মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬ || কংগ্রেস হাতছাড়া হচ্ছে রিপাবলিকান পার্টির!
নিউইয়র্ক টাইমস প্রতিবেদনঃ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সেক্রেটারি অব ডিফেন্স পিট হেগসেথ ইরানে হামলা চালিয়েছেন আজ ছয় মাস পার হয়ে গেল। জ্বালানি খরচের প্রতিবাদে বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে যুদ্ধের বেশির ভাগ সময়জুড়ে যেমনটা ছিল, তেলের দাম এখনো ১০০ ডলারের নিচেই রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তি গ্যাসের দাম এবং খানিকটা মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়া লাগলেও স্প্রিংএ অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে যেসব বিকট সতর্কবার্তা আমরা শুনেছিলাম, সে তুলনায় অর্থনৈতিক প্রভাবটি কিছুটা সামলে নেওয়া গেছে বলেই মনে হয়। শুল্ক আরোপের মতোই এ যুদ্ধও দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তবে রাজনীতির সমীকরণ কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। সেখানে যুদ্ধের প্রভাব প্রথম থেকেই বেশ স্পষ্ট এবং ট্রাম্পের গলায় ঝুলে থাকা অসংখ্য কলঙ্কের মধ্যে এটিই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, মাত্র এক—তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের ভূমিকা সমর্থন করেন।
কিন্তু তার চেয়েও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, মার্কিন নাগরিকরা তাঁদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে যে বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন, তাতেও যুদ্ধের একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে তাঁরা মনে করেন। ১০ জনের মধ্যে ৮ জন মার্কিন নাগরিক বলছেন, এ যুদ্ধের কারণেই তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে।
লেবার ডে পার হতেই নির্বাচনের চিত্রটা দ্রুত স্পষ্ট হতে শুরু কেও, এমনটাই মনে করছেন রাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষকরা। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম কয়েক সপ্তাহের জনমত জরিপ থেকে যা দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত পরিষ্কারÑএকটি বড় ধরনের ডেমোক্রেটিক বা ‘ব্লু ওয়েভ’—এর সুস্পষ্ট পূর্বাভাস।
জরিপের গড় হিসাব বলছে, ২০১৮ সালের সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনের চেয়েও এ দফায় ডেমোক্রেটরা অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছেন। যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তা নির্দেশ করে যে ক্যানসাস, আইওয়া, সাউথ ক্যারোলাইনা ও ফ্লোরিডার মতো জায়গায় সিনেট আসনগুলোর ভাগ্য এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত এবং ডেমোক্রেটদের হাতের মুঠোয় চলে আসতে পারে।
অবশ্য নির্বাচন এখনো ছয় সপ্তাহ দূরে। রিপাবলিকানদের হাতে বিপুল পরিমাণ নির্বাচনী তহবিল রয়েছে এবং ডেমোক্রেটিক সিনেট জয়ের পথটি দূর থেকে সব সময়ই এক ঝুঁকিপূর্ণ সরু দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটার মতোই মনে হতো।
কিন্তু ট্রাম্প দিন দিন অজনপ্রিয় হয়ে পড়ছেন এবং তাঁর গ্রাফ নিচের দিকে নামছে। তরুণ, কৃষ্ণাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ ভোটারদের রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার যে বহুচর্চিত পুনর্গঠনের কথা বলা হচ্ছিল, তা এই দফায় কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
আসলে সেই পরিবর্তন আদৌ সত্যি ছিল, নাকি স্রেফ একটা সাময়িক বিভ্রান্তি বা মরীচিকা ছিল, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে ডেমোক্রেটদের আর ইমেজ সংকটে ভোগা কোনো দল বলে মনে হচ্ছে না; সাধারণ জরিপগুলোয় তারা ধারাবাহিকভাবে ওপরের দিকে উঠছে এবং নির্দিষ্ট প্রার্থীর নাম ঘোষণা করার পর তাদের পারফরম্যান্স আরও ভালো দেখাচ্ছে।
তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের চূড়ান্ত লড়াইয়ে ট্রাম্পের যেসব স্পষ্ট দুর্বলতা রয়েছেÑতাঁর নগ্ন দুর্নীতি, ইমিগ্রেশন নিয়ে কঠোরতা, নামমাত্র আইনি অর্জন এবং দেশের সিংহভাগ মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ত্বরান্বিতকারীদের পক্ষে অবলীলায় অবস্থান নেওয়া, সেগুলোর মধ্যে ইরান যুদ্ধ যেভাবে আলাদা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, সেটাই সবচেয়ে বেশি চমকপ্রদ মনে হয়েছে।
সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই সংঘাত ছিল একটি চরম অপমানজনক ব্যাপার। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে এক অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র শক্তির সস্তা ড্রোন এবং ক্ষণস্থায়ী মিসাইলের সামনে পিছু হটতে হয়েছে।
আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে, ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং সাম্প্রতিক রিপোর্টগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আসল সংখ্যাটি আরও বেশি হতে পারে।
মার্কিন নাগরিকদের জীবন বাঁচাতে আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটিগুলো খালি করতে হয়েছে, দেশের ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টরের মজুত মারাত্মকভাবে কমে গেছে এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর ভেতরের পরিস্থিতি বিশ্বমঞ্চে এক লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পরিণত হয়েছে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের মতে, এই সামরিক অভিযানের কারণে পেন্টাগনের ইতিমধ্যে ৩৮ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে গেছে এবং প্রতি মাসে এই খরচের খাতা কেবলই বাড়ছে। শুরুতেই এ যুদ্ধকে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল, কমপক্ষে তা—ই ছিল জনমত। আর এখন মনে হচ্ছে, এটি একটি চিরন্তন ও অন্তহীন যুদ্ধ।
সামরিক দিকটি তো গেল। দেশের ভেতরে, যুদ্ধের এই ছয় মাসে মার্কিন নাগরিকেরা জ্বালানির জন্য ইতিমধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত অর্থ গুনেছেন, যা সংঘাত না থাকলে দিতে হতো না। ট্রাম্পের নামে চাপানো এই অতিরিক্ত মূল্যকে বার্ষিক হিসাবে রূপান্তর করলে তা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমান।
