ট্রাম্পের নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী তারেক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরঃ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে নিউইয়র্কে সমবেত বিশ্বনেতাদের সম্মানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফাস্টর্ লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান। বুধবার লোটে নিউইয়র্ক প্যালেস হোটেলে নৈশভোজটি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে ১৪৫টি দেশের নেতা ও তাঁদের স্ত্রী বা স্বামীরা অংশ নেন।

এর আগে একই দিনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের জন্য প্রাতরাশের আয়োজন করেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তারেক ও জুবাইদাও সেখানে অংশ নেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে তারেক নিউইয়র্কে আসেন ২১ সেপ্টেম্বর। ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই সমাবেশে এটিই তাঁর প্রথম উপস্থিতি। তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। সরকারপ্রধান হিসেবে এটিই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ।

তাঁর নিউইয়র্ক সফরসূচিতে জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট ও অন্যান্য বৈশ্বিক বিষয় নিয়ে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও অনুষ্ঠান, পাশাপাশি বিদেশি নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও হয়।

প্রধানমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। সেখানে বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের উপায় নিয়ে দুই পক্ষ আলোচনা করে।

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা সম্পর্কিত বৈঠকে যোগদান

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত  ‘হাই লেভেল মিটিং টু এড্রেস দ্য  এক্সিসটেনশিয়াল থ্রেটস পোজড বাই সি—লেভেল রাইজিং’  শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বক্তব্য দিয়েছেন।

বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় ও দ্বীপরাষ্ট্রসহ জলবায়ু—ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সৃষ্ট বহুমাত্রিক ও অস্তিত্বগত হুমকির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ, ন্যায়সংগত অর্থায়ন, অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও বাংলাদেশ এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা জোরদার, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় সুরক্ষায় বিনিয়োগ।

জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পানি সংরক্ষণে পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া, তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকীকরণ এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্যের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে বাংলাদেশের অগ্রসর হওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব শিল্প ও পরিবহন ব্যবস্থার প্রসার, জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলা এবং বন, জলাভূমি ও ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় কাজ চলছে।

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

দুই প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

জাতিসংঘসহ বহুপাক্ষিক ফোরামে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার এবং অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সমন্বয় বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।

মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক দাতব্য, জনহিতকর ও মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নিয়েছেন।

বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় জনহিতকর ও মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এর মধ্যে গেটস ফাউন্ডেশন, ভিসা ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) এবং রোটারি ইন্টারন্যাশনালসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বৈঠকের মাধ্যমে চলমান ইউএনজিএ অধিবেশনের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক মানবিক সংকট, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন উদ্যোগে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রোডম্যাপ দেওয়ার আহ্বান 

বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত হয়ে থাকুক। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দৃঢ় প্রতিশ্রুতির সাথে এগিয়ে আসতে হবে। রোহিঙ্গাদের জীবনের গল্প যেন আর নিপীড়নের না হয়ে ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার আলো হয়ে ওঠে।

রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক সাইড ইভেন্টে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল সোয়া ১১টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সম্মেলন কক্ষে বৈঠকটি শুরু হয়। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় এই আলোচনার আয়োজন করা হয়। বৈঠকের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—‘দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের নতুন আহ্বান’। বৈঠকে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক ও সামাজিক—অর্থনৈতিক চাপ বাংলাদেশের পক্ষে অনির্দিষ্টকাল বহন করা আর সম্ভব নয়। সংকটের মূল উৎপত্তি মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। রাখাইনে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ তৈরিতে বিশ্বনেতাদের অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী আয়োজনের জন্য গাম্বিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সহযোগী দেশগুলোকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বহু দশক ধরে মিয়মানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার। ১৯৭৮ ও ১৯৮০—এর দশকে আসা রোহিঙ্গাদের শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে সফলভাবে প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল। তবে ২০১৭ সালের চরম সহিংসতার পর পরিস্থিতি ইতিহাসের জটিলতম রূপ নেয়।

প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বিগত নয় বছর ধরে বাংলাদেশ ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। দিন দিন মানবিক এই বোঝা আরও ভারী হচ্ছে। শরণার্থী শিবিরে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করায় অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন এক প্রজন্ম গড়ে উঠছে। বাংলাদেশ তাদের খাবার, চিকিৎসা এবং প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে শিক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই শিবিরগুলো বাসযোগ্য পরিবেশ নয়।

গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও মার্ক সুজম্যানের বৈঠক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক সুজম্যান। মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর হোটেলে উচ্চপর্যায়ের এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে জনস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান কর্মসূচি, সাশ্রয়ী ভ্যাকসিন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব এ কে এম নাজমুল হক এ তথ্য জানান।

তিনি জানান, বৈঠকে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি সম্প্রসারণ, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও তাদের প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষিত এসব স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমন্বিত ‘ডিজিটাল পাবলিক হেলথ কেয়ার সিস্টেম’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েও ফলপ্রসূ মতবিনিময় হয়।

তারেক রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয়ের ৩৪তম তলায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই নেতা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং দুই দেশের জনগণের কল্যাণে সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়ে গঠনমূলক মতবিনিময় হয়।

দুই প্রধানমন্ত্রী পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমঝোতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বৈঠকে উভয় পক্ষ অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে নিয়মিত যোগাযোগ ও সংলাপ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে।

Related Posts