মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু ফিলিস টেইলরকে স্মরণ ফিলাডেলফিয়া সিটিতে
আশরাফুল ইসলাম আরিফঃ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু, শান্তিকর্মী, মানবাধিকারকর্মী ও সমাজসেবী ফিলিস টেইলরের জীবন ও কর্ম স্মরণে ফিলাডেলফিয়ায় এক আবেগঘন স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর রবিবার অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে তাঁর পরিবার, বন্ধু, সাবেক সহকর্মী, শান্তিকর্মী, সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন অভিবাসী কমিউনিটিসহ বাংলাদেশী প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের অস্ত্র সরবরাহের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক ‘ইষড়পশধফব’ আন্দোলনের অন্যতম সাহসী কর্মী ছিলেন ফিলিস টেইলর। স্বামী রিচার্ড টেইলরসহ শান্তিকর্মীদের সঙ্গে তিনি পাকিস্তানের জন্য অস্ত্রবাহী জাহাজ ঠেকানোর অহিংস আন্দোলনে অংশ নেন। ফিলাডেলফিয়া ও বাল্টিমোর বন্দরকেন্দ্রিক ওই প্রতিবাদে ছোট নৌকা ও ক্যানো নিয়ে জাহাজের গতিপথ বাধাগ্রস্ত করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ আন্দোলন আন্তর্জাতিক সংহতির একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। কয়েক মাসের প্রতিবাদ ও আন্দোলনের পর যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করে দেয় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
ফিলিস টেইলরের জীবন শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি দীর্ঘদিন শান্তি, মানবাধিকার, কারাবন্দিদের অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করেছেন। নার্স ও চ্যাপলিন হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি কারাগারে স্বাস্থ্য ও মানবিক অধিকার নিয়ে কাজ করেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান। ১৯৬০—এর দশকে তিনি নাগরিক অধিকার আন্দোলনে অংশ নেন এবং ফোলক্রফটে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারের বসবাসের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, ইমিগ্রেশন ও শরণার্থীদের সহায়তা এবং বিভিন্ন মানবাধিকার কার্যক্রমে তিনি যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও দীর্ঘদিন অব্যাহত ছিল।
২০২৫ সালে ফিলাডেলফিয়া বইমেলা ও নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলায় তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও তাঁর স্বামী রিচার্ড টেইলরের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছিলেন। ফিলিস টেইলরের জীবন ও ১৯৭১ সালের আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে নির্মিত ‘ইষড়পশধফব’ প্রামাণ্যচিত্রেও তাঁর সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণ স্থান পেয়েছে। পরিচালক আরিফ ইউসুফ নির্মিত ৮৫ মিনিটের এই প্রামাণ্যচিত্রে ফিলিস ও রিচার্ড টেইলরসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্দোলনকারী বিভিন্ন ব্যক্তির ভূমিকা তুলে ধরা হয়।
স্মরণসভায় ফিলাডেলফিয়া ও আশপাশের বাংলাদেশি কমিউনিটির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন ফিলাডেলফিয়া সিটি কাউন্সিল মেম্বার এ্যাট লার্জ ড. নিনা আহমেদ, হবিগঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট সোসাইটি অব পেনসিলভেনিয়ার সভাপতি কামরুল হাসান; ‘ইষড়পশধফব’ প্রামাণ্যচিত্রের পরিচালক আরিফ ইউসুফ ও তাঁর পরিবার, ওয়াশিংটন ডিসি থেকে সৈয়দ তাজবীর ইমাম তাসবির; আপার ডারবির শাওন আহমেদ; ল্যান্সডেল থেকে নুসরাত রওশন ও তাঁর পরিবার, বাংলাদেশী আমেরিকান কমিউনিটি ফোরাম অব পিএ এর শাওন, আরিফ ও কামরুলসহ কর্মকর্তাবৃন্দ এবং ফিলাডেলফিয়া পত্রিকার সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম আরিফ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. নিনা আহমেদ, আশরাফুল ইসলাম আরিফ ও নুসরাত রওশন ফিলিস টেইলরের জীবন, মানবিক মূল্যবোধ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাঁর ভূমিকার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। ডঃ নিনা আহমেদ বলেন, ফিলিস টেইলর বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন না; কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও দুর্ভোগ তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান প্রমাণ করে, মানবিকতা ও বিবেকের কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই।
স্মরণসভায় আশরাফুল ইসলাম আরিফ বলেন, ‘ফিলিস টেইলর শুধু বাংলাদেশের একজন বন্ধু ছিলেন না, তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসেরও অংশ। তাই তাঁর অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থনের ইতিহাসে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।’
স্মরণসভায় অংশ নেওয়া ফিলিস টেইলরের বন্ধু, সাবেক সহকর্মী, পরিবারের সদস্য, সমাজকর্মী ও ইমিগ্রান্ট কমিউনিটির প্রতিনিধিরা তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে—ফিলিস টেইলরের জীবন ছিল শান্তি, ন্যায়, মানবিকতা ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক দীর্ঘ পথচলা।
ফিলিস টেইলর ৪ জুন ২০২৬, ৮৪ বছর বয়সে ফিলাডেলফিয়ার উইনমুরে কিস্টোনকেয়ার হসপিসে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর জীবন ও কর্ম বিশেষ করে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাঁর অবস্থান নতুন করে স্মরণ করছে বাংলাদেশী কমিউনিটি। ফিলিস টেলরের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি স্মরণসভা থেকে তাঁর অবদান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস ও কমিউনিটির স্মৃতিতে সংরক্ষণের আহ্বান জানানো হয়।
