আলমা ফেরদৌসি লিয়ার একক চিত্রপ্রদর্শনী || সীমাহীন শুভ্রতায় দিগন্তের ডানা
ড. জীবন বিশ্বাসঃ বাংলাদেশী—আমেরিকান শিল্পী আলমা ফেরদৌসী লিয়া’র একক চিত্র প্রদর্শনী হয়ে গেল ১১ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত, গভর্নর্স আইল্যান্ডের ১৬ নোলান পার্কের একটি গ্যালারিতে। কক্ষটিকে লিয়া প্রদর্শনকক্ষের সীমা ছাড়িয়ে এক ভিন্ন শিল্প—অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করেছিলেন। এই ভবনের ভেতরে তিনি নির্মাণ করেন বৃহৎ আকারের এক লাইভ—পেইন্টিং—ইনস্টলেশন, যা ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত নেমে এসে দেয়ালের প্রচলিত সীমানার বাইরেও যেন প্রবাহিত হয়েছে অসীমের উদ্দেশে। মেঝের ওপর অনন্য শৈলিতে সাজানো স্তুপাকৃতির প্লাস্টিক যেন জলের ঢেউ তুলে জানান দিচ্ছে, জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান জল। জীবনকে চলমান রেখেছে বিশাল জলরাশি। সাদা রঙের ওপর সাদা, বুননের ওপর বুনন; তার মধ্যে ডানাওয়ালা ক্ষুদ্র অবয়ব, প্রজাপতি এবং একটি আয়তাকার ফ্রেমÑসব মিলিয়ে কাজটি যেন দেখার জন্য নির্মিত কোনো স্থির ছবি নয়, বরং দৃষ্টির মধ্য দিয়ে দিগন্তে প্রবেশ করার এক অবারিত তোরণ।
ঊাংলাদেশী আমেরিকান আর্টিস্ট ফোরামের ২০২৬ সালের গভর্নর্স আইল্যান্ড রেসিডেন্সি কর্মসূচি ‘বিটুইন রিভার এন্ড হারবরঃ স্টোরিস দ্যাট ক্যারি আস’—এর অংশ হিসেবে লিয়ার এই একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এই ধরনের পরীক্ষামূলক কাজের জন্য লিয়ার শিল্পজীবনের পূর্বপ্রস্তুতিও ছিল সুদৃঢ়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রাফট বিষয়ে বি.এফ.এ. সম্পন্ন করা আলমা লিয়া ড্রয়িং, পেইন্টিং, ইনস্টলেশন, চারকোল, ইঙ্ক, গোল্ড লিফ ও মিশ্রমাধ্যমে কাজ করেন। মানবজীবনের জার্নি, নারীত্ব এবং দৈনন্দিন অস্তিত্বের অনুচ্চারিত বাস্তবতা তাঁর শিল্পচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০২১ সালে নিউইয়র্কে তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। কিউরেটর হিসেবেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য; ৩৫ জন বাঙালি শিল্পীর কাজ নিয়ে আয়োজিত ‘মেমোয়ার’ প্রদর্শনী তিনি কিউরেট করেছিলেন মূলধারার জ্যাকেল গ্যালারিতে। বর্তমানে তিনি জেক্যাল—জি ভিজ্যুয়াল ভয়েসের কিউরেটর হিসেবেও কাজ করছেন।
শিল্পী আলমা লিয়া তার এই বিশাল কাজটির আনুষ্ঠানিক কোনো নাম দেননি। তাই পাঠক ও দর্শকের শনাক্তকরণের সুবিধার্থে এই নিবন্ধে একে ‘মুক্ত ডানার সীমানা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। শিল্পকর্মটির সূচনা একটি বিশাল উল্লম্ব সাদা আয়তক্ষেত্র দিয়ে, যা দেয়ালের প্রায় সম্পূর্ণ উচ্চতা জুড়ে বিস্তৃত। সেই সাদা পৃষ্ঠে শিল্পী সরাসরি কাজ করেছেন সাদা রং ও উপাদানের প্রশস্ত প্রলেপ, উঁচু—নিচু বুনন এবং প্রায় ভাস্কর্যসদৃশ রিলিফ তৈরি করে। এগুলো স্থির আলোয় প্রায় অদৃশ্য, কিন্তু আলো ও দর্শকের অবস্থান বদলালে ছায়ার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে সেগুলো বেরিয়ে আসে।
