক সপ্তাহ পর আবার এক সকালে সে ‘কিউ ফিফটি এইট’ বাসে ওঠে। অভ্যাসমতো জানালার পাশের সিটে বসে। বাস চলতে শুরু করে। বাড়িঘর পেছনে সরে যায়। গাছপালা পেছনে সরে যায়। শপিং মল। টেনিস কোর্ট। মানুষ। সবকিছু। বিশাখা অভ্যাসবশত ঈষৎ ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাতে যায়। তারপর হঠাৎ থেমে যায়। জানালার কাচে নিজের মুখ দেখতে পায়। চোখের কোণে বয়সের রেখা। ঠোঁটে মৃদু হাসি। সে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর খুব আস্তে করে বলে,‘এইবার আর নয়।’ 

সে পেছনে তাকায় না। সামনে তাকায়। সামনের রাস্তা তখন দীর্ঘ, উন্মুক্ত। বাস ছুটে চলেছে। 

তার ব্যাগের ভেতর একটি খাম। খামের ভেতর তার গল্প। আজ সেটি একটি সাহিত্যপত্রিকার ঠিকানায় যাবে।

গল্পটি কেউ পছন্দ করবে কি না, সে জানে না। কেউ প্রশংসা করবে কি না, জানে না।

কেউ ভুল বুঝবে কি না, তাও জানে না। কিন্তু আজ প্রথমবার এসবের কোনোটিই তার সিদ্ধান্তের কারণ নয়। সে শুধু জানে, এটি সে করতে চায়। এইটুকুই যথেষ্ট।

বাসটি সামনে ছুটে চলেছে। জানালার বাইরে নিউইয়র্ক তার প্রতিদিনের মতোই দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বিশাখা এবার আর পেছনে তাকায় না। কারণ সে বুঝেছে, পেছনে ফিরে দেখা প্রয়োজন। কখনো খুব প্রয়োজন। পেছনে না তাকালে জানা যায় না, কতটা পথ পেরিয়ে এসেছি। কত মানুষ আমাদের বদলে দিয়েছে। কত ব্যর্থতা আমাদের তৈরি করেছে। কত না—পাওয়া আমাদের ভেতরে নতুন কোনো আকাক্সক্ষার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু পেছনে তাকিয়ে সারাজীবন দাঁড়িয়ে থাকাও যায় না। একসময় ঘাড় ফিরিয়ে সামনে তাকাতে হয়। হাঁটতে হয়। ছুটতে হয়। নিজের দিকে। নিজের জন্য। বিশাখার মনে হলো, এতদিন সে ভেবেছিল ‘ঈক্ষণ’ মানে শুধু পেছনে ফিরে দেখা। আজ বুঝল, ঈক্ষণ মানে ফিরে দেখা, নিজেকে চিনে নেওয়া, তারপর ঠিক সময়ে সামনে ফিরে আসা।

বাস ছুটে চলেছে তার কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে। আর বিশাখার নিজের জীবনের গন্তব্য হয়ত এখনো স্পষ্ট নয়। তবু আজ সে জানে, সে কোথায় যাচ্ছে। খুব দূরে নয়। কোনো শহরের শেষপ্রান্তে নয়। কোনো অচেনা ঠিকানায় নয়। সে যাচ্ছে, নিজের কাছে। আর সেই পথে এবার, স্টিয়ারিংটা তার নিজের হাতে।


Related Posts