শেষ হলো শিল্পাঙ্গনের নাট্যমেলা || তিন দিনে ৮টি নাটক মঞ্চায়ন
বিশেষ প্রতিবেদনঃ শিল্পাঙ্গনের নবম নাট্যমেলা সম্পন্ন হলো। এই নাট্যমেলা হয় ১৩, ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর। প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হয় ১৩ সেপ্টেম্বর জ্যামাইকা সেন্টার ফর আর্টস এন্ড লার্নিং—এ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হয় ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর হিক্সভিল শহরের লেভিটটাউন হলে। এবারের শিল্পাঙ্গন নাট্যমেলার প্রতিপাদ্য ছিল ‘শেকড় থেকে আধুনিকতায়’। শিল্পাঙ্গন নাট্যমেলার তিনদিনের আয়োজন উৎসর্গ করা হয় তিনজন বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্বের স্মৃতির উদ্দেশে। তাঁরা হলেন আতাউর রহমান, মুস্তাফা মনোয়ার, এবং জামাল উদ্দিন হোসেন। নাট্যজনদের স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন রোকেয়া রফিক বেবি, আহমাদ মাযহার, এবং লুৎফুন নাহার লতা।
শিল্পাঙ্গন নবম নাট্যমেলার তিন পর্বের উদ্বোধন করেন তিনজন প্রথিতযশা নাট্যজন। প্রথম পর্ব রেখা আহমেদ, দ্বিতীয় পর্ব আহমাদ মাযহার, এবং তৃতীয় পর্ব খাইরুল ইসলাম পাখি। প্রবাসে বাংলা নাটকের সুযোগ ও সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করেন নাট্যজন মুজিব বিন হক, আনোয়ার সেলিম, সীতেশ ধর, এজাজ আলম, মাসুদ সুমন, এবং রাজিয়া নাজমী।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বের শিল্পাঙ্গন নাট্যমেলার সূচনা হয় প্রতিদিন শোভাযাত্রার মাধ্যমে। শিল্পাঙ্গনের সদস্যবৃন্দ বিভিন্ন নাটকের পোশাক ও মুখোশ পরে শোভাযাত্রায় অংশ নেন। মুখোশগুলো শিল্পাঙ্গনের শিল্পীরাই এঁকেছেন যেখানে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাসনিম খান। উদ্বোধক মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে এবং শিল্পীদের কণ্ঠে ‘আগুনের পরশমনি’ গান দিয়ে নাট্যমেলার উদ্বোধন করা হয়। অতিথিকে শিল্পাঙ্গনের পক্ষ থেকে উত্তরীয় এবং সম্মাননা প্রদান করা হয়। স্বাগত বক্তব্য রাখেন শিল্পাঙ্গনের সভাপতি আমর আশরাফ এবং পরিচালক আকতার কামাল। উদ্বোধনী বক্তব্যে অতিথিবৃন্দ শিল্পাঙ্গনের নাট্যপ্রয়াসের প্রশংসা করেন এবং নাট্যচর্চার সমৃদ্ধি ও বিকাশে বিভিন্ন পরামর্শ দেন।
শিল্পাঙ্গনের নবম নাট্যমেলায় শিল্পাঙ্গনের পাশাপাশি আমন্ত্রিত নাট্যদল অংশগ্রহণ করে তাদের নাট্যপরিবেশনা নিয়ে। বিশেষ আকর্ষণ ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চন্ডালিকা’ নৃত্যনাট্যের অংশ। সমাজে বৈষম্য ও মানবতার অমর্যাদার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি খন্ডচিত্রে অংশ নেয় এ প্রজন্মের অত্যন্ত মেধাবী শিল্পী লিয়ানা মানহা ও এরিনা মানহা। নির্দেশনায় ছিলেন চুমকি মল্লিক।
নাট্যমেলায় নাট্যদল কৃষ্টি যোগ দেয় এক নিরীক্ষাধর্মী নাট্যালেখ্য ‘ইমপ্রিজনমেন্ট ৪৬৮২’ নিয়ে। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কারাবাস নিয়ে রচিত আত্মজীবনী থেকে সংকলিত অংশ উপস্থাপন করা হয়। মাসুদ সুমনের গ্রন্থনা ও নির্দেশনায় অংশ নেন তিনিসহ মাহজাবিন মুমু, লিটন ফিলিপস, শ্যাম ঘোষ, জীবন বিশ্বাস, মুক্তা ধর, শিপ্রা দে, এবং আলী আকবর। সঙ্গীত পরিচালনা করেন জীবন বিশ্বাস।