শিল্পকর্মটিতে সাদা রঙের নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাদা কোনো শূন্যতা নয়; বরং স্মৃতি ও স্পর্শের সঞ্চয়। কাপড় বা পৃষ্ঠের ভাঁজ, পুরু রঙের রেখা, হাতে গড়া অংশ, ছায়া ও উঁচু হয়ে ওঠা আকার—সবকিছু মিলিয়ে আপাত—নির্জন শুভ্রতা ধীরে ধীরে ঘটনাবহুল হয়ে ওঠে। প্রথম দর্শনে যা নীরব, তাকেই কিছুক্ষণ পরে মানুষের স্পর্শের দলিল বলে মনে হয়। এই শুভ্র ক্ষেত্রজুড়ে ছড়িয়ে আছে সূক্ষ¥ ডানাওয়ালা অবয়ব, প্রজাপতি, যাদের হালকা উপস্থিতি বিশাল সাদা পটভূমির ভারের সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। প্রজাপতি এখানে রূপান্তর, অস্থায়িত্ব, অভিবাসন কিংবা মুক্তির প্রতীক হতে পারে, কিন্তু কাজটি কোনো একটি বিশেষ অর্থে তাদের আটকে রাখে না। নিউইয়র্ক হারবারের মাঝখানে, বাংলাদেশী ডায়াস্পোরার একটি প্রদর্শনীর প্রেক্ষাপটে এই ডানাওয়ালা অবয়ব আরও একটি সম্ভাব্য অর্থ বহন করেÑএক ভূগোল থেকে অন্য ভূগোলে যাত্রা স্মৃতিকে মুছে দেয় না, বরং তার আকৃতি ও অপার সম্ভাবনা বদলে দেয় অগ্রগামিতার স্পর্শে।
তবে কাজটির সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান হলো শূন্য আয়তাকার ফ্রেমটি। সাধারণত ফ্রেম আমাদের বলে দেয়—শিল্প কোথায় শুরু, বাস্তব জগৎ কোথায় শেষ। লিয়া এই প্রচলিত নিয়মটিকেই বদলে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। অলংকৃত সোনালি ফ্রেমটির ভেতরে কোনো স্থির ছবি নেই। দর্শক যে অবস্থান থেকে তাকান, সেই মুহূর্তে তার ভেতরে এসে পড়ে কখনো সাদা বুনন, কখনো প্রজাপতি, কখনো শিল্পী নিজে, কখনো দর্শক, আবার কখনো ঘরের কোনো একটি অংশ।
আলমা লিয়ার অন্যান্য কাজও তার এই শিল্পকর্মটিকে সমর্থন করে। তাঁর সাম্প্রতিক প্রদর্শনী ও কিউরেটোরিয়াল প্রকল্পে স্বপ্ন ও বাস্তবতা, নারীর উত্থান, স্মৃতি, অভিবাসন, অন্তর্গত হওয়া এবং মানুষের অনুচ্চারিত অভিজ্ঞতা বারবার ফিরে এসেছে। মূলত তার লাইভ পেইন্টিং ও ইনস্টলেশনের সমন্বয়ে নির্মিত এই কাজটি অভিবাসন, আত্মপরিচয় এবং যৌথ মানবিক অভিজ্ঞতা অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও দিকচক্রবালে দৃষ্টি প্রসারিত করতে আহ্বান জানায়।
লিয়ার এই ‘মুক্ত ডানার সীমানা’ শিল্পকর্মটির সাফল্য এখানেই যে একটি চতুষ্কোণ ফ্রেমের মাধ্যমে দৃষ্টির সীমানা পরিবর্তন করে জীবনকে খুঁটিয়ে দেখার স্পৃহাকে তিনি আত্মপরিচয়ের গভীর অনুসন্ধানে রূপ দিয়েছেন। স্মৃতিকে স্থায়ীভাবে ফ্রেমে আটকে রাখা যায় না। অভিবাসনকে একটি মাত্র ভূগোল দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। তুলির শেষ আঁচড় কিংবা পাথরের শেষ খাঁজে এসে শিল্প ফুরিয়ে যায় না; বস্তুর বাঁধন ছিঁড়ে সে ছড়িয়ে পড়ে ভাবনার নীলিমায়। রূপের শেষ রেখায় এসে থমকে যাওয়ার নাম শিল্প নয়, তার বস্তুগত সমাপ্তিতেই প্রকৃতপক্ষে শুরু হয় এক অরূপের মহাযাত্রাÑ লিয়ার শিল্পকর্ম তাই—ই যেন নির্দেশ করে।
