শিল্পীর ভাবনা কাঠের ভেতরের নকশা, মানুষের ভেতরের রূপ || আখতার আহমেদ রাশা

সমুদ্র বা নদীর জলে ভেসে আসা একখন্ড ড্রিফ্টউডের জীবন বড় অদ্ভুত, বড় করুণ অথচ সুন্দর। ঝড়, উত্তাল ঢেউ, লোনা জল আর কঠিন পাথরের নিরন্তর ঘর্ষণে তার বাইরের সমস্ত অপ্রয়োজনীয় কৃত্রিম অংশগুলো একসময় ক্ষয়ে যায়। সেখানে কোনো ছদ্মবেশের সুযোগ থাকে না। যা অবশিষ্ট থাকে, তা প্রকৃতির এক চরম অনাবৃত সততা। সেই নগ্ন, খাঁটি রূপটিকে চিনে নিয়েই একজন শিল্পী কাঠের ভেতরের সুপ্ত আত্মাকে জাগিয়ে তোলে এবং তাকে দান করেন শিল্পের চিরন্তন অমরত্ব

কিন্তু মানুষের সমাজ মনোস্তত্ত্ব এর ঠিক বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। মানুষ প্রায়ই রাজনৈতিক, সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক মঞ্চে নিজেকে অত্যন্ত মসৃণ, মহৎ, উদার সংস্কৃতিমনা হিসেবে উপস্থাপন করেÑযা আদতে স্বরচিত এক কৃত্রিম মুখোশ। সম্পর্কের শুরুতে বা নতুন পরিচয়ে মানুষ অপরকে প্রায় নিখুঁত মনে করে, কারণ তখন আমরা বাহ্যিক কথাবার্তা সাময়িক মিলগুলোকে ব্যক্তিত্বের গভীরতা ভেবে ভুল করি। কিন্তু সময়ের ঘর্ষণে ক্ষুদ্র স্বার্থের টানে যখন সেই মানুষের ভেতরের আসল চরিত্র বাকুটিল রূপপ্রকাশ পায়, তখন খুব দ্রুত মোহভঙ্গ ঘটে। মুহূর্তে অতিপছন্দের মানুষটি পরিণত হয় অতিঅপছন্দের

রাজনীতি, ধর্ম বা সামাজিক ব্যানার কেবল বাহ্যিক পরিচায়ক। এগুলো মানুষকে সাময়িকভাবে একটি পতাকার নিচে বা দলে এক করে ঠিকই, কিন্তু আত্মার গভীর সংযোগ বা মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ না থাকলে সেই সম্পর্ক বেশিদিন টেকে না। সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ওহমৎড়ঁঢ় রফবহঃরঃু বলা হয়, তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সম্পর্ক স্বার্থের সামান্য সংঘাতেই ভেঙে পড়ে। তাই একই রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ধর্মের অনুসারী হলেও অহংকার, ক্ষমতার লোভ হিংসার কারণে কাছের মানুষও নিমেষেই চরম শত্রুতে পরিণত হয়। তদুপরি, আধুনিক জীবন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে মানুষের ধৈর্য আজ তলানীতে। হাতে অজস্রঅপশনথাকায় সম্পর্ক বোঝাপড়া বা ক্ষমাশীলতার মাধ্যমে টিকিয়ে রাখার চেয়ে মুহূর্তের মধ্যে তা ছুঁড়ে ফেলাকেই সবাই সহজ মনে করছে।

শিল্পের দান কখনো কোনো সাধারণ বস্তুর কেনাবেচা নয়; এর সাথে মিশে থাকে শিল্পীর রক্ত, আত্মা আবেগের প্রতিটি কণা। অথচ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মানুষকে নিজের পরম আবেগে গড়া শিল্পকর্ম উপহার দেওয়ার পর যখন দেখা যায় তারা সেটিকে শিল্পের মর্যাদা না দিয়ে কেবল আভিজাত্য জাহির করারসামাজিক ট্রফিবা সাজসজ্জার উপকরণ বানিয়েছে, তখন শিল্পীর অন্তরে এক অনাবিল রক্তক্ষরণ হয়। গ্রীক দার্শনিক প্লেটো যেমন অনুভূতির জগৎ সত্যের জগতের পার্থক্য দেখিয়েছিলেনÑএই সংগঠনগুলোর মিষ্টি কথা, বাহ্যিক আড়ম্বর কিংবা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা হলো কেবলইআপাত দৃশ্যমান রূপ কিন্তু তাদের ভেতরের অসংবেদনশীলতা আর চরম আত্মকেন্দ্রিকতাই হলো আসল চরিত্র।

তবে ইতিহাস শিল্পের ইতিহাস সবসময় একই সত্যের সাক্ষ্য দেয়Ñমানুষের স্বার্থপর মুখোশ একদিন খসে পড়ে, কুটিলতা কালের গর্ভে ঝরে যায়, কিন্তু শিল্পের ভেতরের সততা শিল্পীর নৈবেদ্য চিরকাল অক্ষুণ্ণ থাকে। কাঠের নিজস্ব গ্রেইন বা ভেতরের নকশা যেমন চেঁচেছেঁটে রূপ দেওয়ার সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তেমনই জীবনের প্রতিকূলতা ঘর্ষণে মানুষেরও প্রকৃত সত্তা উন্মোচিত হয়। লোনা জল আর পাথরের আঘাতে গড়ে ওঠা ড্রিফ্টউডের প্রতিটি খাঁজ ক্ষত যেমন বঞ্চনা পেরিয়ে আসা সত্যের প্রতীক, মানুষের আত্মিক রূপান্তরও কেবল অহংকার স্বার্থ ভুলে সত্যবাদিতা, সহনশীলতা মানবিক মূল্যবোধের নোঙরেই স্থির হতে পারে।

Related Posts