শিল্পাঙ্গন নাট্যমেলায় অংশ নেয় নন্দিত নাট্যদল ঢাকা ড্রামা। তাদের সাম্প্রতিক তিনটি নাটকের অংশবিশেষ নিয়ে একটি বিশেষ নাট্যপরিবেশনা উপস্থাপন করে ‘নাট্যকোলাজ’। গ্রন্থনা করেন গোলাম সারোয়ার হারুন। নির্দেশনা দেন গার্গী মুখার্জি এবং গোলাম সারোয়ার হারুন। নাট্যকোলাজে অংশ নেন গার্গী মুখার্জি, প্রতিমা সুমি, রেশমা চৌধুরী, গোলাম সারোয়ার হারুন, বসুনিয়া সুমন, এজাজ আলম, এবং মনিরুল হক সরকার।
বাংলা থিয়েটার নাট্যমেলায় পরিবেশন করে নাট্যজন মামুনুর রশিদের ‘মানুষ’ নাটকের আংশিক। শিরীন বকুলের নির্দেশনায় এতে অভিনয় করেন শিরীন বকুল, মোহাম্মদ কামাল, শফিউল আলম, আনোয়ার সেলিম, এবং লিটন ফিলিপস। শব্দ নিয়ন্ত্রণ করেন মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন মুজিব বিন হক।
নাট্যমেলায় শিল্পাঙ্গনের নিজস্ব প্রযোজনায় চারটি নতুন নাটক পরিবেশিত হয়। প্রথম নাটক ‘আমাদের হালখাতা’ আমাদের চারপাশের পরিচিত মানুষের কিছু খন্ডচিত্র উপস্থাপন করে। মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের রচনা ও নির্দেশনায় ‘আমাদের হালখাতা’ নাটকের অভিনয় করেন তুবা মুক্তাদির, তাসনিম খান, ফারজানা সুলতানা, এবং রুবিনা চৌধুরী। শব্দ নিয়ন্ত্রণে ছিলেন তৌফিক খান। দ্বিতীয় নাটক ‘কাঁটাতারে বিঁধে আছে লাল গোলাপ’। গল্পকার রাজিয়া নাজমীর লেখা এই নাটকে আলোবিহীন, ভালোবাসাহীন এক অন্ধকার জীবনের করুণগাঁথা উঠে এসেছে। মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের নির্দেশনায় অভিনয় করেন রাফিয়া খান নিশি, সুলতানা খানম, শফিউল আলম এবং আহ্ছান উল্লাহ। শব্দ নিয়ন্ত্রণে ছিলেন হাসিব হোসেন।
তৃতীয় নাটক ‘বেদের মেয়ে’। পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের কালজয়ী নাটকটি উপস্থাপনা করে শিল্পাঙ্গন। ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা যাত্রার অনুসরণে ‘বেদের মেয়ে’ নাটকের মঞ্চায়নের পরিকল্পনা ও নির্দেশনার দায়িত্বে ছিলেন মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। সঙ্গীত পরিচালনা করেন রাফিয়া খান, সৈয়দ ইসলাম টুটুল এবং লিটন ফিলিপস। নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন রাফিয়া খান। অংশগ্রহণ করেন শাহরুখ তাসনিম, রাফিয়া খান, সোনিয়া পান্না, সুলতানা খানম, জান্নাত সুলতানা, মৌসুমী রহমান, আফরীন খান, শিল্পী রফিক, শান্তা মনি, নুসায়বাহ কবির, শফিউল আলম, লিটন ফিলিপস, আহ্ছান উল্লাহ, মুস্তাফা মোর্শেদ, সৈয়দ ইসলাম টুটুল, স্বপন কবির, আওকাত খান, এবং মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। আলোক নিয়ন্ত্রণ করেন বাবর খাদেমী। নাট্যমেলায় শিল্পাঙ্গনের চতুর্থ নাটক ছিল ‘রক্তকরবী’। এ বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকের প্রকাশনার একশ’ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে নাটকের একটি সংকলিত উপস্থাপনা নির্মাণ করা হয়। নাট্যশিল্পী শিরীন বকুলের নির্দেশনায় এতে অভিনয় করেন শিরীন বকুল, মোহাম্মদ কামাল, রীপন শওকত রহমান, আনোয়ার সেলিম, শওকত রিমন, লিটন ফিলিপস, এবং মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। আবহ সঙ্গীত নিয়ন্ত্রণ করেন নাজিহা বুশরা। আলোক পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ করেন বাবর খাদেমী।
শিল্পাঙ্গন নাট্যমেলার তত্ত্বাবধানে ছিলেন রাহাত হোসেন, আমর আশরাফ, ফালাহ আহামেদ, এবং আকতার কামাল। উপস্থাপনায় ছিলেন সামিনা আশরাফ, মাহনাজ হাসান, ইশরাত আহামেদ, শাহপার ইসলাম, শাহীণূর শাণূ, নাজনীন মির্জা, সাবরিনা হোসেন, এবং সোনিয়া হক। শব্দ ও আলো নিয়ন্ত্রণ করেন সায়েম। পরিকল্পনা, গ্রন্থনা ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম।
